সমৃদ্ধি থেকে পতন — অষ্টাদশ শতকের বাংলা
একাদশ অধ্যায়
চন্দননগরে ব্রিটিশ আক্রমন পলাশীর রাস্তা খুলে দিল
সিরাজ তার রাজত্বে ইওরোপিয়দের নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু হোক, এটা নবাব সিরাজ চাইছিলেন না। সহকারী, হুগলি [বন্দরের] দায়িত্বে থাকা নন্দকুমারকে বলেন, তিনি যেন দুপক্ষকেই এই ব্যাপারটি জানিয়ে দেন (Watts to Clive, 18 Feb. 1757, Hill, Bengal in 1756-57, vol-II, p. 288; Clive to Selec’t Committee, 22 Feb. 1757, Hill, Bengal in 1756-57, vol. II, p. 240)। কিন্তু উমিচাঁদের মাধ্যমে নন্দকুমারকে ঘুষ দিয়ে রাখে ব্রিটিশেরা, যাতে তারা চন্দননগর আক্রমণ করলে নবাব পক্ষ ফরাসিদের সাহায্যে না আসে। আলিনগরের চুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিটিশেরা ফরাসীদের চন্দনগর থেকে উচ্ছেদ করতে বদ্ধ পরিকর ছিল, এবং চন্দননগরে যে কোনও দিন ব্রিটিশ আক্রমন করার জন্যে তৈরি শুধু কয়েকটা সমস্যার জন্যে তাদের পরিকল্পনাটা স্থগিত রাখতে হয়। বম্বে থেকে পাঠানো যে নৌ বাহিনীর সাহায্যের আশায় প্রতিদিন পথ দেখছিল কলকাতার আমলারা, সেই বাহিনী তখনও বাংলায় এসে পৌঁছোয় নি। চন্দননগর দখল করলে নবাবের ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে পড়তে হতে পারে, এই ভয়ে ব্রিটিশেরা হাত গুটিয়ে বসেছিল। ব্রিটিশদের হাতে যা বাহিনী আছে তাই নিয়ে সম্ভাব্য বঙ্গ-ফরাসী জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে মরিয়া হয়ে উঠলেও সাহস হচ্ছিল না। নবাবের সমর্থন না থাকায় এডমিরাল ওয়াটসন ফরাসীদের আক্রমনে দ্বিধা করছিলেন। ৪ মার্চ পর্যন্ত ক্লাইভ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নি (Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, pp. 108-110)।
পরের দুদিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় অবস্থা নাটকীয় মোড় নিল। এই ঘটনা দুটো পরের সময়ের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে। প্রথমত কাম্বারল্যান্ডশ জাহাজে করে বম্বে থেকে পাঠানো বাহিনী বাংলায় এল (Orme, Military Transactions, vol. II, pp. 142-43)। দ্বিতীয়ত আহমদ শাহ আবদালির সম্ভাব্য বাংলা আক্রমনের আশংকায় ক্লাইভের কাছে চিঠি পাঠিয়ে নবাব জানালেন ব্রিটিশেরা তার সঙ্গে যোগ দিলে তিনি ক্লাইভকে মাস ১ লক্ষ টাকা দিতে ইচ্ছেক (Sirajuddaullah to Clive, 4 March 1757, Hill, Bengal in 1756-57, vol. III, pp. 270- 71)। এই দুই ঘটনা একসঙ্গে ঘটে যাওয়ার নিশ্চেষ্ট, আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে না পারা ক্লাইভ আগের অবস্থান বদলে দুদিন পরেই সিদ্ধান্ত নিলেন বিশ্ব ব্রিটিশদের চক্রান্তের বিষয়ে যা খুশি ভাবুক, তিনি কোনও কিছুকেই পাত্তা দেবন না। ৮ মার্চে ক্লাইভ চন্দননগরের দিকে বাহিনী নিয়ে কুচ করলেন। আশংকিত ফরাসীরা ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে ৯ মার্চ ক্লাইভ জানালেন — I very sincerely declare to you that at this present time I have no intention to attack your settlement. If I should alter my mind, I shall not fail to advise you of it (Clive to the French Council at Chandernagore, 9 March 1757, Hill, Bengal in 1756-57, vol. II, p. 277)।
