| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন — এইটিনথ সেঞ্চুরি বেঙ্গল : সুশীল চৌধুরী, (৬ষ্ঠ কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৬০১ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৩

সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা

দুই.তিন. অর্থনৈতিক পরিবেশ

বাংলা সুবায় ইওরোপিয় কোম্পানি ১৭২০-৫৭

অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে যে কটা ইওরোপিয় কোম্পানি বাংলা থেকে বিপুল রপ্তানি বাণিজ্যে অংশ নিয়েছে, তাদের মধ্যে সামনের সারিতে ছিল ডাচ আর ব্রিটিশ। দুই কোম্পানিই প্রায় একই সময়ে মধ্য সপ্তদশ শতকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যকর্ম শুরু করে। কেপ হয়ে এশিয়া আসার রাস্তা আবিষ্কারের পরে ইওরোপ আর এশিয়ার সরাসরি যোগাযোগের বাণিজ্য রাস্তা খুলে যায়। ষোড়শ শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজদের উদ্যমে এশিয়া-ইওরোপে বিপুল বিশাল ব্যপ্ত মশলা ব্যবসা দুই উপমহাদেশের ব্যবসা চিত্র পাল্টে দিল। ইওরোপে মশলার অসীম চাহিদা আর সেই ব্যবসায় বিপুল লাভের হাতছানিতে ১৬০০-য় তৈরি হল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ১৬০২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ভিওসি)। এরপরে তৈরি হল ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফরাসিরা বাংলা ব্যবসা শুরু করে ১৬৮০ নাগাদ। অষ্টাদশ শতকে বাংলায় অস্টেনড (জার্মান) এবং ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুবই সীমিতভাবে ব্যবসা শুরু করে। অষ্টাদশ শতকের প্রথম সময়ে ডাচ আর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানির তুলনায় বাংলা নির্ভর রপ্তানি ব্যবসায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ডাচ আর ব্রিটিশদের বিপুল ব্যবসা করার ক্ষমতা অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানির ব্যবসাকে ম্লান করে দেয়। ব্যতিক্রমী কুশলী ফরাসী কুঠিয়াল ডুপ্লে নেতৃত্বে ফরাসীরা ১৭৩০-এর দশকে প্রতিযোগী দুই ইওরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিপুল ব্যবসাজাল ফেঁদেতোলে।

