কেন বাঙালিদের একটা অংশ, বিশেষত তথাকথিত বাঙালি ‘বুদ্ধিজীবীদের’ বড় অংশ, এবং বহু সংখ্যক ভারতীয় সুভাষ চন্দ্র বসুর চাইতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে তুলনামূলক-ভাবে বেশি পছন্দ করেন
ভূমিকা
উপরোক্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তরটা খুবই জটিল ও বহুমুখী। আসল কারণগুলো বিবিধ এবং সেগুলো বুঝতে হলে আমাদের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের গভীরে যেতে হবে এবং স্বাধীনতাপূর্ব কাল থেকে ভারতের ও ভারতবাসীর সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও রাজনীতি, ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছুটা অধ্যয়ন করতে হবে। তাছাড়া মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও সুভাষচন্দ্র বসু — এই দুজন সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে হবে। এনাদের দুজনের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত, ইত্যাদিও বিশদভাবে জানতে এবং বুঝতে হবে।
এসব সমস্ত ব্যাপার বিশদে লিখতে হলে লেখাটা বিশাল বড় হয়ে যাবে যা পড়ার ধৈর্য বহু পাঠকের নেই। তাই, লেখাটাকে আমি একাধিক পর্বে লিখবো। প্রথম পর্বে আমি পটভূমির সামান্য কিছু তথ্য সংক্ষেপে পাঠককে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করব যা, আমার মতে, পরে পাঠকদের শিরোনামের বিষয়টা বুঝতে কিছুটা অন্তত সাহায্য করবে।
আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক বিচার ও তার ফলশ্রুতি
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দেরে আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে নেতাজীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের পরে ভারতে প্রথমে গুজব ছড়ায় যে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রায় ২০ হাজার সৈনিককে দিল্লির লাল কেল্লায় বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং এদের মধ্যে ছয়জনকে ইতিমধ্যেই বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হবার পর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় খবরের কাগজগুলোর উপর থেকে যুদ্ধকালীন কঠোর সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ায় নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের গৌরবজনক পরাক্রম ও শৌর্যের কথা ভারতবর্ষের জাতীয় পত্রিকাগুলোতেই সবিস্তারে প্রকাশিত হতে শুরু হয়। এসব খবর প্রচারিত হবার সময় সাধারণ ছাপোষা ভারতবাসী প্রথমবারের মত ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের কথা, ভারত ভূখণ্ডে তাঁদের প্রবেশের কথা, কোহিমা ও ইম্ফল যুদ্ধে তাদের বড় রকম প্রাথমিক সাফল্যের কথা বিস্তারিত জানতে পারেন।
তারপর দিল্লির লাল কেল্লায় ৮ই অক্টোবর ১৯৪৫ থেকে আই-এন-এ বা আজাদ হিন্দ ফৌজের তিনজন সেনানায়কের ‘রেড-ফোর্ট ট্রায়াল’ বা সামরিক আদালত পরিচালিত ‘কোর্ট মার্শাল’ হবার ঘোষণাও খবরের কাগজ মারফত সমস্ত ভারতবাসীর জানা হয়ে যায়। পরে অবশ্য সেই ট্রায়াল বা সামরিক বিচার লাল কেল্লায় ৫ই নভেম্বর ১৯৪৫ তারিখে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের শেষ অবধি চলেছিল। কিন্তু বিচার শুরু হবার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সাধারণ ভারতবাসী সামরিক আইনের সূক্ষ্ম ব্যাপারসমূহ সম্পর্কে অবগত না হওয়া সত্ত্বেও এই তিনজন সেনাধ্যক্ষের বিচার নিয়ে প্রচন্ডভাবে আগ্রহান্বিত হয়ে পরেন কারণ ভারতবাসীর হৃদয়ে তখন নেতাজী ঈশ্বরের স্থান অধিগ্রহণ করে ফেলেছেন। দেশবাসী ততদিনে এঁদের এবং সমস্ত আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনানীদের নেতাজীর আদর্শের প্রতীকরূপে গ্রহণ করে নিয়েছেন। সে সময় সমস্ত ভারতবাসী এই তিনজনের মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠেন।
