সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
অষ্টম অধ্যায়
রেশম ব্যবসা এবং রেশম শিল্প
ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর রেশম বরাত
নভেম্বর বন্দ আর কুমারখালি প্রজাতির জন্যে কোম্পানিগুলি ৮০ শতাংশ এবং গুজরাট রেশমের জন্যে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম দিত (Ibid., ‘vol. 6, Consult. 21 Feb. 1744)। তবে নগদ অর্থের ঘাটতি কোম্পানিগুলির দীর্ঘকালীন সমস্যা ছিল। যে সব ব্যবসায়ী নগদে ব্যবসা করত অথবা যাদের ধার পাওয়ার সুবিধে ছিল তাদের কোম্পানি দাদন দিত না। বহু সময় কোম্পানি হাস্যকরভাবে কম দাদন দিত; ১৭৪৮ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি মাত্র ৩.২৫ শতাংশ টাকা বণিকদের দাদন হিসেবে দিয়েছিল (BPC, vol. 20, f. 303vo, 20 Jan: 1748)। কোম্পানি সওদাগরদের বিলস অব ডেট দিত, যা সওদাগরেরা নিয়ে জমা করত স্রফদের কাছে পুঁজির বিনিময়ে (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 7, Consult. 2 June 17 48; 1 Nov. 1748; vol. 10, Consult. 15 March 1751)। বহু সময় নগদ অর্থের এতই সঙ্কট দেখা দিত যে ব্যবসায়ীরা হুমকি দিত আগের বছরের অর্থ না শোধ করলে তারা আর বাজারে কোম্পানির জন্যে রেশম কিনবে না। বাধ্য হয়ে কোম্পানিরা স্রফদের থেকে অর্থ ধার করত (Ibid., vol. 7, Consult. 2June 1748; BPC; vol. 22, f. 330vo, 31 Oct. 1749)। ১৭৫০ সালে ব্যবসায়ীরা অগ্রিম অর্থ পাওয়ার জন্যে চুক্তির সময়ে প্রতি সেরে মাত্র ৪ আনা দাম কমানোর জন্যে রাজি ছিল, না হলে তাদের বাজার থেকে অনেক বেশি সুদে অর্থ ধার করতে হত (BPC, vol 16, ff. 9vol-92, 29 March 1743)। ১৭৪৩ সালের ২৯ মার্চ-এর কাশিমবাজারের বৈঠকের বর্ণনায় আমরা এই সমস্যা বুঝতে পারি In the latter end of January several of the most substantial merchants represented … that the Company’s dadney being commonly given out late in the season / and this year there being no probability of its being otherwise/ that the true and pure Novemberbuhd putney I of which but a small quantity is produced this year/ would be all bought up by other people before their dadney would be delivered out and that they must be great sufferers by employing their own money or taking it up at interest of the shroffs … (BPC, voL,16, ff. 9lvo-92, 29 March 1743)।
চুক্তির সময় রেশম-এর নমুনা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হত, যদিও পরে কোম্পানি মাল যখন বণিকদের থেকে নিত, সে সময় বহু কিছু কাটছাঁট করতে হত। মরশুমের শুরুতে চুক্তির সময় যে দাম নির্ধারিত হত, পরের দিকে দাম বাড়লেও ব্যবসায়ীকে সেই চুক্তিবদ্ধ দামে পণ্য কোম্পানিকে সরবরাহ করতে হত। ব্যবসায়ীদের মরশুমের মধ্যে উৎপাদন নানান কারণে ব্যহত হলে দাম বাড়ত, কিন্তু তাকে কোম্পানিকে সেই পুরোনো কম দরেই পণ্য সরবরাহ করতে হত। ১৭৪৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কোম্পানি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট দামে চুক্তিবদ্ধ হলেও, কিছু মাস পরে ফেব্রুয়ারিতে জানায় যে দাম না বাড়ালে তাদের পক্ষে চুক্তি মান্য করা সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে কাশিমবাজার কাউন্সিল যে বৈঠক করে, সেই বৈঠকের বর্ণনায় বাংলার রেশম বাজারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, We told them the price being already agreed, it was, not in our power to alter it, and if they would not undertake the investment we must look out for other merchants that would, to which they replied we might do as we pleased, but they were sure no merchants could contratt cheaper than themselves, who had been bred up in silk business from their childhood, but that they could not give us theier labour without some profit of which they saw no prospect at … the price we kept…. (Fact. Records, Kasimbazar, vol : 7, Consult. 19, Jan., 28 Feb. 1745)।
