শ্রী কে-এম মুন্সীকে ব্যবহার করে ইংরেজদের চক্রান্ত
১৯৩৭-১৯৪০ সালে শ্রী কে-এম মুন্সী ছিলেন বোম্বে প্রেসিডেন্সীর গৃহমন্ত্রী। তাঁর সাথে সর্দার প্যাটেল আর গান্ধীজীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা ইংরেজরা জানতো এবং এটা তারা নানাভাবে ব্যাবহার করতো। সুভাষচন্দ্রের ব্রিটিশ-বিরোধী আপসহীন মনোভাব এবং জনপ্রিয়তাতে সন্ত্রস্ত ব্রিটিশ সরকার যেনতেন প্রকারে চেষ্টা করতো যাতে তিনি রাজনীতিতে অংশ না নিতে পারেন। সেজন্য ইংরেজরা গান্ধীজী আর সুভাষচন্দ্রের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইত। ব্রিটিশ গুপ্তচর-বিভাগ ১৯৩৮ সালে শ্রীমুন্সীকে এমন কিছু গোপনীয় নথি দেখিয়েছিল যাতে মনে হতে পারে যে সুভাষচন্দ্র কলিকাতাস্থিত জার্মান কন্সালের সাথে দেখা করে এই বোঝাপড়ায় এসেছেন যে যুদ্ধ বাধলে জার্মানরা তাঁর সাহায্য লাভ করবে। ধূর্ত ইংরেজদের অভিপ্রায়মত মুন্সীজী খবরটা গান্ধীজীকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই খবরটা গান্ধীজীকে সুভাষচন্দ্রের বিরোধিতায় কতটা ইন্ধন যুগিয়েছিল তা জানা সম্ভব না হলেও পরে জার্মানদের নথি থেকে এই খবরের অসত্যতা প্রমাণিত হয়েছিল। [১২]
ত্রিপুরীতে গান্ধীগোষ্ঠীর চক্রান্ত
গান্ধীজী ত্রিপুরী-কংগ্রেসে আসেন নি। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর প্রার্থীকে সুভাষচন্দ্র হারিয়ে দিয়েছিলেন। তাই তিনি আসতে চান নি। তিনি যে ত্রিপুরী-কংগ্রেসে আসতে চান না একথা জওহরলাল নেহেরুকে এক চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন। গান্ধীজির কাছে তাই তখন রাজকোটের রাজার সঙ্গে প্রজাদের বিবাদের সমস্যা বড় হয়ে উঠেছিল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা থেকে তখন গান্ধীজী-সহ গান্ধীবাদীদের কাছে আত্মশ্লাঘা বড় বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। ত্রিপুরী অধিবেশনের শুরুতেই বিষয়-নির্বাচনী কমিটিতে গান্ধীবাদীদের পক্ষে গোবিন্দবল্লভ পন্থ প্রস্তাব রেখেছিলেন যে গান্ধীজীর প্রদর্শিত পথেই কংগ্রেসকে চলতে হবে, একমাত্র গান্ধীজীই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন। নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গান্ধীজীর পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়েই গঠন করতে হবে। অনেক বাদানুবাদ আর বিতর্কের পর পন্থ-প্রস্তাব গৃহীত হয়। কংগ্রেসের সাধারণ অধিবেশনেও পন্থ-প্রস্তাব বিপুল ভোটাধিক্যে অনুমোদিত হয়েছিল। প্রধানত জওহরলাল নেহেরুর সৌজন্যে বহু বামপন্থীরা নিরপেক্ষ থেকেছিলেন সেদিন। ষড়যন্ত্রকারীরা গান্ধীজীর ইশারায় অগণতান্ত্রিক উপায়ে অসুস্থ সুভাষচন্দ্রকে নিষ্ক্রিয় করার চক্রান্ত করেন। ইংরেজরা গান্ধীজীর সাথে সুভাষচন্দ্রের বিরোধ চাইতো। তৎসত্ত্বেও বড়লাট লিনলিথগো ৭ মার্চ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, “গান্ধীজী ত্রিপুরীতে যান আর নাই যান, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তিনি সুভাষচন্দ্রকে কনুই-এর ধাক্কা দিয়ে কোণঠাসা করেছেন এবং নিজেকে মঞ্চের আলোর সামনে নিয়ে এসেছেন”। [১৩]