তিন.এক. এশিয়া ব্যবসায় কোম্পানিগুলির অংশিদার

শুরুর দিকে ডাচ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উভয়েই ইস্ট ইন্ডিজ [আজকের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া — অনুবাদক] অঞ্চলের তথাকথিত মশলা দ্বীপপুঞ্জগুলো থেকে বিশেষ করে ইন্দোনেশিয় উপদ্বীপগুলি থেকে মশলা কিনে ইওরোপে বিপুল লাভে বিক্রির পরিকল্পনা করে। নতুন বিশ্ব থেকে লুঠ করা রূপো নিয়ে মশলা চাষের দ্বীপগুলি থেকে মশলা কিনতে গেল ইওরোপিয় কোম্পানিরা। দামি ধাতু হাতে নিয়ে মশলা দ্বীপগুলোয় পৌঁছে অবাক হয়ে দেখল, মশলা কিনতে দামি ধাতু রুপো নয় চাই শস্তার ভারতীয় কাপড় — তার নাম ক্যালিকো। মশলা দ্বীপগুলোয় ক্যালিকো কাপড়ের আকাশ ছোঁয়া চাহিদা। ইওরোপিয় কোম্পানিরা ভারতবর্ষের দিকে মুখ ফেরাল শস্তা মোটা খসখসে সুতির কাপড় কেনার জন্যে। উদ্দেশ্য ক্যালিকোর বিনিময়ে তারা ইন্দোনেশিয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে মশলা কিনবে। তখনও তারা বাংলার দিকে মুখ ফেরায় নি। তাদের প্রাথমিক কাজ হল করমণ্ডল উপকূল থেকে চাহিদামত মোটা সুতির কাপড় কিনে, তার বিনিময়ে মশলা দ্বীপপুঞ্জ থেকে বিপুল মশলা কিনে ইওরোপের বাজারে উচ্চলাভে বিক্রি করা। ইতিমধ্যে করমণ্ডল এলাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরুপদ্রবে চাহিদামত কাপড় পাওয়া যেমন সমস্যা তৈরি হল, তেমনি কাপড়ের দাম আকাশ ছুঁতে চলল। মন্বন্তর, যুদ্ধ বিগ্রহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ছেয়ে গেল দক্ষিণাঞ্চল [যাকে আজ আমরা দাক্ষিণাত্য বলি, বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণের অংশটুকু – অনুবাদক]। এই অঞ্চলের উতপাদনে রাজনৈতিক অস্থিরতা ধাক্কা মারায় মোটা কাপড় সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে উঠল। মশলা কেনার জন্যে মোটা কাপড়ের নতুন সরবরাহ অঞ্চল খোঁজ করতে গিয়ে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর নজর পড়ল বাংলা ভূখণ্ডে। সমীক্ষা চালিয়ে তারা বুঝল [ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় ব্যবসা করতে আসার ইন্টারেস্টিং ইতিহাস সুশীল চৌধুরী বিশদে লিখেছেন, তার জীবনের প্রথম গবেষণা পত্র ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানাইজেশন অব বেঙ্গল বইতে। এই বইও অনুবাদ করেছি। প্রস্পারিটি… ধারাবাহিক শেষ হলে ঐ বইটির অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করব — অনুবাদক]। কোম্পানিগুলো বুঝল বাংলায় ব্যবসা করলে অনেকগুলো অতিরিক্ত সুবিধে পাওয়া যায়। বাংলা শুধু বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শস্তার বস্ত্র, বিশ্বের সব থেকে বেশি পরিমানে বস্ত্র, সব থেকে দামি সুতি বস্ত্র উৎপাদন করে না, একই সঙ্গে এই ভূখণ্ড বিশ্ব বাজারের সর্বশ্রেষ্ঠগুণমানের রেশমি সুতোর সঙ্গেও সমানতালে পাল্লা দেয়। এখানে বিপুল পরিমানে রেশম উতপাদন হয়। ডাচ আর ব্রিটিশ কর্পোরেটদের উদ্যমে বাংলার রেশম ইওরোপিয় বাজারে পৌঁছলে, চোখের পলকে ইতালিয় আর ফারসি রেশম সুতো বিশ্ব বাজার থেকে হঠে গেল [এর পর প্রায় পলাশী পর্যন্ত বাংলার রেশমের জয়যাত্রা চলবে বিশ্ব বাজারে — অনুবাদক]। পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মত ব্যবসার জন্যে তৃতীয় যে পণ্যটা ইওরোপিয়রা পেয়েগেল, সেটি ছিল বাংলা সুবার সরকার সারনের সোরা। যুদ্ধে যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইওরোপে সাম্রাজ্য বাড়ানোর কাজে বারুদ তৈরিতে অতিপ্রয়োজনীয় একটি উপাদান ছিল সোরা। এছাড়াও ইওরোপে বাংলা ভূখণ্ড থেকে যেসব জাহাজ যেত তাদের খোলে ব্যালাস্ট হিসেবে ভারি পণ্য ভর্তি করতে সোরাকে ব্যবহার করা হল (S. Chaudhuri, Trade and Commercial Organization, pp. 11-16)।

