সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
একাদশ অধ্যায়
ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ
কিন্তু কলকাতা থেকে ব্রিটিশ আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ১৭৩০-এর পরে দ্রুত কমতে শুরু করে। উল্টোদিকে চন্দননগরের উৎসাহী ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নেতৃত্ব আর ফরাসী ব্যক্তিগত আমলা ব্যবসায়ীরা ডুপ্লের নেতৃত্বে বিপুল উদ্যমে ব্যবসা করতে শুরু করলে ১৭৪০-এর পরে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে (ডুপ্লের ব্যবসার বিষয়ে বিশদে জানতে দেখুন I. Ray, ‘Dupleix’s Trade at Chandernagore’, IHR, vol. 1, 1974, pp. 279-94)। মধ্য ১৭৩০-এর দশক থেকে চন্দননগরের ফরাসী কর্তৃপক্ষ ১৭২০-র পরের খাদে পড়া ব্যবসা টেনে তুলতে শুরু করে এবং তার পরিমান ব্রিটিশ ব্যবসার কাছাকাছি পৌঁছে যায় (Virginia M. Thompson, Dupleix, p. 73)। প্রাথমিকভাবে ফরাসী আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিষিদ্ধ হলেও ১৭২২-এর পরে তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়া হয় (I. Ray, ‘Dupleix’s Trade’, IHR, vol. 1, 1974, p. 283)। ফলে ক্রমশঃ তারা ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে শুরু করে। পূর্বাঞ্চলের ফরাসী কোম্পানি প্রধান ডুপ্লে সরাসরি আন্তঃএশিয় ব্যক্তিগত ব্যবসায় যোগ দিলেন এবং ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দিলেন। এর ফলে ফরাসী ব্যবসা উদ্যম বিপুল বেড়ে যায়। চন্দননগরে ডুপ্লের প্রাথমিক উদ্যম রাজনৈতিক ছিল না, ছিল ব্যবসায়িক (ঐ)। ১৭৩১ সাল থেকে ১৭৪২ পর্যন্ত ডুপ্লে অন্তত ৯০টা সমুদ্র যাত্রা আয়োজন করেছেন। তিনি যে ধরণের জাহাজের চরিত্র বেছেছে, তা Holden Furber (John Company)-এর তত্ত্ব অনুযায়ী সে সময়ের ভারতীয় এশিয় ব্যবসার ট্রন্ড অনুযায়ী মূলতঃ পূর্ব-পশ্চিম দিকমুখী (Holden Furber, John Company, p. 162)।
ব্রিটিশদের তুলনায় বাংলাকে ভিত্তি করে এশিয় ব্যবসায় ফরাসিরা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার হয়ে উঠছে, সেটা মোটেই ব্রিটিশদের পছন্দের বিষয় ছিল না। ফলে ব্রিটিশ-ফরাসী ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকল। ১৭৪০-এর প্রথমের দিকে বাংলায় ব্রিটিশদের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে থাকে। এই দ্বন্দ্বটির মূল সূত্র আমি উল্লেখ করেছি ১১.১ তালিকায় যেখানে আমরা বাংলা থেকে ছাড়া ব্রিটিশ-ফরাসি জাহাজের তথ্য দেখব (VOC, 2469, ff. 1~07-8; 2489, ff. 291-9lvo, 293; 2504, ff. 1065-66; 2518, ff. 515,517; 2556, ff,575-76 থেকে সংগৃহীত এবং গণনা করা হয়েছে)।

ওপরের তালিকা থেকে পরিষ্কার, ১৭৪০-এর প্রথমের দিকে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা এতই কোণঠাসা হয়ে পড়ে যে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযোগ আনে। ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা উদ্ধারে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল, চন্দনগরের মূল ফরাসি বসতির সঙ্গে সমস্ত রকমের ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ১৭৪২ সালে কাউন্সিল যে প্রস্তাবনাটি গ্রহণ করে সেটি হল, The French having for some time past been of great disservice to the private trade of this place by the assistance and supply of money and goods that they have had from Calcutta and more particularly to the ports of Judda, Mocha and in the Gulph of Persia and as we have ships bound this year to those places. In order therefore to prevent any ill consequence in future such as we have formerly experienced thereby.
