সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
নবম অধ্যায়
কোম্পানিগুলি এবং সোরা রপ্তানি
অতিলাভের এই ব্যবসার দখল নিতে যেখানে ইওরোপিয় কর্পোরেট কোম্পানিগুলি পরস্পরকে প্রতিমুহূর্তে মাত দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেখানে বিপুল পুঁজি আর রাজনৈতিক ক্ষমতা কি করে দূরে থাকে? ১৭৪০, ১৭৫০ সাল জুড়ে বাংলার ব্যবসা বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী কলকাতার ব্যবসায়ী উমিচাঁদ সোরা ব্যবসায় প্রথম প্রবেশ করেন ১৭৩৪ সালে ভাগলপুরের ৩০০০ মণ সোরা ফরাসীদের থেকে বরাত পেয়ে। তিনি গোমস্তা মীরচাঁদকে মুঙ্গের পাঠান সোরা কিনতে (BPC, vol. 10, f. 26vo, 7 Mcrch 1734; f. 68, 1 July 1734; f. 92vo, 15 July 1734)। ১৭৪০ সাল নাগাদ তিনি ১৭টি পরগণায় সোরা উৎপাদন করাতেন। পারিবারিক পাটনা কুঠির দায়িত্বে থাকা ভাই দীপচাঁদকে সামনে রেখে এবং আর্মেনিয় ব্যবসায়ী খাজা ওয়াজিদের সহায়তায় ১৭৪০-এর দশকের মাঝখান থেকে বাংলার সোরা ব্যবসায় একচেটিয়া পকড় কায়েম করেন।
উমিচাঁদের মুর্শিদাবাদের দরবারে প্রভাব ছিল অসীম। বিহারের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আরও গভীর। ১৭৪১ থেকে টাঁকশালের মিন্ট মাস্টার (দারোগা?) ছিলেন তিনি (পাটনায় তিনি তার নাম স্বাক্ষর করেন উমিচাঁদ আগরওয়াল রূপে, বাড়ি আজিমাবাদ অর্থাৎ পাটনায়) ফলে তিনি আর তার ভাই সোরা ব্যবসা প্রায় পুরোটাই দখল নেন(Fact. Records; Patna, vol. 2, 3 April 1747; BPC, vol. 17, f. 664, 26 Aug. 1745; vol. 18, f. 458, 26 Nov. 1746; vof. 21, f. 142vo, 7 July 1748; C&B. Abstr., vol. 4, f. 376, 11 Dec. 1741)।
১৭৪৫ সালে আলিবর্দি খানের থেকে দীপচাঁদ, সরকার সরনের ফৌজদার পদ লাভ করেন। সরকার সারনে দেশের (এবং বলা ভাল বিশ্বেরও) গুণমানে সব থেকে ভাল সোরা উৎপাদন হয় (BPC, vol. 17, t 572, 20 May 1745)। তিনি সারণ, ছাপড়া আর ফতেপুরে সোরা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা আর গুদাম তৈরি করান। এই তথ্য থেকে আমরা বুঝতে পারি, ১৭৪০এর দশকের শেষের দিকে কতদূর এই পরিবারটি বিহারের সোরা ব্যবসায় পকড় স্থাপিত করতে পেরেছিল (Fact. Records, Patna, vol. 2, 31 March 1747)। পাটনার ডাচ প্রধান ড্রাবিরের অভিযোগ, ১৭৪৮-এ খাজা আহমেদ এবং উমিচাঁদ, দীপচাঁদকে অর্থ সরবরাহ করছে, prompting him not to spare trouble nor cost to be master of all pette in Bihar এবং দীপচাঁদকে নবাব অধিকার দিয়েছে বিহারের সব এলাকায় সোরা উৎপাদন করতে the farm of all the petre (C&B. Abstr., vol. 5, f. 87, para. 68, 22 Feb. 1747; Beng. Letters Recd., vol. 21, f. 112, para. 68; ff. 264-65, para. 129; ff. 270-71, para. 143)। ১৭৪৮ সালের প্রথম দিকে ব্রিটিশেরা লিখছে দীপচাঁদ বিহারের সব সোরা উৎপাদন অঞ্চল দখল নিয়েছে (BPC, vol. 21, f. l 6vo, 4 March 17 48)।
১৭৪৭-এর কাছাকাছি সময়ে কলকাতার উমিচাঁদ, হুগলির খাজা ওয়াজিদ আর পাটনার দীপচাঁদের ত্রিভূজ পাটনার সোরা ব্যবসাকে মোটামুটি একচেটিয়া বানিয়ে নিয়ে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে দরকষাকষি করতে থাকে। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি জাহাজে সোরা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা তারা বুঝত।
