সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
দশম অধ্যায়
রেশমের দাম
সুতির কাপড়ের দামের পরিবর্তনের থেকে কোরা রেশমের দামের প্রবণতার একটু অন্য ধরণের প্রবণতা পাচ্ছি। ১০.৭ তালিকায় ১৭৩৩ থেকে ১৭৫৩ সালের মধ্যে বহু কটা বছরে এই গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের দাম ওঠাপড়া করেছে নিয়মিত।

১০.৭ তালিকায় আমাদের আলোচ্য সময়ে কোরা রেশমের দামের অস্থিরগতি লক্ষ্য করি। তবুও একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই তালিকা সূত্রে কোরা রেশমের দামের উর্ধ্বগতির সূত্র মেলে না এবং ১৭৪০-এর পরে বাংলায় পণ্যের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলেছিল — বিভিন্ন ইতিহাসকারের তৈরি এই তত্ত্ব প্রমান হয় না। উপরুন্তু প্রমান হয় ১৭৩৩ থেকে ১৭৪৫এর মধ্যে কোরা রেশমের দাম বৃদ্ধি তল্প। ১৭৩৩ বা ১৭৪৫-এর তুলনায় একমাত্র ১৭৪৭ এবং ১৭৪৮ — এই দুই বছরে দাম বেশ বেড়েছিল, কিন্তু এটা অস্থায়ী প্রবণতা প্রমানিত হয়, ১৭৪৮-এর জুলাইএর পর থেকে দাম আবার দ্রুত পড়তে থাথাকায়, ১৭৫১ সালের ফেব্রুয়ারির দাম জুন ১৭৪৮-এর দামের কাছে পৌঁছয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে ইতিহাসকারেরা কোরা রেশমের যে দাম বৃদ্ধির প্রবণতার কথা আলোচনা করেছেন, আমাদের আলোচ্য সময়ে তার উল্টো প্রবণতা লক্ষ্য করি। দামস্তরের কেন অস্থিরতা দেখা যায়, সে তত্ত্ব আমরা এর আগে আলোচনা করেছি (অষ্টম অধ্যায় দেখুন)। সেই বিষয়টা নতুন করে সংক্ষেপে বলি, তুঁত গাছে গুটি চাষ থেকে শুরু করে রেশম সুতো তৈরি পর্যন্ত ধাপগুলি প্রকৃতির পরিবেশের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল এবং জলবায়ুর অবস্থা অনুকূল হলে রেশম উৎপাদন বাড়ে আবার উলোটা হলে কমে। এছাড়াও আমরা আগে আলোচনা করেছি ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির তুলনায় দেশিয় এশিয়ব্য বসায়ীরা অনেক বেশি ব্যবসা করত, ফলে রেশম-বাজারে তাদের চাহিদায় ওঠাপড়া করত দামস্তর। ১০.৭ তালিকায় একটা বিষয় পরিষ্কার, ১৭৫২র পর থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কুমারখালি রেশম রপ্তানি করত না বরং গুজরাট বা নভেম্বর বন্দ ইত্যাদি তুলনামূলক দামি প্রকারের রেশম রপ্তানির দিকে নজর দিয়েছিল। এর ফলে এই সময়ের পরে ব্রিটিশ কোম্পানির রপ্তানি করা রেশমের কাপড়ের গড় একক দাম বেড়ে যায় — এর ফলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে বাজারে রেশমের দাম বেড়েছে। উল্লিখিত সময়ে বাংলার রেশমের দামস্তরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার, লক্ষ্যণীয় এবং দীর্ঘকাল ধরে রেশমের দাম বাড়ার যে তত্ত্ব বাজারে চালুছিল তা ভিত্তিহীন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দানাশস্যের দাম
আগেই আমরা বলেছি চাল ছিল খাদ্যশস্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণতম ফলে আমরা যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ে এর দামস্তর কি ছিল সেটাও আমাদের গভীরভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। চালের দাম বিচারের ক্ষেত্রেও আমাদের একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, বিপুল বিশাল চালের বৈচিত্র সঙ্গে প্রত্যেকটার আলাদা আলাদা দাম। ১০.৮ তালিকায় আমরা এই বক্তব্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি।

