সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
একাদশ অধ্যায়
ব্যবসা, দামি ধাতু আমদানি এবং বাংলা বিজয়
সাম্প্রতিক কালে বলা হচ্ছে পলাশী চক্রান্তকে (সুশীলবাবু যদিও রেভলুশন কথাটা ব্যবহার করেছেন — অনুবাদক) বোঝার জন্য অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় হিন্দু/জৈন ব্যঙ্কিং আর সওদাগর শ্রেণীর সঙ্গে ব্রিটিশ ব্যবসার সঙ্গে সংযোগকে গভীরভাবে দেখতে হবে। কয়েক পাতা আগে আমি যাকে হিলের ভুত বলেছিলাম, সেই মানসিকতা যে গবেষকদের মাথা থেকে বিন্দুমাত্র নামেনি, এই তত্ত্বটা তার প্রকৃষ্ট প্রমান। সম্প্রতিককালে ব্রিজেন কে গুপ্ত (সুজাউদ্দৌলা বইতে ৩২ পাতা — অনুবাদক) এই তত্ত্ব আমদানি করে বলছেন, ইন্দো-ইওরোপিয় সামুদ্রিক ব্যবসায় হিন্দু সওদাগরি শ্রেণী এবং ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটা গোষ্ঠীস্বার্থ তৈরি হয়েছিল; এই শ্রেণী স্বার্থই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের হাতে বাংলাকে তুলে দেয়। সাম্প্রতিককালে আরও বলা হচ্ছে (C.A. Bayly, Indian Society, pp. 49-50, P.J. Marshall, Bengal, pp. 65) বাংলার ব্যবসা বিশ্বে ইওরোপিয় ব্যবসার হাত ধরে বিপুল পরিমানে দামি ধাতু বাংলায় আসতে শুরু করে, যার ফলে বাংলায় ব্যঙ্কিং ব্যবস্থা আর ইওরোপিয় সওদাগরেরা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে শুরু করে, ইওরোপিয় স্বার্থের সঙ্গে বাংলার ব্যঙ্কিং ব্যবসার স্বার্থ জড়িয়ে যায়। এই তাত্ত্বিকেরা আরও বলার চেষ্টা করেন, বাংলার (উনি লিখছেন ভারতের) ব্যবসায়ী এবং জমিদারদের স্বার্থ ইওরপিয় স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা পড়ছিল, তাই [সিরাজের] কলকাতা থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়ন ব্রিটিশ বন্ধু, বাংলার ব্যবসায়ী এবং জমিদারেরা মেনে নেয় নি, যার ফল পলাশী চক্রান্ত (লিখেছেন রেভলুশন) সফল হওয়া। ভারতীয়দের ঐতিহাসিকদের পক্ষ থেকে আসা এই জোট বন্ধন (কোলাবরেশন) তত্ত্ব আদতে পলাশী চক্রান্তে ব্রিটিশ অংশগ্রহণ অনেকটা লঘু করে ফেলে (P.J. Marshall, Bengal, p.77 বলছেন — ‘By April it was clear to the British that there was a party pf malcontents in Bengal led by the Jagat Seths who were prepared to try to use British power to gain their ends.’ এবং Rajat Kanta Rayও ‘Colonial Penetration and Initial Resistance’, IHR, vol. XII, nos. 1-2, p.15. একই কথা বলেছেন)।
ওপরের সিদ্ধান্তে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্য রয়েছে, যেগুলোর বাস্তবতা সম্বন্ধে সাম্প্রতিক গবেষণাকর্ম যথেষ্ট প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রথম উপপাদ্য হল পলাশীর আশেপাশের সময়ে অর্থাৎ ১৭৫৭-র আগে আগে বাংলার ব্যবসা জগতে ইওরোপিয় বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণতম চলক ছিল। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক কাজগুলি আমাদের এই তত্ত্ব মানতে আমাদের বাধ্য করে (S. Chaudhuri, Trade and Commercial Organization; K.N. Chaudhuri, Trading World; Om Prakash, Dutch Company)। কিন্তু সাম্প্রতিককালে শিরিন মুসভি এই তত্ত্বকে খারিজ করে জোর দিয়ে বলেছেন হয়ত বা অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, ইওরোপিয়রাই শুধু দামি ধাতু বাংলায় আনত না, এবং তারাই একমাত্র সব থেকে বেশি দামি ধাতুও আনত না (Shireen Moosvi, ‘The Silver Influx, Money Supply, Ptices and Revenue Extraction in MughaHndia’, JESHO, vol. XXX, 1987, pp. 92-94.)