১৯৩৪ সালে ‘দী ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ বইতে গান্ধীনীতির সমালোচনা
তিনি ১৯৩৪ সালে তাঁর ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ বইতে সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন, “মহাত্মা গান্ধীর মধ্যে এমন কিছু আছে যা সাধারণ ভারতবাসীর হৃদয়কে নাড়া দেয়। অন্য দেশে জন্মালে হয়তো তিনি সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হতেন। যেমন রাশিয়া বা জার্মানি কিংবা ইতালিতে তিনি কি করতেন? তাঁর অহিংসা-নীতির জন্য তাঁকে ফাঁসিকাঠে কিংবা মানসিক হাসপাতালে যেতে হত। ভারতে অবস্থাটা পৃথক। তাঁর সাদাসিধা জীবন যাপন, নিরামিষ আহার, ছাগ-দুগ্ধ পান, সপ্তাহে একদিনের মৌনব্রত পালন, চেয়ারে না বসে মেঝেতে উপবেশন, তাঁর কটিবস্ত্র পরিধান — বাস্তবিকপক্ষে তাঁর সম্পর্কিত প্রতিটা জিনিসই তাঁকে প্রাচীনকালের অদ্ভুত স্বভাবের মহাত্মাদের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং তাঁকে জনগণের কাছাকাছি এনেছে। … ভারত-ইতিহাসের অন্য যুগে জন্মালে তিনি হয়তো নিজেকে এত বৈশিষ্ট্যপ্রদান করতে পারতেন না। উদাহরণ স্বরূপ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় তিনি কি করতেন … শেষে, মহাত্মা ব্যর্থ হয়েছেন কারণ তাঁকে একসাথে দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হয়েছে — একদিকে পরাধীন মানুষদের নেতার ভূমিকা এবং একজন বিশ্ব-শিক্ষক হয়ে নতুন মতবাদ প্রচারের ভূমিকা। এই দ্বৈত ভূমিকার জন্যই তিনি একদিকে মিস্টার উইনস্টন চার্চিলের মতানুসারে ইংরেজদের আপোষহীন শত্রু আর মিস এলেন উইলকিনসনের মতানুসারে ইংরেজদের সর্বশ্রেষ্ঠ পুলিশ হয়ে উঠেছেন।”
‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ বইতে সুভাষচন্দ্র বসু আরও লিখেছেন, “মহাত্মার ক্ষেত্রে কোন ভবিষ্যৎবাণী বিপজ্জনক প্রস্তাব। তথাপি একটা বিষয় নিশ্চিত। মহাত্মা কারও অধীনত্ব স্বীকার করবেন না। যতদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব করা তাঁর পক্ষে সম্ভব, তিনি থাকবেন; কিন্তু যদি কংগ্রেসের সংগঠন বা মানসিকতার পরিবর্তন হয়, তিনি সম্ভবত সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন। … কিন্তু যদি ইংরেজদের আচরণ বর্তমানের মত আপোষহীন থাকে তবে রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তাঁর উপর আর তাঁর অহিংস অসহযোগ (আন্দোলন) সম্বন্ধে জনগণের বিশ্বাস বহুলাংশে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। সেক্ষেত্রে তারা (দেশবাসী) স্বাভাবিক ভাবেই বৈপ্লবিক নেতৃত্ব আর নীতির দিকেই ঝুঁকবেন।”
সুভাষচন্দ্র বসু “দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’এর এই ‘ভারতীয় ইতিহাসে গান্ধীর ভূমিকা’ ( ‘Role of Mahatma Gandhi in Indian History’) শিরোনামের অধ্যায়টা শেষ করেছিলেন এভাবে, “মহাত্মা গান্ধী তাঁর দেশের জন্য বিস্ময়কর কাজ করেছেন এবং করে যাবেন। কিন্তু ভারতের মুক্তি তাঁর নেতৃত্বে অর্জিত হবে না”। [“Mahatma Gandhi has rendered and will continue to tender phenomenal service to his country. But India’s salvation will not be achieved under his leadership.” [অনুবাদগুলো আমার নিজের করা। আমি পাঠকদের মূল ইংরেজি বইটা থেকে পড়ে দেখতে অনুরোধ করব।]
মেজদা শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা সুভাষ চন্দ্র বসুর ৩১.১০.১৯৪০ তারিখের চিঠি
