সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
নবম অধ্যায়
দামের চলন
১৭২০ থেকে ১৭৬০ সালের মধ্যে বাংলা বাজারে দামস্তর বৃদ্ধি বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত। তাদের বক্তব্য ১৭৪০-এর দশকের শুরুর পরের সময়ে নিয়মিত এবং যথেষ্ট পরিমানে মূল্যবৃদ্ধি বাস্তব প্রক্রিয়া। কোরা রেশম, বাংলার তাঁতজাত পণ্যের দামে যথেষ্ট উর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে এই সময়ে। এই পণ্যগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তারা চালের দামের ঊর্ধগতিকেও চিহ্নিত করেন (উদাহরণস্বরূপ দেখুন K.K. Datta, Bengal Suba, pp.463-69; Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah,.p.33; K.N. Chaudhuri, Trading World; pp. 99-108; P. J. Marshall, East Indian Fortuni:s, p. 35; Bengal, pp. 73,142-43, 163-64, 170)। বিভিন্ন আঙ্কিক তত্ত্ব যেমন weighted moving-average of price series, histogram and, polynomial and linear trend of prices of several commodities, মাধ্যমে এই বিশেষজ্ঞরা খুব সহজেই বলেন যে সাধারণ সিঙ্ক্রোনিক প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা দিয়েছে (the general synchronic trends are clearly visible) এবং সামগ্রিক সময়জুড়ে দামস্তরের বৃদ্ধি নিয়মিতভাবে ঘটে চলেছে (K.N. Chaudhuri, Trading World, pp. 99-108, 159)। তবে এর মধ্যে সবার নজর ছিল ১৭৪০-এর দশকটায়। প্রায় সক্কলেই এক স্বরে বলেছেন ১৭৪০-এর দশকের পরে দামস্তর বাড়ার প্রবণতা উর্ধ্বমুখী। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে দামের সার্বিক অস্বাভাবিক উর্ধ্বগতির তত্ত্বকে জোড়া হয়েছে ইওরোপিয় রপ্তানির সূত্র ধরে বাংলায় দামি ধাতু ঢূকতে শুরু করার সময় থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই দামবৃদ্ধির বড় কারণ হল ইওরপিয় কোম্পানিগুলির রপ্তানি বাণিজ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, এবং ১৭৪০-এর পরে ঘটে যাওয়া মারাঠা হ্যাঙ্গাম বাংলার অর্থনীতিকে ব্যহত করে।
দশম অধ্যায়
‘লক্ষ্যণীয় এবং নিয়মিত’ বৃদ্ধি?
ওপরে কথিত দাম বৃদ্ধির প্রবণতায় সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর হাত ধরে রপ্তানি বাণিজ্যের ফলে বাংলায় আসা দামি ধাতুর প্রভাব। এই তত্ত্বে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে নগদ অর্থের বিনিময়ে কেনা রপ্তানি পণ্যের চাহিদা বিদেশের বাজারে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকার ধাক্কা অনুভূত হয় দেশিয় বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে, এবং দেশিয় বাজারে দেশিয় পণ্যের এই চাহিদা বৃদ্ধিতে মূল্যস্তর বৃদ্ধি প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয় (Ibid., p.108)। অবশ্যই অস্বীকার করার উপায় নেই অষ্টাদশ শতক জুড়ে বাংলায় ইওরোপিয় বাণিজ্যের লক্ষ্যণীয় বৃদ্ধি ঘটছিল। সেই বাড়তে থাকা বাণিজ্যের হাত ধরে প্রভূত পরিমানে দামি ধাতু বাংলায় আসছিল। সম্ভবত এর জন্যেও বাংলায় কিছুটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঊর্ধগতি দেখা যায় এবং অর্থনীতিতে অর্থের জোগানও বাড়ে। কিন্তু অর্থের পরিমান বৃদ্ধির প্রভাব সার্বিক অর্থনীততে এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ে দামের চলনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, সে পরিমানটি আজও নির্দিষ্টভাবে কষা যায় নি।
আমরা এর আগে যুক্তি দেখিয়ে বলেছি (৭ অধ্যায়ে) মধ্য অষ্টাদশ শতকে ইওরোপিয় বাণিজ্য বাংলার অর্থনীতির পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল না বরং বাংলা ভিত্তিক এশিয় বণিকদের এশিয় ব্যবসার পরিমান ইওরোপিয়দের তুলনায় অনেক বড় ছিল। এর সঙ্গে এই তথ্যটাও বলা দরকার ইওরোপিয়রা একমাত্র বাংলার দামি ধাতু আনত না, এবং তারাই বড়তম দামি ধাতুর আমদানিকারক ছিল না। মারাঠা হ্যাঙ্গাম অবশ্যই বাংলার অর্থনীতিকে ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু মারাঠা হ্যাঙ্গাম নামক চলকটি বাংলার অর্থনীতিতে যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, সে ততটা গুরুত্ব পাওয়ার উপযোগী কি না ভাবা দরকার। মাথায় রাখতে হবে মারাঠা বর্গীদের অত্যাচারের ব্যপ্তি খুব বড় এলাকায় পড়ে নি। বর্গীর হাঙ্গামার আঞ্চলিকতাকেও আমাদের নজরে রাখতে হবে। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি এবং তাদের সঙ্গে এশিয় বণিকদের প্রতিযোগিতা অবশ্যই ছিল কিন্তু এই চলকটিকে কতটা গুরুত্ব দেব, সেটা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