কোম্পানিগুলির রপ্তানির খাতায় সোরা খুব গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ছিল। সোরা ব্যবসার প্রভাব ও গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারি ডাচ কর্তাদের বিহারের সোরা ব্যবসার বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা থেকে। ১৭৪৪-এ Sichtermann-এর মেমোয়ার্সে পাচ্ছি, তিনি বুঝছিলেন, বিহারে সোরার দাম বেড়েছে ব্রিটিশ-ডাচ প্রতিযোগিতার জন্য। Sichtermann লিখছেন আগে ছোট পরিমান বরাত দেওয়া হত বলে অগ্রিম অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না, কিন্তু বর্তমানে বিপুল বরাতের জন্য আবশ্যিকভাবে দাদন দিতে হচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেছেন অগ্রিম অর্থ দিয়েও সোরার দামের হেরফের ঘটে নি, তিলমাত্র কমেছে মাত্র (Sichtermann’s ‘Memorie’, VOC, 2629, ff. 931-43, 14 March 1744)। তার পরের নির্দেশক Huijgheps সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন ব্রিটিশদের ওপর, কেননা তারা যৌথতার চুক্তি মানে নি। তিনি বলছেন — ছাপড়ার ফৌজদার দীপচাঁদ ব্যবসাকে কুক্ষিগত করতে চাইছে যাতে ব্রিটিশদের সমস্ত পণ্য এবং সোরা বিক্রি করতে পারেন (Huijghens ‘Memorie’, VOC, 2763, ff. 455-56, 20 March 1750)।
বিহারের নায়েব সুবাদার জানকিরামের উদাহরণ দিয়ে জাঁ কার্সেবুম (তার মেমোয়ারকে ভুল পড়েছেন কীর্তি নারায়ণ চৌধুরী। কীর্তির মতে জাঁ, খাজাকে কীর্তিচাঁদের গোমস্তা বলেছে। মেমোয়ারে জাঁ gemagtigden শব্দটা ব্যবহার করেছেন যার আভিধানিক অর্থ empowered one। খাজা তখনই এত বড় ব্যবসায়ি যে তার পক্ষে দীপচাঁদের গোমস্তা হওয়া অবাস্তব। এটা বাস্তব যে উমিচাঁদের সঙ্গে খাজার চুক্তি ছিল, সে পাটনা থেকে যত পরিমান সোরা হুগলিতে পাঠাবে, সেই সোরা খাজাকে অনেক বেশি দামে বিক্রি করতে হবে ত্রিমূর্তির লাভের জন্য) লিখছে ডাচেরা দীপচাঁদের থেকে ৫০,০০০ মন ৩.৫ টাকা প্রতি মনে কেনার জন্য তৈরি ছিল, কিন্তু ১৭৪৭ সালে ৪২,০০০ মন দীপচাঁদ হুগলিতে খাজা ওয়াজিদের কাছে পাঠিয়ে দেয়, তাদের সেই পরিমান সোরা বর্ধিত মূল্য ৬টাকা দরে বাধ্য হয়ে কিনতে হয়। তার অভিযোগ দীপচাঁদ যেহেতু পরগণাগুলোতে ধার দিয়ে রেখেছে, ফলে ডাচেদের পক্ষে খোলা বাজার থেকে সোরা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। দীপচাঁদকে সোরা বাজার থেকে বার করতে ডাচেরা হাজি আহমদকে ৪৫,০০০ টাকা দিলেও বিশেষ কাজের কাজ হয় নি (Jan Kerseboom’s ‘Memorie’, VOC 2849, ff. 103vo-106, 14 Feb. 1755. It has been wrongly stated by K.N. Chaudhuri that Wazid was the agent or gomasta of Deepchand. The word used in Dutch is ‘gemagtigden’ which literally means ’empowered one’. By this time, Wazid was too substantial and powerful a merchant to be a gomasta of Deepchand. It appears that there was a mutual agreement that Umichand and Deepchand would send the saltpetre to Wazid at Hughli where it could be sold at a higher price to the ben~fit of all three)।