Resolved that no merchants of this place white or black either in the Company’s service or otherwise under their protection be permitted to sell or furnish the French with any sortments of goods whatever or to freight goods on any of the French ships bound out of this river … (Virginia M. Thompson, Dupleix)।
চন্দননগরের গভর্নর হিসেবে থাকাকালীন ডুপ্লের লেখা I made the English tremble for they saw their commerce dwindling and their merchants forced to declare themselves bankrupt. I accomplished all this’ in nine years টিকে কি শুধুই বাগাড়ম্বর হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় (Virginia M. Thompson, Dupleix, p. 72.3)?
১৭৫০-এর প্রথমপাদ থেকে ব্রিটিশ কর্পোরেট কোম্পানি আর ব্যক্তিগত ব্যবসা দুরন্ত সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। ১৭৪৮ সালে ব্রিটিশ-ফরাসি যুদ্ধের শেষে এবং মারাঠা আর বাংলার নবাবের মধ্যে যে শান্তিচুক্তি হল, তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার যে ফরাসী আর এশিয় ব্যবসায়ীরা বাংলার আন্তঃএশিয় ব্যবসায় নতুন করে জাঁকিয়ে বসার সুযোগ পেল। বাংলা ব্যবসাকে নতুন উদ্যমে ঢেলে সাজাতে শুরু করল ফরাসীরা হুগলী, কাশিমবাজার, ১৭৫০-এ ঢাকায় (BPC, vol. 23, f. 150vo, 4 Jan. 1750) এবং পাটনায় (Ibid., f. 407vo, 8 Dec. 1750) কুঠি খুলে। এর সঙ্গে জুড়ল আর্মেনিয় সহ অন্যান্য এশিয় ব্যবসায়ীদের কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা (Ibid., f. 407vo, 8 Dec. 1750)। বাংলার মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্কুচনে কোম্পানির পক্ষে বিশেষ করে শেঠেদের মোকামের গদি থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল, ৪০-এর দশক থেকে কোম্পানি যে ধার নিয়েছে আগে সেগুলি শোধ করলে আগামী দিনে ঋণ পাওয়া যাবে, তারা এমনও শর্ত দিল ব্রিটিশদের (FWIHC, vol. l, p. 472; BPC, vol. 23, f. 303vo, 23 Aug. 1750)।
ব্যক্তিগত ব্যবসা ক্ষেত্রটা খুবই প্রতিযোগিতার মুখোমুখি পড়ছিল বাংলায়। consulage-এর (বাণিজ্যে যেতে নির্দিষ্ট দেশের দূতাবাসকে দেওয়া শুল্ক) পরিমান দ্রুত কমতে থাকে, তার ফলে অনুমান করা যায় কলকাতায় ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা ঢালুর দিকে যাচ্ছে। সে সময়ে কলকাতার দায়িত্বে থাকা রবার্ট ওরমে, তাঁর বন্ধু রবিনসকে লিখছেন, The consulage in years of extensive trade used to be from 20 to 30 thousand rupees to the best of my memory, it is now scarce 5 or 6 clear(Orme to Mr. Robbins, 10 May 1751, Orme, OV 12, f. 83)। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের প্রধান সদস্য চার্লস ম্যানিঙ্গহ্যাম আর উইলিয়ম ফ্রাঙ্কল্যান্ড ক্লাইভকে লেখা চিঠিতে যতদূর সম্ভব ব্যক্তিগত ব্যবসার পতন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছে, … the situation of trade since you left us has continued so bad(Eur. G. 37, Box 21, I Sept. 1753)।

ফরাসী ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত আর ব্রিটিশ আমলাদের ব্যবসাকে কড়া প্রতিযোগিতায় ফেলেও দেওয়া, কলকাতা ভিত্তিক ব্রিটিশ ব্যক্তিগত (বিশেষ করে কোম্পানি আমলাদের) ব্যবসা পতনের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ১৭৫২ সালে কলকাতাবাসী ক্যাপ্টেন ফেনউইক লিখলেন, The French it is probable are now in their zenith of trade in Bengal (Orme Mss., India VI, f. 111 vo)। ডাচ মহাফেজখানায় জাহাজের তালিকা থেকে প্রমান হয় ১৭৫০এর মাঝামাঝি সময়ে বাংলা থেকে চরম শক্তিশালী ফরাসি ব্যবসায়িক জাহাজের বহর ব্রিটিশদের তুমুল প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দেয় এবং রপ্তানি ব্যবসায় ব্রিটিশ প্রাধান্য খর্ব হতে শুরু করে। ১১.২ তালিকায় ১৭৫০-এর মাঝামাঝি সময়ের ব্রিটিশ-ফরাসি জাহাজের তালিকা আমার তত্ত্ব প্রমান করতে সাহায্য করবে, তবে তালিকায় কতগুলি শূন্যস্থান থাকায় পরিপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসা গেল না (voc, 2754, r. 277; 2829, ff. 294-97)।
