সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
দশম অধ্যায়
কাপড়ের দাম
একটিমাত্র সূত্র থেকে আমরা কাপড়ের দামের চলনের একটা সাধারণ সূত্র পেতে পারি। সেটা হল কোম্পানিগুলি প্রত্যেক বছর কাপড়ের বরাতের জন্যে যে দামে দাদনি বণিকদের সঙ্গে চুক্তি করত তার তালিকা। এই চুক্তিতে যেহেতু কাপড়ের আকার, তার গুণমান এবং আড়ংগুলোর নাম উল্লিখিত হত, তাই আমরা এই চুক্তির তথ্য থেকে সে সব উপাত্ত পেয়ে যাই। আমাদের যদি দামের চলনের সত্যকারের তদন্ত করতে হয় তাহলে উল্লিখিত আলোচ্য চলকগুলো ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হবে। এই তথ্যগুলি যদি আমরা না জানি ঠিকমত, তাহলে দামের চলকের উপযুক্ত মান নির্ধারণ করতে পারব না। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে মধ্যস্থদের সঙ্গে এই দামে উপনীত হতে গিয়ে কোম্পানিরা দিনের পর দিন দাম নিয়ে দরদস্তুর করত। কিছু সময়ে যদিও কোম্পানিরা ব্যবসায়ীদের বাজারের তুলনায় একটু কম দামে কাপড় সরবরাহে রাজি করাত, কিন্তু সেটা হত পড়ন্ত গুণমানের কাপড়গুলোর জন্যে, যে গুণমান চুক্তিতে উল্লিখিত হত সেই গুণমানের পণ্য তারা সরবরাহ না করতে পারলে। আমরা ছটি নির্দিষ্ট বছরের, ১৭৩২, ১৭৪১, ১৭৪৪, ১৭৫১, ১৭৫২ এবং ১৭৫৪ চুক্তিতে উল্লিখিত দামের চলাচলের সাধারণ প্রবণতা বোঝার চেষ্টা করব। এই ছয় বছর কেন বেছে নিলাম? ১৭৩২ হল সাধারণ বছর কোন রাজনৈতিক গোলোযোগ ছিল না, ১৭৪১ সাল মারাঠা হ্যাঙ্গামের আগের বছর, ১৭৪৪-এর বছরটি হল মারাঠা হ্যাঙ্গামের ধাক্কা লাগা সময় যে সময়ে দামের ধাক্কা হয়ত অনুভূত হবে, এবং ১৭৫১ সালে মারাঠা আক্রমন বন্ধ হয় এবং ১৭৫২-র হল গণহত্যা আর লুঠের বছরের এক বছরের পরের দাম। এই বছরগুলিতে রাজনৈতিক এবং আর্থনৈতিক প্রভাবের দরুণ স্বাভাবিকভাবে দামের প্রচুর চড়াই উৎরাই ঘটতে পারে। আমাদের বর্তমান বিশ্লেষণের জন্যে উল্লিখিত ছয়টা বছর ডাচ চুক্তিতে উল্লিখিত দুটি প্রধান ধরণের মসলিন খাসা আর মলমলের দাম পরিবর্তিত হয়েছে দেখব তালিকা ১০.২তে (For the wide variation in the price of the same type of textiles, e.g., khasa and mulmul, depending on size, quality and aurung, see, Table 10.1)।

ওপরে উল্লিখিত তালিকা থেকে পরিষ্কার ১৭৩৪ সাল থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত উল্লিখিত চুক্তিতে খাসা নাদোনা ব্যতীত, যেটি মাঝারি গোছের সাধারণ দামের খাসা কাপড়, ২০টি আলাদা আলাদা খাসা আর মলমলের ভ্যারাইটির দামের কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে নি। এই তালিকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য বোঝা যায়, সেটি হল খাসা নাদোনা ছাড়া সব ধরণের খাসা এবং মলমলের ভ্যারাইটির দাম ১৭৩২ এবং ১৭৪৪-এর সময়ের দামস্তর থেকে ১৭৫১-৫৪ সালে কমেছে। অন্যভাষায় বলতে গেলে খাসা এবং মলমলের ১৭৩২-১৭৫৪ সময় পর্যন্ত দামের লক্ষণীয় এবং নিরবিচ্ছিন্ন বৃদ্ধির তত্ত্বকে অস্বীকার করছে। আমাদের এই অবস্থানের বিপরীতে কেউ প্রশ্নই করতে পারেন যে খাসা এবং মলমল যেহেতু দামি ক্যালিকো কাপড়ের ভ্যারাইটিতে পড়ে, তাই সাধারণ এবং মাঝারি দামি কাপড়ের দামের পরিবর্তন কি হয়েছে দেখা যাক ১০.৩ তালিকায়। এই তালিকায় ডাচ কোম্পানির বরাতের তালিকার শীর্ষে থাকা মসলিনের থেকে কম দামি এবং এক্কেবারে অদামি কাপড়ের দামের তালিকা পাচ্ছি

