১৯৫৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্বতন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড ক্লিমেন্ট এ্যাটলী যদিও ব্যক্তিগতভাবে বলে গিয়েছিলেন যে তাদের ভারত ছাড়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রভাবের জন্য ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবের উন্মেষ, আমাদের ভারত সরকার তখন এসব কথা যাতে প্রচার না হয় তার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং সরকারী সংস্থাগুলোকেও একাজে ব্যবহার করেছে। কলকাতা হাই কোর্টের প্রথম ভারতীয় প্রধান বিচারপতি জাস্টিস ফণীভূষণ চক্রবর্তী ক্লিমেন্ট এ্যাটলীর বলে যাওয়া কথা বহু মানুষজনকে বলেছিলেন। শ্রী বরুণ দে সেকথার সত্যতা ১৯৬০ সালে অক্সফোর্ডের ন্যাফিল্ড কলেজে স্বয়ং লর্ড ক্লিমেন্ট এ্যাটলীর কাছ থেকে যাচাইও করেছিলেন। ফণীভূষণ চক্রবর্তীর লিখিত প্রমাণ সংগ্রহ করে ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার একথা একাধিক বইতেও লিখেছিলেন। ১৯৬৩ সালের ২৩শে জানুয়ারি নেতাজী ভবনে সভাপতির ভাষণে আবার জাস্টিস ফণীভূষণ চক্রবর্তী একথার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ সেই অংশটুকু সেন্সর করে অনুষ্ঠানটি প্রচার করেছিল। ১৯৮১ সালে ফণীভূষণ চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে নেতাজী রিসার্চ ব্যুরো তাদের ত্রৈমাসিক ‘The Oracle’ পত্রিকায় ১৯৬৩-র নেতাজী জয়ন্তীর সেই অনুষ্ঠানের ভাষণ ইত্যাদি প্রকাশ করেছিল কিন্তু তারাও জাস্টিস ফণীভূষণ চক্রবর্তী এই কথা সেন্সর করে বাদ দিয়েছিল।
১৯৭৮ সালে জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাপক সমর গুহের একক প্রচেষ্টার কারণে ভারতের পার্লিয়ামেন্টে প্রথমবার নেতাজীর ফটো রাখা হয়েছিল। তার আগে নেতাজীর স্থান হয়নি সেই গ্যালারিতে।
বহু বছরের দাবীর পর ১৯৯৭ সালে কলকাতার বিমান বন্দরের নাম নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর করা হয়েছিল। আমরা আজ দেখি যে সেই বিমান বন্দরে গান্ধীজির নামে গ্যালারী করা হয়েছে। এতেই প্রমাণ হয় যে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারও গান্ধীজিকে নেতাজীর উপরে স্থান দিয়ে থাকেন।
২০১৮র অক্টোবরের ২৩ তারিখে দিল্লির লাল কেল্লার ভেতরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর গঠিত অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের ৭৫-তম বৎসর-পূর্তির দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। সেদিন তিনি একবারও জয় হিন্দ বলেন নি। অন্যান্য স্লোগান দিয়েছিলেন।
কাজেই সহজেই অনুমেয় কেন কংগ্রেসি এবং অন্যান্য দলের নেতারা নেতাজীকে তেমন পছন্দ করেন না। যদি সত্য কথাটা অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাফল্যের কথা স্বীকৃত হয়, তবে সমস্ত সাগরেদ-সহ গান্ধীজির সারা জীবনের প্রধান প্রচেষ্টা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। শুধু কংগ্রেস কেন, বি-জে-পি সহ ভারতের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ পুরুষেরা গান্ধী ও তাঁর অন্ধ-অনুগামীবৃন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যে ভারত সরকার কোটি কোটি টাকা গান্ধীজির মিথ্যা প্রচারের উপর এত বছর ধরে ব্যয় করে এসেছে, সত্যিটা প্রকাশ হলে তা সব ভস্মে ঘি ঢালার মত অপচয় বলে বিবেচিত হলে এদের লজ্জার শেষ থাকবে না। তাই যেসব মানুষ এই রাজনৈতিক নেতাদের অন্ধ ভক্ত, তারা নেতাজীর উপর গান্ধীজিকে স্থান দেবেন, তাই তো স্বাভাবিক।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি
১৯৪৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় ছিল বা তাদের নেতারা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন — যেমন কংগ্রেস, যুক্তফ্রন্ট, বাংলা কংগ্রেস, সিপিএম, লেফ্টফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস ইত্যাদি — তাদের প্রায় সবগুলোই ছিল গান্ধী-অনুরক্ত দল এবং ভেতরে ভেতরে নেতাজী-বিদ্বেষী। রাজনৈতিক কারণে এরা সবাই দল হিসাবে নিজেদের নেতাজীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে দেখাতে চেয়েছে কিন্তু যখন নেতাজী ও গান্ধীজির মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বলা হবে, তখন তারা গান্ধীজিকেই বেছে নেবে। অর্থাৎ গান্ধীজিই ছিলেন এদের কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য।
গান্ধীজি এক প্রশ্নের উত্তরে ১২ই জুন ১৯৪২ তারিখে বলেছিলেন, “সে (সুভাষ চন্দ্র বসু) বিপথগামী এবং তার পথ কখনই ভারতকে মুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে না।” [হরিজন পত্রিকা, ২১ জুন ১৯৪২।] এই গান্ধীজিই অসহযোগ করে সুভাষচন্দ্র বসুকে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। আবার ১৯৩৯-এর আগস্ট মাসের ১১ তারিখ কংগ্রেস দল থেকে সুভাষ চন্দ্রকে বিতাড়িতও করেছিলেন এই মোহনদাস গান্ধী। সেই সাস্পেন্সনের রিজোলিউসানটাও ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের পক্ষ থেকে গান্ধীজি নিজেই ড্রাফ্ট (মুসাবিদা) বানিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসুকে হেনস্থা করার পেছনে নাটের গুরু ছিলেন এই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। এন্ড্রুজ সাহেব রবীন্দ্রনাথের তরফ থেকে গান্ধীজিকে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে এই শাস্তির ব্যাপারে লিখেছিলেন। উত্তরে গান্ধীজি এন্ড্রুজ সাহেবকে লিখেছিলেন যে সুভাষচন্দ্র একজন spoilt child বা বখাটে ছেলে।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর বছর অর্থাৎ ১৯২২ সালের রিপাবলিক ডে প্যারেডে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের তরফ থেকে কলকাতার রেড রোডে যে ট্যাবলু প্রদর্শিত হয়েছিল সেটা দেখলে আমি কি বলতে চাইছি সেটা বোঝা কিছুটা সহজ হবে। সেই ট্যাবলুর একটা ফটো আমি এই পোস্টের নীচে সংলগ্ন করলাম। আমরা জানি যে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য এবং উত্তরসাধক। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের সেই ট্যাবলুটা (tableu) দেখলে তাই দুঃখ হয়। এটার একপাশে যে দশ জনের ষড়ভুজাকার ফ্রেমের মধ্যে মুখগুলো দেখা যাচ্ছে তার সব চাইতে উপরের সারিতে একক ভাবে রয়েছে গান্ধীজির মুখ। তার নীচের সারিতে আমরা দেখতে পাই বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও রামমোহন রায়, এই চার জনের মুখাবয়ব। আর তারও নীচের সারিতে আমরা দেখি আম্বেদকার, স্বামী বিবেকানন্দ, বিরসা মুন্ডা (খুব সম্ভব), সাবিত্রীবাই ফুলে (খুব সম্ভব) এবং শহীদ ভগত সিং, এই পাঁচ জনের মুখের ছবি। যদিও নেতাজীর দুটো স্ট্যাচু ছিল এই ট্যাবলুর উপরে, তথাপি নেতাজীর আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী বিবেকানন্দের স্থান গান্ধীজির দুই সারি নীচে দেখে সহজেই বোঝা যায় যে নেতাজীর তুলনায় গান্ধীজিকে কতটা সম্মান করেন বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ। এই ব্যাপারে আমি কোন বুদ্ধিজীবীর তরফ থেকে কোন প্রতিবাদ হতে শুনিনি।
পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষেরা বেশীর ভাগই নেতাজীকে পছন্দ করেন তবে তারা যেসব রাজনৈতিক দলের সমর্থক সেই দলগুলো কিন্তু নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে গান্ধীজির উপরে স্থান দেয় না, তা বোঝা সহজ। কাজেই যারা সাধারণ রাজনৈতিক দলের সদস্য, তাদের বলতে শোনা যায় নেতাজীকে ভালবাসি বলে কী গান্ধীজিকে সম্মান করবো না? নেতাজীকে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে জানার তাদের সময় বা অবসর কোথায়?
প্রতিটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতা লাভ করতে আর ক্ষমতা ধরে রাখতে আগ্রহী। তাই তারা বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে খুশি রাখতে ব্যস্ত। [ক্রমশ]