ক্লিমেন্ট অ্যাটলির নেতৃত্বে লেবার পার্টির ও ব্রিটিশ সরকারের ভারত সম্পর্কে উদ্বেগ
ব্রিটিশ সরকার ২৬শে জুলাই ১৯৪৫ পর্যন্ত চার্চিলের ‘ওয়ার ক্যাবিনেট’ এর অধীনে ছিল। ৫ই জুলাই ১৯৪৫-এ ব্রিটেনে জাতীয় নির্বাচন সঙ্ঘটিত হয়; কিন্তু কিছু কেন্দ্রে ভোট গ্রহণে বিলম্বের কারণে ফলাফল ২৬শে জুলাই ১৯৪৫ তারিখে ঘোষিত হয়। ফলাফল প্রকাশ হলে দেখা যায় যে ক্লিমেন্ট অ্যাটলির নেতৃত্বে লেবার পার্টি প্রথম বারের মত সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে জয়লাভ করেছে।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম পর্যায়ে (বিশেষত ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় অংশে) নেতাজী পরিচালিত আজাদ হিন্দ বাহিনীর পরম বিক্রমের খবর জানাজানি হবার পর ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যেও ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবের সৃষ্টি হয়; ব্রিটিশ সরকার তখন বুঝতে পারে যে এবার তাদের মানে মানে বিদায় নেবার সময় এসে গেছে। অন্যথায় তাদের ভারতীয়রা মেরে তাড়াবে। তাই ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানমন্ত্রী লর্ড অ্যাটলির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল যে ভারতে জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা যে কোন সময় একটি পূর্ণ রক্তাক্ত বিদ্রোহ শুরু হতে পারে, যেমন ভাইসরয় ওয়াভেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যেটিকে দমন করার জন্য ব্রিটিশদের তেমন কোন উপায় ছিল না। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বিদ্রোহের কারণে ব্রিটিশ সরকার যে কোন সময় পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। সেরকম কিছু হলে এবং ব্রিটিশদের হঠাৎ করে পালিয়ে যেতে হলে সেটা হবে সারা বিশ্বের চোখে ব্রিটেনের জন্য খুবই অসম্মানজনক ব্যাপার। ব্রিটিশ সরকার তাই খুব শীঘ্র ভারত ছাড়ার পরিকল্পনা করে ফেলে। [এব্যাপারে দু’টো অতি গোপনীয় ফাইল রয়েছে (যেগুলোর উপরে লেখা ছিল: ‘নট ফর ইন্ডিয়ান আইজ’ অর্থাৎ ভারতীয়দের দেখা নিষিদ্ধ), যার কথা নেহেরুপন্থী ঐতিহাসিকেরা কখনও উল্লেখ করেন না।] আত্মাভিমানী ব্রিটিশেরা সম্মানীয় পলায়ন বা নির্গমনের পরিকল্পনা করতে গিয়ে প্রথমেই অনুগত গান্ধীবাদী ভারতীয়দের সহায়তা লাভে সমর্থ হয়।
সিমলা সম্মেলন
এর মধ্যে অবশ্য ব্রিটিশ-ভারতের ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল লন্ডনে তৎকালীন সেক্রেটারি অফ স্টেটের সাথে পরামর্শ করে ৪ঠা জুন, ১৯৪৫, তারিখে দিল্লি ফিরে এসেছিলেন। পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক ভারতীয়দের উষ্মা প্রশমিত করার অভিপ্রায়ে ১৪ই জুন ১৯৪৫ তারিখে ভাইসরয় ঘোষণা করেন যে ২৫শে জুন সিমলায় তিনি একটি রাজনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করছেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের সেজন্যই ১৫ই জুন ১৯৪৫ তারিখে মুক্তি দেওয়া হয়। সম্মেলনটি 25 জুন সিমলার ভাইসরিগাল লজে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে ২১ জন আমন্ত্রিত ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন। আমন্ত্রিতদের মধ্যে কংগ্রেস পার্টির নেতা এবং কেন্দ্রীয় পরিষদে মুসলিম লীগের উপনেতা, কাউন্সিল অফ স্টেটের কংগ্রেস পার্টি ও মুসলিম লীগের নেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; এছাড়া বিধানসভায় ইউরোপীয় গোষ্ঠীর নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এদের অতিরিক্ত, মিঃ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং মিঃ মহম্মদ আলি জিন্নাহ, দুই প্রধান দলের এই দুই স্বীকৃত নেতা, এবং রাও বাহাদুর এন. শিবরাজ এবং মাস্টার তারা সিং, যথাক্রমে তফসিলি জাতি ও শিখদের প্রতিনিধিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মিঃ গান্ধী সিমলা গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেন নি।