। যে কোন সূত্রই আমাদের যে কোন গুণগত তথ্য দিক না কেন, অষ্টাদশ শতকের চতুর্থ আর পঞ্চম দশকে বাংলা নির্ভর এশিয় ব্যাপারীদের ব্যবসার পরিমান মোট ইওরোপিয়দের এশিয় ব্যবসার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। একই সঙ্গে প্রমান করা যায়, দুটি মূল রপ্তানি পণ্য — সুতিকাপড় আর রেশমে, বাংলার এশিয় ব্যবসায়ীদের অংশিদারি, ইওরোপিয়দের তুলনায় অনেক বেশি ছিল (৭, ৮ অধ্যায়)। ফলে জোড় দিয়ে বলতে হবে ইওরোপিয়দের মতই এশিয়রাও বাংলায় প্রচুর দামি ধাতু নিয়ে আসত, এবং তাদের এই দামি ধাতু দিয়েই ব্যবসা করত, কারণ বাংলা বাজারে ধাতুকে মুদ্রায় রূপান্তরিত না করে কোন পণ্য কেনা যেত না[অর্থাৎ কর্পোরেট বাণিজ্যের ভাষায়বাংলায় লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল — অনুবাদক]। ফলে ইওরোপিয়রা বাংলার সব থেকে বড় দামিধাতু আমদানি করত এই ভিত্তিহীন তত্ত্বের মূল্য নেই এবং একই সপ্নগে ইওরোপিয় বাণিজ্যের ওঠাপড়ার সঙ্গে পলাশী বিপ্লবের সম্বন্ধও প্রশ্নের মুখে পড়া দরকার।
দ্বিতীয় উপপাদ্যটাও একইভাবে অনিশ্চিত এবং প্রশ্নবোধক হয়ে রয়েছে। বলা হয়েছে ইওরোপিয় কর্পোরেটদের সঙ্গে বাংলার বণিক আর জমিদারদের ভাগ্য ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল, এবং যেহেতু পলাশীর আগে ইওরোপিয়রা ছিল বাংলার মুখ্য রোজগার সূত্র, তাই ইওরোপিয়দের আনা সম্পদের সূত্রে, বা ইওরোপিয়দের সঙ্গে ব্যবসা সূত্রে বাংলার বাণিকদের ক্ষমতায় আরোহণ ঘটে। অথচ এর আগে আমরা দেখিয়েছি, বাংলার ব্যবসা জগতে ইওরোপিয়রা মুখ্যভূমিকায় ছিল না বরং তাদের তুলনায় বাংলার এশিয় সওদাগরেরা বাংলা ব্যবসা ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এশিয় বণিকদের ভাগ্য ইওরোপিয় কর্পোরেট বা সামগ্রিক ইওরোপিয় ব্যবসার সঙ্গে এক সুতোয় ঝুলেছিল এমন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। আমার এই তত্ত্বকে প্রমাণিত করা যায় বাংলার তখন তিন সব থেকে বড় সওদাগর, জগতশেঠ, উমিচাঁদ এবং খাজা ওয়াজিদ বিষয়ে আলোচনায় — এই তিন ব্যবসায়ী পলাশী চক্রান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণতম খেলোয়াড়। ১৭৫৭-য় লুক স্ক্র্যাফটনের ক্ষা হিসেবে দেকঘি, জগতশেঠ পরিবারের বাৎসরিক আয় ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। এই ৫০ লক্ষ টাকার মধ্যে কোম্পানিগুলোর বাংলায় আনা দামিধাতু থেকে মুদ্রা তৈরির বাটা এবং ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোকে দেওয়া ধারের সুদ সূত্রে রোজগার হত খুব বেশি হল ১৫ লক্ষ টাকা (৫ অধ্যায় দেখুন)। এর পরে কী করে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি জগতশেঠের গদির ভাগ্য নির্ভর করত একমাত্র ইওরোপিয়দের আনা দামি মুদ্রার বাটার ওপরে! একইভাবে উমিচাঁদ এবং খাজা ওয়াজিদ যদিও ইওরোপিয় ব্যবসার সঙ্গে অনেক গভীরভাবে যুক্ত ছিল, কিন্তু তাদের মূল রোজগার ছিল বাংলার নুন আর সোরার একচেটিয়া ব্যবসা থেকে। এছাড়াও উমিচাঁদ আফিম এবং শস্য ব্যবসায় হাত দেন আর খাজা জড়িয়ে ছিল সুরাট, লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরীয় ব্যবসায় তার নিজের বিপুল বাণিজ্য বহর নিয়ে। এইসব উদাহরণে আমাদের ধারণা হয় না যে বাংলার ব্যবসা সংগঠন কোনভাবে ইওরোপিয় ব্যবসার সংগঠনের ভাগ্যের সঙ্গে সমানুপাতিকহারে জড়িয়েছিল।
চন্দননগরে ব্রিটিশ আক্রমন পলাশীর রাস্তা খুলে দিল
