কী অদ্ভুত সমাপতন যে, ঋত্বিক ঘটকের ৯৫তম জন্মদিনের ঠিক এক সপ্তাহ পরেই শিল্প-সাহিত্য জগতের আরেক কিংবদন্তির জন্মদিন। আজ, অর্থাৎ ১১ নভেম্বর ২০২০, আমরা ফিওদর দস্তয়েভস্কির দ্বিশতবার্ষিকীতে উপনীত হলাম। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে আমাদের মধ্যবিত্তের বিচারে দণ্ডিত এক ‘মদ্যপ’ এবং রুশ দেশের এক জুয়াড়ি— দুজনেই নভেম্বরিয়ান। এই দুজনেরই জীবদ্দশায় অনেকেই এঁদের পরিচয় গণ্য হয়েছে নিতান্তই এক আপাত দৃষ্টিকেই অবলম্বন করে। কিন্তু গোটা বিশ্ব জুড়ে তাঁদের জন্য নতুন নতুন অভিধা অন্বেষণ করতে হচ্ছে সাহিত্য বা সিনেমার আলচকদের। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সোজা প্রশ্ন, ‘মদ্যপ তো অনেকেই হয়- কিন্তু ক’জন ‘অযান্ত্রিক’ বা ‘সুবর্ণরেখা’-র মতো ছবি বানাতে পারে? এগুলো কোনও মদ্যপের কাজ নয়, এগুলো কাজ একজন দার্শনিকের’। দস্তয়েভস্কির ক্ষেত্রেও কি একই কথা প্রযোজ্য নয়? প্রধান পরিচয়, তাঁরা দুজনেই প্রকৃতপ্রস্তাবে দার্শনিক বা কবি। আর এক দ্বিশতবর্ষীয়ান শার্ল বোদলেয়ার তাঁর এক গদ্যে বলেছেন, যিনি মানুষের অন্তরলোকের উন্মোচন করতে পারেন, তিনিই কবি। ঋত্বিক ঘটক এবং দস্তয়েভস্কি, এঁরা দুজনেই তো পরতে পরতে মেলে ধরেছেন মানব সভ্যতার অন্দরের কথা। এবং দুজনেই নিজেদের জীবনে একাধিকবার অকল্পনীয় যন্ত্রণার মুখে পড়েও human spirit-এর প্রতি আস্থা হারাননি। দস্তয়েভস্কির ‘দ্য ড্রিম অফ এ রিডিকিউলাস ম্যান’ গল্পের প্রৌঢ় নায়কের কথায়— ‘Because I have seen the truth, I have seen it and I know that people can be beautiful and happy without losing their ability to dwell on this earth. I cannot and will not believe that evil is man’s natural state.’ (ওলগা শার্তসের অনুবাদ)।
দস্তয়েভস্কি বা ঋত্বিক, এঁরা দুজনেই আগুনের ঘরের বাসিন্দা। দস্তয়েভস্কির সেই বিখ্যাত স্বীকারোক্তি আমাদের মনে রাখতে হবে— ‘আমি শিশুদের জন্য ঘুমপাড়ানি গান লিখতে চেয়েছি বটে, কিন্তু বুঝেছি যে আমি এ কাজে ততটা পারঙ্গম নই’। (ঋত্বিক ঘটকও বোম্বাইতে ‘মুসাফির’, ‘মধুমতী’-র মতো ব্লকবাস্টার ছবির চিত্রনাট্য লিখে সেসব হেলায় ফেলে কলকাতা ফিরে এসেছিলেন)। এখানে অবশ্য মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশের মানুষ, যাঁরা দিবারাত্রি তাঁদের আপাত দৃষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়ার সুখকর কাজে মজে থাকেন, তাঁরা বলতেই পারেন যে এমন একজন লেখক যিনি শিশুদেরকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না, তিনি নিছকই একজন অহংকারী ইন্টালেকচুয়াল ছাড়া কিছু না। আজকের মতো তিক্ত, বিভাজিত – এবং জুডিথ বাটলারের ভাষায় ‘অ্যান্টি-থট’ – পরিবেশে সেটা খুব অস্বাভাবিক হবে না। বলা বাহুল্য, তাঁদের এই ধারণা ভুল তো বটেই, বরং ‘দ্য ইডিয়ট’ উপন্যাসে প্রিন্স মিশকিন মৃগীরোগ চিকিৎসার জন্য চার বছর বিদেশে কাটিয়ে ফেরার পর ইয়েপানচিন পরিবারের খাবার টেবিলে তাঁর বিদেশে থাকার গল্প করার সময় বলে— ‘…I spent all my time with children… I did not teach them, oh no, they had their own schoolteacher for that… I suppose I did teach them in a way, but I was simply with them mostly, and I spent all my four years like that… I used to tell them everything. I concealed nothing from them… And what were they (their parents and relations) so afraid of? A child can be told everything – everything!… I call them little birds because there is nothing better than a bird in the world… It is through children that the soul is cured…’ (ডেভিড মাগারশাকের অনুবাদ)
‘আমি তাদের ছোট্ট পাখি বলছি কারণ পাখির চেয়ে সুন্দর এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই’। আমাদের মনে পড়বে, প্রায় একশো বছর আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকে অভিজিৎ বলে— ‘…চেয়ে দেখো ঐ পাখি দেবদারু-গাছের চূড়ার দালটির উপর একলা বসে আছে ; ও কি নীড়ে যাবে, না, অন্ধকারের ভিতর দিয়ে দূর প্রবাসের অরণ্যে যাত্রা করবে জানি নে— কিন্তু ও যে এই সূর্যাস্তের আকাশের দিকে চুপ করে চেয়ে আছে সেই চেয়ে থাকার সুরটি আমার হৃদয়ে এসে বাজছে।
বিশ্বসাহিত্যে একমাত্র শেক্সপিয়র ব্যতীত এমন কোনও লেখক নেই যাঁর গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলি এতদূর স্মরণীয় হয়ে উঠেছে এবং আলোচিত হয়েছে। যেমন ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর রাস্কলনিকভ, যার বাস তার স্রষ্টার মতোই নেহাতই একটি কুঠুরিতে, সে আজ কিংবদন্তি না প্রহেলিকা বলা শক্ত। বহু পর্যটক সেন্ট পিটার্সবুর্গে গেলে আজও দস্তইয়েভস্কির এই চরিত্রের ঘুরে বেড়ানো পথঘাট পরিভ্রমণ করে। ঘুরে দেখতে চান নেভস্কি প্রস্পেক্ট। সেই হত্যাকারী রাস্কলনিকভ যে আত্মার শুদ্ধিকরণে গণিকার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে। সেই গণিকা (সোনিয়া) যখন বিস্মিত হয়ে তাকে বলে, ‘why, why do you do that to me’ তখন রাস্কলনিকভ যা বলে সেটা যদি আমরা বলতে পারতাম তাহলে এই সভ্যতার তাবৎ গ্লানি দূর হতো। রাস্কলনিকভ বলে, ‘I prostrate myself not before you, but through you, to the entire suffering of mankind’.
ফিওদর দস্তয়েভস্কির জন্ম ১৮২১ সালের ১১ নভেম্বর।