আশাকরি পাঠক ব্রিটিশ লেখক মি. হডসনের কথাগুলো হৃদয়ঙ্গম করেছেন। তিনি সত্যিটা তুলে ধরেছেন; স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে অন্যান্য কংগ্রেসি রাষ্ট্রপতি ও নেতাদের — এমনকি গান্ধীজিরও রক্তক্ষয়ী লড়াই করার মত সাহস ছিল না। যাদের এই বঙ্গানুবাদে সন্দেহ হবে, তারা অনুগ্রহ করে মূল ইংরেজি বইটার উল্লিখিত অংশটা (পৃষ্ঠা ৩৬–৩৭) পড়ে দেখবেন। পাঠকের সুবিধার্থে সেই পৃষ্ঠাদুটো এই লেখার নীচে সংলগ্ন করা হল। এছাড়া মি. হডসন জওহরলাল নেহেরু সম্বন্ধে কী লিখেছেন, তাও পড়ে দেখার জন্য সবার কাছে অনুরোধ রইল। [পাদটীকা ১]
সুভাষচন্দ্র বসুর সময়কার কংগ্রেসি নেতাদের যেরকম মনোভাব ছিল, আজকের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদেরও (বিশেষ করে বেশীরভাগ বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীদের) একই মনোভাব। তারা সব নেহেরুপন্থী ঐতিহাসিকদের বই পড়ে সুভাষ বসুকে জেনেছেন। সত্যিকার ইতিহাস পড়ে দেখার অবসর পান নি। বেশীরভাগ বুদ্ধিজীবী, বিশেষত বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সুবিধালাভের আশায় শাসক শ্রেণী বা শাসক পরিবারের তোষামোদি করে এসেছেন। তাদের আদর্শ পুরুষেরা যা পারেন নি, এবং তারা যা পারতেন না, তা যিনি পেরেছেন, তাঁর প্রতি ঈর্ষাকাতর হওয়া, তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করাই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। এতে যে শাসক পরিবারের মানুষেরা খুশি হবেন, এই কথা তাদের জানা ছিল। নিজেদের অহংবোধের কারণে এখন আর তারা মত বদলানোর কথা ভাবতে পারেন না। তাছাড়া নতুন করে সত্যিকারের ইতিহাস পড়ে নিজেদের শোধরানোও এখন আর সম্ভব নয়, এতে তাদের ইগো হার্ট হবে বা অহং-এ আঘাত লাগবে। তাই তারা গান্ধীজির আর নেহেরুর পক্ষে, আর সুভাষ বসুর বিপক্ষে। আমি হয়তো খুব রূঢ় ভাবে বা খুব চাঁচাছোলা ভাষায় আমার জানা মূল কারণটা এখানে ব্যক্ত করলাম।
সংখ্যাগরিষ্ঠরা বিপ্লব-বিরোধী সুভাষচন্দ্র বসু
এবার আমরা দেখবো সুভাষচন্দ্র বসু এব্যাপারে কী বলেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর একান্ত অনুগত শ্রীনরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে টানা তিন মাস প্রেসিডেন্সী জেলের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডে একসাথে ছিলেন। [পাদটীকা ২] এসময় তাঁদের মধ্যে যেসব কথোপকথন হয়েছিল সেগুলো নিয়েই শ্রীনরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীর তিন খণ্ডের বই “নেতাজী সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’-এর দ্বিতীয় খণ্ডটা লেখা।
এবিষয়ে তাঁদের কথোপকথন হয়েছিল মঙ্গলবার, ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই অক্টোবরের রাত্রে। সেদিন ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। আরও অনেক কথার মধ্যে সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু লেখককে বলেছিলেন:
“চিরদিন গান্ধী ছিলেন ইংরেজের গুণমুগ্ধ রাজভক্ত প্রজা। ইংরেজের ভুল, ত্রুটি, দুর্বলতা সবই তিনি দেখেছেন কিন্তু শোধনের ঊর্ধ্বে আর কিছু করণীয় থাকতে পারে, এ-কথা ভাবেননি। গান্ধীর ‘চেঞ্জ অব হার্ট’ শুদ্ধিরই নামান্তর।
“যখনই দেশে বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, হয় গান্ধী আন্দোলন থামিয়ে দিয়েছেন, আর না হয়, আপোসের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ১৯২২, ১৯৩০, ১৯৩৩ গান্ধী জীবনের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি।
তিনি আরও বলেছিলেন: ‘লক্ষ্য করে দেখো, ইংরেজ এই সব আন্দোলনের মাঝখানে কোনদিনই গান্ধীকে বন্দী করেনি। যদি-বা করেছে অনেক পরে, বাজে অজুহাতে ওঁকে ছেড়েও দিয়েছে কিছু দিন পরই। ইংরেজ জানে, গান্ধী আর যাই করুন, বিপ্লব ঘটাতে দেবেন না। ইংরেজের ভয়ানক কিছু অনিষ্ট হবে, ইংরেজ বিপন্ন হয়ে পড়বে, এমন কিছু গান্ধী করবেন না, গান্ধী করতে পারবেন না, বা চাইবেন না, – ইংরেজ যেন এটা আগে-ভাগেই ধরে রেখেছে।’
