সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
অষ্টম অধ্যায়
রেশম ব্যবসা এবং রেশম শিল্প
উৎপাদন এবং সংগঠন
প্রথম চরণেই স্পিনারেরা গুটি থেকে পুটনি বা পাটনি নামক সুতো বার করে। এই সুতো মিহিও হয় একটু মোটাও হয় (ঐ ১৫-১৬ পাতা)। স্পিনারদের দক্ষতা সম্বন্ধে যা বলে গিয়েছেন সেটা মনে হয় খুব একটা বাড়াবাড়ি ছিল না — The women wind off raw silk from the pod of the worm. A single pod of raw silk is divided into twenty different degrees of fineness; and so exquisite is the feeling of these women, that whilst the thread is running through their fingers so swiftly that their eyes can be of no assistance, they will break it off exactly as the assortments change, at once from the first to the twentieth, from nineteenth to the second. (Orme, Historical Fragments, p. 412.)। ১৮০৭ সালের আশেপাশে বুকানন গুটি থেকে সুতো বার করার যে প্রযুক্তি সম্পর্কে লিখছেন সেটি থেকে মনে হয় এই কাজটি মূলত মহিলাদের একচেটিয়া ছিল (F. Buchanan, Bhagalpur, p. 613.)।
বাংলার রেশম উৎপাদনের তিনটি মরশুম ছিল, যার নাম ছিল বন্দ। নভেম্বরের বন্দে সব থেকে ভাল রেশম উৎপাদন হত। পরের উৎপাদনের মরশুম হল মার্চ বন্দ রেশম এবং এর পরেরটি জুলাই বন্দ রেশম যা মোটামুটি একটু মোটাই। নভেম্বরের বন্দে সব থেকে ভাল পরিমানে সুতো উৎপাদন হবার কারণ ছিল, গুটিগুলি শীতের আমেজে তুঁত গাছের পাতাগুলি খুব নরম হত ফলে গুটিগুলি এই পাতাগুলি খেয়ে খুব ভাল রেশম সুতো উৎপাদন করত। আবহাওয়া যত গরম হতে থাকত তুঁত গাছের পাতাগুলো ততই মোটা আর খড়খড়ে হত এবং গুটি সে সব মোটা পাতা আর ভালভাবে খেত না ফলে সুতোর গুণমানও ভাল হত না। ফলে শীতের রেশম সুতো যে দাম পেত মার্চ বা জুলাইএর রেশম সুতো সেই দাম পেত না। জুলাই-এর রেশমের আরেকটি সমস্যা হল বর্ষাকালের বর্ষা, ঝড় আর তাপের প্রভাবে সুতোর গুণমান অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেত। ফলে তিনটি বন্দের মধ্যে জুলাইএর বন্দটি খুবই কম দাম পেত।
আমাদের এই আলোচনা থেকে পরিষ্কার রেশমের সুতোর গুণমান আর পরিমান উভয়ই নির্ভর করত আবহাওয়ার ওপর। তাই প্রত্যেক বছর এক পরিমান রেশম উৎপাদন হত না, আবহাওয়ার বদল ঘটলে সেই প্রভাব উতপাদনের পরিমানের ওপরে পড়ত, ফলে প্রত্যেক বছর রেশম সুতোর দাম ওঠানামা করত এবং তীব্র প্রতিযোগিতাময় বাজারে কম উৎপাদন হলে সুতোর চাহিদা আর দামও বাড়ত। ১৭৫৫ সালে ডাচ কুঠিয়াল Jan Kerseboom লিখছেন প্রথম দুটি বন্দের পরিমান ছিল বাংলার রেশম উতপাদনের দুয়ের তিন অংশ এবং এগুলি গুদামে রেখে দিলেও ফিলামেন্টগুলি তার ঔজ্জ্বল্য এবং সফটনেস এবং হলুদ রং কোনটাই হারাত না (voe, vol. 2849, f.119 vo-110.)