আবদালির আক্রমনের আশংকা মাথার ওপরে উদ্যত খাঁড়ার মত ঝুললেও যুবা নবাব বাংলা সুবায় ইঙ্গ-ব্রিটিশ দ্বন্দ্ব প্রশমিত করতে এডমিরাল ওয়াটসনকে চিঠি লিখলেন। উদ্দেশ্য ছিল এর আগে ফরাসীদের নিরপেক্ষ থাকার চুক্তিতে উপনীত হওয়ার বিষয়টা ব্রিটিশদের মনে করিয়ে দিতে। চিঠিটি লিখছিলেন নবাবের সচিব। ওয়াটসন তাকে যথেষ্ট পরিমান ঘুষ দিয়ে নিশ্চিত করান যে চিঠির বক্তব্য এমন হবে যাতে অবিলম্বে ব্রিটিশেরা আক্রমন শানাতে পারে এবং সেই চিঠি যাতে তাড়াতাড়ি পৌঁছয় সে ব্যবস্থাটাও তারা করলেন। to pen this important epistle in a proper style so as to permit the attack immediately and to desptach it without delay (John Campbell, Memoirs, pp. 42-43)। এটা বলা হয় যে এই চিঠিতে ওয়াটসন চিঠির এমন একটা বয়ান তৈরি করালেন যাতে মনে হয় তারা নবাবের অনুমতি ছাড়াই চন্দননগর আক্রমন করার অনুমতিপ্রাপ্ত (বিশেষ করে সেই সময়ের দুই আমলা ওয়াটস এবং ঈভসের ভূমিকাটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশদের জন্যে দেখুন Brijen K. Gupta, Sirajuddaull,q,h, p. 111)। মুর্শিদাবাদের ব্রিটিশ রেসিডেন্ট স্ক্রাফটন মনে করলেন এই চিঠিটার মাধ্যমে নবাব ব্রিটিশদের চন্দননগর আক্রমনের বিষয়টি আন্দাজ করতে পারছেন, যদিও চিঠিতে এমন কিছুই ছিল না (Luke Scrafton, Reflections, p. 75)। বাস্তব হল, ওয়াটসন নবাবের থেকে কোন সম্মতি নেওয়ার কথা ভাবছিলই না। এমন কি নবাবের চিঠি হাতে পাওয়ার আগেই তিনি তার ম্যান-অব-ওয়ারকে সড়ক পথে ক্লাইভের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্যে আগেভাগেই পাঠিয়ে দিলেন (Clive to Watson, 11 March 1757, Hill, Bengal in 1756-57, vol. II, p. 280)।
ফরাসী বিশ্বাসঘাতকেরা ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত না মেলালে ফরাসীদের পতন এত তাড়াতাড়ি হত না, এবং হয়ও নি। ১৩ মার্চ ক্লাইভ ফরাসী সেনা প্রধান রেনল্ডকে দুর্গ ছেড়ে দিতে বললেন এবং রেনল্ড তা অস্বীকার করলে রাতেই যুদ্ধ লেগে গেল। ১৪ মার্চ চন্দননগরে অবরোধ শুরু হল। সিরাজের নীতি ছিল দুই ইওরোপিয় শক্তি যুযুধান হলে তিনি একজনকে সমর্থন করবেন, এবং এই ঘটনায় ফরাসীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি তার আমলা নন্দকুমারকে ফরাসীদের সাহায্য করতে পাঠালেন। ব্রিটিশদের নন্দকুমারকেও ঘুষ দিয়ে প্রভাবিত করে এবং তিনি নবাবকে লিখলেন, That as the French were unable to resist the English, he had therefore ordered ‘his troops to Hughli, lest his [the nawab’s] victorious colours should be invoived in their [the French] disgrace (Luke Scrafton, Reflections, p. 70)।