এই বৈঠক প্রস্তাবনা থেকে পরিষ্কার কাশিমবাজারের কুঠিতে যুক্ত থাকা বণিকদের মধ্যে পেশাদারি বিশেষজ্ঞতা গড়ে উঠেছিল। বিশেষ বিশেষ ধরণের রেশম প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা বণিকেরা একমাত্র লাভের ইঙ্গিত থাকলেই চুক্তিবদ্ধ হত। বণিকদের মধ্যে জোট গড়ে ওঠাটাও কাশিমবাজার কুঠির ব্যবসা জগতের স্বাভাবিক প্রবণতা। কাশিমবাজারের কুঠির সঙ্গে জুড়ে থাকা রেশম ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাটমারা ছিল প্রধানতম ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। কলকাতায় উঠে আসার আগে, ত্রিশ বা চারের দশকে কোম্পানিকে কাটমারা তাদের মোট চাহিদার অধিকাংশ রেশম সরবরাহ করেছে। কোম্পানির দালাল বা চিফ মার্চেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হত এই পরিবারের সদস্য। হাতু কাটমাকে কেন নিযুক্ত করা হয়েছে এই যুক্তি দেখিয়ে। ১৭৩১ সালে কোম্পানি লিখছে, … the necessity of their affairs greatly requiring such a person to make proper dispositions for beginning their investment and this being the properest time for buying the Novemberbund silk … they confirmed him as broker(BPC, vol. 8, f. 337, 4 Jan.T731)। তার উত্তরাধিকারী বলাই বা বলরাম কাটমা ১৭৩৭ সালে মধ্যস্থ নিযুক্ত হয় এবং তার উত্তরাধিকারীর পথ বেয়ে তার অধীনে থাকা বণিকদের মাধ্যমে কোম্পানির রেশম ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নিশ্চিত করত। কাউন্সিল কলকাতাকে ১৭৩৯ সালে লিখে জানাল বলাই অন্যান্য রেশম ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ছিল। অধিকাংশ ব্যবসায়ী যখন মার্চ বন্দের দাম কমাতে অস্বীকার করে চুক্তিমত রেশম সরবরাহ করতে অস্বীকৃত হচ্ছে, সেই সময়ে বলাই নিজে মোট সরবরাহের এক চতুর্থাংশ সরবরাহ করে ব্যবসায়ীদের গোষ্ঠীবদ্ধতা ভাঙতে সাহায্য করেছে। কাউন্সিলের খাতায় আমরা পাচ্ছি, ১৭৪০ সালে বলাই উদ্যোগী হয়ে দাম কমাবায় এবং তার সরবরাহ করা পণ্য অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশি গুণমানের ছিল (Ibid., vol. 14, f. 47, 4 Feb. 1740)। তাকে যখন নবাব কারারুদ্ধ করেন, কাউন্সিল তখন হতাশ হয়ে পড়ে তাকে জানায় তার পরিবারের কেউ the remainder of our silk and silk piece-goods সরবরাহ করেন। কাটমাদের ওপর কোম্পানির সম্পূর্ণ নির্ভরতা প্রকাশ পায় কাশিমবাজারের এই কন্সালটেশনে … for if some of-that family will not assist us on this occasion, we find it on several Tryalls impossible to get any of our other merchants to agree for more silk or piece-goods (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 6, Consult. 10 March 1742)।
প্রথম দিকে কাউন্সিল তাদের রেশম ব্যবসায় ব্যবসায়ীদের থেকে দাদন দেওয়ার জন্যে অগ্রিম জামিন নিত না। ১৭৪১ সালে কোম্পানি কোরা রেশম সরবরাহের জন্যে চুক্তিবদ্ধ ২৫ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন ব্যবসায়ীর থেকে ঠিকঠাক অগ্রিম নেয় কারন the rest being substantial persons (Ibid., vol. 6, Consult, 5 March 1741)। কিন্তু কোর্ট অব ডিরেক্টর্স কাশিমবাজার কাউন্সিলের এই দাবি মানে না এবং ফোর্ট উইলিয়ামকে লেখে … this is by no means satisfactory, the more substance a man has he