এই প্রেক্ষিতটি নজরে নিয়েই ডাচ আর ব্রিটিশেরা ১৬৫০-এর দশকে বাংলায় কুঠি তৈরি করে। আশ্চর্যের নয়, দুটো ইওরোপিয় কোম্পানির কুঠিই বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবসাকেন্দ্র বন্দর হুগলিতে তৈরি হল। হুগলি সে সময়ের বাংলার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণতম বন্দর। মধ্য সত্তর দশক থেকে বাংলার থেকে দুটি কোম্পানিরই এশিয় রপ্তানি ব্যবসা শৃঙ্গের দিকে উঠতে শুরু করবে। ১৬৭০-এর দশকে বাংলার রেশম রপ্তানিতে জোয়ার আসে। রেশম ব্যবসা আশির দশকে আরও বড় হয়ে ওঠে ইওরোপের প্রতিযোগিতাময় বাজারে বাজারে বাংলার রেশমের গুণমান পরীক্ষিত হওয়ায়। আশির দশক থেকেই ইওরোপিয় কোম্পানিরা বাংলার পণ্য নিয়ে এশিয় ব্যবসায় বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। তারপর থেকে বাংলা হয়ে উঠবে এশিয়া থেকে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির সব থেকে বড় ব্যবসা অংশিদার। মূলত ইওরোপিয় ব্যবসা করত ডাচ আর ব্রিটিশ কোম্পানিই। ১৬৮০-র পর থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত সাত দশক জুড়ে এই দুটি ইওরোপিয় কোম্পানিই বাংলার আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণতম ভূমিকা পালন করেছে (Om Prakash, Dutch Company, p. 8 Kristof Glamann, Dutch Asiatic Trade, P144)।

আজ একথা মনে রাখা দরকার ইওরোপি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এশিয় ব্যবসা হিসেবে যে মশলা ব্যবসা শুরু হয়েছিল ইন্দোনেশিয় দ্বীপুঞ্জের মশলা ইওরোপে বিক্রির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মাধ্যমে, পরের কয়েক দশকে সেই ব্যবসার চরিত্র সম্পূর্ণ হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ হবে। শুরুর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের চরিত্র বদল হয়ে ত্রিপাক্ষিক চরিত্রের ব্যবসা হয়ে আবির্ভূত হল — ক। বাংলা ইওরোপ ব্যবসা, খ। ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে (শস্তার মোটা কাপড়) ব্যবসা এবং গ। মশলা দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ব্যবসা (যেখানে ভারতীয় বস্ত্র বিনিময় করা হত মশলার সঙ্গে এবং সেই মশলা উচ্চদামে বিক্রি করা হত ইওরোপে)। শেষ দিকে এই ব্যবসা আবার পুরোনো দ্বিপাক্ষিক চরিত্রে ফিরে আসবে — মূলত ইওরোপ আর বাংলার সঙ্গে ব্যবসায় রূপান্তরিত হবে। ১৬৮০-র পরের দিকে এই পার্থক্যটা চোখে পড়ার মত। বাংলা হয়ে ওঠে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির এশিয় বাণিজ্যের মূল অংশিদার। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ডাচ কোম্পানির এশিয় পণ্যমূল্যের ৪০% পণ্য যেত বাংলা থেকে। ডাচেরা যত কাপড় বিক্রি করত তার ৫০%-এরও বেশি জোগাড় করত বাংলার আড়ং থেকে। অষ্টাদশ শতের শুরুতে ডাচ কোম্পানির, শুধু উপমহাদেশিয় বাণিজ্য মানচিত্রেই নয়, এশিয় বাণিজ্য মানচিত্রে বাংলা ছিল গুরুত্বপূর্ণতম অংশিদার। একই কথা বলা যায় ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষেত্রেও। বাংলার ব্যবসাকে কোম্পানির খাতাপত্রে উল্লিখিত করা হয়েছে best flower of the Company’s garden বা the choicest jewel হিসেবে। সপ্তদশ শতকের শেষে জনৈক ব্রিটিশ কুঠিয়াল লিখলেন, Bengal is the most considerable to the English nation of all their settlements in India। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে, বাংলার সব থেকে বড় সমুদ্র বাণিজ্য অংশিদার ছিল অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ডাচ আর ব্রিটিশেরা। এই তথ্যটা আমরা পাচ্ছি জার্মান অস্টেন্ড কোম্পানির প্রধান কুঠিয়াল আলেকজান্ডার হিউমের ১৭৩০-এর লেখা নথি থেকে the English and Dutch … are the greatest traders in this country (Alexander Hume’s ‘Memoir’, Stadsarchief Antwerp, General Indische Compagnie, 5769)।

