সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
অষ্টম অধ্যায়
রেশম ব্যবসা এবং রেশম শিল্প
রেশম রপ্তানি, কোম্পানিগুলি এবং এশিয় বণিক
সপ্তদশ শতকের সমগ্র দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে পরিষ্কার হয়ে যায় যে ব্রিটিশ কোম্পানির তুলনায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রেশম অনেক বেশি রপ্তানি করে (Glamann, Dutch Asiatic Trade, pp. 126 : 130; Om Prakash, Dutch Company, pp. 217-19)। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের দুই দশকেও ডাচেদের রেশম রপ্তানির অগ্রগতি বজায় থাকে এবং এই তথ্য ৮.১ তালিকায় স্পষ্ট হবে।

কিন্তু ১৭২০-র দশকের পরে ডাচ রেশম রপ্তানির ব্যবসা পড়তে থাকে। ১৭২০-র দশকের শেষের দিকে বাংলার ব্রিটিশ রেশম রপ্তানির পরিমান ডাচ রপ্তানিকে ছাড়িয়ে যায় (Glamann, Dutch Asiatic Tmde, p.131)। ৮.২ তালিকা থেকে পরিষ্কার, কোরা রেশম রপ্তানিতে ব্রিটিশ উদ্যম নতুন উচ্চতা ছুয়ে ফেলে। ঐ তালিকা থেকে স্পষ্ট হবে মধ্য ১৭৪০-এর দশকে ব্রিটিশ রেশম রপ্তানি অনেকটা কমে গেলেও ১৭৫০-এর দশকের প্রথমপাদে আবার নতুন করে তারা সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছাবে।

ওপরের ৮.২ তালিকা থেকে স্পষ্ট ১৭৩০-এর রপ্তানির শৃঙ্গ পৌঁছনোর সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানির গড় সর্বোচ্চ রপ্তানির পরিমান ছিল ২৮৬৬ মন বা ০.২১ মিলিয়ন পাউণ্ড, কিন্তু ৩০০০ মন বা ০.২৩ মিলিয়ন পাউন্ড পরিমান ছাড়িয়ে যায় নি। ১৭৪০-র দশক থেকে ১৭৫০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৭৩০-এর দশকের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছনোর যে গড় ছিল তার অর্ধেকেরও কম পরিমান রপ্তানি করেছে।
ঠিক এর পাশাপাশি কোরা রেশম রপ্তানির ডাচ উদ্যম ১৭৩০-এর দশক থেকে ১৭৫০-এর দশক পর্যন্ত বেশ ভালভাবে এগোতে থাকে। তবে এর মধ্যে ১৭৪০-এর দশকে কিছুটা পতন ঘটা এবং ১৭৫০-এর দশকে আবার পুরোনো যায়গায় ফিরে যাওয়া বাদ দিলে। প্রবণতাটি আমরা ৮.৩ তালিকায় লক্ষ্য করি (ফ্লোরেতা বা মোচা বা মটকা রেশম এই অঙ্কের হিসেবে গণ্য করি নি, কারণ এটিকে কোরা রেশম হিসেবে গণ্য করা হত না। এটি tanny, adapangia, Gujarat, tanna banna ইত্যাদির থেকে শস্তা রেশম হিসেবে গণ্য করা হত। এমন কি হল্যান্ডের বিভিন্ন চেম্বারের নিলামে একে tanny, cabessa-র মত কোরা রেশম হিসেবে গণ্য করা হত না কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল ফ্লোরেতার সুতো (c.f., Notice of Auction, 16 Sept. 1755, Resolutions of Heeren XVII, VOC 7380)। Om Prakash (pp. 202, 218)। তবে কোরা রেশম ও ফ্লোরেতাকে আলাদা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব সত্ত্বেও আমরা ফ্লোরেতাকে আমাদের গণ্য করলেও ৪০-এর দশকের শুরুর দিকের আমাদের আলোচ্য অবস্থার কোনও ব্যতিক্রম ঘটছে না, কারণ বাৎসরিক মাত্র ৮৪ মণ রপ্তানি হত এবং ৫০-এর দশকে বাতসরিক গড় ছিল ১৮৪ মণ (ডাচ রপ্তানি ইনভয়েস থেকে পাওয়া))।