তবুও তখনও সব শেষ হয়ে যায় নি। মুর্শিদাবাদের দরবারে ফরাসী প্রতিনিধি জাঁ ল’ ব্রিটিশ আক্রমনের খবর পেলেন ১৫ মার্চ। তিনি ঘটনার পূর্ণ বর্ণনা দিলেন নবাবকে কিন্তু দেখলেন নবাব কেমন যেন অনিশ্চয় এবং দ্বিধান্বিত। তার মনে হচ্ছিল মুর্শিদাবাদের দরবারেই যেন চন্দনগর আক্রমণের চক্রান্ত তৈরি হচ্ছে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে নবাব যখন তার দক্ষ সেনাপতি রায়দুর্লভ এবং মীর মদনকে ২২ মার্চ হুগলী পাঠালেন তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে — ফরাসী প্রধান রেনল্ট তাদের সমস্ত সম্পদ পিছনে ফেলে রেখে চন্দনগর ছেড়ে যাওয়ার কাগজে স্বাক্ষর করে দিয়েছে (For detailed account, see Brijen K. Gupta, Sirajuddaullah, pp. 112-13)। চন্দননগরের পতনের কারণ খুঁজিতে গিয়ে স্ক্রাফটনই আদত মন্তব্য করেছেন, নবাব ভয় আর ইচ্ছের মধ্যে দোদুল্যমান ছিলেন (Nabob floated between his fears and his wishes) ভয়টা ছিল আবদালির আক্রমন, আর তার দরবারের আমলা/অভিজাতদের বিশ্বাসঘাতকতা; ইচ্ছেটা ছিল ফরাসীদের সাহায্য করতে তাদের পাশে দাঁড়ানো আর সেনানায়ক (মার্কুইস দ্য) বুসির নতুন করে সেনাবাহিনী এনে ব্রিটিশদের পরাজিত করার ভাবনা।
বহুকাল ধরেই ব্রিটিশদের হাতে চন্দনগর আক্রমনের যে যুক্তি দেওয়া হয়ে এসেছে সেটা হল ইঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং বাংলা-ফরাসী জোট ভাঙ্গা। কিন্তু আমাদের হাতে যতটুকু তথ্য আছে তার থেকে যে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে ফুটে ওঠে সেটি হল, ফরাসী আন্তঃএশিয় ব্যবসা এবং বাংলায় হুগলীভিত্তিক খাজা ওয়াজিদের নেতৃত্বে এশিয় ব্যবসায়ীদের প্রতাপে ১৭৪০-এর পর থেকে ১৭৫০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা মাথা থুবড়ে পড়ছিল। ফরাসীরা বাংলা দখলে ব্রিটিশ পরিকল্পনার সামনে বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাশাপাশি বাংলা থেকে ফরাসীদের তাড়িয়ে দেওয়ার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল নবাবের দরবারে ফরাসী লবিকে দুর্বল করে দেওয়া। খাজা ওয়াজিদ ফরাসীদের পক্ষে মুর্শিদাবাদ দরবারে তার সামাজিক, ব্যবসায়ীক প্রভাব নিয়ে উপস্থিত থাকতেন। ফরাসীদের পতনের ফলে বাংলায় ব্রিটিশ আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার দ্বার এবং বাংলা দখলের সুযোগ উন্মুক্ত হয়ে গেল। আরও একটা বিষয় স্পষ্ট হল পলাশী চক্রান্তের বীজ রোপন হয়েছিল সেন্ট জর্জ কাউন্সিল থেকেই, আমরা আগেই দেখেছি, তারা স্পষ্ট জানিয়েছিল to effect a junction with any powers যা disgruntled or had pretensions to nawabship। এই বক্তব্যই চক্রান্তের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। পলাশি চক্রান্তে যদি নবাবির বিরুদ্ধে যদি কোন অসন্তোষ থাকত, তাহলে সেটা প্রয়োজনীয় অবস্থা ছিল কিন্তু যথেষ্ট পরিমানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বিভিন্ন সূত্র অবলম্বন করে আমরা আরও বলতে পারি যে উভ্যুত্থানটা ঘটিয়েছিল এক্কেবারে ব্রিটিশদের পরিকল্পনাতেই। তারা দরবারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিজাতকে যোগাযোগ করেছিল যাতে our [British] project [of deposing the nawab] into execution (Orme Mss., India V, f. 1228; O.V. 170, f.265. বিশদের জন্যে দেখুন আমার প্রবন্ধ ‘Trade, Bullion and Conquest — Bengal in the mid-18th Century’ in Itinerario, vol. 15, 1991, no. 2, pp. 27-30)। এবং এর পরে বাংলায় ব্রিটিশ বিজয়ের পথ উন্মুক্ত হয়। (চলবে)