সুভাষচন্দ্র বসু জানতেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে কোন দিন কোন দেশে বিপ্লব আসেনি। দেশবাসী গান্ধীপন্থীদের কথা বেশি লোকে শোনে, এও একটা প্রমাণ যে, গান্ধীর ও গান্ধীপন্থীদের কথা বিপ্লব-বিরোধী।
তিনি আরও জানতেন যে গান্ধীজি একটা অসাধারণ মনস্তত্ত্বের অধিকারী । অতি দীর্ঘ দিন পরাধীন থেকে ভারতবর্ষের মানুষ পরাধীনতাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে। স্বাধীনতার স্থান গ্রহণ করেছে উদ্দেশ্যহীন, আয়েসী আধ্যাত্মিক উন্মাদনা। গান্ধীজি এই মানসিকতা কাজে লাগিয়েছেন।
সুভাষচন্দ্র বসু এসব কথা বলেছিলেন ১৫ই অক্টোবর ১৯৪০ তারিখ রাত্রে তাঁর এক সহকর্মীকে, একান্তে। আর শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীর বইটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৬-র জানুয়ারিতে। এই বইটার কোন ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু আমরা আশ্চর্য হই যে ইংরেজ লেখক মিঃ হেনরি ভিনসেন্ট হডসন ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসুর কথারই প্রতিধ্বনি করে লিখেছেন: “Given its revolutionary purpose, the Congress was remarkably tame and non-revolutionary in practice.” অর্থাৎ, “বৈপ্লবিক উদ্দেশ্য সাধনের প্রেক্ষিতে গঠিত হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেস পার্টি ছিল অসাধারণভাবে নিস্পৃহ এবং কার্যকলাপে অবৈপ্লবিক।”
গান্ধীভক্তদের বংশধরেরা সবাই মত পরিবর্তন করেন নি; বেশ কিছু এখনও সক্রিয়
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা-কংগ্রেসের সময় গান্ধীজীর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্র বসুর সংশোধনী প্রস্তাব ১৩৫০–৯৭৩ ভোটে পরাজিত হয়েছিল। সেসময় প্রদেশ অনুযায়ী ভোটের পরিসংখ্যান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়নি। কিন্তু শ্রী এচ-এন-মিত্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দী ইন্ডিয়ান এন্যুএল রেজিস্টার, ১৯২৮, ভলিউম ২’, পৃষ্ঠা ৩৬৮, থেকে জানা যায় যে বাংলা প্রদেশের দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধি সংশোধনী প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কাজেই এক-তৃতীয়াংশ বাংলার গান্ধী-ভক্ত প্রতিনিধি সেদিন সুভাষচন্দ্রের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
আবার জানুয়ারি ১৯৩৯-এ ত্রিপুরী কংগ্রেসের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধীজির সমর্থিত পার্থীকে যখন পরাজিত করেছিলেন, সেই নির্বাচনে তিনি বাংলা প্রদেশ থেকে যেমন ৪০৪-টা ভোট পেয়েছিলেন, তেমনি বাংলার ৭৯-জন প্রতিনিধি তাঁর বিপক্ষেও ভোট দিয়েছিল।
সেইসব সুভাষ-বিরোধী এবং গান্ধীভক্তদের বংশধরদের অনেকেই হয়তো যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আজ সুভাষ-ভক্তে পরিণত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মেকি সুভাষ-ভক্ত সেজে আমাদের মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছেন ঠিক যেমন স্লিপার সেলে (sleeper cell-এ) টেরোরিস্ট বা সন্ত্রাসবাদীরা লুকিয়ে থাকে, তেমনি। আর তাদের মধ্যে কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়েছেন যারা মনে করেন যে তারা নিজেরা কেউই সুভাষচন্দ্রের থেকে কোন অংশেই কম সাহসী এবং কম কর্মদক্ষ নন। তাদের নেতাজী সম্বন্ধে পড়াশুনা খুবই সীমিত, তারা বলে থাকেন যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তো সামরিক বিদ্যা কখনও শেখেন নি। তাই তিনি আর কী এমন করেছেন, ইত্যাদি। তাদের কেউ কেউ আবার এও বলেন যে সুভাষচন্দ্র বসুর উচিত হয়নি ভারত ছেড়ে ‘পালিয়ে’ যাওয়া।
