আইএনএ ট্রায়াল এবং সেসময়ের পরিস্থিতিতে কংগ্রেস পার্টির প্রতিক্রিয়া
সৌভাগ্যবশত, ঠিক সেই সময় আই-এন-এর তিনজন অফিসারের বিচারের ঘোষণা করা হয়েছিল এবং এজন্য একটি সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। একথা শুরুতেই বলা হয়েছে। এই তিনজন INA অফিসারের একজন ছিলেন হিন্দু, একজন ছিলেন মুসলিম এবং তৃতীয় জন ছিলেন শিখ। বিচারটি মূলত ৮ অক্টোবর ১৯৪৫ তারিখে শুরু হওয়ার কথা ছিল। পরে তা পিছিয়ে ৫ই নভেম্বর ১৯৪৫ তারিখে শুরু হয়েছিল। এটি সম্ভব হয়েছিল লাহোর হাইকোর্টের বিচারক এবং প্রেম কুমার সেহগলের পিতা বিচক্ষণ বিচারপতি আছরু রামের কারণে, যিনি প্রসিকিউশন পক্ষকে বলেছিলেন যে ‘ডিফেন্স টীমের’ পক্ষে সাক্ষী জোগাড় করার জন্য বেশ কিছু মানুষজনকে সনাক্ত করতে এবং সেইসব প্রতিরক্ষা সাক্ষীদের পূর্ব এশিয়া থেকে দিল্লিতে আনাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। এই পর্বগুলি নিয়ে আমি অতীতে ফেসবুকে একাধিক পোস্টে বিশদ আলোচনা করেছি এবং কীভাবে আই-এন-এ ইস্যুটি কংগ্রেস পার্টিকে পুনর্জীবিত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা বিশদভাবে আলোচনা করেছি। এখানে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করব না।
আইএনএকে সমর্থন করার ব্যাপারে কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দের প্রাথমিক দ্বিধা এবং আসফ আলীকে সারা ভারত সফর করে দেশবাসীর মন বোঝার দায়িত্ব, ইত্যাদি।
কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মনে তখন দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে। “আজাদ হিন্দ ফৌজ’ যা করার চেষ্টা করেছে তা কী তাদের করা উচিত ছিল?” এই প্রশ্নে কংগ্রেস দল প্রথমে তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল। এদিকে আবার নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচনী প্রচারের ইস্তাহারে নেতাজীর নামের উল্লেখ পর্যন্ত ছিল না! আর আই-এন-এ বা আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক তো ছিলেন কংগ্রেস থেকে নিলম্বিত (অপসারিত) দু’বারের কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু যিনি কিনা গান্ধীজির বিরুদ্ধে কথা বলার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন!
আমরা এখন ‘ডিক্লাসিফাইড’ ‘ট্রান্সফার অফ পাওয়ার’ ডকুমেন্ট/নথি [নং. ১৬০, ভলিউম ৬] থেকে জানতে পারি যে কংগ্রেস দল তখন আসফ আলীকে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সফর করে আইএনএ সম্পর্কে জনসাধারণের অনুভূতি বুঝে উঠার জন্য পাঠিয়েছিল। সফর শেষে আসফ আলী যে উদ্বেগজনক রিপোর্ট পেশ করেছিলেন তার ফলস্বরূপ কংগ্রেস পার্টিকে শুধুমাত্র আইএনএ-র পক্ষ নিতেই দেখা গেল না, কংগ্রেস পার্টি রাতারাতি তিন অভিযুক্ত আই-এন-এ সেনাধ্যক্ষের পক্ষে সামরিক আদালতে প্রতিরক্ষা দল গঠন করে তাঁদের পক্ষে সওয়াল করার নীতি গ্রহণ করতেও বাধ্য হল। এর সবকিছুই অবশ্য আন্তরিক সদিচ্ছা থেকে উদ্ভূত ছিল না; সবই ছিল ভারতীয়দের হৃদয় জয় করে রাজনৈতিক মুনাফা লাভের জন্য। এরপর কংগ্রেস দল বোম্বেতে অনুষ্ঠিত অল-ইন্ডিয়া-কংগ্রেস-কমিটির ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ এর সভায় ৭ সদস্যের একটা ডিফেন্স টিম তৈরি করে। [পাদটীকা ৩]
দাম্ভিক কাগজের বাঘ
ডক্টর পিটার ওয়ার্ড ফে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাসাডেনাতে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ইতিহাসের অধ্যাপক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট। তিনি এ বিষয়ে বহু বছর গবেষণা করে “দ্য ফরগটেন আর্মি” নামক তাঁর অনন্য শ্রমসাধ্য গবেষণাধর্মী বইতে লিখেছেন: “যদিও এটি ছিল সাতজনের একটি কমিটি, সাতজনার মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম ঢোকানো হয়েছিল কেবলমাত্র জনগণের নজর কাড়তে।”
