গান্ধীজিকে লিখিত চিঠিতে ন্যায়পরায়ণ সুভাষচন্দ্রের অকপট মনোভাবের পরিচয়
ত্রিপুরী কংগ্রেসের পর ২৯ মার্চ ১৯৩৯ জামাডোবা থেকে সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীকে লিখেছিলেন, “আমি প্রকৃতগতভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি নই এবং বিরোধ পুষে রাখি না। এক অর্থে আমার মনোবৃত্তি মুষ্টিযোদ্ধার মতো অর্থাৎ মুষ্টিযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে হাসিমুখে করমর্দন করি এবং খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তিতে ফলাফল গ্রহণ করি।” আর ৬ এপ্রিল ১৯২৯-এ লিখেছিলেন, “আপনি ভালো করেই জানেন যে আমার অনেক দেশবাসীর মত আপনি যা-যা বলেন বা বিশ্বাস করেন তা আমি অন্ধের মত অনুসরণ করি না। … জীবনে যদি আমার গর্ব করার মত কিছু থেকে থাকে তবে তা হল এই যে আমি একজন ভদ্রলোকের সন্তান এবং সেজন্য আমি ভদ্রলোক। দেশবন্ধু দাশ আমাদের প্রায়ই বলতেন, ‘জীবন রাজনীতি থেকে বৃহত্তর।’ তাঁর কাছ থেকে সেই শিক্ষাই আমি পেয়েছি। আমি রাজনীতিতে একদিনও থাকব না যদি তা করতে গিয়ে আমার ভদ্রতার মানের পতন ঘটে যা কিনা শৈশব থেকে আমার চেতনায় গভীরভাবে মিশে রয়েছে এবং যা আমি আমার শোণিতধারায় অনুভব করি।”
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে গান্ধীজি এবং জওহরলাল নেহেরু (যাকে গান্ধীজি সুভাষ এবং তাঁর নিজের চিঠিগুলোর প্রতিলিপিগুলো পাঠাচ্ছিলেন এবং যিনি এই চিঠিগুলো পড়েছিলেন) চাইছিলেন না যে চিঠিগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হোক। গান্ধীজি ভেবেছিলেন যে চিঠিগুলোর প্রকাশ যদি কিছুটা বিলম্বিত করা যায় তবে ভারতবাসীর উপর এগুলো তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসু বার বার এগুলো প্রকাশ করার জন্য অনুমতি চাইলে গান্ধীজি অনুমতি দিতে বাধ্য হন।
গান্ধীজি এবং গান্ধীবাদ সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের প্রকৃত মনোভাব
গান্ধীজি সম্পর্কে সুভাষচন্দ্রের প্রকৃত মনোভাব আমরা জানতে পারি বার্লিন থেকে ১১ জুলাই ১৯৪২ তারিখে শ্রীযুক্ত রাস বিহারী বসুকে লেখা তাঁর চিঠিটা থেকে। আমরা দেখেছি যে সুভাষচন্দ্র বসু সর্বদা কৌশল অবলম্বন করে চলতেন। তাঁর সম্পূর্ণ মনের কথা সহজে কেউ বুঝে উঠতে পারতো না। যেহেতু বিপ্লবী শ্রী রাসবিহারী বসু সে সময় জাপানে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন, তাই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে খুলে লিখেছেন গান্ধী সম্বন্ধে। চিঠিটি তিনি জাপান/জার্মান কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিটা এই লেখার দ্বিতীয় পর্বে একবার উদ্ধৃত করা হয়েছিল। চিঠিটাতে অন্যান্য কথার সাথে সুভাষচন্দ্র বসু শ্রীযুক্ত রাস বিহারী বসুকে লিখেছিলেন: “ভারতের ইতিহাসে গান্ধী যুগের সমাপ্তি ঘটেছে ১৯৩৯ সালে। … যেহেতু গান্ধী ইংল্যান্ডের সাথে একটি সমঝোতা চান, তিনি কখনই অক্ষ-শক্তি-পন্থী হবেন না। … গান্ধী আজ আর প্রগতিশীল (ডাইনামিক) এবং বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব নন। … গান্ধী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সহমত হবেন এমন আশা করা একটি অলীক স্বপ্ন মাত্র। ফলস্বরূপ, গান্ধীকে অত্যধিক প্রশংসা করে তাঁর অবস্থানকে শক্তিশালী করা আমাদের নিজস্ব অনুসরণকারীদের দুর্বল করার সমান হবে এবং এটা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যা করার মতন। আপনি মাঝে মাঝে গান্ধীকে রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে প্রশংসা করতে পারেন, তবে আপনার সর্বদা মনে রাখতে হবে যে গান্ধী কখনই আপনার পক্ষে আসবেন না।”
চোখে ঠুলি পরে থাকা আমাদের নেহেরুপন্থী ঐতিহাসিকরা অবশ্য এসব চিঠি পড়ে দেখার আগ্রহ দেখান না। তাদের মতে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বিরাট গান্ধী ভক্ত।
অক্টোবর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের লেখা সুভাষ চন্দ্রের একটা কম প্রচারিত পত্র
