যদিও সব রাজনৈতিক দলগুলো কমবেশি জনসমর্থন পেতে নেতাজীর নামও ব্যবহার করার চেষ্টা করে থাকে, তাদের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি সেরকম ‘আনুগত্য’ তবেই হবে যদি সেই দলের সদস্যরা প্রবলভাবে তা দাবী করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে তথাকথিত নেতাজী-ভক্তেরা নেতাজীর চাইতে সেইসব রাজনৈতিক দলের প্রতি বেশী অনুগত হয়ে পড়েছে।
যারা নিরপেক্ষ এবং বোঝার ক্ষমতা রাখেন, তাঁরা ঠিক বুঝতে পারবেন আমি কী বোঝাতে এবং প্রমাণ করতে চেষ্টা করলাম। আর যারা অন্ধ গান্ধীভক্ত, তারা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন বলে তাদের বোঝানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
পাদটীকা
[১] এখানেই শেষ নয়। এর পরই মি. হডসন নেহেরুর মুখোশ উন্মুক্ত করে দিয়ে লিখেছেন: “পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, মহাত্মার পরে বর্তমান ইতিহাসে কংগ্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, অনেক দিক থেকেই তাঁর (গান্ধীর) বিপরীত মতাবলম্বীর ছিলেন। দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পূর্ণরূপে পাশ্চাত্য, লালন-পালন ও মানসিকতায় শহুরে ও উচ্চশ্রেণীর, মতামতের দিক থেকে উগ্রপন্থী, ভারতীয় জীবন ও ঐতিহ্যের শিকড়ের প্রতি গান্ধীবাদীদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, সহজে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হন এমন, ঘৃণা করতে এবং আকস্মিকভাবে জ্বালাময়ী বিস্ফোরণে সক্ষম, তিনি প্রায়শই নিজে তাঁর নায়কের (বাপুর) মনোভাব দেখে বিরক্ত, হতাশ বা বিভ্রান্ত বোধ করতেন। তথাপি বারবার তিনি তাঁর (বাপুর) কাছে আনুগত্যের কারণে আত্মসমর্পণ করতে অভ্যস্ত ছিলেন, এমন বিশ্বাসে যেমন এক পুত্র তার প্রিয় পিতার কাছে করে থাকেন তাদের মধ্যে অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও।” [THE GREAT DIVIDE : Britain – India – Pakistan by H.V. HODSON; Hutchinson of London, 1969.]
[২] আমরা জানি যে সুভাষচন্দ্র বসু ভারতবর্ষে শেষ বারের মত গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২রা জুলাই ১৯৪০ তারিখে। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন যে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের জন্য একটা গণআন্দোলন করবেন। ৩রা জুলাই ছিল সিরাজদৌল্লার স্মৃতিদিবস। সুভাষচন্দ্র বসু ঠিক করেছিলেন যে নবাব সিরাজদৌল্লার স্মৃতিদিবসেই এই গণআন্দোলন শুরু হবে। কিন্তু তার ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ২রা জুলাই ১৯৪০ তারিখ দুপুরে সুভাষচন্দ্রকে ভারত-রক্ষা আইনের ১২৯ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্সী জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তিনি ৫ ডিসেম্বর ১৯৪০ তারিখ অবধি অন্তরীণ ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসুর কারাবাস হওয়া সত্ত্বেও ফরওয়ার্ড ব্লকের অন্যান্যেরা পূর্বপরিকল্পিত সময়সূচী অনুযায়ী ৩রা জুলাই বিকেলে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। দলের অনেকেই বন্দী হয়েছিলেন। ৬ই জুলাই গ্রেপ্তার হলেন শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী। এর পরেও আন্দোলন চলতে লাগলো।
প্রথমে গভর্ণমেন্ট শক্ত হতে চেয়েও পরে ইসলামিয়া কলেজে পুলিশের লাঠি-চার্জের পর ২৮ জুলাই ১৯৪০ তারিখে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে যে বিরাট জনসমাবেশ হয়েছিল এবং সভা শেষে কলকাতার রাস্তায় যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তাতে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক হার স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং সেদিন সন্ধ্যায়ই ঘোষণা করেন যে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারিত হবে। এরপর বিরোধী দলনেতা শরৎচন্দ্র বসু আবেদন জানালেন আন্দোলনকারীদের সত্যাগ্রহ বন্ধ করার জন্য এবং সাথে সাথে সরকার পক্ষকেও অনুরোধ করলেন সত্যাগ্রহীদের এবং ভারতরক্ষা আইনে আটক বন্দীদের মুক্তি দিতে।
২৯শে আগস্ট ১৯৪০ তারিখে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হল শুধু দুজন ছাড়া। তাঁরা হলেন শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু এবং সুভাষ চন্দ্রের একান্ত অনুগত শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী। অবশ্য তখন তাঁরা প্রেসিডেন্সী জেলেরই আলাদা আলাদা ওয়ার্ডে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে — খুব সম্ভবত ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪০ তারিখে নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীকেও সুভাষচন্দ্র বসুকে যে ‘ইওরোপিয়ান ওয়ার্ডে’ রাখা হয়েছিল, সেখানেই স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সেই থেকে টানা তিন মাসের উপর তাঁরা দুজনে একই সাথে ছিলেন প্রেসিডেন্সী জেলে। এই তিন মাসাধিক সময়ে সুভাষচন্দ্র অনেক কথা বলেছিলেন শ্রী নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তীকে। সেগুলো নিয়েই তাঁর লেখা তিন খণ্ড বই “নেতাজী সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ এর দ্বিতীয় খণ্ডটা লেখা। [সমাপ্ত]