বস্ত্রের ক্ষেত্রেও যেমন শুধুই মিহি বা মোটা কাপড় ছিল না, বাংলার বস্ত্র উৎপাদন ক্ষেত্রে ছিল বিপুল সংখ্যক কাপড় বৈচিত্র, তেমনি চাল উতপাদনেও একই কথা বলা যায়। যে দেশে মোটা চালের দাম টাকায় ৪ মন ১৫ সের থেকে ৭ মন ২০ সের পর্যন্ত ভ্যারি করত (যে পার্থক্যটি ৭১%) সেখানে চালের দামের নিরন্তর উর্ধ্বগতি ঘটেছিল বলে দায় সেরে দেওয়া বিপজ্জনক প্রবণতা এবং সেই জন্যেই আসল ঘটনা জানতে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে কোন ধরণের চালের, কোন সময়ে কি ধরণের দাম ছিল, নাহলে যে গবেষণার কাজই করি না কেন তাতে উত্তর ভুল উঠে আসবে এবং সেটা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়াবে। তা সত্ত্বেও এই ধরণের তথ্য হাতে নিয়েও বহু গুরুত্বপূর্ণ গবেষকই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, Rice which was sold at 100 to 120 seers for a rupee in 1738, was being sold only thirty seers for a rupee in the mid-1740s as evidence to show that ‘production declined and prices soared’ or that by the 1740s ‘Bengal’s advantages seemed to be disappearing (Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 33; P.J. Marshall, East Indian Fortunes, p. 35)। প্রাচীন এক গবেষকের এই সিদ্ধান্তে ভর দিয়ে বর্তমান সময়ের এক গবেষক মন্তব্য করেছেন between 1738 and 1754 it was thought that the price of rice in Calcutta had risen by three or four times এবং আরও বলছেন local shortages জন্যে greatly increased food prices (P.J. Marshall, Bengal, p. 73; East India Fortunes, p. 35)।
এবারে উদ্যোগী হয়ে চাল ব্যবসার একটু ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যাক প্রবীণ গবেষকের (K.K. Datta, Bengal Suba, p. 463-64; Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, p. 33) এই মন্তব্য কতদূর সে সময়ের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। তাঁর এই তথ্যের ভিত্তি ১৭৫২ সালে ঢাকা কুঠিয়ালের কলকাতায় পাঠানো চিঠির বয়ান-তথ্য, যে চিঠিতে তিনি কেন খারাপ গুণমানের কাপড় পাঠান সেই অভিযোগের আত্মপক্ষ সমর্থন করছেন এবং এই চিঠিটার বয়ান আমরা এর আগে আলোচনা করেছি। তিনি যে শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন করছিলেন তাই নয়, আদতে ঢাকা কুঠিয়াল ১৭৫২ সালে বসে ১৭৩৮ সালের চালের দাম উল্লেখ করছিলেন। কোম্পানিকে বাজে গুণমানের কাপড় গছানোর জন্যে কুঠিয়ালেরা এমন কিছু কল্পিত দামস্তর উদ্ভাবন করতেন যাতে তাদের কুকীর্তি ঢাকা পড়ে যায়। আর যদি সেটা সত্য হয়, তাহলে এটাও বলা দরকার এই দাম শুধুই ঢাকার জন্যে প্রযোজ্য, কলকাতা আর ঢাকার দামের সাযুজ্য এক্কেবারেই স্বকপোল কল্পনা। এটাও বলা দরকার ঢাকার ১৭৩৮-এর দামের সঙ্গে ১৭৫২ বা ১৭৫৪-র ঢাকার দামের তুলনা টানা কতদূর উচিত সেটাও ভেবে দেখা দরকার। কোম্পানির কাগজপত্রের বহু তথ্য থেকে পরিষ্কার, কলকাতার বাজারে চালের দাম ওঠাপড়া নির্ভর করত দক্ষিণপূর্ব বাংলার বাখরগঞ্জ এবং দৌলিয়া অঞ্চলের চাল সরবরাহের পরিমানের ওপর, যে অঞ্চলের চাল সরবরাহ কলকাতা কলকাতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যেমন ছিল, তেমনি না থাকলে কলকাতা খুবই দুর্দশায় পড়ত। কলকাতার মত নতুন এবং বাড়তে থাকা শহরে আড়তদারেরা চালের অপ্রাপ্যতার সুযোগ নিয়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করত (BPC, vol. 26, ff 56vo-57, 19 Feb. 1753; ff. 152-54, 24 May 1753; ff. 336-36vo, 19 Nov. 1753; vol. 27, f.181, 10 June 1754; ff. 244vo-245, 12 Aug. 1754; ff.378-78vo, 5 Dec. 1754)।
