২০১৯ সাল। ১৭তম লোকসভা গঠনের জন্য সাধারণ নির্বাচন হবে। এপ্রিল ও মে মাসে। তার আগেই দুম দাম ফটাস ফাঁই। কত সেনা চলেছে সমরে। হুণ্ডির রাজার সে কি বিক্রম !
মাস দুয়েক পেছিয়ে যান। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ৭৮টি গাড়িতে ২৫০০ জন সি আর পি এফ জওয়ানকে নিয়ে চলেছে এক কনভয়। জম্মু ও কাশ্মীরের দিকে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ৪৪ দিয়ে চলেছে কনভয়। আচমকা সেই কনভয়ে ঢুকে পড়ল একটা বাস। সে বাসটা ঠাসা ছিল বিস্ফোরকে। বিস্ফোরণ হল প্রচণ্ড শব্দে। ৭৬তম ব্যাটালিয়ানের ৪০ জন ভারতীয় সেনা শহিদ হলেন। চারদিকে কালো ধোঁয়া। লকলকে আগুনের শিখা।
ভারতের প্রত্যাঘাত। দাবি, পাকিস্তানের বালাকোটের জঙ্গি শিবিরকে গুঁড়িয়ে দেয় ভারতের বায়ু সেনা। সে কি বিক্রম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর! দেশবাসীকে বলছেন, আমরা ওদের ঘরে ঢুকে মেরে আসব। তাঁদের প্রচারযন্ত্রে সে কথা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হল। জাতীয়তাবাদের জিগির তৈরি হল। পাকিস্তানের কার্যকলাপে এ দেশের মানুষের তার প্রতি অবচেতন মনে যে ঘৃণা জমেছিল, তাকে উত্তপ্ত করা হল। কৃত্রিম দেশপ্রেমের আবেগ তৈরি হল। মনে আছে, আমার পাড়ার এক রিক্সাচালক বলেছিলেন, ‘বেশ করেছে, ঠিক করেছে, একেই বলে হিম্মত।’ লাফালাফি করতে লাগল চিয়ার লিডাররা। কারা তারা? কেন, আমাদের গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কিছু স্বঘোষিত ধারক ও বাহকরা !
ফল কি হল ?
১৭তম লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেল ৩৫২টি আসন। ব্যস কেল্লা ফতে।
প্রত্যাঘাতের স্থান দেখতে এসে বিদেশি সংবাদ মাধ্যম হতাশ হয়েছিলেন। তাঁরা জঙ্গীদের দেহাবশেষ দেখতে পান নি। দেখতে পান নি তাদের আস্তানা। দেখেছিলেন কয়েকটা পাইন গাছ ও একটি কাকের ধ্বংসাবশেষ। ওরা বিদেশি, ওরা আমাদের দেখতে পারে না, বেশ তাদের কথা না হয় বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক কেন বললেন রাজনৈতিক লাভের কথা? কেন বললেন পুলওয়ামা বিস্ফোরণের চেয়ে বিস্ফোরক সত্য লুকিয়ে আছে? সি আর পি এফ এতবড় কনভয় বহন করার জন্য বিমান চেয়েও কেন পা্য় নি? এত সেনা, এত কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও আর ডি এক্স কি ভাবে পৌঁছাল সেখানে?
এসব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায় নি এখনও।
এ বছরের এপ্রিল মাস। গুলমার্গ, সোনমার্গ, পহেলগাঁওতে পর্যটকের ঢল। এবার রিসর্ট জিহাদ। পহেলগাঁওএর বৈসারন ভ্যালির রিসর্টে দুপুর আড়াইটেতে জলপাই রঙের পোশাকপরা একদল ‘জঙ্গী’ ঢুকে পড়ল। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এরা গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। প্রশ্ন করতে লাগল : হিন্দু না ওরা মুসলিম। পোশাক খুলে পরীক্ষাও করল। তাদের গুলিতে ২৬ জন ‘অ-হিন্দু’ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।জঙ্গীরা নাকি টি আর এফের লোক। এই সংগঠন না কি ‘লস্কর-ই-তইবা’, ‘তেহরিক-ই-মিলাত’, ঘাজনাভি-হিন্দে’র পরিকল্পনাকে কাজে রূপ দেয়।

ব্যস। জঙ্গীদের শেকড় উপড়ে ফেলার, তাদের মদত দেয় যে পাকিস্তান তাদের উচিত শিক্ষা দেবার উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা। একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আবহাওয়া তৈরি। অপারেশন সিঁদুর। হিন্দু নারীর সিঁদুর কেড়েছে মুসলমান জঙ্গী, তাই অপারেশন সিঁদুর। এখানেও ধর্মের সুড়সুড়ি। কিন্তু সামনে তো সাধারণ নির্বাচন নেই, তাহলে যুদ্ধ কেন? একেবারে নেই যে তা নয়। বিহার আছে, পশ্চিমবঙ্গ আছে, কেরল আছে। তাছাড়া ভাবমূর্তি ফিকে হবার ব্যাপার আছে। উচ্চ ন্যায়ালয়ের সঙ্গে সংঘাত আছে। ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ ধ্বনিটা তীব্র হবার তীব্র আশঙ্কা আছে।
রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ। আসরে নামলেন বাছাই চিয়ার লিডাররা। বার বার ‘চিয়ার লিডার’ বলছি কেন? এটা কি আমার কথা? না, না, ভারতের সংবাদ মাধ্যমের কিছু ঘোষক আর সঞ্চালককে এই নাকে ডেকেছেন বিখ্যাত ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার প্রতিবেদক — ‘as anchors and commentators became cheerleaders for war between two nuclear — armed states….’ .