প্রথম দিনের ফটো তোলার সময় তাঁরা সবাই (সাতজনই) সেখানে উপস্থিত ছিলেন! সপ্রুর বয়স তখন প্রায় সত্তর, তাছাড়া তিনি ছিলেন অসুস্থ। তিনি কেবল প্রথম দিনই উপস্থিত ছিলেন এবং পরে তাঁর ৭০তম জন্মদিন উদযাপন করতে এলাহাবাদ চলে গিয়েছিলেন।
আমরা ডক্টর পিটার ওয়ার্ড ফের বই থেকে জানতে পারি যে বিচার শুরু হবার কিছুদিন আগে তাঁর বহু ব্যস্ত সময়সূচী থেকে কিছুটা সময় বের করে একদিন জওহরলাল নেহেরু এসেছিলেন তিন অভিযুক্তকে দেখতে। প্রেম কুমার সেহগাল জওহরলাল কে হয়ত কিছুটা বিদ্রূপ করেই বলেছিলেন: “দেখুন, পন্ডিতজি, কংগ্রেস যেহেতু হিংসায় বিশ্বাস করে না, এই ধরণের জিনিসগুলিতে আপনার যদি কোনরকম বিব্রতবোধ থেকে থাকে …, এবং জওহরলাল নেহেরু জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তাঁর এসব নেই।”
বিচারের সময় জওহরলাল নেহেরু নির্বাচনী–প্রচারে তাঁর ব্যস্ততা সত্ত্বেও প্রথম ফটো-অপের দিন (৫ নভেম্বর ১৯৪৫)এবং পরে নভেম্বরে মাসের শেষের দিকে, সময় করে, প্রতিরক্ষা আইনজীবীর সাথে বসতে আর একবার অর্ধেক দিনের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন। তবে তিনি আই-এন-এর তিন সেনাপতির পক্ষে কোন সওয়াল করেন নি এবং সেই দিনটাই ছিল তাঁর ব্যারিস্টারের গাউন পরার শেষ দিন। কিন্তু আমাদের বড় বড় ঐতিহাসিকদের বই পড়ে মনে হয় জওহরলাল নেহেরু কত না যেন রেড ফোর্ট বিচারে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। [DONNING OF BARRISTER’S GOWN BY JAWAHARLAL NEHRU AFTER SO MANY YEARS!]
প্রতিরক্ষা কমিটির পক্ষে সামান্য যে কয়জন আন্তরিক ও নিবেদিত প্রাণ আইনজীবী ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন শ্রী ভুলাভাই দেশাই। এছাড়া ছিলেন শ্রী বদ্রী দাস এবং জাস্টিস অছরু রাম — যিনি ছিলেন লেঃ কঃ প্রেম সেহগালের পিতা। নিজের অসুস্থতা সত্ত্বেও, ডিফেন্স কাউন্সেল হিসাবে কেবলমাত্র শ্রী ভুলাভাই দেশাই-ই সমস্ত সওয়াল করেছিলেন।
নেতাজী ও আজাদ হিন্দ ফৌজের নাম ভাঙ্গিয়ে নির্বাচনে কংগ্রেসের সাফল্য অর্জন
দেশপ্রেমিক আইএনএ বন্দীদের মুক্তির দাবি ছিল নির্বাচনী প্রচারে কংগ্রেস পার্টির প্রধান হাতিয়ার বা অবলম্বন। কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনের ফলাফল ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঘোষণা করা হয়েছিল। সর্বমোট ১০২ টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে কংগ্রেস ৫৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল; মুসলিম লীগ পেয়েছিল ৩০টি; স্বতন্ত্ররা ৫ টি, আকালি শিখ ২টি এবং ইউরোপীয়রা ৮টি আসন। কংগ্রেস অ-মুসলিম নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত ভোটের ৯১.৩ শতাংশ এবং মুসলিম লীগ মহামেডান বা মুসলিম নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটের ৮৬.৬ শতাংশ পেয়েছিল। এতে প্রমাণ হয়েছিল যে ‘মহাত্মা’ গান্ধী ভারতবর্ষে তাঁর ৩০ বছরের (১৯১৫ থেকে ১৯৪৫) রাজনৈতিক জীবনে মুসলিমদের মন জয় করতে অসমর্থ হয়েছেন। তাঁর সময়ে দেশে প্রায়ই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আগের মতই চলছিল। গান্ধীজি ১৯১৫ সালে ভারতে আসার পর ৩০ বছর চেষ্টা করেও দাঙ্গা বন্ধ করতে পারেন নি। বরঞ্চ, খিলাফত আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্য এই দাঙ্গা পক্ষান্তরে প্রশ্রয় পেয়েছে। স্বল্পমেয়াদী সুবিধা লাভের আশায় খিলাফত আন্দোলনকে প্রশ্রয় দিয়ে গান্ধীজি যে ভুল করেছেন তার খেসারত ভারতবাসীকে আজও দিতে হচ্ছে। অথচ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু পরিচালিত আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যে সাম্প্রদায়িক সৌহৃদ্য গড়ে উঠেছিল, তা ছিল তুলনাবিহীন।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর নির্বাচনী ফলাফলে একই রকম প্রবণতা বা ধারা পরিলক্ষিত হয়েছিল। [পাদটীকা ৪]
