গান্ধীজির প্রতি সুভাষ চন্দ্র বসুর ব্যবহার, সুভাষচন্দ্র বসুর গান্ধী-প্রশস্তি এবং গান্ধী-সমালোচনা
আমরা গত পর্বে দেখেছি গান্ধীজি কীভাবে ভেতরে ভেতরে সুভাষচন্দ্র বসুর বিরোধিতা করেছেন এবং এসব কারণে সুভাষ চন্দ্রের কী কী এবং কত ক্ষতি হয়েছিল, ইত্যাদি। এই পর্বে আমরা দেখতে চেষ্টা করবো গান্ধীজির সুভাষ-বিরোধিতা সম্বন্ধে সুভাষচন্দ্রের নিজের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, এসব সত্ত্বেও গান্ধীজির প্রতি সুভাষ চন্দ্রের ব্যবহার কিরকম ছিল, গান্ধীজিকে সুভাষ চন্দ্র বসু কী চোখে দেখতেন, গান্ধীজি সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র কী লিখেছেন বা বলেছেন, ইত্যাদি। তার আগে কিছু প্রাককথনের প্রয়োজন রয়েছে। এর কিছু কিছু পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে; কিন্তু এই বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করা খুব জরুরী।
সুভাষচন্দ্রের চোখে ব্রিটিশ সরকার
সুভাষ চন্দ্র বসু বার্লিন থেকে আজাদ হিন্দ রেডিওর মাধ্যমে ২০শে এপ্রিল ১৯৪২ তারিখে বলেছিলেন: “এই বিস্তীর্ণ বিশ্বে ভারতবর্ষের শুধু একটিমাত্র শত্রু রয়েছে, যে শত্রু আমাদের দেশমাতৃকাকে শতাধিক বছর ধরে শোষণ করে আসছে, এমন শত্রু যে ভারত-মাতার প্রাণশক্তি নিংড়ে খাচ্ছে — আর সেটা হোল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ।”[১]
সুভাষচন্দ্রের কাছে নেতা থেকে দেশ বড়
প্রথমেই আরেকবার বলে নেওয়া প্রয়োজন যে দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচন বা দেশের স্বাধীনতা-অর্জনই সুভাষচন্দ্রের বসুর জীবনের একমাত্র এবং কেবলমাত্র লক্ষ্য ছিল। এই একটা ব্যাপারে তিনি কারও সাথে কোন আপস করতে রাজী ছিলেন না। গান্ধীজীর অনেক কথার সাথেই তাঁর বেশকিছু ভক্ত একমত ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা গান্ধীজীর অনুগ্রহ হারানোর আশঙ্কায় তাঁদের নিজস্ব মতামত গান্ধীজীকে জানাতেন না। অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র বসু দেশকে নেতার থেকে বহু গুণ বেশী ভালবাসতেন বলে গান্ধীজীর সমস্ত ভুলের বিরোধিতা করতে কখনও কুণ্ঠিত বোধ করেন নি। বহুবার তিনি গান্ধীজীর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। আবার, দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের জন্য তিনি নিজের মর্যাদাহানি করেও গান্ধীজির কাছে ছুটে গিয়ে বারবার কাকুতি-মিনতি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করতেন না। তাঁর অহংবোধ একাজে কোন বাধা সৃষ্টি করেনি। আশ্চর্যের বিষয় এই যে গান্ধীজী স্বীকার না করলেও বেশ কয়েকবার তিনি সুভাষচন্দ্রের পরামর্শের যুক্তিযুক্ততা বেশ কিছু বছর দেরীতে বুঝেছেন। এসব ব্যাপারে তাঁর অহংবোধ খুবই বেশী ছিল, তাই তিনি নিজে একথা স্বীকার করে যান নি। তবে তাঁর অনুগতদের কেউ কেউ গান্ধীজি যে সুভাষচন্দ্র বসুর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, একথা স্বীকার করেছেন। [২]
গান্ধীজি সহ অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সুভাষচন্দ্র বসুর মনোভাব
সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, বহু বিষয়ে দক্ষ এবং একজন ব্যতিক্রমী কৌশলবিদ মানুষ। উপরন্তু, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সদাচারী, শিষ্টাচারী এবং পবিত্র মানুষ। তদুপরি তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত ভদ্রলোক। তিনি তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আবার তিনি শৌর্যশালীও ছিলেন। যখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য — ব্রিটিশ অধীনতা থেকে তাঁর মাতৃভূমিকে মুক্ত করার বিষয়ে কোন গুরুজনের সামান্যতম ভুল বুঝতে পারতেন, তখন তিনি চুপ করে থাকতেন না। বিনয় এবং দৃঢ়তার সাথে যিনি ভুল করেছেন, তাঁর সামনে গিয়ে তাঁর ভুলের প্রতিবাদ করতেন।
