আমার বিচারবুদ্ধি ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী শিরোনামে উপস্থাপিত প্রস্তাবের কারণগুলো বিবিধ এবং নিম্নরূপ : —
বিপ্লবীরা ছাড়া সুভাষচন্দ্র বসুর মত দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য আত্মবলিদান করতে সদা প্রস্তুত মানুষের সংখ্যা কংগ্রেসে তখন একজনও ছিল না। তাই বিপ্লবীরা বা সুভাষচন্দ্র বসু তথাকথিত গান্ধীবাদীদের চক্ষুশূল ছিলেন। যা তারা পারেন না, তা যাঁরা হাসিমুখে পারেন, তাঁদের হিংসে করা বা যেন-তেন প্রকারেণ হেয় করাই ছিল এসব ভীতু মানুষদের উপজীব্য। তারা সংখ্যায় বহুগুণ। আর তাদের নেতা তথাকথিত ‘মহাত্মা’ গান্ধী তখন সারা ভারতের প্রায় সর্বজনস্বীকৃত নেতা; এই ভীতু দলের মানুষদের শিরোমণি ছিলেন। দেশকে তারা ভালোবাসতেন হয়তো, তবে নিজেদের ভালোবাসতেন তার থেকে ঢের গুণ বেশী। নিজেদের পরে তারা ভালোবাসতেন নিজেদের খ্যাতি, যশ বা সুনামের, তারপর নিজেদের প্রিয়জনদের। দেশ তো বহু পরে। দেশকে জীবন্ত ‘মা’ ভাবার মত কংগ্রেসি কর্মী হয়তো ছিলেন কয়েকজন; তবে তাঁরা সংখ্যায় অবশ্যই ছিলেন নগণ্য। গান্ধীজি তো বলেইছেন যে স্বরাজ লাভের জন্য তিনি অতটা উতলা বা ব্যাকুল নন। এটা বিপ্লবীদের ঠিক বিপরীত অবস্থান। ‘দেশমাতৃকা’ শৃঙ্খলবদ্ধ তো কি হয়েছে? গান্ধীজি চেয়েছেন তাঁর অহিংস নীতি, তাঁর সত্যাগ্রহ সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর কাছে নিজের যশাকাঙ্ক্ষা ছিল দেশের শৃঙ্খল মোচনের থেকে বড়। কাজেই তিনি দেশকে মায়ের সমান মর্যাদা দেবেন, এমন আশা করা অনুচিত। তিনি এবং তাঁর গুণমুগ্ধ অনুরাগীরা সুভাষচন্দ্রের মতো বিপ্লবী নেতাকে ঈর্ষা করবেন, পেছন থেকে তাঁকে প্রতিপদে হেয় করতে চাইবেন, তাই তো স্বাভাবিক। এই ঈর্ষার কারণ অবশ্যই পরশ্রীকাতরতা। আবার তাদের বংশধরেরা ও ভক্তবৃন্দ যে সুভাষচন্দ্র বসুর সাফল্যকে খর্ব করার চেষ্টা করবেন, ছোট করে দেখাতে চাইবেন, এতে আশ্চর্য হবার কী আছে? সেইসব তথাকথিত অন্ধ-গান্ধীভক্ত নেতাদের সমর্থক বা অনুগামীদের সংখ্যা অনেক, তাই তাদের বৃদ্ধিও হয়েছে জ্যামিতিক হারে। কাজেই এখনও ভারতবর্ষে এরকম বহু গান্ধী-নেহেরুভক্ত সক্রিয় রয়েছেন যারা আসল ইতিহাস পড়ার ধার ধারেন না। এদের সংখ্যা আরও বেশী হতে পারতো, কিন্তু সোসিয়েল মিডিয়ার দৌলতে ইদানীং বেশ কিছু কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতীরা নিজেদের আগ্রহে সত্যিটা জানতে পারছেন এবং তাঁদের গুরুজনদের অন্ধ গান্ধীভক্তি উপলব্ধি করে উঠতে পারছেন।
গান্ধীর ভক্তদের দলের পাণ্ডা আবার ছিলেন জওহরলাল নেহেরু স্বয়ং, তিনি নিজেকে হিন্দু বলতেও খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন না। তবে নিজের নামের আগে কাশ্মীরি হিন্দু ব্রাহ্মণদের রীতি অনুযায়ী ‘পণ্ডিত’ খেতাবটা ব্যবহার করতে তিনি কখনও কুণ্ঠা বোধ করেন নি। তিনি নেতাজীর কৃতিত্বকে ছোট করার জন্য কী কী করেছেন তা বহুবার লেখা হয়েছে। তাঁর ভক্তদের বইতে দেখা যাবে বহু পৃষ্ঠা এই লিখতে ব্যয় হয় যে জওহরলাল নেহেরু সুভাষচন্দ্রের সাথে কোন অন্যায় করেন নি, তিনি সুভাষচন্দ্রকে নিজের ছোট ভাইয়ের মত দেখতেন, আর সুভাষচন্দ্র যে জওহরলাল কে বড় ভাইয়ের মত মনে করতেন তা তো সুভাষ চন্দ্রের চিঠিতেই