ভাইসরয় ২৮ জানুয়ারি, ১৯৪৬ তারিখে ঘোষণা করেন যে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে একটি নতুন কার্যনির্বাহী পরিষদ প্রতিষ্ঠা করবেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি সংবিধান প্রণয়নকারী সংস্থা গঠন করবেন।
হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দমনে ‘মহাত্মা’ মোহনদাস গান্ধীর ব্যর্থতা এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করতে ‘নেতাজী’ সুভাষচন্দ্র বসুর সফলতা
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পাকাপাকি ভাবে ১৯১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। তিনি আসার আগেও ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হত। কিন্তু ‘মহাত্মা’ গান্ধী ১৯১৫ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০ বছরে শত-চেষ্টা সত্ত্বেও ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা বন্ধ বা প্রশমিত করতে অসমর্থ হয়েছেন। বরঞ্চ, খিলাফত আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্য এই দাঙ্গা পক্ষান্তরে প্রশ্রয় পেয়েছে। স্বল্পমেয়াদী সুবিধা লাভের আশায় খিলাফত আন্দোলনকে প্রশ্রয় দিয়ে গান্ধীজি যে ভুল করেছেন তার খেসারত, আমি মনে করি, ভারতবাসীকে আজও দিতে হচ্ছে।
অন্য দিকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু পরিচালিত আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যে সাম্প্রদায়িক সৌহৃদ্য গড়ে উঠেছিল, তা ছিল তুলনাবিহীন। আমরা দেখেছি যে ১৯৪৫-১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বেশীর ভাগ মুসলমান ‘মহাত্মা’ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর পরিবর্তে মহম্মদ আলি জিন্নার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অধীনে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে আজাদ-হিন্দ-বাহিনীর মুসলমান সেনানীদের মধ্যে কোন দ্বিধা ছিল না। আজাদ-হিন্দ বাহিনীতে মুসলমান সম্প্রদায়ের সৈন্য সংখ্যায় বেশী ছিল। মুসলমান সম্প্রদায় নেতাজীর উপর ভরসা করতে পেরেছেন কিন্তু ‘মহাত্মা’জীর উপর তারা আস্থা রাখতে পারেন নি। এটা বলা যেতে পারে যে ‘মহাত্মা’ গান্ধী ভারতবর্ষে তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মন জয় করতে বা আস্থা অর্জন করতে অসমর্থ হয়েছেন।
এছাড়া ব্রিটিশ-মালয়ের সমস্ত ভারতীয়-বংশোদ্ভূত উচ্চনীচ জাতির হিন্দু-মুসলমান-শিখ সম্প্রদায়ের চুক্তিবদ্ধ-মজুরদের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ-হিন্দ-ফৌজে সমান মর্যাদায় গ্রহণ করে তাঁদের হৃত-সম্মান পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সেই প্রবাসী-ভারতীয়রা নেতাজীকে আজও ঈশ্বরজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন।
পাদটীকা
[১] এই সম্মেলনে মিঃ জিন্নাহ জানিয়ে দেন যে ভাইসরয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদে কংগ্রেসের তরফ থেকে কোন মুসলিম সদস্যের নিয়োগে তারা সম্মত হবেন না। সেই পরিষদে মুসলিম সদস্য কেবলমাত্র মুসলিম লীগের তরফ থেকেই হতে হবে। একইভাবে শ্রী শিবরাজ, যিনি সেই সম্মেলনে তফসিলি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন, তিনিও তফসিলি জাতির প্রতিনিধি মনোনীত করার জন্য কংগ্রেসের তফসিল সদস্যের মনোনয়নে আপত্তি জানান। এছাড়া শ্রী শিবরাজ আরও শর্ত আরোপ করেন যে তফসিলি জাতির সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত সদস্য সংখ্যা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে – মুসলিম সদস্যদের অনুপাতের মত হতে হবে। এইভাবে সিমলা সম্মেলন ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন অংশের মধ্যে আরও বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছিল।