১০.৩ এর তালিকায় দামের যে প্রবণতা পাচ্ছি সেটা ১০.২-এর তালিকার প্রবণতা এক্কেবারে আলাদা। ৫টি অদামি মোটা কাপড়ের মধ্যে ৩টির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কিন্তু অন্য দুটির দাম ১৭৩২-১৭৪৪ থেকে ১৭৫১-৫৪ পর্যন্ত কমের দিকে যাওয়ার প্রবণতা দেখি। দাম চলনে এই ধরণের মিশ্র প্রবণতা কেন, সে প্রশ্নের সরাসরি আজ উত্তর দেওয়া মুশকিল, কিন্তু বলা দরকার যে অঞ্চলগুলি থেকে কাপড়গুলি আসত যেমন হুগলি, সেগুলি মারাঠা হ্যাঙ্গামে নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত ইওরোপিয় বা এশিয় ক্রেতাই হোক, মোটা অদামি কাপড় কেনার ক্ষেত্রে উভয়ের প্রচন্ড প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু সেই প্রবণতায় আমরা দুধরণের গিঘ্যামের (gingham) দাম ১৭৩২-১৭৪৪ থেকে ১৭৫১-৫৪-এ কমার প্রবণিতা দেখি। ফলে আমরা যেসব অদামি মোটা কাপড়ের দাম দেখলাম, তাতে আমরা কোনওভাবেই বলতে পারি না যে আমাদের আলোচ্য সময়ে মোটা কাপড়ের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় এবং নিরবিচ্ছিন্ন বৃদ্ধির তত্ত্ব আদৌ খাটছে।

এতক্ষণ আমরা ১০.৪ তালিকায় যে সংখ্যা দেখলাম, তাতে অদামি মোটা কাপড়ের ক্ষেত্রে ডাচ চুক্তি উদাহরণ থেকে কোনও পরিষ্কার ছবি পাচ্ছি না। যদিও প্রথম নজরেই মনে হয় দামের বৃদ্ধি যথেষ্টভাবেই ঘটেছিল, কিন্তু ডাচ তালিকা থেকে এই দাম বৃদ্ধির প্রবণতার মাপন করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ ডাচেরা আমাদের আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন সময়ে নানান ধরণের নানান মাপের কাপড় কিনত, তাই সেগুলোর দামের তুলনা টানা খুব সমস্যার; ফলে এক মাপের কাপড়ের, সময়ের পরিবর্তনে, দামের কি পরিবর্তন ঘটছে, সে ধরণের তথ্য আমরা পাই না। আমাদের আলোচ্য সময়ের মধ্যে এক্কেবারে অদামি কাপড়গুলোর দাম বাড়তেও পারে সেই সম্ভাব্যতা আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না, যদিও ১০.৪ তালিকায় তার কোন প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই না। এই মোটা কাপড়ের দাম কেন বেড়েধিল প্রশ্নটা যদি এই হয়, তাহলে এর উত্তর খুব সোজা। এই ধরণের অধিকাংশ কাপড় উৎপাদন হত বীরভূম, বর্ধমান এবং কাশিমবাজার এলাকায় যেখানে মারাঠা আক্রমন সব থেকে বেশি ধারালো ছিল। আমরা এর আগে দেখেছি (অধ্যায় ৭) এই ধরণের কাপড়ের জন্যে বাজারগুলিতে কি বিপুল প্রমান তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে এবং এই সব কাপড় নিয়ে কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহী ছিল না তার বড় কারণ হল এই সব কাপড়ে লাভের গুড় কম ছিল বরং তারা ভীষণ আগ্রহী ছিল দামি কাপড় নিয়ে চুক্তি করতে। অনেক সময় সাধারণ ক্যালিকোর জন্যে কোম্পানি অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীদের ওপর জোর করে চুক্তির ধারা চাপিয়ে দিত।
আমরা যদি ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির বিষয়টা দেখি, তাহলে দেখব, খাসা বা মলমলের মত মসলিনে দাম বাড়া বা কমার নির্দিষ্ট কোন প্রবণতা দেখা যেত না। আপাতভাবে শস্তার মসলিনের ভ্যারাইটিতে কিছুটা দামের উর্ধ্বগতি যদিও দেখা যায় কিন্তু দামি ভ্যারাইটিগুলির দাম আদপে কিন্তু কমেছিল। উদাহরণস্বরূপ খাসা ভ্যারাইটির তুলনামূলক দামি কাপড় ৪০x৩ আকারের খাসা কগমারিয়া (Cogmaria)-র ১৭৩২ সালে দাম ছিল ১১ টাকা ৮০ আনা, সেটি ১৭৪১-এ কমে হয় ৮টাকা ৮০ আনা, ১৭৪২-এ বেড়ে হয় ১০ টাকা ৮ আনা এবং এই দামে দাঁড়িয়ে থাকে ১৭৫১ পর্যন্ত। তেমনি খাসা কগমারিয়া দামি ভ্যারাইটিটি (৪০x২.৫) ১৭৪০-এর ৮ টাকা দাম ১৭৪২-এ কমে হয় ৭ টাকা ৬০ আনা এবং ১৭৪৪ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত ৭ টাকা ১২ আনায় স্থির থাকে (তালিকা ১০.৫)। একইভাবে শান্তিপুরী মলমল দামি (৪০x৩) ১৭৪০-এ দাম ছিল ১৭ টাকা ৮ আনা, ১৭৪১ আর ১৭৫১ সালে কমে হয় ১৬ টাকা ৮০ আনা। আবার বালেশ্বর মলমল (২০ গজ x ১ গজ) ১৭৪৪ এবং ১৭৫০ সালে ছিল ১১ টাকা ১৭৫১ সালে হয় ১০ টাকা ৮০ পয়সা (তালিকা ১০.৫)। ১০.৫ তালিকা থেকে পরিষ্কার খাসা এবং মলমলের শস্তার কাপড়ের দাম বেড়েছিল। (৪০x২) মাপের খাসা বুড়নের ৪ টাকা ১২ পয়সা থেকে ৫ টাকার মধ্যে ছিল ১৭৩২ থেকে ১৭৪১ পর্যন্ত, সেটির দাম ১৭৪৪ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত বেড়ে হয় ৫ টাকা ১২ পয়সা। দাম বাড়ার প্রবণতা দেখি খাসা কুমারখালিতে (৪০x২) (তালিকা ১০.৫)। কমদামি মলমলে একই দাম প্রবণতা দেখি। যেমন শান্তিপুরী মলমল (৪০x২.৫) ১৭৪১ সালে দাম যেখানে ছিল ৭ টাকা ১২ আনা ১৭৫০ এবং ১৭৫১-য় হয় ৯ টাকা ১২ আনা। শান্তিপুরী মলমলের (৪০x২) ক্ষেত্রে দামের উচ্চগতি লক্ষ্য করি এই সময়ে (তালিকা ১০.৫)। তাহলে আমরা দেখলাম কম দামি মসলিনের দাম বাড়লেও দামি মসলিনের দাম কমেইছিল। ফলে আমাদের আলোচ্য সময়ে কাপড়ের দামের লক্ষণীয় এবং নিরবিচ্ছিন্ন বৃদ্ধির তত্ত্বে আমরা কোনওভাবেই সহজে উপনীত হতে পারছি না।