ত্রিপুরী-কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রের ভাষণ
ত্রিপুরীতে পৌঁছানোর পর জব্বলপুরের সাহেব সিভিল সার্জেন সুভাষচন্দ্রকে অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র কিছুতেই রাজী হলেন না। তবে তিনি প্রকাশ্য অধিবেশনের দিনও মঞ্চে যেতে পারলেন না। তাঁর হয়ে রাষ্ট্রপতির ইংরেজি ভাষণটা পড়লেন শ্রীশরৎচন্দ্র বসু। সেই ভাষণে সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে চরমপত্র দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে বেশীদিন গণ আইন-অমান্য আন্দোলন মোকাবিলা করার অবস্থায় ব্রিটিশ সরকার আর নেই। একমাস আগে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের জলপাইগুড়ি অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র প্রস্তাব পাস করিয়ে নিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে ছয় মাসের মধ্যে স্বরাজের দাবী জানিয়ে চরমপত্র দেওয়া হোক আর সন্তোষজনক উত্তর না আসলে সমস্ত দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হোক।
কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগ
ত্রিপুরী থেকে ফেরার পথে ডাক্তারদের পরামর্শে ১৪ই মার্চ ১৯৩৯ সুভাষচন্দ্রকে ধানবাদ স্টেশনে নামিয়ে নিরাময় আর বিশ্রামের জন্য ৯ মাইল দূরে জামাডোবায় (পোস্ট অফিস জিয়ালগোরা, তদানীন্তন জেলা মানভূম) তাঁর আরেক দাদা শ্রীসুধীরচন্দ্র বসুর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি পাঁচ সপ্তাহ ছিলেন। জামাডোবা থেকে সুভাষচন্দ্র অনেকটা সুস্থ হয়ে ২১ই এপ্রিল ১৯৩৯ তারিখে কলকাতা ফিরে গিয়েছিলেন।
জামাডোবাতে থাকাকালীন কংগ্রেসের এই পন্থ-চুক্তির নতুন নির্দেশ অনুযায়ী সুভাষচন্দ্র ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের বিষয়ে গান্ধীজীর সাথে পত্রবিনিময় শুরু করেছিলেন। কিন্তু গান্ধীজী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেন না। দক্ষিণপন্থীদের এই বিরোধিতার এবং চক্রান্তের ফলে শেষপর্যন্ত সভাপতির পদ থেকে ২৯ এপ্রিল ১৯৩৯ সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেদিন কলকাতার অধিবেশনের ভেতরে ও বাইরে প্রবল জনবিক্ষোভ দেখা দিলে সুভাষচন্দ্র জনতাকে সংযত করে ভিনপ্রদেশী নেতাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছিলেন। ৠষি-কবি রবীন্দ্রনাথ তারবার্তায় সুভাষচন্দ্রের প্রশংসা করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “…তুমি যে ধৈর্য ও মর্যাদাবোধের পরিচয় দিয়েছ তাতে তোমার নেতৃত্বের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য বাংলাকে এখনও সম্পূর্ণ ধীরতা ও ভদ্রতাবোধ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে; তা হলেই আপাতদৃষ্টিতে যা তোমার পরাজয় বলে মনে হচ্ছে তাই চিরন্তন জয়ে পরিণত হবে।” [১৪]
সুভাষচন্দ্রকে সেসময় কবিগুরু ‘দেশনায়ক’ রূপে বরণ করেন।
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক মাইকেল এড্ওয়ার্ডস সংক্ষেপে সুভাষচন্দ্রের এই পদত্যাগ সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘গান্ধী এখন তাঁর অসহযোগের কৌশল ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ না করে কংগ্রেসের নিজস্ব রাষ্ট্রপতির বিপক্ষে প্রয়োগ করলেন। বোসকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করলেন।’ [১৫]
