আপনি কি পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে চান? উৎপাদন ধারাবাহিক রাখতে চান? চাষের উৎপাদন ব্যয় কমাতে কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উর্বর জমি রেখে যেতে চান? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর উঠে এল চাষিদের নিয়ে এক আলোচনাচক্রে। গত ২০ জুন হুগলির পুরশুড়া ব্লকে জৈব পদ্ধতিতে দেশি ধান চাষ করেও লাভজনক হওয়া যায়। তারই পথ দেখালেন উপস্থিত কৃষি বিশেষজ্ঞরা। কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. অনুপম পালের কথায় সমাজের কৃষক-সহ সমস্ত মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। এখনো সময় আছে সুস্থভাবে বাঁচার। চিকিৎসা ব্যয় এখনো কমানো যায়। এই কমানো ব্যয়ের কাজটা একমাত্র চাষিরাই পারেন। তা কীভাবে? খুব সহজ। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ওষুধে চাষ না করে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করে বিষমুক্ত ফসল ঘরে তুলতে হবে। কীভাবে হবে ? তার উত্তরও সহজ করে দিয়েছেন অনুপমবাবু।
উল্লেখ্য, এদিন কলাবতী মুদ্রা ট্রাস্টের পক্ষ থেকে হুগলির ডি আর ডি সি-র যৌথ উদ্যোগে অনুপমবাবুরা মিলিত হন এখানকার কৃষিসখীদের সঙ্গে। উদ্দেশ্য একটাই। তাহল জৈব পদ্ধতিতে দেশি ধানের চাষ।

প্রসঙ্গত, হুগলির ৮ টি ব্লককে জৈব পদ্ধতিতে চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে কলাবতী মুদ্রা ট্রাস্ট। খানাকুল-১, গোঘাট-১, আরামবাগ, পুরশুড়া, তারকেশ্বর, ধনেখালি, পোলবা ও বলাগড়। প্রথমে পুরশুড়া ব্লককে বেছে নিয়েছে ট্রাস্ট। কাজও শুরু হয়েছে। প্রত্যেক কৃষিসখীকে দেশি ধানের বীজও দেওয়া হয়েছে। চলতি মরসুমে চাষও হবে। দেশি জাতের ধান চাষ কীভাবে করতে হবে তার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। পরিষ্কারভাবে কৃষিসখীদের জানানো হয়েছে যে, আমাদের দেশে ৮২ হাজার জাতের ধান আছে। এরমধ্যে বাংলাতেই আছে সাড়ে ৫ হাজার। এগুলি স্বল্প জল, মাঝারি জল ও বেশি জলেও চাষ হতে পারে। সঙ্গে মাছ চাষও সম্ভব। চাষিরা লাভবান হবেন দু-ভাবে। যেহেতু হুগলি বন্যাকবলিত এজন্য দেশি জাতের ধান চাষই একমাএ উপযুক্ত। কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সম্প্রতি বাজার থেকে কেনা অধিক রাসায়নিক সার, কীটনাশক শংসিত বীজ ব্যবহার করেও বহুল প্রচলিত আধুনিক জাত (উচ্চ ফলনশীল) লাল স্বর্ণ (এম টি ইউ ৭০২৯) ধানের বিঘা প্রতি ফলন গড়ে ১৪-১৫ মণের বেশি হচ্ছে না। অথচ এর আগে ফলন হত বিঘা প্রতি ২২-২৪ মণ। কৃষকের কোণঠাসা অবস্থা। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চলেছে সেই অনুযায়ী ফসলের দাম পাচ্ছেন না। তাঁরা নতুন জাতের খোঁজ করছেন। এতে যদি ফলন বাড়ে। কিন্তু একটি করে আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাত কিছু দিন চলার পর অন্য জাত বাজারে আসে। এইভাবেই বীজ বাজারের পণ্য হয়। কৃষকের হাতে নিজের বীজ নেই। অথচ বাংলায় এখনো সাড়ে পাঁচ হাজার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দেশি ধানের সম্ভার আছে। এর ৯৯ শতাংশই কৃষকের জমি থেকে নিশ্চিহ্ন। মনে রাখতে হবে দেশি জাতের ধান একটা সময় বিঘায় ৩০ মণ ফলনও হয়েছে। বাংলায় বিঘায় ১৮-২০ মণ ধান উৎপন্ন হয়েছে। শুধুমাত্র ধানের ফলন নয় ধানের খড়, ধানের স্বাদ বৈচিত্র্য, মুড়ি, চিড়ে, খই, ফেনাভাত, সরু চাল, লাল চাল, পায়েসের চাল, খিচুড়ির চাল ইত্যাদি ধর্তব্যের বিষয় ছিল। আবার দেশি ধানের পুষ্টিগুণও বেশি। এরমধ্যে উল্লেখ করতেই হয় দুধেশ্বর, হাঁটুকেনো (বেগুনি রংয়ের ধান ও গাছ), কেরালা সুন্দরী, কালানামক (সুজাতা এই চালের পায়েস করে ২৬০০ বছর আগে গৌতম বুদ্ধকে নিবেদন করেছিলেন), জয়প্রকাশ-৫৭ ইত্যাদি দেশি জাতের ধান চাষ করে লাভবান চাষিরা হতেই পারেন।