তাই সিমলা সম্মেলন ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির বিভিন্ন অংশকে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং অপরের প্রতি তাদের শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রদর্শনের সুযোগ করে দিয়েছিল।
[২] সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে এই সম্মেলন কংগ্রেসের এতদিনের এই ধারণাকে ভুল প্রতিপন্ন করে দিয়েছিল যে কংগ্রেস একটি ‘বহু-জাতিগত’ সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল, যা মুসলিম, তফসিলি জাতি ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের ভারতীয়দের সমস্ত অংশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। মি.জিন্নাহ এই ধারণার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন এবং অন্যান্য নানা কারণের চেয়ে কংগ্রেসের এই ধারণার কারণেই ভিন্ন দেশ হিসাবে পাকিস্তান গঠনের চিন্তাধারার উদ্ভব বলেও অনেকেই মনে করে থাকেন।
এই সম্মেলনকে সে কারণে কংগ্রেস দলের জন্য পরাজয়-স্বরূপ বলা যেতে পারে। পক্ষান্তরে, এই সম্মেলনকে মিঃ জিন্নাহর জন্য বড় সাফল্য মনে করা হয়।
[৩] ১৯৪৫ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর থেকে ২৩শে সেপ্টেম্বরে বোম্বে শহরে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এ-আই-সি-সির) সভার শেষ দিনে (২৩শে সেপ্টেম্বর), জওহরলাল নেহেরু আইএনএ সম্পর্কে একটি রেজোলিউশন পেশ করেন। তাতে অন্যান্য কথার সাথে বলা হয়েছিল: “এআইসিসি অবশ্য দৃঢ়ভাবে এই মত পোষণ করে যে অন্যান্য অতিরিক্ত সুদূরপ্রসারী ফলাফলের কারণে এবং যুদ্ধের সমাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে, যদি এইসব পুরুষ এবং মহিলা অফিসারদের – যদিও তারা ভুলবশত ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রয়াস করার অপরাধ করেছে — তৎসত্ত্বেও যদি তাদের কোনরকম শাস্তি দেওয়া হয় তবে তা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হবে। এরপর তিনি ঘোষণা করেন যে কংগ্রেস স্যার তেজ বাহাদুর সাপ্রু, মিঃ ভুলাভাই দেশাই, ডঃ কে.এন. কাটজু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, শ্রী রঘুনন্দন শরণ, রায় বাহাদুর বদ্রী দাস এবং শ্রী আসফ আলী (আহ্বায়ক) কে নিয়ে সাত সদস্যের একটি প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করছে।
[৪] শীঘ্রই প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আসামে, কংগ্রেস ১০৮টি আসনের মধ্যে 58টি আসন জিতেছে এবং সরকার গঠন করেছে। সিন্ধু প্রদেশে মুসলিম লীগ ২৭টি আসন এবং কংগ্রেস ২১টি আসনে জয়লাভ করে। নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে কংগ্রেস ৩০টি আসন লাভ করে যেখানে মুসলিম লীগ পায় মাত্র ১৭টি আসন। কংগ্রেস সরকার গঠন করেছে। পাঞ্জাবে, মুসলিম লীগ পেয়েছে ৭৫টি, কংগ্রেস ৫১টি, আকালি শিখরা ২২টি, ইউনিয়নবাদীরা ২০টি এবং স্বতন্ত্ররা ৭টি। বাংলায়, ২৫০টির মধ্যে, মুসলিম লীগ ১১৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ১১৩টি এবং কংগ্রেস পেয়েছে ৮৭টি। বোম্বে, মাদ্রাজে। , ইউপি, বিহার, ওড়িশা, এবং সিপি কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। যাইহোক, এই ছয়টি প্রদেশে, মুসলিম আসনের বিষয়ে মুসলিম লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। বোম্বে, মাদ্রাজ ও উড়িষ্যায় সমস্ত মুসলিম আসন মুসলিম লীগের দখলে। কিন্তু ইউ.পি., বিহার এবং সিপি-তে, মুসলিম লীগ ৬৬, ৪০ এবং ১৪ নম্বর মোট মুসলিম আসনের মধ্যে যথাক্রমে ৫৪, ৩৪ এবং ১৩টি আসন পেয়েছে। প্রদেশগুলির নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিত করেছে যে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগই কেবলমাত্র দুটি দল যারা, সাধারণভাবে বলতে গেলে, নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স এবং সিন্ধু প্রদেশ ছাড়া, যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। [ক্রমশ]
উৎপল আইচ, ডিসেম্বর ১, ২০২৩, কলকাতা।