গান্ধীজী এবং তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের সুভাষ-বিরোধী হবার নেপথ্য কাহিনী
১৯২৮ সালে কলকাতা-কংগ্রেস শুরুর আগের দিন গান্ধীজীর অনুরোধে প্রকাশ্য-বিরোধ এড়িয়ে চলার উদ্দেশে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ‘নেহেরু রিপোর্ট’-এ সাক্ষর করলেও তাঁর সমর্থক বামপন্থী সাধারণ কর্মীদের ঘোরতর বিরোধিতার ফলে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সুভাষচন্দ্র পরের দিন মুক্ত অধিবেশনে গান্ধীজীর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবীতে তাঁর পেশ করা সংশোধনী প্রস্তাব এই বলে শেষ করেছিলেন, “নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রীতি, প্রশংসা এবং ভক্তি এক জিনিস, আর নীতির প্রতি শ্রদ্ধা অন্য জিনিস।” সেই সংশোধনী প্রস্তাব অবশ্য ১৩৫০ — ৯৭৩ ভোটে পরাস্ত হয়েছিল। ‘মহাত্মা’জী সেদিন খুব সম্ভব একজন প্রায় আধ-বয়সীর জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত হয়েছিলেন এবং মত পরিবর্তন করার জন্য সুভাষচন্দ্রের উপর ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। [৭] এছাড়া পরে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছিল যার কারণে গান্ধীজির ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেগুলো কয়েকটা পরে জানাচ্ছি।
সুভাষচন্দ্রের প্রতি গান্ধীজীর উষ্মার এবং বিকৃত রুচির বহিঃর্প্রকাশ
সুভাষচন্দ্রের প্রতি গান্ধীজীর উষ্মা প্রত্যক্ষ করা যায় তাঁর অনুগামী শ্রীসতীশচন্দ্র দাশগুপ্তকে ২৪ আগস্ট ১৯২৯ তারিখে লেখা এক পত্রে। সেই চিঠিতে ‘মহাত্মা’জী লিখেছিলেন, ‘সুভাষচন্দ্র (আমার) কটিবস্ত্র কখনো মার্জনা করবে না। আমাদের তাকে সহ্য করতে হবে।’ [৮] যারাই সুভাষচন্দ্র সম্বন্ধে এবং তাঁর লেখা পড়েছেন, তারা একবাক্যে স্বীকার করবেন যে গান্ধীজীর এই বিষোদগার ছিল সম্পূর্ণ অমূলক এবং তাঁর বিকৃত রুচির বহিঃর্প্রকাশ। সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর বেশভূষার উপর কখনো কোন ঘৃণ্য মন্তব্য করেন নি। তাঁর বক্তব্যে কটিবস্ত্র বা loin-cloth-এর কথা এসেছে কিন্তু কখনও কোন কুরুচিকর অর্থে নয়। শ্রীসতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত পত্রে যাই অভিযোগ করে থাকুন না কেন, একজন তথাকথিত ‘মহাত্মা’র এরকম প্রতিক্রিয়া অনভিপ্রেত এবং দুর্জ্ঞেয়। ৬০ বছরের গান্ধীজীর প্রায় অর্ধেক-বয়সী (সুভাষচন্দ্রের বয়স তখন ৩২ বছর ৭ মাস) এক অদম্য স্বাধীনতাকাঙ্খী দেশপ্রেমিক সম্বন্ধে এরকম কুৎসা-রটনা কিরকম রুচিশীলতার পরিচয় দেয় সেই পর্যালোচনায় না গিয়ে এইসব কুৎসার কি ফলশ্রুতি হয়েছিল তার একটা উদাহরণ আমরা এখানে আলোচনা করব।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুভাষচন্দ্র বঙ্গ-রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেছিলেন। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর বঙ্গ-প্রদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়ে গান্ধীজী শ্রীযতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তকে বাঙলায় কংগ্রেসের (বি-পি-সি-সি) সর্বেসর্বা করে দিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালের নভেম্বরে প্রদেশ-কংগ্রেসের নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের উপদলকে বি-পি-সি-সি থেকে বহিষ্কার করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়ে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়। এসব ঝঞ্ঝাটের সময় লাহোর-কংগ্রেসে যাবার পথে ২৪ ডিসেম্বর ১৯২৯-এ লেখা একটা চিঠি থেকে সুভাষচন্দ্রের তখনকার মনোভাব জানতে পারা যায়। গুরুপত্নী ‘মা’ শ্রীযুক্তা বাসন্তীদেবীকে লিখেছিলেন, “বার বার আমায় পরাভূত করিবার জন্য শত্রুপক্ষেরা দল বাঁধিয়াছে — প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছে। অদৃশ্য শক্তির বলে আমিও বার বার তাদের ব্যর্থ করিতে পারিয়াছি। শেষ পর্যন্ত কি হইবে তাহা অবশ্য বলিতে পারি না।” [৯]