। তিনি অবশ্য রেশম উতপাদনের চার মরসুমের কথা বলেছেন, বৈশাখী বন্দ (এপ্রিল মে’র উৎপাদন), আষাড়ী বন্দ (জুন জুলাইএর উৎপাদন), শাওনী বন্দ (আগস্টের উৎপাদন), এবং শেষমেশ আশ্বিন বন্দ (সেপ্টেম্বর অক্টোবরের উৎপাদন) (ঐ ১১০ পৃ)। অন্য দিকে অস্টেন্ড কোম্পানির কুঠিয়াল আলেকজান্দার হিউম ১৭৩০ সালে একটা অতিরিক্ত বন্দ-এর কথা লিখছেন। তিনি বলছেন বাংলার পাঁচটা মরশুমে রেশম উৎপাদন হয় — ভাল রেশমের নাম অগ্নি। এট নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উতপাদিত হয়। অন্যান্য মরশুম হল চৈতা (মার্চ), বৈশাখী (এপ্রিল, মে), আষাঢ়ী (জুন), শাওনি (জুলাই), এবং আশ্বিনী (সেপ্টেম্বর) (Stadsarchief Antwerp, GIC 5769)। আগে উল্লেখ করেছি প্রথম তিনটি মরশুমের উৎপাদন ছিল প্রধান এবং দামি পরেরগুলি হয়ত তার সাব-ভ্যারাইটি।
আমরা সে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই অষ্টাদশ সময়ের প্রথম পাদে দুই প্রকারের কোরা রেশম ডাচ কোম্পানি রপ্তানি করত তান্নি (tanny) এবং তান্নাবান্না (tannabanna)। এই কোরা রেশম উতপাদিত হত pattany পাত্তানি ফিলামেন্ট থেকে আর তান্নিটি ছিল রেশম সুতোর মধ্যে সব থেকে গুণমানে উঁচু এবং উৎপাদন করতে অনেক বেশি গুটি প্রয়োজন হত (Om Prakash, Dutch Company, p.55.)। ব্যবসার প্রথম দিকে ডাচ কোম্পানি রপ্তানি করত মূলত তান্নাবান্না রেশম। এর আবার তিনটি ভ্যারাইটি কাবেসা, বারিগা আর পি cabessa, bariga and pee যার মানে ব্রিটিশ খাতায় লেখা আছে মাথা, পেট আর পা। তান্নি ভ্যারাইটির রেশম প্রথম ডাচেদের খাতায় উল্লেখ পাচ্ছি ১৬৭৬ সালে, তার পর থেকে এটিই বাংলা রেশম উতপাদনের প্রধান রপ্তানি পণ্য হয়ে ওঠে (Glamann, Dutch Asiatic Trade, p. 124)। ১৭৩০ থেকে মধ্য অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ডাচ রপ্তানি তালিকায় তান্নি রেশমই ছিল সব থেকে বেশি পরিমানে পাওয়া যাওয়া ভ্যারাইটি। এই সময়ে আরেকটি ভ্যারাইটি রপ্তানি করত ডাচেরা যার নাম adapangia এবং ডাচ খাতায় যাকে বলা হয়েছে kleene gestrengde (short skein) এবং তানা-বানার ভ্যারাইটিটির নাম ছিল groote gestrengde’ (long skein)। ডাচেদের রপ্তানি তালিকায় আরও একটি ভ্যারাইটি ছিল তার নাম mochta রেশম (যতদূর সম্ভব এটি আধা রেশম বা যাকে আমরা আজ জানি মটকা হিসেবে)।
