‘লুচির কোলে পড়ল চিনি,
যেন শ্যামের কোলে সৌদামিনী।।’
গানটি প্রচলিত, গীতিকার অজানা। কিন্তু তিনি যে কত উচ্চ স্তরের লুচিরসিক, তা তাঁর উপমাই বুঝিয়ে দেয়। লুচির সৌরভে ম-ম করছে লুচিবিলাসী বাঙালীর সাহিত্য, ছায়াছবি, গান ।
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শীতকালের প্রত্যেক শনিবারে তাঁর বাড়িতে বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করতেন পদ্য লিখে।
‘ফুলকো লুচি ভাজা কপি/ মাংস থাবা থাবা/ খাবে যদি, পদ্মপুকুর/ দৌড়ে এস বাবা।’
বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘যে আকাশে লুচি-চন্দ্রের উদয় হয়, সেইখানে আমার মন-রাহু গিয়া তাহাকে গ্রাস করিতে চায়। অন্যে যাহা বলে বলুক, আমি লুচিকেই অখণ্ড মণ্ডলাকার বলিয়া থাকি’। এটা কি কেবলই কমলাকান্তের মুখের কথা, স্বয়ং সাহিত্যসম্রাটের মনের কথা নয়?
‘লুচি আমাদের সামনে একটা মোটা কাঠের বারকোশে রাশ করা থাকিত। প্রথমে দুই-একখানি মাত্র লুচি যথেষ্ট উঁচু হইতে শুচিতা বাঁচাইয়া সে আমাদের পাতে বর্ষণ করিত।… তাহার পর ঈশ্বর (পরিচারক) প্রশ্ন করিত, আরও দিতে হইবে কিনা’ রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’র পাতা ওল্টালেই দেখা যায় যে তাঁর বাল্যস্মৃতি লুচির সুবাসে ভরপুর। আবাল্য লুচিসেবনে অভ্যস্ত রবীন্দ্রনাথের লেখালেখিতেও তাই বোধহয় লুচির ঘ্রাণ!
‘সহজ পাঠ ‘এ শক্তিনাথ আর আক্রমের বাঘ শিকারের গল্পটা মনে আছে ? বন্দীপুরের বনে বাঘ শিকারে গিয়ে শক্তিবাবু খাওয়ার জন্যে সঙ্গে কী নিয়ে গেছিলেন ?

‘সঙ্গে ছিল লুচি, আলুর দম আর পাঁঠার মাংস’।
বিলিতি গল্প হলে লাঞ্চপ্যাকে স্যান্ডউইচ থাকত, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বাঙালী শক্তিবাবুর জন্য লুচি ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন নি।
এক চিঠিতে প্রমথকে লিখছেন , ‘খবরের কাগজের সমস্ত প্রসঙ্গ যখন তুমি বাদ দিতে লিখেচ তখন চিঠি লেখাই একরকম অসম্ভব। ঘি বাদ দিয়ে লুচি ভাজতে বললে, হয় লুচি ভাজা বন্ধ করতে হয়, নয় অনুরোধটা একটু পরিবর্তন করতে হয়।’
শরৎচন্দ্রের লেখালেখিতে আছে বাঙালি জীবনের খাওয়া ও খাওয়ানোর অন্তরঙ্গ বর্ণনা, আর সেখানেও লুচির সুরভিত উপস্থিতি। ‘পল্লী-সমাজ’এ দেখা যায় রমেশের পিতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে পংক্তিভোজনে খাইয়ে দাইয়ে সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল ‘ ষোলখানা লুচি, চারজোড়া সন্দেশ’।
ভোজনপ্রিয় বিভূতিভূষণের লেখায় যে বাঙালির পাতের বিবিধ রান্নার খুঁটিনাটি বর্ণনা থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক, আর তার মধ্যে লুচি থাকবে না? তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘উপেক্ষিতা’। সেখানে গ্রামের স্নেহশীলা বৌদিদি তার পাতানো ভাইকে এটা ওটা করে খাওয়াতেন। বিভূতিভূষণের বর্ণনায়— ‘সাত আট দিন পরে রুটির বদলে কোনদিন লুচি, কোনদিন পরোটা দেখা দিতে লাগল।’
‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’এ পাওয়া যায় হাজারি ঠাকুরের লুচিভাজার অনবদ্য বর্ণনা — ‘তারপর একঘন্টা হাজারি অন্য কিছু ভাবে নাই, কিছু দেখে নাই। দেখিয়াছে শুধু লুচির কড়া, ফুটন্ত ঘি, ময়দার তাল আর বাখারির সরু আগায় ভাজিয়া তোলা রাঙা রাঙা লুচির গোছা— তাহা হইতে গরম ঘি ঝরিয়া পড়িতেছে’। পড়তে পড়তে পাঠকের জিভেও জল ঝরা আশ্চর্য নয়।