গান্ধীজীর এই চক্রান্তের মর্মান্তিক পরিণাম
কৃষ্ণদাস নামে গান্ধীজীর এক বিশ্বস্ত অনুগামী ১৯৩১ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারিতে এক পত্রে গান্ধীজীকে বঙ্গীয়-প্রদেশ-কংগ্রেস সম্পর্কে অন্য কথার সাথে এও জানিয়েছিলেন যে বাংলার বিপ্লবীদের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের গোপন সংস্রব রয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে চিঠিটা গোয়েন্দা-পুলিশের হস্তগত হয় এবং পরিণতিস্বরূপ সুভাষচন্দ্রকে বিনা বিচারে কারাভোগ করতে হয়। সুভাষচন্দ্র যে বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং কিছু বিপ্লবীর সঙ্গে যে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে তা পুলিশের জানা থাকলেও এব্যাপারে তাদের কাছে কোন আইনত গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ছিল না। কাজেই বিনা বিচারে সুভাষচন্দ্রকে বন্দী করে রাখতে এই চিঠিটা ইংরেজ সরকারের খুব কাজে এসেছিল।
কৃষ্ণদাসের চিঠির কথা জানাজানি হয় ১৯৩৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন সিমলায় কেন্দ্রীয় আইনসভা পরিষদে সরকারের তরফে সুভাষচন্দ্রের বিনা বিচারে কারাদণ্ডের পক্ষে এই চিঠির বেশ কিছু অংশ পাঠ করা হয়। কৃষ্ণদাস বিবেকদংশনে দগ্ধ হয়ে সংবাদ-মাধ্যমকে যে বিবৃতি দেন তাতে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে গান্ধীগোষ্ঠীর সেসময়কার মনোভাব জানা যায়। বিবৃতিতে কৃষ্ণদাস বলেছিলেন যে সুভাষচন্দ্রের সাথে যুগান্তর দলের বিপ্লবীদের সহযোগিতার কথা যা তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন তা ছিল গুজব বা জনশ্রুতি-ভিত্তিক মাত্র। ‘গান্ধীবাদী আমরা শ্রীসুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই পক্ষপাতদুষ্ট ছিলাম, কারণ হল কলকাতা ও লাহোর এই দুই কংগ্রেসে তাঁর গান্ধীজীর বিরোধিতা করা আর গান্ধী-নীতির খোলাখুলি সমালোচনা করার জন্য। … কিছু মানুষ প্রায়ই ফিস্-ফিস্ করে আমাদের কানেকানে বলে বেড়াত যে সুভাষচন্দ্রের মূল বিরোধ কংগ্রেসি অহিংসানীতিকে কেন্দ্র করে যা আমরা অনেকেই বিশ্বাস করেছিলাম।’ [১০]
জানা যায় যে এই কৃষ্ণদাস বাবাজী শিক্ষাব্রতী শ্রী সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের শিষ্য ছিলেন এবং তাঁর পূর্ব জীবনের নাম ছিল দেবেন্দ্রকুমার সিংহরায়।
আশ্চর্যজনকভাবে কৃষ্ণদাসের সেই চিঠির সম্বন্ধে গান্ধীজীর কোন মন্তব্য কোন বইতে খুঁজে পাইনা।
সুভাষের বিরুদ্ধে অযাচিতভাবে গান্ধীজির নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক চুকলি
গান্ধীজি ভাইসরয় আরউইন-এর কাছে সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে আড়ালে কিছু নিন্দা বা অভিযোগ করেছিলেন, যাকে আমরা কথ্য ভাষায় ‘চুকলি করা’ বলি। তার উপর তখন সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন কারাগারে। গান্ধীজি তাঁর স্বভাব অনুযায়ী ভাইসরয় আরউইন-এর সাথে আপস করার জন্য এক নাগারে ১৮ দিন আলাপ আলোচনায় বসেছিলেন। প্রতিদিন তিনি আলাপ শেষে তাঁর ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের এব্যাপারে ব্রিফিং দিতেন অর্থাৎ সেদিন তাঁদের কী আলোচনা হল তা সবাইকে জানাতেন।