রয়েছে, ইত্যাদি। এই ভক্তদের মধ্যে তথাকথিত ঐতিহাসিকেরাও রয়েছেন যারা এও বলে থাকেন যে সুভাষচন্দ্র নাকি তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর তিনটা ব্রিগেডের নামকরণ গান্ধী, নেহেরু ও আজাদের নামের উপর করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীজি কে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে আজাদ হিন্দ রেডিওর এক ভাষণে “আমাদের জাতির পিতা” বলে সম্বোধন করেছিলেন। এই ঐতিহাসিকদের অবশ্য সব নথি পড়ার অবসর নেই বা পছন্দসই নথি ছাড়া অন্য নথি পড়ার ব্যাপারে এলার্জি রয়েছে। তাঁরা শুধু তাঁদের পছন্দসই নথি পড়েই ইতিহাস লিখতে পছন্দ করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে গান্ধী, নেহেরু ও আজাদের নামে নামকরণ করা হয়েছিল মোহন সিং-এর প্রথম আই-এন-এ তে। নেতাজী সেই আগের নামগুলো পরিবর্তন করেন নি। আবার যেমন ১৯৪২ সালের জুলাই মাসের ১১ তারিখ বার্লিন থেকে টোকিওতে নির্বাসিত বিপ্লবী শ্রীযুক্ত রাস বিহারী বসুকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু যে বিখ্যাত চিঠিটা লিখেছিলেন যাতে গান্ধীজিকে কী ভাবে মাঝে মাঝে প্রশংসা করে তাঁকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে হবে, ভারতে তাঁদের নিজেদের সহকর্মীদের মাধ্যমে গান্ধীজির উপর কীভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে, ইত্যাদি কথা লেখা রয়েছে, এরকম যেসব গুরুত্বপূর্ণ নথি পড়লে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কটা পরিষ্কার হয়ে যায়, সেগুলো তাঁরা পড়ে দেখা পছন্দ করেন না। এদের দলে আবার জওহরলালের বন্ধু বিচারপতি খোসলাকেও আমরা দেখতে পাই কী হাস্যকর ভাবে সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের উপর তার এক সদস্যের তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট লিখতে গিয়ে তিনি বহু পৃষ্ঠা জুড়ে সুভাষচন্দ্রের প্রতি জওহরলাল নেহেরুর কোন বিদ্বেষ ছিল না সে কথা কত ভাবে প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেছেন।
জওহরলাল নেহেরু ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর বছর দুয়েকের মধ্যেই তার কন্যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং দুই দফায় প্রায় ১৬ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকেছেন। এদের সৌজন্যে অনেক তাঁবেদারের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মার্কসবাদী এবং নেহেরুপন্থী। এদের সংযুক্ত প্রয়াস ছিল খুব ধূর্ততার সাথে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভাবমূর্তিকে ছোট করে দেখানো। তাই নেহেরু পন্থী ঐতিহাসিকদের প্রথম প্রয়াস হচ্ছে আমাদের এই মিথ্যে বোঝানো যে সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন জওহরলাল নেহেরুর অনুজপ্রতিম, তাঁদের মধ্যে কোন মনোমালিন্য ছিল না, সুভাষচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী ছিলেন, তিনি গান্ধীজিকে ‘জাতির পিতা’ বলেছেন, ইত্যাদি।