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদৌলা প্রথম দস্তক অপব্যবহারের অস্বস্তির এবং তার সঙ্গে দুর্গ বানানোর বেআইনি কাজের বিষয় উত্থাপন করেন এমন সময়ে যখন তার কিছু আগেই কয়েক দশক ধরে চলা ব্রিটিশ আমলাদের ফুলেফেঁপে ওঠা ব্যক্তিগত ব্যবসা সঙ্কটপূর্ণ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে; এবং কোম্পানি এবং নবাবের মধ্যে দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে (আমার প্রবন্ধ দেখুন Sirajuddaullah, English Company IHR, vol: XIII, nos. 1-2, pp. 113-122)। ব্রিটিশদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে নবাব কলকাতায় দূত এবং চিঠি পাঠালেন। নবাব যখন পূর্ণিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন সে সময় রাজমহলে তার কাছে খবর এল তার প্রথম চিঠি বহন করে নিয়ে যাওয়া দূত নারায়ণ সিংএর প্রতি দুর্ব্যহার করা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে তিনি তুরন্ত গতিতে কাশিমবাজারে এসে কুঠি দখল করেন। এরপরে তিনি কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ব্যক্তিগত ব্যবসায় নাক পর্যন্ত ডুবে থাকা ব্রিটিশ প্রশাসক রজার ড্রেক প্রকাশ্যে নাকি বলেছিলেন, the sooner he [Sirajuddaullah] came [to Calcutta] the better and he [Drake] would make another nawab (Watts and Collet to the Court of Directors, 17 July 1756, quoted in S.C. Hill, Bengal in 1756-57, vol. i, pp. 116-17)। নবাব কলকাতা দখল নিলে ব্রিটিশরা কলকাতা থেকে পালিয়ে ফলতায় আশ্রয় নেয়। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের সদস্য এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী ম্যানিংহ্যাম মাদ্রাজে আরও বাহিনী পাঠাবার বার্তা পাঠান। ১৭৫৬ সালের ১৩ অক্টোবর মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জ থেকে ক্লাইভ এবং ওয়াটসনের নেতৃত্বে পাঠানো বাহিনীকে শুধুই কলকাতা দখলের নির্দেশ দেওয়া ছিল তাই নয়, প্রয়োজন হলে effect a junction with any powers in the province of Bengal that might be dissatisfied with the violence of the nawab’s government or that might have pretensions to the nawabship(Records of Fort St. George, Diary and Consultation Books, Military Dept., 1756, p. 330; Orme Mss . vol. 170, f. 90)। বাংলায় শুধু সরকার উতখাতের ঘটনা ঘটানোর কথাই বলা ছিল না তার সঙ্গে সেন্ট জর্জের কাউন্সিল ফরাসীদের চন্দননগর থেকে উতখাতের প্রয়োজনীয়তাও জানিয়েছিল We have desired Mr. Watson, if he thihks it practicable, to dispossess the French of Chandernagore …. Should you be of this opinion we desire that you will enforce our recommendation (Fort St. George Select Committee to Select Committee, Fort William, 14 Nov. 1756, Hill, Bengal in 1756-57, vol. I, p. 302)।
ব্রিটিশেরা কলকাতা দখল করল এবং হুগলির পোতদারকে পদত্যাগে বাধ্য করাল। এই ঘটনার একটা উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য হতে পারে এশিয় বণিক আর ফরাসী ব্যক্তিগত বণিকদের আন্তঃএশিয় ব্যবসা ধ্বংস করা। হুগলি আক্রমনে খাজা ওয়াজিদের ব্যবসা সাম্রাজ্যে আঘাত হানল। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নবাবের শিবিরে চিড় ধরানো যা ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের চিঠিতে পরিষ্কার The capture and destruction of Hugli was esteemed so essential to strike a terror into the Subah’s troops and encourage any malcontents to declare in our favour …. This we have reason-to believe has had the desired effect (Beng. Letters Reed., vol. 23, f. 405, 31 Jan. 1757)। ৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭ সালে কলকাতায় ব্রিটিশেরা নবাবের সঙ্গে আলিনগর চুক্তি করতে বাধ্য হল। যে উদ্যমে এই চুক্তিটি সম্পন্ন হল তাতে ব্রিটিশদের ধারণা হল যে নবাবের সমর্থনে ফরাসীদের দমন করা যাবে এবং এই কাজে তারা উইলিয়াম ওয়াটস এবং উমিচাঁদকে নবাবকে প্রভাবিত করতে নিয়োগ করল। (চলবে)