সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
দশম অধ্যায়
কাপড়ের দাম
বাংলার কাপড়ের বিপুল দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে যারা উপনীত হয়েছেন তাদের মুল সূত্র ১৭৫২ সালের ডিসেম্বর মাসের Bengal Public Consultations নথিতে উল্লিখিত তথ্যের ভ্রান্ত (এবং অপ্রাসঙ্গিক) পাঠ (BPC, vol. 26, f. 214, Consult. 11 Dec. 1752; Bengal and Madras Papers, vol. II, p. 34; James Long, Unpublished Records, p. 40, doc. no. 103)। এই Public Consultations আদতে ঢাকা থেকে ১৭৫২ সালের ডিসেম্বর মাসে পাঠানো চিঠির প্রতিউত্তর যেখানে ঢাকার কুঠিয়ালেরা কলকাতা কাউন্সিলের কাছে ঢাকা থেকে পাঠানো রেশমি কাপড়ের খারাপ গুণমানের অভিযোগের উত্তর দিয়ে বলেছেন ১৭৩৮ সালে ঢাকা থেকে পাঠানো নমুনাটি, বিচারের জন্য মানানসই মান নয় [not ‘fit standard for judging’]। কাপড়ের খারাপ গুণমান খারাপ কেন, সে বিষয়ে তারা জানিয়েছিলেন (নজরটান আমার) … as the Copass [kapas-cotton] or country cotton has not been for the two years past under 9 or 10 rupees and the price of rice at the same time very dear, whereas in 1738 the Cappas did not exceed Rs. 2 or Rs. 2-8 and the rice very cheap, mostly 2 maunds 20 seers to 3 maunds for a rupee to which may be added which is well known to all the purchasers of cloth that the prices of all sorts of cloths have risen near 30 per cent, some more, since the year 1738, and that they now labour there and has done so for these two years past under the inconvenience of a French factory continually emulating the Hon’ble Company’s trade and have advanced the price of all cloth both coarse and fine and obliged them to be 1ess severe with their dellols in prizing their cloth ….।
এই বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে খারাপ গুণমানের কাপড়ের বেশি দাম ধার্য করার জন্যে ঢাকার কুঠিয়ালেরা নিজেদের কাজকে জাস্টিফাই করতে ১৭৩৮ থেকে ১৭৫২ পর্যন্ত সময়ে ৩০ শতাংশ দাম বাড়ার অজুহাত দিচ্ছেন। ১৭৩৮ সালের নমুনাটিকে (muster) প্রমিত (standard) ধরে, অন্য কোন কারণে নয়, ১৭৩৮ হল year of reference সূত্রটি উল্লেখের বছরমাত্র। কেউ যদি ওপরের ছত্রটি মন দিয়ে পড়েন তাহলে তাদের নিশ্চই চোখ এড়াবে না these two years past শব্দবন্ধটি যেটা আমি নজরটানে রেখেছি, যার অর্থ তারা যে ধরণের কাপড় পাঠিয়েছেন তার গুণমান হ্রাস হয়েছে এই বিশেষ দুই বছরে, ১৭৩৮ থেকে ১৭৫২ পর্যন্ত সামগ্রিক সময়সীমায় নয়। আর যদি বিশেষভাবে উল্লিখিত near 30 per cent বৃদ্ধির সূত্রকে সামগ্রিক সময়ের জন্যে সত্য বলে ধরে নিতে হয়, তাহলে এই বৃদ্ধি শুধুই ঢাকা অঞ্চলের জন্যে প্রযোজ্য, একে কোনওভাবেই বাংলার সার্বজনীন দাম বাড়ার চরিত্র হিসেবে ধরে নেওয়া উচিৎ নয়। এছাড়াও দুর্নীতির অভিযোগের উত্তরে তারা নিজেদের