বাংলা-ইওরোপ ব্যবসার অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিল দামি ধাতুর বিনিময় করে পণ্য কেনা। বাংলায় রপ্তানি পণ্য কিনতে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে দামি ধাতুর আমদানি করতে হত। বাংলা নির্ভর যে সব এশিয় বণিক বাংলা থেকে পণ্য রপ্তানি করত, তাদেরও এই নীতি মেনেই ব্যবসা করতে হত [অর্থাৎ বাংলায় প্রত্যেক ব্যবসায়ীর জন্যের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল। বাংলা নির্ভর ব্যবসায়ীদের বাংলায় পণ্য কেনার জন্যে আলাদা সুযোগ দেওয়া হত না — অনুবাদক]। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর ধাতু ছাড়া বাংলায় আমদানি ব্যবসা তুচ্ছ পরিমান ছিল। তারা বাংলায় মূলতঃ ব্রডক্লথের মত শস্তার কাপড় আমদানি করত। কিন্তু বাংলায় ব্রডক্লথের বাজারমূল্য নগণ্য ছিল [তেমনি এই রকম কাপড়ের ক্রেতাও কম ছিল — অনুবাদক]। উল্টো দিকে সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় পাদে ডাচ কোম্পানি বাংলায় আমদানি করা অন্যান্য পণ্যের তুলনায় দামি ধাতুর অংশিদারি ছিল ৮৭.৫%। ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষেত্রেও খুব আলাদা অভিজ্ঞতা ছিল না। উপমহাদেশে আনা পণ্যের তুলনায় সোনারূপোর অংশিদারি ছিল ৭৫% (কীর্তি নারায়ণ চৌধুরীর K.N. Chaudhuri, Trading World, p. 512 থেকে ওম প্রকাশের গণনা)। আর বাংলার ক্ষেত্রে অষ্টাদশ শতকের শেষের দুশতকে দামি ধাতু আমদানির পরিমান বেড়ে হয় ৯০-৯৪% (S. Chaudhuri, Trade and Commercial Organization, p. 208.)। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করব, সেই পাঁচ দশকজুড়ে দামি ধাতু আমদানি ক্ষেত্রে, বাস্তব অবস্থার যে খুব বেশি কিছু তারতম্য ঘটেছিল বলা যাবে না। এর একটা বড় কারণ বাংলায় ইওরোপিয়দের আমদানি করা পণ্যের বাজার ছিল খুব নগণ্য।

বহু ঐতিহাসিকই বলেছেন বাংলা বাজারে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর আমদানি করা পণ্যের চাহিদার অভাবের জন্যে দায়ি বাংলা বাজারের খরিদ্দারের অনমনীয় চরিত্র বা পূর্বের মানুষদের পণ্য জমিয়ে রাখার ইচ্ছে বা খরচের অনিচ্ছে। কোনও যুক্তির জোরালো ভিত্তি নেই। সম্প্রতি কোনও কোনও ঐতিহাসিক একটা যুক্তি ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন ইওরোপের কোম্পানিগুলো এত বেশি দামে পূর্বের দেশগুলোর বাজারে মাল বেচত যে, স্থানীয় খদ্দেরদের পক্ষে সেই দামে পণ্য কেনা সম্ভব হত না, ফলে সেই সব পণ্য বিশাল পরিমানে বিক্রি হত না [the inability of Europe to supply western products at prices that would generate a large enough demand for them (Om Prakash, Dutch Company, p. 12)]। এই বিষয়টা আলোচনা করতে বাংলার বাণিজ্য ক্ষেত্রর চরিত্রটা বোঝা জরুরি। বাংলায় ইওরোপিয়রা আমদানি করত ব্রডক্লথ আর নানান ধরণের পশম দ্রব্য। যদি ধরেই নি যে এগুলি তারা এদেশের বাজারে জলের দরে বেচার কথা ভাবছে, তাহলেও অন্তত বাংলা বাজারে এই ধরণের পণ্যের জন্যে ক্রেতা পাওয়া কঠিন। তার একটা বড় কারন ছিল ভারতবর্ষীয় গ্রীষ্ম জলবায়ু। এই অঞ্চলে পশমের চাহিদা খুব বেশি হলে মরশুম নির্ভর।