২০১৯ সালে মিথ্যার বেসাতি করেছিল কিছু সমাজ মাধ্যম, এবার নেমে পড়েছে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াও। দক্ষিণ এশিয়ার মিথ্যা ও ভুল তথ্য নিয়ে গবেষণা করছেন যে সুমিত্রা বদ্রিনাথন, তিনি বলেছেন যে আগে বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন, এমন কিছু সাংবাদিক, মিডিয়া হাউস নিযুক্ত হয়েছেন মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। মিথ্যার একটা শক্তি আছে। মার্ক টোয়েন বলেছেন, ‘সত্য যতক্ষণ জুতো পরতে সময় নেয় সেই সময়ে মিথ্যা ঘুরে আসে অর্ধেক পৃথিবী। ’
চার দিনের যুদ্ধ নিয়ে বান ডাকল মিথ্যার। জাতীয়তাবাদের জিগিরটা কেমন থিতিয়ে যাচ্ছিল। তাই মরা গাঙে বান ডাকাতে হল …
করাচি বন্দর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে… পাকিস্তানের পরমাণু কেন্দ্র বিধ্বস্ত … পাকিস্তানের তেল ও বাণিজ্যকেন্দ্রের শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে … দুটি পাকিস্তানি ফাইটার জেট ভূপাতিত … ভারতীয় নৌবাহিনী আক্রমণ করেছে করাচি … ইসলামাবাদ করায়ত্ত … এমনি আরও কত কি। পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যমও গল্পের গরুকে এইভাবে গাছে উঠিয়েছে।
মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের জন্য রাজদীপ সরদেশাইএর মতো অন্য কোন সাংবাদিক ক্ষমা চান নি। বরং ‘মেজর ম’ ও ‘কর্ণেল সু’র মতো আজও গোয়েবলসীয় কায়দায় বেমালুম মিথ্যে বলে চলেছেন।
সেসব না হয় হল, কিন্তু জঙ্গীরা গেল কোথায় ?
পুলওয়ামার ঘটনায় জঙ্গী আদিল দার নাম পাওয়া গিয়েছিল, এবার? না, নাম পাওয়া যায় নি। তারা এলো কি ভাবে এবং গেল কোথায় কেউ জানে না। সেনায়-গোয়েন্দায় মোড়া কাশ্মীরে এরা ঢুকল কিভাবে তাই জানা যায় নি। কিছু দিন পরে কাশ্মীরের পুলিশ জনা তিনেক জঙ্গীর ছবি দিয়ে জনগণের কাছে আবেদন জানালেন তাদের খুঁজে দিতে। তার মানে তারা ভারতেই আছে? তাজ্জব কি বাত। ভারতেই থাকে যদি তাহলে যুদ্ধটা লাগল কেন বলুন তো! আর যুদ্ধ যদি লাগলই, তাহলে হঠাৎ যুদ্ধবিরতি হল কেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নির্দেশে? কিন্তু নির্দেশ দেবার তিনি কে?
সন্দেহ, সন্দেহ, সন্দেহ…
সেই সন্দেহ আরও বেড়ে যায় দেশে দেশে বিরোধীদের দৌত্য করার ডাকে। যে প্রধানমন্ত্রী এই সেদিনও বলেছেন যে বিরোধীরা পাকিস্তানের ভাষায় কথা বলেন, সেই তিনি আজ সহযোগিতার জন্য ডাকছেন বিরোধীদের।
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের লোকেরা বুঝতে পেরেছেন এই যুদ্ধটা আগের মতো ভারতের জনতা ঠিক গিললো না। ধর্ম-ধর্ম ব্যাপারটা যেমন ফিকে হচ্ছে, যুদ্ধ-যুদ্ধ ব্যাপারটাই তেমনি ফিকে হচ্ছে।
তাহলে উপায়?
অসাধারণ মূল্যায়ন!
অত্যন্ত বলিষ্ঠ প্রতিবেদন!