কাশিমবাজারে উতপাদিত দামি কোরা রেশমটির ভ্যারাইটিটির নাম ছিল গুজরাট, যতদূর সম্ভব বাংলার রেশম বাজারের প্রধানতম ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নামে। ১৭৩০এর দশকের আগে ব্রিটিশেরা বেশি পরিমানে গুজরাট রেশম রপ্তানি করে নি। ব্রিটিশেরা খুব বেশি গুজরাটি প্রজাতি নিত না কারণ তাদের মনে হয়েছিল তাদের throwsters-রা এত মিহি পণ্য পছন্দ করবে না ফলে তাদের চাহিদা মত লাভ হবে না। কিন্তু ১৭৩৫এর পর গুজরাটি রেশম ইংলন্ডের ক্রেতাদের কাছে এতই চাহিদাবন্ত হয়ে পড়ে যে কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স বাংলার কুঠিয়ালদের কোম্পানির কোম্পানির আমলাদের গুজরাটি রেশমের ব্যক্তিগত ব্যবসা বন্ধ করে সেগুলি কোম্পানির নামে তুলতে নির্দেশ দেয় (DB, vol. 106, para 31, f.411, 31 January 1735)। এটাও হতে পারে ইংলন্ডের গুজরাটির মিহি ভ্যারাইটির রেশমের চাহিদা বাড়ার একটা কারণ অষ্টাদশ শতকের প্রথমপাদে সেখানকার কারিগরদের উন্নত রিলিং প্রযুক্তির বিকাশ ঘটা (K.N. Chaudhuri, Trading World, p. 349)। কিন্তু বাংলা থেকে যত প্রজাতির রেশম রপ্তানি ঘটত তার মধ্যে গুজরাটি রেশম খুব উচ্চ পরিমানের ছিল না। ব্রিটিশেরা অষ্টাদশ শতকের তিনের দশকের পরের দশকগুলিতে কুমারখুলি আর রংপুর রেশম রপ্তানি করতে থাকে। তারা কুমারখালি এবং রংপুরের নভেম্বরের বন্দটির বরাত গুজরাটির তুলনায় অনেক বেশি পরিমানে দিত। ১৭৩৩ সালের কাশিমবাজারের রেশম কুঠিয়ালদের সঙ্গে রেশম ব্যবসায়ীদের যে চুক্তি হয় সেই চুক্তি অনুযায়ী আমরা সে সময়ের রেশমের নানান ভ্যারাইটির সে সময়ের বাজার দর পাই (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 5, Consults. 7 March, 19 March, 3 Sept. 1733; 28 Jan., 6 Maren 1740.)
নভেম্বর বন্দ : ২৪০০ মন প্রতি সের ৫ টাকা ১২ আনা দরে
গুজরাট : ৭৮০ মন ৬ টাকা ৬ আনা সের দরে
কুমারখালি : ৬০০ মন ৫ টাকা ২ আনা সের দরে
রংপুর : ৮০০ মন ৪ টাকা ৬ আনা প্রতি সের
মোট : ৩৫৮০ মন
যদিও কুমারখালি ভ্যারাইটিটি নভেম্বর বন্দ এবং গুজরাট ভ্যারাইটি থেকে একটু মোটা, তাই এটি ইংলন্ডে রপ্তানি হওয়া অন্য ভ্যারাইটিগুলি থেকে বেশ সস্তা দরে পাওয়া যেত। ১৭৪০ সালের কাশিমবাজার কাউন্সিল কুমারখালির ১৮০০ মন, নভেম্বর বন্দ ১৩৫০ মন, গুজরাট ৪২০ মন এবং ১৫০ মন রংপুর রেশমের চুক্তি করে। ১৭৪১ সালে রেশমের বিনিয়োগ ৩৭২০ মন থেকে ২৫৯০ মনে কমে এলেও এই ট্রেন্ড চলতে থাকে। কোম্পানি কুমারখুলির ১৭২০ মন, নভেম্বরের ৯৯০ মন এবং গুজরাটের ৩৩০ মন রেশমের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয় (Ibid., 6 March, 9 March 1741)।