আলোচ্য ১১.২ তালিকা আমাদের বলে ১৭৫০এর মাঝামাঝি সময়ে ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসা ডুপ্লের স্বর্ণিল সময়কেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। ১৭৫৪ সালে কলকাতায় আসা মোট ব্রিটিশ জাহাজের সংখ্যা ছিল ২০টি (১২টি কোম্পানির, মাত্র ৮টা ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের)। উল্টোদিকে ফরাসী ২৭টি জাহাজের মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদেরই জাহাজ ছিল ২২টা। ১৭৫১ সালে ব্রিটিশ জাহাজের মোট টনেজ ছিল ৭,৪২০ টন, সেখানে ১৭৫৪ সালে ফরাসিদের মোট ব্যবসা ছিল ১০,৪৫০ টন আর ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের অর্ধেক ৫,০২০ টন, আর ফরাসি ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের টনেজ ছিল ৭,৪৫০ টন। এর থেকেও প্রমান হয় ফরাসীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বিপুলভাবে বেড়েছে।
ব্রিটিশদের ব্যক্তিগত ব্যবসাকে খর্ব করছিল ফরাসীরা, এই তথ্য ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে আতঙ্কে রেখেছিল। ব্রিটিশ ব্যবসার পতন রুখতে নানান ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছিল কোম্পানির কলকাতার কর্তারা। প্রথমটি হল ১৭৫০-এর দস্তক সংস্কার, যাতে এশিয় আর ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা সেটি ব্যবহার না করতে পারে (BPC, vol. 23, f. 328, 17 Sept. 1750)। তাদের উদ্দদেশ্য পরিষ্কার ব্রিটিশ আমলা ব্যবসায়ী ছাড়া আর কেউ এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধে না পায় (Ibid.,. vol. 26, ff. 23-24, 13 Jan. 1753)। এছাড়াও ১৭৫৩ সালে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যবসা ছাড়পত্র, ট্রেডিং পাস দেওয়ারও প্রথা শুরু করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ যাতে বন্দরে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের শুল্ক দিতে না হয়। কলকাতার কোম্পানির ব্যবসায়ী কর্মচারীদের বাইরে থাকা ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী জন উড এই প্রথাতে ক্ষিপ্ত হয়ে লিখলেন, এর ফলে কোম্পানির কর্মচারীরাই শুধু একচেটিয়া সমুদ্রপথ ব্যবসা করতে পারবে। ১৭৫৫ সালে গভর্নর রজার ড্রেক আরও বড় বিধিনিষেধ জারি করলেন (Ibid., vol. 28, f. 263vo, 20 Oct. 1755)। কোম্পানির দস্তক আর ট্রেডিং পাস সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে জুড়ল ১৭৫৩-র বিনিয়োগে দাদনি প্রথা থেকে গোমস্তা প্রথায় সরে আসা (৫ অধ্যায় দেখুন)। এই যে সংস্কারের ঝড় চলল ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিলের পক্ষে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এর কারণ হল কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রচেষ্টা। এতক্ষণ আমরা যে বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করলাম সেটি হল, এক দিকে বাংলা আর অন্য দিকে ফরাসী চন্দননগর দখল করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির বাংলা-আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থকে বজায় রাখা। (চলবে)