“ইংরেজ সম্পর্কশূন্য স্বাধীনতা গান্ধী কল্পনা করতে পারেন না। যদি পারতেন, এই সুবর্ণ সুযোগ তিনি হেলায় হারাতেন না। ইওরোপের যুদ্ধে ইংরেজ জড়িয়ে পড়বার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কংগ্রেসের তথা দেশের সমগ্র শক্তি কেন্দ্রীভূত করে জাতীয় সংগ্রামে প্রবৃত্ত হতেন। কিন্তু হলেন না। হলেন না কেন? কেন এলো দ্বিধা? বিরুদ্ধ পক্ষের বিপদের সময় নাকি তাকে উদ্ধ্যস্ত করতে নেই। কেতাবে লেখা আছে এই নিষেধাজ্ঞা। দীর্ঘ এক বৎসর এই নীতিশাস্ত্র মানবার পর অকস্মাৎ ব্যক্তি-সত্যাগ্রহই-বা তিনি চালু করতে গেলেন কেন? ইংরেজ কি একান্তই নিরুদ্বিগ্ন আর প্রসন্ন হয়ে উঠেছে এই ব্যবস্থায়? অর্থাৎ সাপও মরে, লাঠিও যেন না ভাঙে। ইংরেজ একটু দুর্বল হোক, কাবু হয়ে পড়ুক, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তার অস্তিত্বের পক্ষে মারাত্মক যেন কিছু না ঘটে। ঘটলে ইংরেজ মরবে। গান্ধী তা চান না।
সুভাষ চন্দ্র আরও বলেছিলেন — “গান্ধী আর জহরলালের মিলন-সুত্রও এইখানে। ওঁরা কেউই ইংরেজের সম্পর্ক কাটাতে চান না।”
এরপর নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী সুভাষচন্দ্রকে প্রশ্ন করেছিলেন, — ‘কিন্তু দেশের লোক তো ওঁদের কথা বেশি শোনে আর মানেও।’
এই প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন: — ‘খুবই সত্যি। সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে কোন দিন কোন দেশে বিপ্লব আসেনি। ওঁদের কথা বেশি লোকে শোনে, এও একটা প্রমাণ যে, ওঁদের কথা বিপ্লব-বিরোধী।’
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী জানতে চেয়েছিলেন, ‘কিন্তু শোনে কেন?’
উত্তরে সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন: — ‘কেন? তারও কারণ আছে। একটা অসাধারণ মনস্তত্ত্বের অধিকারী গান্ধীজি। অতি দীর্ঘ দিন পরাধীন থেকে এদেশের লোক পরাধীনতাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে। স্বাধীনতার স্থান গ্রহণ করেছে উদ্দেশ্যহীন, আয়েসী আধ্যাত্মিক উন্মাদনা। গান্ধীজি এই মানসিকতা কাজে লাগিয়েছেন।’
“গান্ধী অলৌকিক, গান্ধী অসাধারণ, গান্ধী অবতার। হাজার হাজার অজ্ঞ মানুষ গান্ধীকে দর্শন করবে, প্রণামী দেবে, পায়ের ধুলো নিতে জীবনও বিপন্ন করবে, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য কয়জন এগিয়ে আসবে? কোটি কোটি লোকের দেশ ভারতবর্ষ, কিন্তু কোন আন্দোলনেই এক লক্ষ লোকও জেলে যায়নি। নিছক জেল, মরা নয়, তবুও যায়নি।
সুভাষচন্দ্র বসু আরও বলেছিলেন : — ‘এ সত্ত্বেও যুদ্ধ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে যদি গান্ধী সত্যাগ্রহ চালু করতেন, এবার দেশের লোক অনেক বেশি যোগ দিতো আন্দোলনে। কিন্তু গান্ধী তা চান না।’
নরেন্দ্রনারায়ণ: — ‘কেন?’
সুভাষচন্দ্র বসু: — ‘এবার সত্যাগ্রহ শুরু হলে ইংরেজের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। গান্ধী ইংরেজের পরাজয় চান না।’
নরেন্দ্রনারায়ণ: — ‘কিন্তু ইংরেজের পরাজয় না হলে সত্যাগ্রহেরই-বা জয় হবে কোত্থেকে?’
সুভাষচন্দ্র বসু: — ‘গান্ধী সত্যাগ্রহ জয় চান না, চান আপোস।’
নরেন্দ্রনারায়ণ: — ‘সত্যাগ্রহ, তা হোক না ব্যক্তি সত্যাগ্রহ, এছাড়াও তো আপোস হতে পারতো?’
সুভাষচন্দ্র বসু: — ‘পারতো। কিন্তু গান্ধীর অলৌকিকতা তাতে প্রমাণিত হতো না। তাছাড়া, গান্ধী ইংরেজকে বোঝাতে চান যে, তিনি আজও অকেজো হননি, উপেক্ষার পাত্রও নন। দেশের লোকও বুঝবে যে, গান্ধী এই পরমক্ষণে বসে নেই।’
সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু আরও বলেছিলেন ‘ইংরেজ যদি বুঝতো যে, গান্ধীর সত্যাগ্রহে তাকে সত্যি সত্যি বিপন্ন হতে হবে, সেও তাই করতো [আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিত] যেমন করেছিল সেপাই-বিপ্লবের পর। গান্ধীর সত্যাগ্রহ একদিকে ইংরেজকে অভয় দিয়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত বিপ্লবের সম্ভাবনা রেখেছে ঠেকিয়ে।’
[উপরিউক্ত উদ্ধৃতিগুলো শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী লেখা ‘নেতাজি সঙ্গ ও প্রসঙ্গ – দ্বিতীয় খণ্ড’ বইয়ের দ্বিতীয় মুদ্রণ – আষাঢ়, ১৩৭৪, থেকে নেওয়া। বইটার প্রকাশক গ্রন্থপ্রকাশ, কলিকাতা-১২; বইটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২৩ জানুয়ারি ১৯৬৬ তারিখে।] [ক্রমশ]