৮.৩ তালিকা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার ১৭৩০ থেকে ১৭৫৫ পর্যন্ত বাংলা থেকে ডাচ কোরা রেশম রপ্তানি ১০০০ মন অর্থাৎ ০.০৮ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়ায় নি, যদিও এই পরিমানটা ১৭২০-র দশকের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুদশকের গড় রপ্তানির পরিমানের তুলনায় বেশ কম। অন্যভাবে বলতে গেলে ১৭৪০-এর দশকের শেষের দিক এবং ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাদে দুটি ইওরোপিয় কোম্পানির বাংলার রেশম রপ্তানির পরিমান ২৫০০ মন বা ০.১৯ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়ায় নি এমন কি ব্রিটিশ রপ্তানি গড় ১৫০০ মন এবং ডাচ ১০০০ মন ধরে এই গড় পরিমান ৩৫০০ মন বা ০.২৬ মিলিয়ন পৌঁছেছে (The Dutch export of Bengal raw silk to Japan, which was an important branch of trade of the VOC in the second half of the 17th century (see, Om Prakash, p. 126) was only 6154 Dutch lb. on ari average in the quinquennial period 1740-45 while in the 5 year periods from 1730 to 1735 and 1750 to 1755, it was nil. I have collected and computed all this evidence from the Bengal export invoices in the VOC archives)। এই দুই কোম্পানির সঙ্গে অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির গড় রপ্তানি খুব বেশি হলে ১০০০ মন জুড়তে পারে (Among other European companies, only the French were of some importance. The Ostend Company had to abandon its trade in 1744 while the Danish Company was permitted to establish its factory only in 1755. Though the French private trade increased remarkably in the early 1750s, the volume of their corporate trade seems to have been much smaller than that of the English or the Dutch. Even assuming, as did P.J. Marshall (Bengal, p.66), that the volume of the French Company’s trade was about half of that of the English or the Dutch trade, the French export of raw silk would have been around 500 mds at the most And raw silk does not seem to be a staple commodity in the European private trade to Western India, Red Sea or Persian Gulf area (VOC 2304, f.21i, HB. 30 Nov.1734). Hence it could be reasonably assumed that the export of raw silk by other Europeans (i.e. excluding the English and the Dutch Companies) could not have been more than 1000 mods at the maximum on an average in a year in the early 1750s)।
এই প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে সেটি হল বাংলা থেকে এশিয় বণিকেরা, ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির তুলনায় কত পরিমান কোরা রেশম রপ্তানি করত। আমাদের ভাগ্য ভাল ১৭৪৯ থেকে ১৭৬৭ পর্যন্ত বাংলা থেকে এশিয় বণিকদের মোট রেশম রপ্তানির মোট সংখ্যা আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে। ১৭৬৯ সালে এই সমীক্ষাটি প্রকাশ করেন কাশিমবাজার কুঠির প্রধান কুঠিয়াল ডবলিউ অল্ডারসে (W Aldersey) লন্ডনের কর্তাদের পাঠানো বাংলার রেশম শিল্পের পতনের কারণ বিশ্লেষণে। অল্ডারসে বিশেষ করে বলছেন তিনি মুর্শিদাবাদ আবগারি দপ্তর থেকে বাংলার natives only on which Duties have been collected বণিকদের, যারা শুল্ক দিয়েছেন, তাদের রপ্তানির এই সংখ্যাগুলো উদ্ধার করেছেন। ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত আমরা এশিয় বণিকদের সঙ্গে ইওরোপিয় কোম্পানির তুলনা করেন (তালিকা ৮.৮ এবং ৮.১এর সংখ্যা দ্রষ্টব্য)। বিশদ দেওয়া আছে ৮.৫ এবং ৮.৭ তালিকায়