নিম্নলিখিত অংশগুলো প্রেসিডেন্সি জেল থেকে ইংরেজিতে লেখা এবং ১৬০ এবং ১৬১ নম্বর পৃষ্ঠা, নেতাজী: কালেক্টেড ওয়ার্কস; ভলিউম ১০ [নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো এবং পার্মানেন্ট ব্ল্যাক, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০১৬] থেকে নেওয়া মেজদা শ্রী শরৎচন্দ্র বসুকে লেখা সুভাষ চন্দ্র বসুর ৩১.১০.১৯৪০ তারিখের চিঠির অংশ এবং আমার করা বাংলা অনুবাদ। [মূল ইংরেজি চিঠিটার প্রতিলিপি এই পোস্টের নীচে সংলগ্ন করা হল।]
[মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত]
“প্রেসিডেন্সি জেল, কলকাতা, ৩১.১০.৪০
“আমার প্রিয় মেজদাদা,
“আপনি নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয় আইনসভায় আমার নির্বাচিত হবার কথা খবরের কাগজগুলোতে পড়েছেন। আশা করি কংগ্রেস হাই-কমান্ড এটা থেকে প্রয়োজনীয় নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে না।
“আমি কংগ্রেসের রাজনীতি নিয়ে যতই ভাবি, ততই নিশ্চিত হই যে ভবিষ্যতে আমাদের আরও শক্তি এবং সময় দিতে হবে হাই-কমান্ডের সাথে লড়াই করার জন্য। যদি স্বাধীনতা লাভের পর ক্ষমতা এদের মত হীনচেতা, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং বিবেকহীনদের হাতে চলে যায়, তবে দেশের অবস্থা কী হবে? আমরা যদি এখন থেকেই তাদের সাথে লড়াই না করি, তাহলে আমরা তাদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়া ঠেকাতে পারব না। তাদের সাথে লড়াই করার আমাদের অন্য একটি কারণ হল জাতীয় পুনর্নির্মাণ সম্বন্ধে তাদের কোন ধারণাই নেই। যদি স্বাধীন ভারতকে গান্ধীয়, অহিংস নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে চাওয়া হয় তবে গান্ধীবাদ স্বাধীন ভারতকে একটা খাদে নিক্ষেপ করবে। ভারত তখন সমস্ত সুযোগসন্ধানী শোষণকারী ক্ষমতাশীল দেশের স্থায়ী আমন্ত্রণ-প্রদানকারীতে পর্যবসিত হবে। যেখানেই এবং যখনই সম্ভব আমাদের উচিত অন্য রাজনৈতিক দলগুলির সাথে জোট করা এবং পূর্ণ মনোযোগ সহ কংগ্রেসের হাই-কমান্ডের সাথে লড়াই করে যাওয়া।
“আপনার অতি স্নেহের সুভাষ”
[সংলগ্ন প্রতিলিপি দ্রষ্টব্য]
গান্ধীজীর প্রশস্তি
১৯৩৪ সালে লেখা ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল ১৯২০–১৯৩৪’ গ্রন্থে সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীজীর একাগ্র নিষ্ঠা, অটল সংকল্প, নিরলস শ্রম ইত্যাদির প্রশংসা করে লিখেছেন, “দেশের জন্য মহাত্মা গান্ধী অভূতপূর্ব কাজ করেছেন ও করে যাবেন কিন্তু ভারতের মুক্তি তাঁর নেতৃত্বে আসবে না।” যেমন তিনি গান্ধীজীর অনেক ভুল সিদ্ধান্তের কথা সবিস্তারে জানিয়েছেন আর সেগুলোর যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করেছেন, ঠিক তেমনি আবার নিঃসঙ্কোচে গান্ধীজীর ‘নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি’ বলেও কিছু কাজের প্রশংসা করতে কার্পণ্যবোধ করেননি। যেমন লবণ-আইন অমান্য আন্দোলনের প্রশংসায় লিখেছেন, “ডান্ডি অভিযান ছিল একটা ঐতিহাসিক ঘটনা, যা নেপোলিয়নের প্যারী অভিযান কিংবা মুসোলিনীর রোম অভিযানের সঙ্গে একই সারিতে স্থান পাবে।” গান্ধীজির আজ যখন অনেক সমালোচনা হচ্ছে, তখন বহু নেহেরু-পন্থী ঐতিহাসিক সুভাষচন্দ্রের এই কথাগুলো বেশী করে উল্লেখ করেন। এটা নিশ্চয়ই কৌতুকের বিষয় যে অতীতে যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে গান্ধীপন্থীরা মোটেই পছন্দ করত না, শেষে তাঁর নাম নিয়েই তারা গান্ধীজিকে মহান প্রতিপন্ন করার প্রয়াস করছে আজ। বার্লিন থেকে তাঁর ১১ জুলাই ১৯৪২ তারিখে শ্রীযুক্ত রাসবিহারী বসুকে লেখা চিঠিতেও সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীর অবদানের কথা লিখেছেন: “তিনি (মহাত্মা গান্ধী) ভারতীয় জনগণকে রাজনৈতিক চেতনা প্রদান করেছেন এবং তিনি একটি সর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন।” এসব থেকেও সুভাষচন্দ্র বসুর মাহানুভবতা বোঝা যায়। [ক্রমশ]