এমন কি ১৭৫০-এর দশকের প্রথমপাদে ১৭৪০-এর দশক থেকে চলা মারাঠা হ্যাঙ্গামের ধাক্কায় রেশম উতপাদনে বিপুল ধাক্কা লেগেছে সে সময় রেশম ক্ষেত্রে বিশেষ করে কুমারখালি এবং নভেম্বর বন্দে কোম্পানি বিনিয়োগের পরিমান বেশ কমিয়ে দেয় (Ibid., vol. 10, Consult. 17 March 1741; Beng. Letters Recd., vol. 22, para, 64, ff. 175-76; C&B. Abstr., vol. 5, f.299)। ১৭৫২ সাল থেকে গুজরাট আবার বাংলা রেশম রপ্তানি শিল্পে বিপুল স্থান করে নেয়; কাশিমবাজার কুঠি ১০০০ মন নভেম্বর বন্দ এবং ৮০০ মন গুজরাটি ভ্যারাইটির বরাত দেয় (BPC, vol. 25, f.86vo, 16 March 1752; f.127vo, 27 April 1752)। এরপর থেকে ব্রিটিশ কোম্পানির রপ্তানিতে এই দুইটি প্রধান ভ্যারাইটি হয়ে দাঁড়ায়। এর একটা কারণ হতে পারে কুমরখালি আর রংপুর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্তি সঙ্গত দামে চুক্তি করে উঠতে পারত না। এটাও বলা দরকার ১৭৫২ সালে কাশিমবাজার কুঠি কুমারখালি আর রংপুরের রেশম বণিকদের সঙ্গে চুক্তি না করার কারণ ছিল যে বণিকদের অভিযোগ ছিল তাদের লাভ হচ্ছে না thereby they gain a little (ঐ)। এমন কি ১৭৪০এর দশকেও রংপুর রেশম বরাত দেওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল। ১৭৪১ সালে কাশিমবাজার কুঠিকে চুক্তির মরশুমে পরে ঢোকা বলাই কাটমা এবং অন্যান্য রেশম ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে they chose not to meddle with this article’ and ‘those that had ever done any for the Company had always been great losers by it। রংপুরের রেশমের দাম বেড়ে যায় কারণ greatly occasioned by the Guzzeratt and Hydravad merchants who have bought up great quantities to send up [to Delhi and Agra?] with the King’s treasure। কাউন্সিল যখন রংপুর রেশম ব্যবসায়ীদের কম দামে রেশম সরবরাহ করতে বলল, তারা তাদের অক্ষমতা জানিয়ে বলল তাদের মধ্যে ছয় কি সাতজন ever traded to said aurung …and, that they ever lost very considerably by this Rangpore Silk Business (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, Consult. 9 Dec. 17 41)। শেষ পর্যন্ত কাউন্সিল এডওয়ার্ড আইলস (Edward Eyles) কে রংপুরে পাঠায় intelligence regarding prices there, procure putney and see how the price comes out by winding off putney জানতে (Ibid., Annex to Consult. 18 Jan. 1742)। ১৭৫৩তে কাশিমবাজার কুঠির রেশম বিনিয়োগ খুবই অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে — ছোট ছোট খেপে ছোট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আর কুঠি বেনিয়ান অর্থে কোম্পানির কর্মচারীদের সঙ্গে কাউন্সিল ব্যবসার চুক্তি করতে থাকে যাতে রেশম আড়ং থেকে পাটানি রেশম পাওয়া যায় কি না এবং শেষ পর্যন্ত তারা কাশিমবাজারের জনৈক জুনিয়ার ফ্যাক্টর ওয়ারেন হেস্টিংসকে বলে পুটনি আড়ঙে গিয়ে রেশম ব্যবসা সামাল দিতে (BPC, vol. 28, f. 302, 24 Nov. 1755; Fact. Records, Kasimbazar, vol. 12, Annex. to Consult. 21 Nov. 1755)। (চলবে)