৮.৪ তালিকায় স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে কোরা রেশম রপ্তানিতে এশিয়রা, ইওরোপিয়দের থেকে বহু যোজন আগে এগিয়েছিল। চল্লিশের শেষ এবং পঞ্চাশের শুরুতে দেশিয় বণিকদের গড় রেশম রপ্তানি ১৯,৮০৩ মন বা ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড, সেখানে এই সময়েই ইওরোপিয় কোম্পানির মিলিত রপ্তানি ছিল ৩৫০০ পাউন্ড। অর্থাৎ ইওরোপিয়দের তুলনায় এশিয়রা ৫গুণের বেশি রেশম রপ্তানি করত। ৭ টাকা প্রতি সের ধরে ৩৫০০ মনের ইওরোপিয় রপ্তানি ০.৯৮ মিলিয়ন। অন্যদিকে ১৭৪৯ থেকে ১৭৫৩ পর্যন্ত এশিয় ব্যবসায়ীদের গড় রপ্তানি ছিল ৫.৫ মিলিয়ন এবং ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৮ পর্যন্ত ছিল গড়ে ৪.১ মিলিয়ন। ফলে বাংলা থেকে এশিয় বণিকদের যে পরিমান রেশম রপ্তানি হত, তার অর্থমূল্য ইওরোপিয়দের তুলনায় ছিল ৫ গুণ এবং ৪ গুণ বেশি। ডাচ নির্দেশক জাঁ কারবাসুমের (Jan Kerseboom) চাকরির শেষের দিকে ১৭৫৫ সালে রেশম খুব দামি পণ্য ছিল কারণ, imposition of the government, high prices of provisions and as the orders of the European nations far surpassed the quantity the country yields become superfluous See for example, Mss. Eur. D. 283, f. 21; Verelt’s letter to the’Court of Directors, 5 April 1769, FWIHC, vol. v, pp. 18-19. For the indigenous account, see N.K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. 1, p. 112 (Jan Kerseboom’s ‘Memorie’, voc, 2849, f. 112)।
এশিয় বণিকেরা যে বিপুল পরিমানে করা রেশম সরবরাহ করত, এমন কি ১৭৪০-এর শেষের দিকে এবং ১৭৫০-এর প্রথমের দিকে, সেগুলি কোন বাজারে যেত সেই বিষোয়টাও তদন্ত করা জরুরি। মনে রাখা দরকার যে আমাদের সূত্রে এই প্রমান জোগাড় করা খুব কষ্টের (I do not think that for my present thesis it is absolutely essential to show where the silk was exported to. Contrary to an opinion expressed in private conversation by a distinguished historian of the period that my thesis “stands or falls on this very question of identifying the destination of the raw silk exported from Bengal, I maintain, as some experts in the field do, that so far as I know the volume and value of raw silk exported by the Asian merchants, it is more than sufficient for my present thesis. However I agree that it is worth investigating the destination of the raw silk exports from Bengal so that we can have a comprehensive idea of the silk trade as a whole)। আমরা ভাগ্যবান এশিয় ব্যবসায়ীদের রেশম রপ্তানির বাজার বিষয়ে ১৭৭৫-৭৭ সালের কিছু তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। ১৭৭০ সালেরও কিছু তথ্য আমাদের হাতে আছে যা দিয়ে আমরা প্রাক-পলাশী সময়ের রপ্তানি বাজার সম্বন্ধে একটা ধারনা করতে পারি। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার পলাশীতে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু করার পর থেকে ব্রিটিশ আমলা আর বণিকেরা যে অত্যাচার চালাতে থাকে তার ফলে ১৭৭০এর দশকের পর থেকে এশিয় বণিকদের বৈদেশিক বাজারের রপ্তানির পরিমানে আঘাত এসেছে। অল্ডারসের সমীক্ষা থেকেও আমরা এশিয় বণিকদের রপ্তানি পতনের সূত্র পাই এবং ৮.৫ তালিকায় যে তথ্য পাচ্ছি, সেগুলি আমাদের তত্ত্বকে প্রমান করছে।