গান্ধী-আরউইন চুক্তি বা দিল্লি চুক্তি ১৯৩১ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে, গান্ধী লর্ড আরউইন এর সাথে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া একাধিক বৈঠক এবং দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা করেছিলেন এবং গান্ধী ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের সম্পূর্ণরূপে অবহিত করেছিলেন। আলোচনা অনুষ্ঠিত ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩১-এ আলোচনা চলাকালীন, মহাদেব দেশাইয়ের রেকর্ডকৃত কার্যবিবরণী অনুসারে, লর্ড আরউইন গান্ধীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে সুভাষ বোস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন কিনা।
গান্ধীজি নেতিবাচক উত্তর দিয়েছিলেন। কিন্তু, তারপরেই আশ্চর্যজনকভাবে, এমন কিছু কথা অযাচিতভাবে যোগ করেছিলেন যা কোন তথাকথিত ‘মহাত্মা’র কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত ছিল। এইভাবে সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রতি তাঁর বিরোধিতার সহজাত প্রবৃত্তির প্রকাশ করে ফেলেছিলেন গান্ধীজি। তিনি তাঁর সত্যিকারের স্বরূপটা দেখিয়ে ফেলেছিলেন সেদিন। তিনি ভাইসরয়কে সুভাষ চন্দ্র বসু সম্পর্কে কোনো প্ররোচনা ছাড়াই বলেছিলেন, “সে (সুভাষ) আমার প্রতিপক্ষ এবং আমার নিন্দা করবে”। ঠিক কী বলেছিলেন আমাদের ‘মহাত্মা’জি, তা বরঞ্চ পাঠক ইংরেজীতেই পড়ে দেখবেন। সেই পাতা দু’টো সংলগ্ন করা হল। [১১]
আমার জানা মতে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি গান্ধীর বিদ্বেষের কারণগুলি ছিল নিম্নরূপ: (১) সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসের কলকাতা কংগ্রেসের সময়, মোহনদাস গান্ধীর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নেহেরু রিপোর্টে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। সেই সংশোধনী প্রস্তাব ১৩৫০–৯৭৩ ভোটে খারিজ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু ৫৯ বছর বয়সী গান্ধী এবং মতিলাল সহ অন্যান্য সমস্ত বয়োজ্যেষ্ঠ গান্ধীপন্থীদের বিরুদ্ধে ৩১ বছরের এক যুবকের ৯৭৩ টি ভোট কেড়ে নেবার ব্যাপারটা গান্ধীজিকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। গান্ধীজি আনুগত্য পছন্দ করতেন, এই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী দেখে তাঁর আশংকা হয়েছিল। (২) সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর সহকর্মী বিপ্লবী যতীন দাসের ৬৩ দিন অনশনের পর তাঁর আত্মাহুতির জন্য একটি শোক বার্তা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে গান্ধীজিকে একাধিক টেলিগ্রাম করেছিলেন। গান্ধীজি এতে খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন এবং এই আবেদনের কোন জবাব দেননি। তাছাড়া (৩) সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে লাহোর কংগ্রেসে পূর্ণ স্বরাজ অর্জনের প্রস্তাব অনুমোদিত হবার পর একটি সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। গান্ধীজি এতে খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন। যাই হোক, একজন ২৭ বছরের বেশী কনিষ্ঠ সহকর্মীর প্রতি তথাকথিত ‘মহাত্মা’-এর এই ধরনের আচরণ আমাদের মত কিছু মানুষের কাছে ব্যাখ্যাতীত এবং খুবই কষ্টদায়ক।
আমি এখানে একটা বিষয় সম্বন্ধে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেদিন ওয়ার্কিং কমিটির সকল সদস্যকে গান্ধী ভাইসরয়ের সাথে তাঁর কী আলোচনা হয়েছিল এবং সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে তিনি ভাইসরয়কে কী মন্তব্য করেছিলেন তা বিস্তারিত অবহিত করেছিলেন। এতে গান্ধীজির সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধাচরণে অন্যদের প্ররোচনা বা অন্তত মৃদু উৎসাহ দেওয়াও হয়েছিল নিশ্চয়ই। [ক্রমশ]