গান্ধীজির শুরু থেকেই এক বা একাধিক সেক্রেটারি ছিল যে বা যারা তাঁর হয়ে চিঠিপত্র গুছিয়ে রাখতেন, নানা ভাবে সাহায্য করতেন। তাছাড়া ভারত সরকারের সাহায্যে গান্ধীজির চিঠিপত্র সংগ্রহীত ও সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের ক্ষেত্রে সেক্রেটারি, ইত্যাদির কোন বালাই ছিল না। ভারত সরকারের তরফ থেকে খুব একটা সাহায্য পাওয়া যায়নি তাঁর তাঁর চিঠিপত্র সংগ্রহে। নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো কত অনুদান পেয়েছে এবং কী খাতে, তা আমার জানা নেই। তবে এটা আমাদের জানা যে তাঁর লিখিত সব চিঠিপত্র আজ আর পাওয়া যায় না।
১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত ইউরোপে নির্বাসনে থাকার সময় এবং এর পরেও সুভাষচন্দ্র অনেককেই গান্ধীবাদের বিরুদ্ধে চিঠিপত্র লিখেছিলেন। তবে সব মনের কথা হয়তো সেসব চিঠিতে খুলে লিখতেন না। আজ আমি এই পর্ব শেষ করবো সুভাষচন্দ্র বসুর এমনি একটা খুব কম প্রচারিত বাংলায় লেখা পত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে। এই মূল চিঠিটা বাংলায় লিখিত। এই চিঠিটা সুভাষচন্দ্র বসু লিখেছিলেন জেনেভার নিকট অবস্থিত গ্ল্যান্ড নামক গ্রাম বা শহরের একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ১৯শে অক্টোবর ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে। লিখেছিলেন তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সহকর্মী ও গান্ধীজির অনুরক্ত তৎকালীন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারকে। অন্যান্য কথার মাঝে সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে লিখেছেন, “মহাত্মা গান্ধীকে অন্ধভাবে আর কতদিন অনুসরণ করবেন? দেশ তো একেবারে ডুবিল বলিয়া মনে হইতেছে — সময় থাকিতে একটা নতুন বাণী প্রচার করুন ও নতুন আন্দোলন জাগাইয়া তুলুন। নতুবা পরে আবার জাগানো খুব সময়সাপেক্ষ হইবে।” আশাকরি গান্ধীজি ও গান্ধীনীতি সম্পর্কে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মনোভাব এই চিঠিতে কিছুটা স্পষ্ট। এটা লক্ষণীয় যে এই চিঠিটা ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে লেখা। [চিঠিটার অনুলিপি পোস্টের নীচে সংলগ্ন করা হল]
উপসংহার
কাজেই বোঝা যাচ্ছে যে গান্ধীজি এবং তাঁর শাগরেদরা সুভাষচন্দ্র বসুকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। কেন করতেন না, সেটা আগামী পর্বে আর একটু আলোচনা করা যাবে। দক্ষিণপন্থীদের ভয় ছিল যে তাদের পরিবর্তে অন্য কেউ না দেশোদ্ধার করে ফেলে। [৩] এ সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র বসুর একটা সুন্দর শ্লেষাত্মক উক্তি রয়েছে। ১৯৩৯ সালের নভেম্বরের ২৫ তারিখে তাঁর প্রকাশিত ফরোয়ার্ড ব্লক সাপ্তাহিকে তাঁর ইংরেজি উক্তিটা প্রকাশিত হয়েছিল। সেটা ছিল এরকম : —
“If India is to be freed, let her be freed by us or not at all” — so says a Bengali adage and so think our Rightists today.” — Subhas Chandra Bose [ফরোয়ার্ড ব্লক পত্রিকার এই অংশের অনুলিপি এই পোস্টের নীচে সংলগ্ন করা হল।]
এটার বাংলা অনুবাদ কিছুটা এরকম হতে পারে : —
“যদি ভারতকে মুক্ত করতে হয়, তবে সে আমাদের দ্বারাই স্বাধীন হোক অন্যথায় সে যেন কোনদিনও মুক্ত না হয়।” –ম একটা বাংলা প্রবচন তাই বলে এবং আজ আমাদের ডানপন্থীরাও তাই মনে করেন।” — সুভাষ চন্দ্র বসু।
আশাকরি এবার পাঠক গান্ধীজি, সুভাষচন্দ্র এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন। পরের পর্ব পড়ার আগে সবাইকে বিনীত অনুরোধ যে আগের পর্বগুলো পাদটীকা সহ অতি অবশ্য পড়ে নেবেন।
পাদটীকা
[১] “In this wide world India has but one enemy, the enemy who has exploited her for over hundred years, the enemy who sucks the life-blood of Mother India, British Imperialism.” — Netaji Subhas Chandra Bose, in his broadcase from Berlin Azad Hind Radio on April 20, 1942.