৮.৫ তালিকা থেকে পরিষ্কার, ১৭৬৩ থেকে ১৭৬৭ পর্যন্ত গড় রপ্তানি ছিল ৬৭৭৯ মন যা ৭০২৫-এর কাছাকাছি। পাটনা শুল্ক দপ্তরের তিন বছরের তথ্য থেকে আমরা পাচ্ছি, কোন বাজারে কত পরিমান রেশম এশিয় বণিকেরা রপ্তানি করত ৮.৬ তালিকায়।

৮.৬ তালিকা থেকে পরিষ্কার, বাংলা থেকে অধিকাংশ রেশম যেত প্রধানত মির্জাপুরে, যেটি গুরুত্বপূর্ণ উতপাদন কেন্দ্র নয়। এটি সে সময়ের পুনঃরপ্তানিকেন্দ্র ছিল, যেত উত্তর এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের বাজারে। দ্বিতীয় তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে ছিল লাহোর মুলতান এবং আওরঙ্গাবাদ। মধ্য ১৭৭০ দশকে যদি এই সব বাজারে এশিয় বণিকেরা রেশম পাঠাত, তাহলে আমরা স্বাভাবিকভাবে ধরতে নিতে পারিও ১৭৪০-এর শেষ এবং ১৭৫০-এর প্রথম দিকে এশিয় বণিকেরা সেই বাজারগুলোতেই পণ্য পাঠাত।

এই আলোচনা থেকে পরিষ্কার যে বাংলা ভিত্তিক এশিয় বণিকেরা অষ্টাদশ শতকের মধ্যপাদ পর্যন্ত বাংলা রেশম ব্যবসার মুল অক্ষদণ্ড ছিল এবং মোট ব্যবসায় তারা ইওরোপিয়দের বহুদূর ছাড়িয়ে যায়। রেশম ব্যবসায় এশিয়দের নেতৃত্বের আরও উদাহরণ আমরা পাই জনৈক গুজরাটি বণিকের গোমস্তা এবং প্রায় ত্রিশ বছরের রেশম ব্যবসায়ী, সদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় সূত্রে। আমরা জানতে পারছি শুধু মুর্শিদাবাদে অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ী ছিল, যারা বাংলার ১৩,০০০ থেকে ২০,০০০ মন কোরা রেশম বাতসরিকভাবে রপ্তানি করত (Proceedings of the Board of Trade, 13 March I 791, quoted in N.K. Sinha, Economic History of Bengal, vol. I, pp. 111-112)। বাংলায় ডাচ কুঠিয়াল লুই টেইলফার্ট ১৭৬৩ সালে বলেন অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকেই লাহোর আর মুলতানের ব্যবসায়ীদের গোমস্তাদের রেশম কেনার পরিমান বেড়ে গিয়েছে (Taillefert’s ‘Memorie’, HR, 246, f. 141, 17 Nov. 1763)। বাংলা থেকে বিপুল ক্যারাভান উপমহাদেশের এবং এশিয়ার নানান দেশে পাঠানো হত প্রাকপলাশী সময়ে বলছেন হ্যারি ভেরলেস্ট, উইলিয়াম বোল্টস এবং লুক স্ক্র্যাফটন (সাত অধ্যায় দেখুন)।
বাংলার রেশম শিল্পে এশিয় বণিকদের নেতৃত্ব বলপ্রয়োগ করে স্থানচ্যুত করে কোম্পানি পলাশী উত্তর সময়ে; সেই জন্যে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এশিয় বণিকদের রপ্তানি অংশিদারি কমতে থাকে। (চলবে)