সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
নবম অধ্যায়
সোরার উৎপাদন পদ্ধতি, উৎপাদক এবং ব্যবসায়ী
ছাপরার ১৪ জন সোরা ব্যবসায়ীকে নিয়ে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি তৈরি করে ব্রিটিশেরা। ১৬৮০-তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় জয়েন্ট স্টক কোম্পানির তৈরির উদ্যম ব্যর্থ হয়। করমণ্ডলে কিন্তু জয়েন্ট স্টক কোম্পানি তৈরির কাজটা সে সফলভাবে করাতে পেরেছিল (বিশদ আলোচনার জন্যে দেখুন S. Chaudhuri, Trade and Commercial Organization, pp. 84-85; S. Arasaratnam, ‘Indian Merchants and their Trading Methods (circa 1700)’, IESHR, March 1966., vol. 3, no. 1, p. 86)। ছাপরার সোরা ব্যাপারীদের কোম্পানি তৈরি করে দিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭২৫ সালে ছাপরার অসমিয়া ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হওয়ার যে শর্ত লিপিবদ্ধ করে সেগুলি মন দিয়ে পড়া যাক (BPC, vol. 9, ff. 250-50vo, Annex. to Consult. 1 Feb. 1733) We fourteen assomies of the English Company … do agree to unite ourselves for the joint purchasing of saltpetre, to divide what quantity shall be procured and each person to pay in such summes of money as shall become due from him in proportion to his Dividend of saltpetre. If any person of the confederacy shall have a dispute with the Dutch or their assomies, the expense of it shall be paid out of the Joint Stock and all the saltpetre provided shall be on the general account. Whatever have been bought of saltpetre since November last shall be brought into the confederacy al1d if any person shall pay in more money to the stock than his proportion, he shall be allowed for it 2 percent interest.
এই ব্যবসায়ীরা নিজেদেরকে কোম্পানি হিসেবে সংগঠিত করছে। এই ঘটনাটা আমাদের আলোচ্য সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উদ্যম। কারণ ১৬৮০ সালেই পাটনা কুঠিয়াল এই ধরণের সংগঠন গড়ে তোলার কজে উদ্যমী হয়েছিল We much doubt of bringing our old or new petremen to it, we knowing by experience, they are unwilling to trust their own brothers, much less to be securities for one another whitch makes us fear, the abler sort will not be brought to it(Fact. Records, Hughli, vol. 10, ff. 165, 182-83, 185)।
ব্রিটিশেরা মনে করছিল অসমিয়া ব্যবসায়ীদের যৌথ অংশিদারি সংগঠন গড়ে তুললে ডাচেদের সোরা কেনার চাহিদার বিরুদ্ধে পাঁচিল তোলা যাবে। ১৭২৮ সালে ইওরপে সোরার বাজারে মন্দার যুক্তি দেখিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল পাটনাকে আগের বছরগুলোর পরিমানের সোরা কেনার কাজ থেকে সরে আসতে বলে। তখন পাটনার কুঠিয়াল লেখে যে এই মুহূর্তে অসমিয়া ডাচেদের সঙ্গে কাজ করা ব্যবসায়ীরা কোম্পানি তৈরি করছে, এবং এই মুহূর্তে যদি অসমিয়াদের কাজে লাগানো না যায়, তাহলে, ডাচেরা আমাদের সরে আসার সুযোগ ব্যবহার করে তারা সব সোরা কিনে নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা আরও লেখে অসমিয়াদের থেকে সোরা না কিনলে বিপুল পরিমান সোরা যেমন পাওয়া যাবে না, তেমনি দামেও পোষাবে না। আপাতত তারা অসমিয়া ব্যবসায়ীদের থেকে ১০ হাজার মন সোরা কিনছে (BPC, vol. 6, f. 640vo, 6′ Sept. 1728; C&B. Abstr., vol. 3, r;.. 135 , para. 42, 2 Feb. 1729) যাতে ভবিষ্যতে চাইলেই বেশি সোরা কেনা যায়। ১৭৩১ সালে বিপুল পরিমান সোরা কেনার প্রশ্ন ওঠে কারণ, লন্ডনের কর্তারা বড় পরিমান সোরা কেনার বরাত দেয়। এর জন্যে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল ১৭৩১/৩২ সালে পাটনা কাউন্সিলকে ৪০০০০ মণ সোরা কিনতে বলে (BPC, vol. 8, f.457, 20 Sept. 1731)। কিন্তু ততদিনে দেশিয় ব্যবসায়ীদের কোম্পানি ভেঙ্গে গেছে।
কোম্পানিগুলি এবং সোরা রপ্তানি
১৭৪০, ১৭৫০-এর দশকের দিকে সোরা রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় দুই ইওরোপিয় কোম্পানির মধ্যে রেশারেশি তীব্র হতে থাকে। এর ফলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষেরা কোম্পানিগুলির মধ্যে ঝগড়াকে ব্যবহার করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর সোরা ব্যবসায় নাক গলাতে শুরু করে। বিশেষ করে সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রশাসনিক ও দরবারি অভিজাতরা সোরা ব্যবসা দখল করে কিছুটা একচেটিয়া অধিকার কায়েম করার পরিকল্পনা করে (S. Chaudhuri, Trade and Commercial Organization, p. 166)। এরা নিজেরা কিছু সোরা কিনে, সেই সোরা বিপুল দামে ইওরোপিয় কোম্পানিদের কিনতে বাধ্য করত। সে সময়ে এ ধরণের একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাশালী অভিজাতর নাম হাজি আহমদ। ১৭৪০ থেকে ১৭৫৬ পর্যন্ত বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের বড় ভাই। নবাবের দরবারের যে ত্রিমূর্তি সুজাউদ্দিনের নবাবির সময় (১৭২৯-৩৯) বাংলার প্রশাসনে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হাজি আহমদ।