এমন কি আমরা যদি তর্কের খাতিরে দামবৃদ্ধির তাত্ত্বিকদের অবস্থান মান্য করে ধরেই নিই কাপড় এবং কোরা রেশমের মত রপ্তানি পণ্যের দাম মাদের আলোচ্য সময় ধরে নিয়মিত বাড়ছিল, তার বিপক্ষের যুক্তিও তাহলে দিতে হবে। সাম্প্রতিককালে এক বিশেষজ্ঞ বলছেন, উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দামবৃদ্ধির প্রবণতার থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যর দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি মেটানো যায় নি; এই প্রবণতা অর্থনীতিতে সাধারণ মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত নাও হতে পারে (Om Prakash, Dutch Company, p. 250)। এই তত্ত্ব প্রমান করতে আমরা তথাকথিত ওয়েজ গুডস (wage goods) নামক পণ্যগুলির দামের চলন ধরার চেষ্টা করব। এগুলির মধ্যে দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য হল ধান আর গম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের এই ধরণের উদ্যম কতটা ফলদায়ি হবে সন্দেহ আছে, হয়ত দামস্তর অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে (extremely erratic behaviour of the prices of provisions); এই ধরণের সময় সারণী ধরে নানান দৈনন্দিনের ভোগ্যপণ্যের দামের খুবই অনিশ্চিত আচরণের একটা গবেষণার কাজ আমরা সাম্প্রতিককালের ১৬৫০-১৭২০ গণনায় দেখেছি (Ibid., pp. 251-53. K.N. Chaudhuri, however, shows with histogram a steady increase in the price of rice during the period under review)। এছাড়াও কোয়ান্টিটি থিওরি অব মানি সূত্রে যে বলা হচ্ছে, নগদ অর্থের বিনিময়ে কেনা বাড়তে থাকা রপ্তানির জন্যে পণ্য কেনার ইওরোপিয় উদ্যমে চাল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রবের চাহিদা বাড়িয়েছিল — এই তত্ত্বেও আস্থা পেশ করছি না। সম্প্রতি এক গবেষক অন্যভাবে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন (ঐ, পৃ ২৫৩)। Though the extent of increase in the velocity of money circulation as a result of European trade cannot be precisely determined, the increasing European trade implied that the ‘monetized transactions as a proportion of total transactions in the economy would have gone up’. Besides, over the period of more than 35 years from 1720 to 1757, ‘natural increase in population would have necessitated a secular rise in output and, transaction if the per capita output and availability were not to go down’. All these factors, it has been pointed out, would gravitate towards checking a general rise in prices which could have been the result of an increase in the supply of money following the influx of bullion connected with the European trade. (এই বিষয়টি বিশদে সামগ্রিকভাবে আলোচনা করেছেন Om Prakash, pp. 253-256)।
কাপড়ের দাম
বাংলার মুল রপ্তানিযোগ্য পণ্য, কোরা রেশম আর তাঁতের কাপড় ইওরোপিয় এবং এশিয় ব্যবসায়ীরা রপ্তানি করত। সে সব পণ্যের দাম একটা নির্দিষ্ট সময়ে উর্ধ্বগতি প্রাপ্ত হয়েছিল কিনা, সেই আলোচনা করতে গেলে সর্বপ্রথম আমাদের বাংলার অন্যতম প্রধান দানাশস্য চালের দাম সেই সময়ে বেড়েছিল কি না সেই জরুরি বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। এ বিষয়ে শেষতম গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই দাম বৃদ্ধি নিয়মিত এবং লক্ষ্যণীয় পরিমানে ঘটেছে (K.N. Chaudhuri, Trading World, p. 102; following him, P.J. Marshall, Bengal, p. 73. কাপড় এবং রেশমের দামের বহুপদী এবং রৈখিক প্রবণতার উপর চৌধুরী নির্ভর করে Chaudhuri depends on polynomial and linear trend of textile and silk prices (pp. 103-4, 107-8), যা দামের উঁচু এবং নিয়মিত বৃদ্ধি দেখায়, কিন্তু আমরা দেখব তাঁর অনুসরণ করা পদ্ধতিটি যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ)। আমরা এবারে পরীক্ষা করব তাঁর এই দাবি কতদূর সত্য; যদি সত্য হয়, তাহলে আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে কতদূর দামের নিরবিচ্ছিন্ন বৃদ্ধি ঘটেছিল সেটাও দেখা দরকার। মনে রাখা দরকার শুধু সাম্প্রতিক সময়ের গবেষকেরাই নয়, অতীতের গবেষকেরাও ১৭৩৮ থেকে ১৭৫৪ এই সময়ে তাঁতকাপড়, কোরা রেশমের ৩০ শতাংশের কাছাকাছি দামের বিপুল বৃদ্ধির কথা বলে গিয়েছেন (K.K. Datta, Bengal Suba, p. 464; Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 33)। সেই সময় নিয়ে শেষতম গবেষণায় আগের কাজের সূত্র উল্লেখ করে, তার কাছাকাছি সংখ্যায় তারা উপনীত হয়েছেন (P.J. Marshall, East.Indian Fortunes, p. 35; Bengal, p 73)। (চলবে)