সিমলা সম্মেলনের ফলশ্রুতি
কার্যনির্বাহী পরিষদ (বা একজিকিউটিভ কাউন্সিল) গঠন নিয়ে সিমলা সম্মেলনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। [পাদটীকা ১] এই সম্মেলনকে গান্ধীজী বা কংগ্রেস দলের পরাজয় এবং মহম্মদ আলি জিন্নার সাফল্য বলেও অনেকে মনে করে থাকেন। [পাদটীকা ২]
সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা
নতুন ‘লেবার পার্টি’ বা দলের সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রথম পদক্ষেপটি ছিল ভারতে একটি সাধারণ নির্বাচন করা। এই সাধারণ নির্বাচন বিশ্বযুদ্ধের কারণে বহুবছর মুলতুবী ছিল। কেন্দ্রীয় পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে এবং প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর জন্য ১৯৩৬ সালে। ২১শে আগস্ট, ১৯৪৫-এ ঘোষণা করা হয়েছিল যে আসন্ন শীতের মাসগুলিতে বিভিন্ন আইনসভার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। লর্ড ওয়াভেল ২৪শে আগস্ট আবারও লন্ডনে যান। তিনি ‘মহামহিম’ ব্রিটিশ সরকারের সাথে পরামর্শ করে ১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫, তারিখে দিল্লিতে ফিরে আসেন। তিনি ১৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫, তারিখে ঘোষণা করেন যে, আসন্ন শীতের মরশুমে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এরপর একটি সংবিধান প্রণয়নকারী গণপরিষদ গঠিত হবে। তদুপরি, প্রাদেশিক নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর, একটি কার্যকরী পরিষদ গঠনের পদক্ষেপও নেওয়া হবে যাতে প্রধান ভারতীয় দলগুলির সমর্থন থাকবে।
কংগ্রেস পার্টীর উভয়-সঙ্কটাবস্থা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪২ সালের ৮ই আগস্ট গান্ধীজীর ‘ভারত-ছাড়ো আন্দোলন’ ঘোষণার সাথে সাথেই আগস্ট মাসের ৯ তারিখে খুব ভোরে গান্ধীসহ কংগ্রেসের সমস্ত ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য-নেতাদের ‘বিশেষ কারাগারে’ অন্তরীণ করা হয়েছিল। গান্ধীজীকে রাখা হয়েছিল পুনের আগা খাঁ প্যালেসে আর জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, আচার্য নরেন্দ্র দেব, আসফ আলি প্রমুখ ১২ জনকে রাখা হয়েছিল পুনের ৭২ মাইল উত্তরপূর্বে স্থিত আহমাদনগর ফোর্টে। অসুস্থতার কারণে মোহনদাস ওরফে মহাত্মা গান্ধীকে ১৯৪৪ সালের ৬ই মে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কংগ্রেসের অন্যান্য ১২ জন গান্ধীবাদী নেতাকে অক্ষ শক্তির অন্যতম দেশ ‘জার্মানি’ আত্মসমর্পণ করার পর (ইটালি প্রায় বছর দুই আগেই আত্মসমর্পণ করেছিল), মিত্রশক্তির জয় যখন নিশ্চিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার ঠিক দু’মাস আগে – ১৫ই জুন ১৯৪৫ তারিখে মুক্তি দেওয়া হয়।
এছাড়া কংগ্রেস দলকেও ১৯৪২ সালেই নিষিদ্ধ বা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কংগ্রেসের এই নেতারা দু’বছর দশমাসের বেশী সময় ‘কারাগারে’ অন্তরীণ থাকার জন্য জনতার কাছ থেকে ততদিনে বেশ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। দলের কিছু নেতা এবং অনেক কংগ্রেস কর্মী তখনও কারাগারে থাকায় দলের সংগঠন বেশ ভেঙে পড়েছিল। তাছাড়া সরকার দলীয় তহবিলও বন্ধ করে দিয়েছিল। কাজেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা কংগ্রেসের জন্য বেশ কিছুটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। [ক্রমশ]
১ ডিসেম্বর ২০২৩, কলকাতা।