সুভাষচন্দ্রের দেশবাসীর প্রতি ভালবাসা এবং স্বাধীনতা-লিপ্সা
স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “আমাদের অসীম শক্তি আছে — নাই আমাদের আত্ম-বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। নিজের উপর, নিজের জাতির উপর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা ফিরাইয়া আনিতে হইবে। দেশবাসীকে অন্তরের সঙ্গে ভালবাসিতে হইবে। মানুষ অন্তরের সহিত যাহা আকাঙ্ক্ষা করে তাহা একদিন পাইবেই পাইবে। স্বাধীনতা লাভের জন্য আমরা যদি পাগল হইতে পারি তবেই আমাদের অন্তর্নিহিত অসীম শক্তির স্ফুরণ হইবে; আমরা নিজেরাই অবাক হইব এত শক্তি এতদিন কোথায় লুকাইয়া ছিল! এই নবজাগ্রত শক্তির বলে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করিতে পারিব।”
১৯২৮ সালে একবার সুভাষচন্দ্র তাঁর মাস্টারমশাই বেণীমাধব দাসের বাড়ী গেলে বেণীবাবুর ছোটমেয়ে বীণা তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, কিভাবে দেশ স্বাধীন হবে — হিংসার পথে না অহিংসার পথে?” সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “আসল কথা হচ্ছে একটা কিছু পাবার জন্য আগে পাগল হয়ে উঠতে হয়। স্বাধীনতার জন্য আমাদেরও সারা দেশটাকে তেমনি পাগল করে তুলতে হবে। তখন হিংসা-অহিংসার প্রশ্ন বড়ো হয়ে উঠবে না।” আগেও বলা হয়েছে যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য এবং উত্তরসাধক। স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন: ‘যে রামকৃষ্ণের ছেলে, সে আপনার ভাল চায় না, প্রাণ দিয়েও পরের কল্যাণাকাঙ্খী তারা।’ ঠিক তেমনি সুভাষচন্দ্রকেও আমরা দেখি দেশের শৃঙ্খলমোচনের উদ্দেশ্যে প্রাণপাত করেতেও সর্বদা প্রস্তুত। গান্ধীজির মত তাঁকেও কেউ দেশোদ্ধার করার দিব্যি দেয় নি। কিন্তু গান্ধীজি যেখানে নিজের মোক্ষ লাভকে আজীবন প্রধান বলে বিশ্বাস করে সাথে অন্য কাজ করে গেছেন, সুভাষচন্দ্র বসু নিজের কথা কখনও চিন্তা করেন নি, তিনি নিজের মঙ্গলের চাইতে বরঞ্চ সতীর্থদের দুঃখে এবং দেশমাতৃকার দুঃখে ছিলেন বেশী কাতর। এটা বুঝতে পারলে তাঁদের দুজনের সম্পর্ক প্রণিধান করা খুবই সহজ হয়ে যায়।
স্পষ্টবাদী সুভাষচন্দ্রের কিছু গান্ধীনীতির সমালোচনা
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা কংগ্রেসে গান্ধীজির সাথে সুভাষচন্দ্রের মতভেদ
১৯২৮ সালের ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে কলকাতা কংগ্রেসের শেষ দিনে মহাত্মা গান্ধী ‘নেহেরু রিপোর্ট’ এর অনুমোদনের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন যেখানে ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’কে ভারতীয়দের লক্ষ্য হিসাবে বলা হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র বসু সেই প্রস্তাবের উপর একটি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন যাতে ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বাধীনতাকে সেই রিপোর্টে ভারতীয়দের লক্ষ্য হিসাবে দেখানোর দাবী জানানো হয়েছিল। সেই প্রস্তাবের পক্ষে সুভাষচন্দ্র বসু সেদিন বলেছিলেন:
“বাংলা প্রদেশের ক্ষেত্রে আপনারা অবগত আছেন যে দেশের জাতীয় আন্দোলনের সূচনাকাল থেকেই আমরা স্বাধীনতা বলতে সর্বদাই পূর্ণ স্বাধীনতাই ব্যাখ্যা করে আসছি। আমরা কখনই স্বাধীনতাকে আধিরাজ্যের মর্যাদা (ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস) হিসাবে মনে করিনি। আমাদের অনেক দেশবাসীর জীবন উৎসর্গ করার পর, আমাদের কবিদের স্বাধীনতার বাণী প্রচার করার পর, আমরা স্বাধীনতা বলতে কেবলমাত্র পূর্ণ স্বাধীনতাই বুঝে এসেছি। আধিরাজ্যের মর্যাদা নিয়ে আলোচনা আমাদের দেশবাসীর কাছে, তরুণ প্রজন্মের কাছে, যারা ছোট থেকে বেড়ে উঠছে তাদের কাছে সামান্যতমও আবেদন করে না এবং সকলের মনে রাখা উচিত যে তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী।” তিনি কেন সেদিন বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের বিপক্ষে গিয়ে সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেছিলেন তা বোঝাতে গিয়ে তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, “নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা এবং প্রশংসা এক জিনিস; কিন্তু নীতির প্রতি শ্রদ্ধা অন্য জিনিস।”
গান্ধীজি সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের একটা অকপট মন্তব্য
বিপ্লবী যতীন দাসের অনশনে মৃত্যুর পর যখন টাউন হল-এ তাঁর স্মৃতি-তর্পণ হয়েছিল, তখন শ্রী সতীন সেনও প্রায়োপবেশন [অনশন] করছিলেন বরিশাল জেলের ভেতর। তাঁর সম্বন্ধেও উদ্বেগজনক সংবাদ আসছিল। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখে সুভাষ চন্দ্র বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীকে নিয়ে বরিশাল গিয়েছিলেন শ্রী সতীন সেনের সাথে দেখা করে তাকে অনশন স্থগিত করার জন্য রাজী করাতে। কলকাতা থেকে খুলনা পর্যন্ত তাঁরা ট্রেনে গিয়ে তারপর রাতে স্টিমারে করে বরিশাল গিয়েছিলেন। স্টিমারে উঠেই দেশপ্রিয় সেনগুপ্ত চা খেয়ে নিজের কামরায় ঢুকে পড়েছিলেন। শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী আর সুভাষ চন্দ্র বসু ডেকে বসে অনেক রাত অবধি কথোপকথন চালিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে কী কথা হয়েছিল তা শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী লিখে গেছেন তাঁর বই “নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ” বইটার প্রথম খণ্ডের ১০নং পৃষ্ঠায়। অন্য আরও কথার সাথে শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী তাঁর বইয়ে লিখেছেন :
“সহসা বলে ওঠেন নেতা, — ‘আচ্ছা গান্ধীজির সঙ্গে আর কতদিন চলতে পারবো মনে হয় তোমার?’