কাজেই এখনও ভারতবর্ষে এরকম বহু গান্ধী-নেহেরু ভক্ত সক্রিয় রয়েছে, যারা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত এবং এরা আসল ইতিহাস পড়তে আগ্রহী নয়। এদের মধ্যে যদিওবা কেউ কেউ পড়াশুনা করে, তারা নেহেরুপন্থী ঐতিহাসিকদের বই থেকে সরে অন্য ঐতিহাসিকদের বই পড়তে ইচ্ছুক বা আগ্রহী নয়। এদের বেশীর ভাগই হচ্ছে সুবিধাবাদী। যেহেতু জওহরলাল নেহেরু এবং তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতা হস্তান্তরের পর প্রায় ৩৩ বছর খণ্ডিত ভারতের সর্বেসর্বা ছিলেন, তাই এইসব গান্ধী-নেহেরু ভক্তবৃন্দ সব সুবিধালাভের আশায় নেহেরুপন্থী — অর্থাৎ সুভাষচন্দ্র বিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর একবার কোন পন্থী হয়ে গেলে ইগোর কারণে পরে আর পন্থা পরিবর্তন ও সহজ হয় না।
আমরা এসব কথা বললে অনেকেই অভিযোগ করতে পারেন যে নেতাজী-অনুগামী বলে এসব মিথ্যে বলছি। তাই একজন ব্রিটিশ লেখক মিঃ এইচ.ভি. হডসন-এর “দ্য গ্রেট ডিভাইড: ব্রিটেন-ভারত-পাকিস্তান” বই থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি। [“দ্য গ্রেট ডিভাইড: ব্রিটেন-ভারত-পাকিস্তান”; লন্ডনের হাচিনসন; ১৯৬৯] মিঃ হেনরি ভিনসেন্ট হডসন ছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, একজন সম্পাদক এবং প্রসিদ্ধ লেখক। তাছাড়া ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তথ্য মন্ত্রক বিভাগের পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন এবং পরে তিনি এক বছরের জন্য ভারতের সংস্কার কমিশনারও হয়েছিলেন। তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের তীব্র সমালোচক ছিলেন। তাই তাঁর লেখাকে আমরা নিরপেক্ষ বলে বিবেচনা করতে পারি। তিনি লিখেছেন, “বৈপ্লবিক উদ্দেশ্য সাধনের প্রেক্ষিতে গঠিত হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেস পার্টি ছিল অসাধারণভাবে নিস্পৃহ এবং কার্যকলাপে অবৈপ্লবিক। সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়া, ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত পঁচিশ বছরের কংগ্রেস পার্টির অন্যান্য রাষ্ট্রপতিরা (তাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিকবার ঐ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন) শান্তিপ্রিয় বুর্জোয়া প্রকৃতির ছিলেন, যাদের রক্তক্ষয়ী লড়াই করার মত সাহস ছিল না – এদের দলে ছিলেন স্বয়ং মি. গান্ধী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, শ্রীমতি সরোজিনী নাইডু, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার, ড. এম. এ. আনসারি, মতিলাল নেহেরু, জওহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল (সম্ভবত এদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ব্যক্তি, কিন্তু বাধা দেওয়ার চেষ্টা করার বা বিরোধিতা করার বা ভিন্ন মতামত প্রকাশ করতে অসমর্থ), শেঠ কাঞ্চোদলাল, মদন মোহন মালবিয়, রাজেন্দ্র প্রসাদ ও আচার্য কৃপালনি। এদের সকলেই ‘মহাত্মা’র প্রশ্নাতীত বা অন্ধ শিষ্য ছিলেন না; দলের নেতৃত্বের মধ্যে এবং দলের নিম্নপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে তাঁর (মহাত্মাজীর) অনেক সমালোচক ছিলেন। তথাপি সর্বোপরি তিনি (দলের মধ্যে) এমন একটি প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিলেন যে সংকটময় মুহূর্তে তাঁর মতবাদই সিদ্ধান্তমূলক হতো।” [ক্রমশ]