may the readier produce Bonds/Men, and … it [is] necessary to take security of every one of your Merchants (DB, vol. 108, f. 624, para. 56, 4 Feb. 1743)। মোটামুটি জানা যায় ১৭৪৪-এর পর থেকে কাশিমবাজার কাউন্সিল প্রায় সব ধরণের ব্যবসায়ীর থেকে দাদনের জন্যে অগ্রিম জামিন দাবি জানায় এবং একই সঙ্গে লেখে as this method is entirely new to them, it occasions a delay in settling their investment (BPC, vol. 17, f. 15vo, 23 Feb. 1744)। তবে বলা দরকার কাশিমবাজারের ব্যবসা বৃত্তে অগ্রিম জামিন দিয়েও পণ্য সরবরাহের নিশ্চিত করা যেত না, ব্যবসায়ীর জামিন হিসেবে যে ব্যক্তি দাঁড়াত, নবাব দরবারে তার জোরদার যোগাযোগের সূত্রে কোম্পানির রক্ত চক্ষু এড়াতে সক্ষম হত। এই তত্ত্বটা আমরা প্রমান করতে পারি জনৈক রেশম ব্যবসায়ী দেবীপ্রসাদের ঘটনায়, যার জামিন হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন রামকৃষ্ণবাবু ১৭৫৩ সালে। কাশিমবাজার কাউন্সিলের সদস্যদের মনে ব্যবসায়ী দেবীপ্রসাদের স্বচ্ছলতা বিষয়ে দ্বিধা দেখা যাচ্ছিল। যে দাদন দেবীপ্রসাদ নিয়েছে, সেই পরিমান দাদন সে বাজারে বিনিয়োগও করে নি, বা কোম্পানিকে ফেরতও দেয় নি। ৭ সেপ্টেম্বর ১৭৫৩ সালে কোম্পানি তাকে কুঠিতে বন্দী করে রেখে তার জামিন রামকৃষ্ণবাবুকে খবর পাঠিয়ে বলে দেবীপ্রসাদের থেকে যে টাকা কোম্পানি পায় সে টাকা যেন কোম্পানিকে রামকৃষ্ণবাবু ফেরত দিয়ে যায় (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 12, Consult. 16 Aug., 6 Sept., 7 Sept. 1753)।
রামকৃষ্ণ নিজে কোম্পানির রেশম ব্যবসায়ী এবং নবাবের দরবারের প্রভাবশালী আমলা চৈন রায়ের দত্তক পুত্র। রামকৃষ্ণ কোম্পানির কুঠির কাউন্সিলে গিয়ে বলেন, সত্য তিনি দেবীপ্রসাদের জামিন ছিলেন, কিন্তু বলেন যে অন্য কোন মানুষের ব্যর্থতার দায় তার ওপর বর্তায় না, he does not think himself answerable for another person’s deficiency। কাউন্সিল তাকেও অন্তরীণ করে রাখে যতক্ষণনা দেবীপ্রসাদকে দেওয়া অগ্রিম সে ফেরত দিচ্ছে till he gives some security। কিন্তু রামকৃষ্ণও চুপচাপ বসেছিল না, কোম্পানিকে দরবারি উকিল জানাল যে রামকৃষ্ণ তার মুক্তির জন্যে জোর চেষ্টা করছে by means of his friends at the Durbur। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রভাবশালী পাচোত্রা দারোগা হাকিম বেগের অধীন কর্মচারী কিশনদেব কাউন্সিলকে জানাল রামকৃষ্ণের বিষয়ে রাজা কিরিটচাঁদ, দেওয়ান এবং তার অধীনস্থ উমিদ রায় এবং মুস্তাদিদের থেকে প্রবলভাবে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। তিনি কাউন্সিলকে স্পষ্টভাবে তার আশংকার কথা জানিয়ে বললেন, নবাব নিজে এই বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন এবং দু-একদিনের মধ্যে যদি তাকে ছাড়া না হয়, তাহলে নবাবের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ কুঠিতে সেনা পাঠানোও হতে পারে।
তিনি কোম্পানিকে পরামর্শ দিলেন রামকৃষ্ণকে যেন তারা তার অধীনে কাজের জন্যে দেয় যাতে এই ধরণের ঘটনা না ঘটে। হয় কাউন্সিল বেশ ভয় পেয়েছিল বা তাদের হয়ত সুবুদ্ধি উদয় হয়, তারা রামকৃষ্ণকে কিশনদেবের হাতে তুলে দেয় এবং কিশনদেব কাউন্সিলকে জানায় যে সে খুব তাড়াতাড়ি রামকৃষ্ণর থেকে জামিন অর্থ উদ্ধার করে কিছু দিনের মধ্যেই তাকে ডাকলে সে কাউন্সিলের সামনে উপস্থিত হবে (Ibid., vol. 1, Consults. 12 Sept., 19 Sept., 24 Sept., 1753)। এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার, আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করছি, সেই সময়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শাসকদের অভিজাত মহলে বেশ ভালই যোগাযোগ ছিল। (চলবে)