ব্যবসার চরিত্র বদল ঘটল ১৭৫৩ সালে খাজা ওয়াজিদ একচেটিয়া ব্যবসার পরওয়ানা নিয়ে ব্যবসায় প্রবেশ করার পরে। ১৭৫৩ সালে সে মুর্শিদাবাদের দরবার থেকে এই অধিকার কায়েম করে। খাজার ব্যবসায় প্রবেশে জাঁ বিরক্তি প্রকাশ করে লিখছেন, সোরা ব্যবসা এখন ওয়াজিদ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং ডাচেদের এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষমতা নেই (Kerseboom’s ‘Memorie’, VOC, 2849, f.105vo, 14 Feb. 1755)। ওয়াজিদ এই ব্যবসা সামলাত তার পাটনা দালাল মীর আস্রফ এবং ভাই খাজা আস্রফ মার্ফত। আরেক ডাচ নির্দেশক বিসডম লিখছেন ওয়াজিদ মাত্র ২৫,০০০ টাকা নবাবকে দিয়ে এই অধিকার হস্তগত করেন। তিনি লিখলেন খাজা আহমেদ বিহারের কিছু জেলা সোরা উতপাদনে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন। এগুলোর বাৎসরিক উৎপাদন ক্ষমতা ৬০,০০০ মন। কিন্তু তারা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, খাজার সোরা ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার থাকা সত্ত্বেও ডাচেরা অসমিয়া দালালদের থেকে ১৭৫৬ সালেই ৩.৫ টাকা দরে সোরা পেয়েছে (Bisdom’s letter to Jacob Mossel, VOC, 2850, IO J~n. 1756; Bisdom’s ‘Memorie’, VOC, 2977, f. 80lvo, II Nov. 1760)। উমিচাঁদ আর খাজার জোট সোরা ব্যবসায় ঢোকেন। তাই ওয়াজিদের দখলে থাকা সোরা উমিচাঁদ ১৭৫৮ পর্যন্ত ব্রিটিশদের দিয়েছে, তারপর হাতের পুতুল মীর জাফরের থেকে কোম্পানি সোরা ব্যবসার অধিকার নিজেদের তাঁবে নেয় (Taillefert’s ‘Memorie’, HR 246, f. 174, 17 Nov. 1763; C&B. Abstr., vol. 5, f.423, 3 Sept. 1753; vol. 6, f. 88, 8 Dec. I755; Beng. Letters Recd., vol. 23, f. 63, 8 Dec. 1755; BPC, vol. 28, ff. 400-400vo, 2 Feb. 1756; vol. 29, f. 99vo, 6 June 1757; NAI, Public General, Letter to Court, s. no. 5, p. 95, para. 34, 10 Jan. I758)।
অষ্টাদশ শতকের প্রথম দু দশকে এমন কি ১৭৩০-এর প্রথমের দিকেও সোরা রপ্তানি ব্যবসার রাশ ছিল কিন্তু ডাচেদের হাতে। কিন্তু ১৭৪০-এর প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে ডাচ কোম্পানি পিছনে পড়তে থাকে, বাংলায় তাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশেরা বেশ কয়েক কদম এগিয়ে যায় সোরা রপ্তানির ক্ষেত্রে। ১৭৫০-এর প্রথম পাদে আবার দুটি কোম্পানির গড় বাৎসরিক সোরা রপ্তানির পরিমান সমান সমান পরিমানে এসে দাঁড়ায়, বরং ডাচেরা একটু বেশি ছিল। ৯.১ তালিকায় ১৭৩০ থেকে ১৭৫৫ পর্যন্ত সময়ে পঞ্চবার্ষিকী সময় ধরে এই হিসেবেটি বিশদে বলা হয়েছে।

১৭৪০-এর প্রথম পাঁচ বছরে দুটি কোম্পানির সোরা রপ্তানির মাত্রা চরমে পৌঁছয়। ১৭৫০ পরে সেটা দ্রুত কমতে থাকে। ডাচেদের রপ্তানি কমে ৩৫ শতাংশ, ব্রিটিশদের কমে ৪৫ শতাংশ। বাংলা থেকে বেশি ডাচ রপ্তানির বছরটি হল ১৭৫০ সাল, এই বছর থেকে রপ্তানির পরিমান কমতে থাকে। ১৭৪০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরে ব্রিটিশেরা সব থেকে বেশি রপ্তানি করে আর ১৭৫০-এ সব থেকে কমে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারি, বাংলা থেকে মোট রপ্তানিযোগ্য পণের রপ্তানি মূল্যের সঙ্গে বাংলার সোরা রপ্তানির মোট মূল্যের সাযুজ্য টানা যায় না(For the total value of the average annual export by the Dutch and English Company in the first quinquennial period from 1730-1755′, see chapter 3)। যদিও সোরা রপ্তানির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল জাহাজের খোল ভরিয়ে তার ভরকেন্দ্রকে স্থির করা, কিন্তু ইওরোপ জুড়ে সোরার চাহিদার হ্রাস বৃদ্ধি সোরা রপ্তানিতে প্রাথমিক প্রভাব ফেলেছে। (চলবে)