যদি এটাকে ত্রুটি বলা যায় তবে সুভাষ চন্দ্র বসুর একমাত্র ত্রুটি ছিল এই যে তিনি ছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস নেতাদের ভেতর সর্বকনিষ্ঠ দের একজন — বয়সে মোহনদাস গান্ধীর থেকে ২৭ বছরেরও বেশী ছোট এবং জওহরলাল নেহরু থেকে ৭ বছরেরও বেশী বয়োকনিষ্ঠ। তবে এ ব্যাপারটা অবশ্যই তাঁর নিয়ন্ত্রণের অধীনে ছিল না। আমাদের দেশে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষেরা আবেগের সাথে বিশ্বাস করে থাকেন যে তাঁরা বয়োকনিষ্ঠদের চাইতে অধিকতর জ্ঞানী। এই দোষে বেশীরভাগ ভারতবাসী আজও নিমজ্জিত। তাই আমরা তথাকথিত ‘মহাত্মা’ গান্ধীর ভুলগুলো স্বীকার করতে এখনও ইতস্তত বোধ করে থাকি।
তাই সুভাষচন্দ্র বসু প্রবীণদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হওয়া সত্ত্বেও যখনই তাঁর প্রিয় ভারতমাতার মুক্তির প্রশ্ন এসেছে, তখনই তাঁর মাতৃভূমির নিঃশর্ত মুক্তির জন্য সক্রিয় আন্দোলনের দাবি থেকে তিনি কখনও একটুকুও পিছপা হননি। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, “নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা, প্রশংসা এবং সম্মান প্রদর্শন এক জিনিস; কিন্তু নীতির প্রতি শ্রদ্ধা অন্য জিনিস।”
অনেক লেখক নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে একজন অতি রহস্যময় এবং অত্যন্ত জটিল চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বাহ্যিক আচরণ থেকে তাঁর ভেতরের চিন্তাভাবনা বুঝে উঠা সহজ ছিল না। কৈশোর থেকে অনেক তথাকথিত শুভাকাঙ্খী ‘বন্ধুদের’ প্রতারণামূলক আচরণের জন্য সুভাষচন্দ্র খুব কম বয়সেই বুঝে উঠতে পেরেছিলেন যে সবার সাথে সব গোপনীয় কথা ভাগ করে নেওয়া উচিত নয়। তিনি ব্যবহারিক জীবনের এসব পাঠ খুব দ্রুত শিখে নিয়েছিলেন এবং তারপর অত্যন্ত সতর্ক ও সংযমী হয়ে দেশের কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। তথাকথিত ‘মহান’ প্রবীণ কংগ্রেসি নেতা সহ অনেকেই তাঁকে সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেননি এবং সর্বদা তাঁর অবমূল্যায়ন করেছেন। অনেকে আবার তাঁকে দাম্ভিক বলেও মনে করেছেন।
“যোগঃ কর্মসু কৌশলম্” — ভগবত গীতার শ্লোকের থেকে সুভাষচন্দ্রের শিক্ষাগ্রহণ
আগেও বলা হয়েছে যে সুভাষচন্দ্র বসু গীতার একটা শ্লোকের শেষ অংশ আক্ষরিক বা স্থূল অর্থে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি একাধিকবার গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫০ নং শ্লোকের অন্তিম অংশ : “যোগঃ কর্মসু কৌশলম্” এর উল্লেখ করেছেন তাঁর বক্তৃতায় এবং লেখায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সফলতার সাথে কাজ করতে হলে কৌশলের আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এর উদাহরণ স্বরূপ ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে জলপাইগুড়িতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। তিনি সেদিন বলেছিলেন: “নিজের শক্তিতে ভর করিয়া, নিজের পায়ের উপর দাঁড়াইয়া, নিজের সাধনার বলে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করিব। কিন্তু তার মধ্যে কৌশলেরও প্রয়োজন আছে। কোন সময় লড়িব, কখন আগাইব, কোন পথে চলিব — এই সকল বিচার সেনাপতি না করিয়া পারেন না। গীতায় বলিয়াছে — “যোগঃ কর্মসু কৌশলম্” — কাজ করিতে হইলে কৌশলের প্রয়োজন।” আমরা দেখতে পাই যে কংগ্রেস পার্টিতে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের সাথে তিনি বার বার এই কৌশলই অবলম্বন করেছেন। [প্রতিলিপি সংলগ্ন করা হোল] [ক্রমশ]