হাজি আহমদ, তার মধ্যস্থ মার্ফত পাটনা থেকে প্রায় মাটির দামে সোরা কিনে, সেটিকে বিপুল দামে ইওরোপিয়দের বিক্রি করত। কোম্পানিগুলোর অভিযোগ ছিল ইওরোপিয়রা যাতে অসমিয়া বণিকদের থেকে সোরা না কিনে নবাবের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের থেকে কেনে, সে বিষয়ে নবাবের দরবার থেকে বহুবার চাপ তৈরি করা হয়েছে (Fact. Records, Kasimbazar, vol. 5, 31 Jan. 1736)। ১৭৩৬ সালে পাটনার কুঠিয়াল অভিযোগ করে পাটনার নবাবের জামাই, আলি হাসান খান ৮-৯ হাজার মণ সোরা কিনে হুগলি পাঠিয়ে(ইওরপিয়দের) উচ্চদামে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে (BPC, vol. 11, ff. 25lvo-252, 17 July 1736)। ১৭৩৭-এ হাজি আহমদ ব্রিটিশদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হুগলিতে জমানো সোরা কেনার জন্য। কোম্পানি সেই সোরা কিনতে বাধ্য হয়, কিন্তু একটা শর্তও চাপিয়ে দেয় যে আগামী দিনে নবাবজাদা আর কোন মধ্যস্থতা করবে না (Ibid., vol. 12, ff. 226, 27 June 1737; f. 226 vo, 228vo-29, 4 Aug. 1737; f.251, 19 Sept. 1737; f. 272vo, 7 Oct. 1737; f. 278, 11 Oct. 1737; f. 229vo, 13 April 1738)। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সে সময়ে কিন্তু দরবারি অভিজাতরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করে নি, যে একচেটিয়া ব্যবসার প্রাধান্য প্রায় অর্ধ শতাব্দীর আগে মীর জুমলা, সায়েস্তা খাঁ বা যুবরাজ আজিমুশ্বান কায়েম করেতে পেরেছিল।
এই বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ১৭৩৬ সালে তিনটি প্রধান ইওরোপিয় কোম্পানি, ফরাসী, ব্রিটিশ আর ডাচ এক যোগে সোরা কিনে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটা ত্রিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন করে। ঠিক হল এই চুক্তির মেয়াদ হবে দুবছর। চুক্তি অনুসারে কোম্পানিগুলি should expressly prohibit the servants of their several factories and all private traders, Indians or Inhabitants of their colonies to buy or cause to be bought directly or indirectly any parcell of saltpetre that came from Patna, Pournea or any aurung so high as Maulda of any person whatsoeyer Moor or Gentue, even if they offer it to sale at an underprice। চুক্তির স্বাক্ষরকারীরা একে দুবছর অবধি টেনে নিয়ে যেতে পারে নি (Ibid., vol. 11, ff. 254-54vo, 22 July 1736)। ডাচ এবং ব্রিটিশ কোম্পানি নিজেদের মধ্যে সোরা ব্যবসা নিয়ে পাটনায় ১৭৪০ সালে তীব্র গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়ে (C&B. Abstr., vol. 4, f. 344, para. 86, 3 Jan. 1741; BPC, vol. 14, ff. 12l vo-22, 24 March 1740)। এই বিতণ্ডাকে ১৭৪৩ সালে আবার নতুন করে সামলাবার চেষ্টা করা হয়। আবার তিনটে কোম্পানি[ডাচ, ব্রিটিশ, ফরাসি] আপস মিমাংসা করে যৌথ উদ্যমে সোরা কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঠিক হয় ডাচ আর ব্রিটিশদের পাওনা প্রতি ১০০ মনে ফরাসীরা পাবে ১৫ মন। এই চুক্তি ১৭৪৫ এই আবার ভেঙে যায় (Ibid., vol. 16, ff. 55-56, 58vo, 18 Feb. 1743; vol. 17, f. 462, 21 Jan. 1745)। ১৭৪৩ সালে ব্রিটিশ কোম্পানির অভিযোগ করে তাদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও, ডাচেরা বিসেরা পরগনায় সোরা উৎপাদন করছে। তারা হুঁশিয়ারি দেয় এর ফল মারাত্মক হতে পারে। কিন্তু ডাচেরা ব্রিটিশদের অভিযোগ পাত্তা দেয় না। ব্রিটিশদের অভিযোগ ডাচেরা তাদের কালো কর্মচারীদের নিয়ে ছাপড়ার দিকে সিরঙ্গ বা সারনের ১৭টি পরগণায় বা সরকারে আলাদা করে সোরা উৎপাদন করছে (Ibid., vol. 16, ff. 55-56, 18 Feb. 1743)। অন্য দিকে ফরাসী আর ডাচেদের অভিযোগ, ব্রিটিশেরা উমিচাঁদ আর তার ভাই দীপচাঁদের মার্ফত পাটনার সব সোরা কিনে নিতে চাইছে। এই জন্য উমিচাঁদ পাটনায় দীপচাঁদকে হাওয়ালা মার্ফত অর্থ পাঠিয়েছে (Fact. Records, Patna, vol. 2, 10 May 1745)। এরপরে আর কোম্পানিগুলোর মধ্যে কোন যৌথ চুক্তি সম্পাদিত হয় নি। (চলবে)