হাস্যরসের মহাগুরু পরশুরামের ‘লম্বকর্ণ’ গল্পে দেখা যাচ্ছে যে রায়বাহাদুরের সঙ্গে যখন তাঁর পত্নী মানিনীর মান-অভিমানের পালা শেষ হলো, তখন মানিনীদেবী স্বামীকে সোহাগ করে বলছেন, —’ওকি, সে হবে না- এই গরম লুচি কখানি খেতেই হবে, মাথা খাও!’ অভিমানিনী পত্নী যখন সোহাগ করে খেতে দিচ্ছেন, তখন লুচি ছাড়া আর কিছু ভাবা যায়! পরশুরাম অন্তত অন্য কিছু ভাবতে পারেন নি।
লুচিকে একটু অন্যভাবে, শ্লেষাত্মক ভাবে পরিবেশন করেছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁর ‘লুচির উপাখ্যান’ গল্পে। ‘হঠাৎ একটা মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। চাকর দু থালা মনোরম আর ফুলকো লুচি নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। …মুহূর্তে লুচির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। টাটকা ঘিয়ের এমন চমৎকার লুচি কতদিন খাইনি!’

লুচি আছে শিশু কিশোর সাহিত্যের পাতেও ।
সুনির্মল বসুর ‘এমন কি আর খাই’ ছড়াটিতে অল্পভোজী মানুষটির চাহিদা দেখুন,
‘তোমরা যাই বল না ভাই, এমন কি আর খাই !
আস্ত পাঁঠা হলেই পরে, ছোট্ট আমার পেটটি ভরে,
যদি তার সঙ্গে ফুলকো লুচি গণ্ডা বিশেক পাই,
এমন কি আর খাই!’
উপেন্দ্রকিশোরের ‘পাকা ফলার’ গল্পে রাজামশাই গরিব ব্রাহ্মণকে পাকা ফলারে খাইয়েছিলেন লুচি।
লুচির সুকুমার আবেদন উপেক্ষা করতে পারেননি লুচি-বিলাসী সুকুমার রায়, যার নমুনা তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে। পাগলা দাশুর একটি গল্পে এক ছাত্রের টিফিনের বর্ণনা — ‘একটা ঠোঙায় করে লুচি, আলুর দম আর সরভাজা’। ‘পালোয়ান’ কবিতায় ষষ্ঠীচরণকে মনে আছে তো ? যিনি খেলার ছলে ‘হাতি লোফেন যখন তখন’ আর ‘সন্ধ্যা হলে লাগায় তেড়ে দিস্তা দিস্তা লুচির তাড়া।’ ‘চোর ধরা’ কবিতায় টিফিনের জিভে- জল- আনা খাবারের তালিকায় কাটলেট, জিবে গজা, মন্ডার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে ‘লুচি তিন গণ্ডা।’ আরেকটি কবিতা ‘খুড়োর কল’-এ কলের সঙ্গে বাঁধা আছে —
‘সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যেরকম রুচি
মণ্ডামিঠাই চপকাটলেট খাজা কিংবা লুচি’
‘বড়ো চোর ছোট চোর’ গল্পে নবুর ওপর রেগে গিয়ে একবার নন্দরাম হাতে যা ছিল ছুঁড়ে মেরেছিল। কী ছুঁড়ে মেরেছিল? শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘তবে তখন নন্দরামের জলখাবারের সময় বলে হাতে ছিল একটা লুচিতে জড়ানো রসগোল্লা । তাই বরাতজোরে নবু বেঁচে যায়। সেই প্রথম রসগোল্লা দিয়ে লুচি খেতে কেমন লাগে তা টের পেয়েছিল। তার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে’।
ভোজনরসিক শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পে লুচি থাকবে না, তা কি হয়? তাঁর ‘রহস্যময় হর্ষবর্ধন’ গল্পে তিনি নতুন শব্দবন্ধ পরিবেশন করলেন — ‘লুচি হারামি’। গোবর্ধনের বৌদির হাতে তৈরি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি আর আলুর দমের টানে টাকা চুরি করেও সে টাকা ফিরিয়ে দিতে এল এক যুবক।
কেবল পত্রপত্রিকা বা গ্রন্থ নয়, বাস ট্রাকের চলন্ত শরীরে কাব্য চর্চার যে সব জ্বলন্ত প্রয়াস দেখা যায়, সেখানেও অনেকেই দেখেছেন এই ছন্দবদ্ধ পংক্তিটি,
‘দেখবি আর জ্বলবি ,লুচির মতো ফুলবি’!