দেশি ও আধুনিক জাতের ধানের তফাৎ হল দেশি খরা বন্যা, লবণ সহনশীল, সব ধরনের জমিতে হতে পারে, বীজ উৎপাদন ও রাখার পদ্ধতি ঠিক হলে ১০০০ বছর চলবে, একবার সংগ্রহ হলে আর কিনতে হবে না, শংসিত বীজ প্রযোজ্য নয়, চাষের খরচ কমে আসে, জৈব সারেই সর্বাধিক ও ধারাবাহিক ফলন। কিন্তু আধুনিক জাতের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র। খরা-বন্যা যেমন সহনশীল নয়, সব ধরনের জমিতে হবেও না, প্রতি বছর চাষের পর বীজ কিনতে হবে, শংসিত বীজ প্রযোজ্য, খরচ ক্রমশ বেড়ে চলে ইত্যাদি।

তবে বীজ অবশ্যই শোধন করে নিতে হবে। দেশি জাতের বীজ শোধনের সহজ উপায় হল ১ লিটার জলে ১৫০ গ্রাম লবণ মিশ্রিত দ্রবণে বীজ ভেজানোর পর ১০ মিনিট রাখতে হবে। উপরের চিটে ধান ফেলে দিতে হবে। পরিষ্কার জলে বীজ ২-৩ বার ধুয়ে নেওয়ার পর ২৪-৪৮ ঘন্টা গোচানোয় ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর গোচোনা ফেলে দিয়ে জাঁক দিতে হবে। দেশি বোরো ধান শীতকালে সামান্য গরম জলে ভিজিয়ে রাখা যেতে পারে। কারণ ঠাণ্ডায় অঙ্কুরিত হতে দেরি হয়। চাষের জমিতে পরিমাণ মতো গোবর সার, জীবাণু সার, নিমখোল বা সরিষাখোল, চালের গুড়ো বা ভাতের ফ্যান, চিটেগুড়, অ্যাজোলা কিংবা ধান মিলের ছাই প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই চাষিরা জৈব পদ্ধতিতে চাষ করে লাভবান হতে পারবেন।

উল্লেখ্য, এদিন দেশি জাতের ধান বীজ প্রায় ৫০ জন চাষির হাতে তুলে দেওয়া হয়। উপস্থিত ছিলেন পুরশুড়া ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক দীপ্তি সাহু, কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. অনুপম পাল, হুগলি আনন্দধারা প্রকল্পের অধিকর্তা শাশ্বতী দাস, হুগলি মার্কেটিং আধিকারিক চন্দন মুখার্জী, সাংবাদিক জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস শেঠ প্রমুখ।