কুকর্মের সমর্থনে যুক্তি হিসেবে যে সব কথা বলছেন, সেগুলিকে কতটা প্রমান হিসেবে ধরা যায় সে প্রশ্নও প্রাসঙ্গিকভাবে ওঠা দরকার। যারা তন্ন তন্ন করে কোম্পানির কাগজপত্র ঘেঁটেছেন গবেষণার স্বার্থে, তারা নিশ্চই খেয়াল করবেন, যখনই বিনিয়োগের badness বা খারাপত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তখনই কুঠিয়ালেরা দাম বাড়া বা এশিয় ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বা রপ্তানিযোগ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়া — এই ধরণের অজুহাতময় যুক্তিতে প্রত্যুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে এই সবগুলিকে ‘প্রমান’ না ‘অজুহাত’ কিভাবে দেখব সেটা কাজ করার সময় গবেষকের মনে রাখা দরকার।
তবুও এটা বলা দরকার প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞরা নানান diagrams, polynomial and linear trends এবং time series ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের আলোচ্য সময়ে a fairly sustained and marked increase [in prices] is particularly strong for raw silk and textiles-এ ঘটেছে (K.N. Chaudhuri, Trading World, pp., 100-108, 533-34, 544-45)। তাহলে আমরা একটু পরেই দেখার চেষ্টা করব এই দুই প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি যতটা নাটকীয় ভাবা হয় ততটা নাটকীয় নয় কেন? প্রখ্যাত গবেষকেরা The weighted average, diagrams, polynomial and linear trends ইত্যাদি হাতিয়ার নিয়ে দাম বাড়ার সপক্ষে যুক্তি শানান, তারা তাঁত এবং রেশম উভয়ের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এমন দুটি বিষয় সন্তর্পনে এড়িয়ে যান। এক ধরণের চরিত্রের কাপড়ের (যেমন মসলিন বা দামি ক্যালিকো) মধ্যে আরও অনেকগুলি প্রকারের কাপড় থাকে (মসলিনের ক্ষেত্রে খাসা, মলমল ইত্যাদি) এবং এই প্রত্যেকটির দাম নির্ভর করত আকার, গুণমান এবং যে সব আড়ংএ এগুলি উতপাদিত হত সেগুলির ওপর যা আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি ১০.১ তালিকায়।

একই কথা বলা যায় কোরা রেশমের ক্ষেত্রে, বিশেষ রকমের চরিত্রের রেশম যেমন গুজরাট, কুমারখালি ইত্যাদির দাম নির্ভর করত তার গুণমান, উতপাদনের মরশুম (বাংলা ভাষায় বন্দ) ইত্যাদির ওপর (অধ্যায় ৮-এ আমরা বিশদে এই চলকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি)। এবং দামবৃদ্ধি নির্ধারণে এই চলকগুলি গণ্য করা হয় নি, যার ফলে দামবৃদ্ধিকে প্রমান করতে যে গণনা প্রক্রিয়া অবতারণা করা হয়েছে এবং সেই ভ্রষ্ট গবেষণার যে ফল ফলবে তা পথভ্রষ্ট হতে বাধ্য। মোট উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মোট রপ্তানিযোগ্য কাপড়ের সংখ্যা ভাগ দিয়ে যে তথ্য উঠে আসে তা দিয়ে এই সময়ের দামস্তরের বাস্তবচিত্র উঠে আসে না (K.N. Chaudhuri, Trading World, pp. 506, 546)। কে এন চৌধুরী বৈজ্ঞানিক সূত্র ব্যবহার করেও যে নিরবিচ্ছিন্ন উচ্চ হারে দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা সে সময়ের বাজারের বাস্তব অবস্থাকে প্রতিফলিত করে না।