‘সেটা চলতে যাবার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’ বললাম আমি। আমার কথার খোঁচাটুকু তিনি খেয়াল করলেন না, বলেই চললেন, ‘সত্যি, আমি ওঁকে ঠিক বুঝে উঠতে পারিনে। দূর থেকে ওঁর কথা শুনে বেশ লাগে। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন খুঁটিয়ে বুঝতে চাই — ‘
‘ওটা শাস্ত্রে নিষেধ।’
‘কী?’
মহাপুরুষের কাছে বেশি যাওয়া।’
‘যাঃ!’
‘সত্যিই। বেশি কাছে গেলে ওঁদের চোখ-ধাঁধানো রোশনাই চোখ সয়ে যায় কিনা।’
আর কথা নেই। নিশ্চল দেহ। অনেকক্ষণ পরে বললেন, — ‘কী জানো, গান্ধীজির জীবনে রয়েছে একটা চিরন্তন দ্বন্দ্ব! দেশকে উনি যথেষ্টই ভালোবাসেন, কিন্তু আমার মনে হয়, নিজেকে উনি ভালোবাসেন আরও ঢের বেশি।’
‘কথাটা আপত্তিজনক, আর যথেষ্ট কিন্তু মোলায়েমও নয়।’ বললাম আমি।
‘না। আমিও জানি তা। ওঁর জীবনে কতকগুলো পরীক্ষা ও নিরীক্ষা আজ বড় হয়ে উঠেছে দেশকেও ছাপিয়ে।‘ ”
[শ্রী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর বইয়ের ১২ নং পৃষ্ঠার প্রতিলিপি সংলগ্ন করা হল।]
১৯৩৩ সালের ‘বোস-প্যাটেল ইস্তাহার’
বহুবার বলা হয়েছে যে দেশের স্বাধীনতা-অর্জনই সুভাষচন্দ্রের একমাত্র এবং কেবলমাত্র লক্ষ্য ছিল। তিনি গান্ধীজীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন, তাঁকে সবসময় মহাত্মাজী বলে সম্বোধন করতেন, এমনকি তাঁকে ভারতের শ্রেষ্ঠ মানব পর্যন্ত বলেছেন। কিন্তু তাঁর ভুল নীতির সমালোচনা করতে কখনও পশ্চাৎপদ হতেন না। ১৯৩৩ সালের মে মাসে গান্ধীজী আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে ৯ই মে ভিয়েনাতে চিকিৎসাধীন সুভাষচন্দ্র ও বিঠলভাই প্যাটেল গান্ধীজীর তীব্র সমালোচনা করে এক বিবৃতি দেন যা ‘বোস-প্যাটেল ইস্তাহার’ নামে খ্যাত। তাতে অন্য কথার মধ্যে তাঁরা সেদিন বলেছিলেন, “আমাদের সুস্পষ্ট অভিমত হচ্ছে যে — রাজনৈতিক নেতা হিসাবে মহাত্মা গান্ধী ব্যর্থ হয়েছেন।…কংগ্রেসের আমূল সংস্কারের সময় এসেছে। এই পুনর্গঠনে প্রয়োজন নেতৃত্বের পরিবর্তন। কারণ মহাত্মা গান্ধী তাঁর আজীবন অনুসৃত নীতির পরিপন্থী কোন নীতি গ্রহণ করবেন বা তেমন কোন কর্মপন্থা উদ্ভাবন করবেন, তাঁর কাছে সেরকম প্রত্যাশা করা অন্যায়।” এই বিবৃতি দেবার মাস দুই আগে বছরাধিক বন্দী করে রাখার পর অত্যধিক অসুস্থতার জন্য ব্রিটিশ সরকার সুভাষচন্দ্রকে নিজ-খরচায় ইউরোপে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। [ক্রমশ]