সুভাষচন্দ্র আর গান্ধীজীর এই হিংসা বনাম অহিংসার দ্বন্দ্ব
নৈতিকতার ধ্বজাধারী মহাত্মা গান্ধী একদিকে অহিংসা-নীতি প্রচার করেছেন কিন্তু মনের নিভৃতে এক বয়োকনিষ্ঠ সন্তানপ্রতিম দেশপ্রেমিক নেতার প্রতি হিংসা আর ক্রোধ পোষণ করে গেছেন। আর অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র দেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষে বলেছেন, এমন কি শেষে অস্ত্র হাতে ইংরেজের বিরুদ্ধে আজাদ-হিন্দ-বাহিনীর হয়ে লড়াই করেছেন, কিন্তু কোন দেশবাসীর প্রতি কক্ষনো কণামাত্র হিংসা বা বিদ্বেষ পোষণ করেননি। তাই মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে এঁদের মধ্যে কে প্রকৃত অহিংস ছিলেন? এটাই বোধহয় ছিল নিয়তিরও পরিহাস। কেন তা আমরা পরে দেখবো।
গান্ধীজির আরও একটা সুভাষ-বিরোধী কার্যকলাপের নমুনা
এবার পাঠকদের জ্ঞাতার্থে গান্ধীজির আরও একটা সুভাষ-বিরোধী কার্যকলাপের নমুনা পেশ করতে চাই। স্বাভাবিক কারণবশত এরকম অনেক ঘটনা গান্ধীজির ‘কালেক্টেড ওয়ার্কসে’ স্থান পায় নি। আর আমাদের সুভাষচন্দ্র বসুও এসব কথা খুব একটা লিখে যাননি।
মহম্মদ ইউনুস তাঁর বইতে লিখেছেন যে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে গান্ধীজি যখন বাদশা খান এবং লেখকের সঙ্গে, একটি শুধু তাঁদের জন্য সংরক্ষিত তৃতীয় শ্রেণীর বগিতে চেপে কলকাতা থেকে ট্রেনে করে ফিরছিলেন, তখন শ্রীরামপুর স্টেশন ছাড়িয়ে বেরোবার সময় কেউ একজন বাইরে থেকে গান্ধীজির দিকে একটি চপ্পল ছুড়ে মেরেছিল। এই ঘটনায় ‘মহাত্মা’ গান্ধী সাংঘাতিক ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং অবিলম্বে সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্দেশ্যে একটি সংক্ষিপ্ত নোট (চিরকুট বা চিঠি) ডিকটেট করেছিলেন এবং সেটা স্লিপারটা ঢোকানো একটা পার্সেলের সাথে সংযুক্ত করে পরবর্তী স্টেশন থেকে সুভাষচন্দ্র বসুর ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠিয়ে ছিলেন। সেই চিঠিতে গান্ধীজি লিখেছিলেন যে স্লিপারটি যেন সেটার মালিককে ফেরত দেওয়া হয়, কারণ সেটি ছাড়া তিনি অসুবিধায় পড়বেন।
মহম্মদ ইউনুস এই পর্বটি এই লিখে শেষ করেছেন: ‘তখন গান্ধীজীর আচরণে মহাত্মাবাদের কোনও ছোঁয়া ছিল না।’ [১৬]
স্বভাবতই, আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন জাগে। গান্ধীজি কীভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন যে প্রতিবাদকারী চপ্পলটা নিক্ষেপ করেছিল, সে সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থক? কে চপ্পল ছুঁড়েছে তা সুভাষচন্দ্র বসু জানবেন কীভাবে? কেন আমরা সুভাষচন্দ্র বসুর লেখা বা বক্তৃতায় এই পর্বের কোন উল্লেখ পাই না, বিশেষ করে যখন গান্ধীজির সাথে তাঁর মতপার্থক্য তখন চরমে ছিল? এত তুচ্ছ বিষয়ে একজন তথাকথিত মহাত্মা কেনই বা এত ক্ষিপ্ত হবেন? এসব কথা নেহেরুপন্থী ঐতিহাসিকরা কখনও লেখেন না। [ক্রমশ]