লুচির সুবাস চলচ্চিত্রেও। ‘চাওয়া পাওয়া’ ছবিতে, ‘এবেলা পোলাও, ওবেলা লুচি খাইয়ে’ তোয়াজ করে মঞ্জু’র (সুচিত্রা সেন) গোপন খবরটা বার করার মতলব করেছিলেন বাড়িওয়ালা তুলসী চক্রবর্তী।
‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ ছায়াছবিতে সিধু (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) যখন ঘুরতে ঘুরতে কৈলাসে গিয়ে হাজির হয়, তখন নন্দীভৃঙ্গি তাকে খেতে দেন — খাঁটি গব্যঘৃত পক্ক প্রসাদী লুচি। আজীবন বনস্পতি ঘিয়ের লুচি খেতে অভ্যস্ত সিধু খাঁটি গব্যঘৃতের গন্ধ সহ্য করতে পারেনি!
লুচির পর্ব আপাতত শেষ করা যাক, নাহলে গুরুভোজনের সম্ভাবনা। শেষ পাতে থাক রসরাজ অমৃতলাল বসুর এক সুস্বাদু গান, যেটি পরবর্তীকালে গেয়ে বিখ্যাত করেছিলেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়।

ওগো লুচি, তোমার মান্য ত্রিভুবনে,
সামাজিক শুভ কার্য্য বিবাহ
তোমা বিনা কিছু হয় না নির্বাহ,
আর পার্বণে পূজায় রাজায় প্রজায়
আনে তোমায় ভবনে।
তুমি অরুচির রুচি, মুখমিষ্টি শুচি
খাই এ ধন্য জীবনে,
ওগো লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে।।
(লুচির বংশ পরিচয়)
তব সহোদর ভাই রুটি ও পরোটা,
আর যে জন জানে না বলে পর ওটা,
ডালপুরি ব্যাটা সে যে তোমার জ্যাঠা,
ভুলিব বল গো কেমনে,
ওগো লুচি তুমি মান্য ত্রিভুবনে।।
তব কন্যার নাম কচুরিসুন্দরী
খাস্তা বলে সে যে সর্বদাই আদুরী,
বড়লোকের বাড়ি দেখি মারামারি
আমরা দেখতে পাইনে,
ওগো লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে। ।
তব চাঁদসম পুত্র চাঁদসই খাজা
সহোদরা ভগ্নী হন ওই পাঁপড়ভাজা
উপযুক্ত ভাগ্নে, নাম জিবেগজা
ইচ্ছে করে দেই আমার বদনে।
তুমি অরুচির রুচি, মুখমিষ্টি শুচি
খাই এ ধন্য জীবনে,
ওগো লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে।।
Wonderfully written.
Excellent. Ujjawalda sahitya r hath besh pokto. Luchi ke Nayak kore etto sundar Southam lekha ekhon biral.
অসাধারণ অনুভূতি হচ্ছে লেখাটি পড়ে, অফিসে বসেও চারিদিকে লুচি লুচি গন্ধ পাচ্ছি।
অপূর্ব