১০.৯ তালিকায় ফোর্ট উইলিয়াম, সেনাবাহিনীর জন্যে মোটা দানার (কিন্তু কোন প্রকারের?) চাল কেনার সিদ্ধান্তের সূত্রে দেখতে পাই প্রত্যেক মাদ্রাজ টাকায় ১৭৩৯ সালে কলকাতার ৩০ সেরের দামের সঙ্গে ১৭৪৪ সালে সাধারণ চালের (common sort) দামের তুলনা। কাউন্সিল চাল আমদানিকারকদের দাম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে জমিদারদের কাছে আর্জি জানাচ্ছে যাতে এই চাল এক আর্কট টাকায় এক মনের তলায় না বিক্রি করার নির্দেশ প্রয়োগ করেন বাজারগুলিতে (BPC, vol.16, f.40lvo, 7 Jan. 1744)। ১০.৯ তালিকা থেকে পরিষ্কার, ১৭৫৪ সালে প্রতি টাকায় চাল পাওয়া যেত ৩২.৫ কিলো এবং মোটা চালের মন ছিল ১ আর্কট টাকা। এই তথ্য অবলম্বনে আমাদের আলোচ্য গবেষকদের গবেষণা সিদ্ধান্ত ১৭৩৮ থেকে ১৭৫৪ পর্যন্ত চালের দাম বেড়েছিল তিন থেকে চার টাকা এই তথ্য মেনে নেওয়া যায় না।

১০.৯ তালিকা থেকে পরিষ্কার দামস্তর নিয়ে কোনই নির্দিষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করি না, এবং এই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, এই যে দামস্তর আমরা লক্ষ্য করি সেটা কিছুটা মন্বন্তর এবং দুর্মূল্যের বাজারের দাম, সাধারণ সময়ের বাজারের দাম নয়। ১৭৩৮-র দামস্তরের কথায় বলা যায়, ১৭৩৭-এর সেপ্টেম্বর অক্টোবরে বাংলার ওপর দিয়ে বিপুল বন্যা আর প্রবল ঝড়ের আভিঘাত নেমে এসেছিল (S. Bhattacharyya, East India Company, pp. 214-15)। মারাঠা হ্যাঙ্গাম মিটে গেলে আবহাওয়া বিকারের জন্যে ১৭৫২ সালে মন্বন্তর নেমে আসে এবং বলা হয় ৬০ বছরের এত দুর্মূল্য আগে আর আসে নি এবং এক টাকায় চালের দাম ২৫ সের হয়ে যায়। এই সময় অত্যুক্তির রাজা হলওয়েলের বয়ানে আমরা দেখি কলকাতায় চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান সে বছর অত্যধিক চালের রপ্তানি এবং কলকাটার বাজারে দৌলিয়া আর অন্যান্য এলাকার চালের সরবরাহে ঘাটতি (BPC, vol.26, ff.56vo-57, 19 Feb. 1753)। কিন্তু মুর্শিদাবাদে চালের দাম আগের তুলনায় ৬ গুণ বেড়েছিল, ওরমের এই দাবির পিছনে সারবত্তা নেই শুধু নয়, সে সময়ের অন্যান্য তথ্যাদি অন্য কথা বলে (Orme, Historical Fragments, p. 405, অন্য দিকে P.J. Marshall, Bengal, pp. 18, 73 বইতে পি জে মার্শাল কলকাতা মন্বন্তর বর্ণনা এবং প্রভাব আর তথ্য বিশ্লেষণে ওরমে আর হলওয়েলের বর্ণনা নির্ভর করেছেন (Holwell, India Tracts, p. 165)। ১৭৫৩ সালের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি তাই শুধুই সাময়িক অবস্থা ১০.৯ তালিকা থেকে পরিষ্কার দামস্তর ১৭৫৪ সালে আবার স্বাভাবিকতায় নেমে এসেছিল। এবং চালের দামকে সার্বিকভাবে দামস্তরের (মূল্যসূচক) বৃদ্ধি হিসেবে দেখানোর প্রবণতা মেনে নেওয়া যায় না কারণ সেই সময়ের বাৎসরিক চালের দামের বৃদ্ধির কোন নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া সহজ নয়। (চলবে)