তাছাড়া পূর্বে বর্ণিত কৃষ্ণদাস (ওরফে দেবেন্দ্রকুমার সিংহরায়) জাতীয় গান্ধীজীর বিশ্বস্ত অনুগামীদের আত্মীয়-স্বজনেরা তো রয়েছেনই। তারা নিজেরা তো সুভাষচন্দ্র বসুর প্রভূত ক্ষতি করেছেনই, তাদের স্বজনেরা এখনও সুভাষচন্দ্রের স্মৃতির মর্যাদা হানির কাজে সক্রিয় রয়েছেন। বছর খানেক আগে যখন ইন্ডিয়া গেটের সামনে নেতাজীর মূর্তি বসানো হচ্ছিল তখনও আমরা এদের কারো কারো মুখোশ খুলে বেড়িয়ে আসতে দেখেছি। ইন্ডিয়া গেট বানানো হয়েছিল ১৯১৪ থেকে ১৯২১ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে সমস্ত ভারতীয় ভাড়াটিয়া সৈন্য (mercenary) ইংরেজদের হয়ে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছিল, তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। আজ অবধি আমি এসব বুদ্ধিজীবীকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভাড়াটিয়া সৈন্যদের (Mercenary-দের) জন্য রাজধানীর এমন বিশিষ্ট স্থানে নির্মিত সেই সৌধের অন্যত্র অপসারণের জন্য দাবী জানাতে শুনিনি। কিন্তু নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর স্ট্যাচু যখন বসানো হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন এদের আমরা নানারকম দাবী করতে দেখেছিলাম।
তাছাড়া শিক্ষাব্রতী সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের শিষ্য হয়েও বঙ্গসন্তান কৃষ্ণদাস বাবাজীর এই ন্যক্কারজনক ভূমিকা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অল্পকিছু বাঙালী এবং ভারতবাসীর মধ্যে নেতাজী-বিরোধিতার কারণ অনুসন্ধানে আর মনঃসমীক্ষণে সাহায্য করে।
প্রথম জীবনে নরেন্দ্রনাথ দত্ত-রূপে ব্রাহ্মসমাজে লালিত এবং ব্রাহ্মসমাজের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে পরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সংস্পর্শে এসে স্বামীজীকেও বেশকিছু ব্রাহ্মসমাজভুক্ত মানুষের কাছে প্রতিরোধ ও আঘাত পেতে হয়েছিল, ঠিক তেমনি স্বামীজির ভাব-শিষ্য সুভাষচন্দ্রকেও ব্রিটিশদের সাথে সাথে একদল ঈর্ষাকাতর চক্রান্তকারী কংগ্রেসকর্মী, কম্যুনিস্ট, প্রভৃতির সম্মিলিত আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে। পরে অবশ্য এই নেতৃবৃন্দের অনেকেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে শুধু মতই পরিবর্তন করেনি, সুভাষচন্দ্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে। সেগুলো কতটা আন্তরিক ছিল তা অবশ্য আমাদের অজানা। তবে কম্যুনিস্ট মতাবলম্বী বেশ কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর যে মত পরিবর্তন হয় নি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
রাজনৈতিক কারণ
এবার আমি বর্তমান সময়ের প্রধান কারণটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। ভারতবর্ষে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, তথাকথিত স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কেউই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু-পন্থী বা নেতাজীর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না। উপরে উপরে নেতাজীর বিরোধিতা না করলেও তারা প্রকৃতপক্ষে নেতাজীর বিরুদ্ধচারী ছিল। তথাকথিত স্বাধীন ভারতের ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’তে নেতাজীর জন্মদিনেও তাঁর কথা বেশী আলোচনা করার উপর এক সময় নিষেধাজ্ঞা ছিল। অন্য দিকে আমরা দেখি যে সর্বভারতীয় স্তরে প্রথমে কংগ্রেস পার্টি বহু বছর ক্ষমতায় থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে গান্ধীজির আর ‘তাঁর অহিংসা নীতি স্বাধীনতা এনেছে’ এই মিথ্যা খবর প্রচার করার পেছনে। কেন্দ্রীয় সরকার নেতাজীর নিকট-আত্মীয়দের পেছনে গোয়েন্দা পর্যন্ত লাগিয়েছিল। এসবই তদানীন্তন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের জ্ঞাতসারেই হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক প্রফেসর ডঃ প্রতুলচন্দ্র গুপ্তকে জওহরলাল নেহেরুর উদ্যোগে ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আই-এন-এ-র ইতিহাস লেখার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। এজন্য তাঁকে আই-এন-এ সম্পর্কিত ব্রিটিশদের সময়কার বেশ কিছু গোপন ফাইলপত্রও দেখতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সময়মত সেই বইয়ের (‘এ হিস্ট্রি অফ দী ইন্ডিয়ান ন্যাশানেল আর্মি ১৯৪২–১৯৪৫’) পাণ্ডুলিপিও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ অবধি সেই বই প্রকাশিত হয় নি। এই সম্বন্ধে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের একটা গোপনীয় নোট সোসিয়েল মিডিয়াতে ফাঁস হলে জানা যায় যে সেই পাণ্ডুলিপির ১৮৬ থেকে ১৯১ পৃষ্ঠায় প্রফেসর প্রতুল চন্দ্র গুপ্ত এমন কিছু লিখেছেন যাতে মনে হয় যে বিমান দুর্ঘটনায় ১৯৪৫-এর আগস্ট মাসে নেতাজীর মৃত্যু হয় নি। কাজেই বোঝা সহজ কেন জওহরলাল নেহেরু সেই বই ছাপতে দিতে রাজী হন নি। [ক্রমশ]