বস্ত্রের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে গেলে আমাদের খুব মনযোগ দিয়ে জানতে হবে ঐ বিশেষ ধরণের কাপড়ের কতগুলি পিস রপ্তানি হয়েছে, সে সবের দৈর্ঘ প্রস্থ, কোন আড়ং-এ সেগুলি তৈরি হয়েছে এবং তাদের দাম। এই চলকগুলি থেকেই আমরা দাম চলাচলের কাছাকাছি সূত্র পেতে পারব। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি যদি আমাদের খাসার দাম নির্ধারণ করতে হয়, তাহলে মোট খাসার রপ্তানির পরিমান এবং তাদের গড় একক দাম নির্ধারণ করা হলে ভুল হয়ে যাবে। আমাদের জানতে হবে খাসাগুলি সাধারণ না দামি বা অতিদামি বা তাদের মাপ 40 co. x 3 co. or 40 co. x 2 3/4 co. or 40 co. x 2 1/2 co (co অর্থে কোভিদো, ১৮ ইঞ্চি মাপ) ইত্যাদি বা এটি জগন্নাথপুর বা কগমারিয়া অথবা আঁঊরিয়া কোন আড়ং-এ উৎপাদিত হয়েছে ইত্যাদি চলকগুলি। কারণ খাসার দাম নির্ভর করে এই সব ক’টি চলকের ওপর। আমরা যাদি এই চলকগুলি না বিবেচনা করে, কোন একটি বিশেষ বছরের ডাচ বা ব্রিটিশ রপ্তানির কাগজপত্র নির্ভর করে দাম নির্ধারণ করতে যাই তাহলে মস্ত ভুল হয়ে যাবে। যদি আমরা কোন কাপড়ের একক দাম নির্ধারন করি, সেই কাপড়ের নানান ভ্যারাইটি যেমন সাধারণ ক্যালিকো বা দামি ক্যালিকো বা অতিদামি ক্যালিকো ইত্যাদির দামগুলি আলাদা আলাদা বিবেচনা না করে মোট ক্যালিকো কাপড় রপ্তানির সঙ্গে ক্যালিকো কাপড়ের গড় দাম ধরে তাহলে দামের চলকের গতি নির্ধারণে যথেষ্ট ভুল উত্তর পাব।
কে এন চৌধুরী টাইম সিরিজ প্রয়োগ করে যে নিরবিচ্ছিন্ন দামের উর্ধ্বগতি দেখতে পেয়েছেন সেটার যুক্তি হল এই কাপড়ের দামি ভ্যারাইটিগুলির দাম নিরবিচ্ছিন্নভাবে বেড়েছে এমন কি রেশমের দামি ভ্যারাইটিগুলির ক্ষেত্রেও দাম বৃদ্ধি ঘটেছে ১৭৪০ এবং ১৭৫০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরগুলোতে, তাই তিনি নিরন্তর দাম বৃদ্ধি দেখতে পেয়েছেন কিন্তু মাথায় রাখতে হবে সার্বিকভাবে কাপড়শিল্প জুড়ে দাম বাড়ে নি, এই সময়ে সার্বিকভাবে আমঅদামি কাপড়ের দাম বাড়ে নি (See chapter 7, Table 7.7 and Figure 7.4)। কোন কাপড়ের একক দাম নির্ভর করে সেটা কোন ভ্যারাইটির কাপড় এবং এটি কোথায় উৎপাদিত সেই তথ্যের ওপর; উদাহরণ হিসেবে ১৭৫৩/৫৪ সালে ডাচ কোম্পানি যে ধরণের কাপড় রপ্তানি করেছিল তার যে সব ভ্যারাইটি আমরা পাই এবং প্রত্যেক ভ্যারাইটির কাপড়ের বিভাগের একক দাম দেখলে আমরা এই দামের ধারনাটি তৈরি করতে পারব। পাটনা থেকে পাঠানো মূলত সাধারণ অ-দামি ক্যালিকোর দাম পড়েছিল মূলত f৬.৩ এবং ঢাকা থেকে পাঠানো মূলত মসলিন আর দামি ক্যালিকোর একক দাম ছিল f২০.০৪, হুগলি থেকে সাধারণ মাঝারি দামের ক্যালিকোর একক দাম ছিল f৯.৫৬ এবং কাশিমবাজার থেকে পাঠানো সিল্কপিসগুডস এবং সাধারণ ক্যালিকোর একক দাম ছিল f৭.৮৫ (Collected and computed from export invoices in VOC records, VOC, 2811, ff, 6vo,7, 20-20vo, 46-46vo, 99-99vo; 2821, ff.635-36; 2840, ff.39, 441-42)। (চলবে)