অবশ্যই দামে লক্ষণীয় এবং নিরবিচ্ছিন্ন বৃদ্ধি ঘটেছিল ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা ব্যবসায়ীদের জন্যে মোটা ক্যালিকোর ক্ষেত্রে। ১০.৬ তালিকায় আমরা দেখছি মিহি ফোতা (২০x২.৫) ১৭৪০ এবং ১৭৪২ সালে ১টাকা ১২ আনা দাম ১৭৪৪ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত সময়ে হল ৪টা ৮০ আনা। গারার ক্ষেত্রেও দাম বাড়ার উদাহরণ পাচ্ছি। মিহি গারা (৭২x২.২৫) ২০টির দাম ১৭৪০-এ ছিল ১০৬ টাকা ১৭৪২-এ হল ১১২ এবং ১৭৫১ এবং ১৭৫২-তে হল ১৬০ টাকা। তেমনি গারা মিহি (৩৬x২.৫) ১৭৪০ এবং ১৭৪২-এ প্রতি ২০ টির দাম ছিল ৫৩ টাকা এবং ৫৬ টাকা, সেটি ১৭৫০ এবং ১৭৫১ সালে হল ৮০ টাকা। আমরা দেখলাম ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে কাপড়ের দাম বেড়েছিল, যা ডাচেদের চুক্তিতে পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় না। আগে আমরা বলেছি, মোটা কাপড় যে সব অঞ্চলে তৈরি হত সেই সব অঞ্চলে মারাঠা আক্রমনের তীব্রতা অনেক বেশি ছিল।

এছাড়াও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরন্তর তীব্র প্রতিযোগিতার জন্যেও বহু সময় মোটা কাপড়ে দাম বাড়ত। ডাচ এবং ব্রিটিশ উদাহরণ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট কয়েকটি ধরণের কাপড়ের দাম ১৭৩০-এর দশকের তুলনায় ১৭৪০-এর শেষের এবং ১৭৫০-এর প্রথমের দিকে আবশ্যিক বৃদ্ধি পেলেও সার্বিকভাবে বলা যাবে না যে আমাদের আলোচ্য সময়ে সাধারণভাবে কাপড়ের সার্বিকদাম বিপুলভাবে বেড়েছিল। (চলবে)