[২] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে আসন্ন তা সুভাষচন্দ্র বসু বহু আগে থেকেই জানতেন। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশ সরকারের সঙ্কটের সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে স্বাধীনতা অর্জনের এমন সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে গান্ধীজির কাছে বহু অনুনয়-বিনয় করেছেন । কিন্তু গান্ধীজি তাঁর কথায় কর্ণপাত করেন নি। নানা মিথ্যা অজুহাত দিয়েছেন যে (১) দেশের জনতা তৈরি নয়, (২) “আমরা ব্রিটেনের ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে আমাদের স্বাধীনতা চাই না। এটা অহিংস নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।” [হরিজন, ১লা জুন ১৯৪০] সেই সত্যের পূজারী গান্ধীজিকেই আমরা দেখি ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘ভারত ছোড়ো’ আন্দোলন শুরু করে ‘ডু অর ডাই’ স্লোগান দিতে যখন যুদ্ধে ব্রিটিশরা পর্যুদস্ত। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর বইতে লিখেছেন যে সুভাষ চন্দ্রের ভারত ছেড়ে চলে যাবার পর গান্ধীজির মধ্যে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রভাব প্রদর্শিত হতে থাকে। আর তার ফলশ্রুতি স্বরূপ গান্ধীজী ‘ভারত-ছোড়ো বা কুইট-ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের ঘোষণা করেছিলেন যা ছিল সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাবিত ইংরেজদের চরমপত্র দেবার অনুরূপ। [“আমি এটাও দেখেছি যে সুভাষ বোসের জার্মানিতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা গান্ধীজির মনে অনেক বড় প্রভাব ফেলেছিল। তিনি অতীতে তার (সুভাষের) অনেক কাজ অনুমোদন করেননি, কিন্তু এখন আমি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি। তাঁর অনেক মন্তব্য আমাকে নিশ্চিত করেছে যে সুভাষ বোস ভারত থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় যে সাহস ও দক্ষতা দেখিয়েছিলেন তিনি তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন। সুভাষ বোসের প্রতি তাঁর প্রশংসা অজ্ঞাতসারে সমগ্র যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবান্বিত করে তুলেছিল।” পৃষ্ঠা ৪০, ‘ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রীডম’ — আবুল কালাম আজাদ।]
[৩] গান্ধীজি মনে করতেন যে অন্য সমস্ত কংগ্রেসি সদস্যদের তাঁর মত সংগ্রাম করার সামর্থ্য বা অনুমতি নেই। তাই যখন লাহোরের কারাগারে ৬৩ দিন অনশনের পর বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাসের মৃত্যু হয়, তখন গান্ধীজি ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন যে যতীন্দ্রনাথের অনশন করাটা সঠিক ছিল না। এরকম নাকি অনশন করা ঠিক নয়। আবার সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হবার পর যখন ফরোয়ার্ড ব্লকের তরফ থেকে আন্দোলন করেন তখন গান্ধীজি কংগ্রেসের হাই কমান্ডকে অর্থাৎ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের দিয়ে নির্দেশ বের করেছিলেন যে কোন কংগ্রেস সদস্য হাই কমান্ডের অনুমতি ছাড়া কোনরকম অসহযোগ আন্দোলন করতে পারবে না। [ক্রমশ]