কিন্তু আমরা অন্যভাবে বিষয়টা দেখতে চাইব। ইওরোপিয় দ্রব্য বাংলার বাজারে তেমন না চলার কারন ছিল এই অঞ্চলের বাজারের স্বনির্ভর চরিত্র। পণ্যগুলো প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করলেও এই বাজারে এই সব দ্রব্য বিক্রি করা খুব কঠিন। ১৭৫৭-র পলাশীর যুদ্ধের পর দামি ধাতুর বাংলায় আসা বন্ধ হয়ে যায়। এবার থেকে বাংলার রাজস্ব দিয়েই ব্রিটিশ কোম্পানি বিপুল অঙ্কের রপ্তানি পণ্য কিনত। এই সময় বাংলায় ব্রিটিশ কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানির বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি কমে যেতে থাকে [কারন বাংলায় আর নবাবি আমলের মত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড রইল না। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা বাংলার চাষী কারিগরের দেওয়া রাজস্বকে পুঁজি বানিয়ে, সেই অর্থে চাষী কারিগরের পণ্য কিনে রপ্তানি করে অসম লাভের মুখ দেখল। সে সুযোগ ছিল না ডাচ বা ডেন বা ফরাসি কোম্পানির। তাদের বাংলা বাজারে কাজ করা সমস্যা হয়ে গেল। ব্রিটিশেরা ইওরোপিয় কোম্পানিকে বাংলায় অতিরিক্ত সুযোগ করে দিল না — অনুবাদক]। সে সময় দয়েপড়া অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর একমাত্র সাহায্যকারী হয়ে দেখা দিল ব্রিটিশ কোম্পানির ব্যক্তিগত ব্যবসা করা আমলারা। নিষিদ্ধ, সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের উদ্বৃত্ত অর্থ এই কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগ করে বিল এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সেই বেআইনি অর্থ দেশে নিয়ে যেত। অব্রিটিশ ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোও আর দেশ থেকে অর্থ না নিয়ে এসে ব্রিটিশ আমলাদের উদ্বৃত্ত অর্থে বাংলায় যতটুকু সম্ভব সীমাবদ্ধভাবে ব্যবসা করেছে। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখা দরকার ইওরোপিয়রা কিন্তু শুধু একাই বাংলা বাজারে দামি ধাতু আনত না বা তারা একমাত্রই দামিধাতুর আমদানির পাত্র ছিল না; তাছাড়া তারা যে পরিমান দামি ধাতু আনত তার মূল্যও খুব বেশি ছিল না (৭ ও ৮ অধ্যায়ে বিশদে দামি ধাতু নিয়ে আলোচনা করব)। বাংলার পণ্য রপ্তানি করা এশিয় বণিকদের বাংলার নিজামতের দেওয়ানিতে দামি ধাতু জমা দিয়ে, এই ধাতুর বিনিময়ে মুদ্রা তৈরি করে রপ্তানি পণ্য কিনতে হত। এবং দেশিয় বণিকদের দামি ধাতু আনার পরিমান ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। যদিও ডুপ্লে দাবি করেছেন, বাংলার নবাব ইওরোপিয় বণিকদের আমদানি করা দামি ধাতুর ওপর নির্ভর করত। ইওরোপিয়রা এত বেশি দামি ধাতু আনত যে তারা চাইলে নবাবের ওপর খুশি মত শর্ত আরোপ করে যে কোনও সময় বন্দর বন্ধ করে দিতে পারত (I. Ray, ‘Some Aspects of French Presence in Bengal, 1731-40’, CHI, vol, I, 1976, p. 110. এই সূত্র ধরে P.J. Marshall-এর দাবি ইওরোপিয়দের অনেক বেশি দামি ধাতু আনার Bengal, p. 65)। এটা যে অত্যুক্তি সে কথা না বললেও চলে কারণ ডুপ্লে ১৭৫১-য় বুসেতে পাঠানো একটি চিঠিতে দাবি করছেন …তিন চারশ সেনা পাঠিয়ে দিলেই ফরাসীদের পক্ষে বাংলা দখল সম্ভব (Dupleix’s letter to Bussy, 16 July 1751, quoted in Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p, 36.)। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev