মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এবং চার্লস ফিয়ার্স এন্ড্রুজ-এর বন্ধুত্ব ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া ঔপনিবেশিক পরিসরে আধুনিকতার নানা দিক নিয়ে এই তিন জন নানা সময় নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করেছেন। অসংখ্য পত্র বিনিময়ও জারি থেকেছে। একটা কথা ঐতিহাসিকরা এই বিপুল পত্র-রাজি মন্থন করে বলছেন, এই তিন জনই এ বিষয়ে স্পষ্ট যে ধর্মবিশ্বাস এবং রাজনীতির যথেষ্ট দূরত্ব থাকা অত্যন্ত জরুরি। অথচ তিন জনেই নিজের নিজের মতো করে ধর্মের কথা ভেবেছেন। এন্ড্রুজ ছিলেন ধ্রুপদী ভাষা ও সাহিত্যের, অর্থাৎ ল্যাটিন ও গ্রিকের সুপণ্ডিত। পড়াশোনা করেছেন কেমব্রিজে। এর পর ১৯০৪ সালে তিনি ভারতে আসেন, Cambridge Brotherhood Mission-এর প্রচারক হিসেবে। দিল্লির St. Stephen’s College-এ অধ্যাপনাও করেন। এন্ড্রুজ ইংরেজির মতোই সংস্কৃত ও বাংলা শিক্ষা করেন। ভারতীয় সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদি বোঝার জন্য।
ইংরেজিতে যাকে বলে মিশনারি জিল (missionary zeal), তাই নিয়েই এন্ড্রুজ কাজ করতেন। কিন্তু বাদ সাধলেন রবীন্দ্রনাথ। লন্ডনের হ্যাম্পস্টেডে ১৯১২ সালের ৩০ জুন, বিখ্যাত ব্রিটিশ চিত্রকর তথা ভাস্কর উইলিয়াম রোদেনস্টাইনের বাড়িতে কবিতা পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। গীতাঞ্জলির ইংরেজি ভাবানুবাদ পড়েছিলেন কবি। উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস। এই কবিতাপাঠের সন্ধ্যা এন্ড্রুজ-এর জীবন বদলে দিলো।
গান্ধীজিকে লেখা এক চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন, কাকে ধর্ম বলে, কাকে বলে মুক্তি, আর মানুষের হাতে নির্মিত শিল্পকলাই বা কাকে বলে, সবই কেমন ওলোটপালোট হয়ে গেলো। আরও পরে এন্ড্রুজ লিখলেন- শান্তিনিকেতনে কবির পায়ের কাছে বসে আমি জীবনের মর্মকথা শুনলাম।
ইতিমধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি এন্ড্রুজের বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে গেছে। নিজের মিশনারি কার্যকলাপ সম্পর্কেও হাজারো প্রশ্ন জেগেছে তাঁর মনে। চার্চের সংস্কার বিষয়ে তিনি সওয়াল শুরু করেছেন। এর পরেই এন্ড্রুজ লিখবেন সেই বিধ্বংসী প্রবন্ধ ‘Race Within the Church’। গান্ধিজিকে লিখেছিলেন, হ্যাম্পস্টেডের সেই সন্ধ্যায় তিনি মুক্ত আকাশের নীচে এসে দাঁড়ালেন। এন্ড্রুজের আবেগ তাঁকে এতো দূর চালিত করবে যে তিনি কবিকেই তাঁর জীবনের আরাধ্য দেবতা বলে অবিহিত করে এক দীর্ঘ কবিতা লিখবেন। এন্ড্রুজের এই উচ্ছ্বাস মহাত্মা গান্ধীকে উৎসাহী করে তুলেছিল কবি সম্পর্কে। এর পর তো ১৯১৩ সালে কবির নোবেল পুরষ্কারলাভ প্রভৃতি ঘটনা।

অন্য দিকে ১৯০৬ সালের ভারতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন এন্ড্রুজ। গোপালকৃষ্ণ গোখলে তখন তাঁকে বলেন, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, তাঁকে সাহায্য করা বিশেষ প্রয়োজন। এর কয়েক বছর পর, ১৯১৩ সালে গোখলে দিল্লিতে সমাবেশের আয়োজন করলেন। উদ্দেশ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীজির সত্যাগ্রহের প্রতি ভারতীয় জনসাধারণের সমর্থনজ্ঞাপন। এর আগের বছর এন্ড্রুজ কলকাতায় বিশপ লেফ্রয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁকে তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীজি ভীষণ লড়াই করছেন। তাঁর আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে চার্চ অর্থসাহায্য করুক। এন্ড্রুজের বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে বিশপ লেফ্রয় চার্চের তহবিল থেকে বড়ো অঙ্কের টাকা দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এর পর এন্ড্রুজ পৌঁছে যান সে সময়ের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে। হার্ডিঞ্জকে তিনি বোঝান, দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতকে বলা হয়, কুলিদের দেশ। সেখানে ‘ভারতীয়’— এই কথার প্রতিশব্দ হলো ‘কুলি’। ১৯১৩ সালের ২৪ নভেম্বর, তৎকালীন মাদ্রাজে লর্ড হার্ডিঞ্জ বলেন, সারা পৃথিবী বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী সংগ্রাম দেখছে। এটা অমানবিক। দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবিকতার দাবিতে সত্যাগ্রহীরা আইনঅমান্য করছে। তাদের প্রতি দমনপীড়নমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে গভীর বেদনার।
ইতিমধ্যে গান্ধীজি চাইছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী জেনারেল সুমটের সঙ্গে দেখা করতে। গোখলে এই বিষয়টি এন্ড্রুজকে জানান। এন্ড্রুজ দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিষয়ে শান্তিনিকেতনে কবির কাছে অনুমতি চাইতে যান। কবি বলেন, উইলিয়াম পিয়ার্সনকে সঙ্গে নিতে। এন্ড্রুজের চিঠি থেকে জানা যায়, এর ঠিক পূর্বে ‘মৃত্যর্মা মৃতংগময়’ মন্ত্রে কবি তাঁকে উজ্জীবিত করেন। ১৯১৪ সালের ২ জানুয়ারি গান্ধীজি তারবার্তা পাঠান তাঁর ‘মেন্টর’ গোখলের কাছে। তাতে লেখেন এন্ড্রুজ এবং পিয়ার্সন নিরাপদেই ডারবান পৌঁছেছেন। তিনি নিজেই ডার্বান বন্দরে তাঁদের স্বাগত জানিয়েছেন। গান্ধীজি ৩ জানুয়ারি, আরএক চিঠিতে গোখলেকে জানান, ডার্বান বন্দরে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সেদিন উপস্থিত হয়েছিলেন। ভারতীয় ও উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে এন্ড্রুজ এবং পিয়ার্সন বলেন, তাঁদের ব্যক্তিসত্তাকে গুরুত্ব না দিতে। কারণ, তাঁরা যা বলছেন, সবই ‘কবির পদপ্রান্তে বসে শিক্ষা’ করেছেন। এন্ড্রুজ তো এতো দূর বলেন, কেমব্রিজ তাঁকে কিছুই শেখাতে পারেনি। তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন শান্তিনিকেতনে ‘নিবিড় বনচ্ছায়ে’ কবির পায়ের কাছে বসে। এর পর সাংবাদিকরা তাঁদের প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা কি খ্রিস্টান মিশনারি? এন্ড্রুজ উত্তর দেন, মিশনারি বটে, তবে ‘poet’s missionary’। তাঁরা তাঁদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যে গোটা বিশ্ববাসীকে জানাতে চান, যে শান্তিনিকেতন থেকে বিকল্প জীবনযাত্রার ধ্বনি আজ দিকে দিকে গুঞ্জরিত হচ্ছে। বিকল্প শিক্ষার পক্ষে কী অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন কবি। ইতিমধ্যে লর্ড হার্ডিঞ্জের তদন্ত কমিটি উপস্থিত হয় ডারবানে। কবির নোবেলপ্রাপ্তির সংবাদ বিস্মিত করেছিল ডারবানের মানুষকে। কুলিদের দেশের একজন কবি নোবেল পুরস্কারও পেতে পারেন! অন্য দিকে গান্ধীজির সঙ্গে এন্ড্রুজ-এর দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বের সূচনা হয়। খুব তাড়াতাড়ি এন্ড্রুজ হয়ে যান চার্লি এবং গান্ধীজি হন মোহন। গান্ধীজি এক চিঠিতে লেখেন- ‘I thank God from the bottom of my heart. It was love at first sight with both of us, and those things never change.’। ডার্বান থেকে বিপুলসংখ্যক চিঠি এন্ড্রুজ লেখেন কবিকে। তাঁর চিঠিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় দরিদ্র ভারতবাসীর অকল্পনীয় যন্ত্রণার কথা কবিকে জানান এন্ড্রুজ। অন্য দিকে গান্ধীজি তাঁর মেন্টর গোপালকৃষ্ণ গোখলেকে লেখেন, প্রিটোরিয়া শহরের সিটি সভাগৃহে এন্ড্রুজ বক্তৃতা দেন। কেমব্রিজ-শিক্ষিত এক খ্রিষ্টান মিশনারি নিজেকে কবির দূত বলে বর্ণনা করছেন। তাঁর বক্তব্য শুনতে এসেছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিখ্যাত সদস্য লর্ড গ্ল্যাডস্টোন। তাছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) জন মেরিম্যানও উপস্থিত ছিলেন। এসেছিলেন প্রিটোরিয়া শহরের মেয়রও। গান্ধীজি এন্ড্রুজ-এর সঙ্গে উপস্থিত সকলের পরিচয় করিয়ে দেন। প্রাক্তন এই খ্রিস্টান মিশনারি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, শান্তিনিকেতন হলো গোটা বিশ্ববাসীর তীর্থক্ষেত্র। যে জীবনযাত্রার কথা কবি প্রকাশ করছেন সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত নান্দনিকতার মাত্রায় উত্তীর্ণ হলে তবেই সেইসব মুহূর্তযাপনের সার্থকতা। এমন কথা বিশ্বের মানুষ আগে শোনেনি। যে শিক্ষাক্ষেত্র কবি গড়ে তুলবেন সেই শিক্ষাঙ্গনে মানুষের প্রধান কাজ হবে সুন্দরের অভ্যর্থনা। জন মেরিম্যান এই বক্তৃতার পর বলেন, উচ্চভারতীয় জীবন সম্পর্কে আজ গভীর শিক্ষালাভ করলাম। লর্ড গ্ল্যাডস্টোন বলেন, ভারত কুলিদের দেশ নয়, সৌন্দর্য এবং মহত্ত্বের জীবনযাত্রার প্রধান ক্ষেত্র। এর পর এন্ড্রুজ এবং গান্ধীজি জোহ্যানেসবার্গ, কিম্বার্লি, ম্যারিৎসবার্গ এবং ডারবান প্রভৃতি শহরে যান।
এন্ড্রুজ কবিকে চিঠিতে লিখলেন, ডারবানের নাতালে এক পরিবারের সঙ্গে আলাপ হলো। সেখানে মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা ছিল। সেই পরিবারের লোকেরা গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা একের পর এক কণ্ঠস্থ করে বলছেন। বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী মিছিলে প্ল্যাকার্ডে লেখা রয়েছে গীতাঞ্জলির উদ্ধৃতি। এ আমার আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। এখানে ছবি তুলতে বড্ড বেশি খরচ। তবুও চেষ্টা করছি কিছু ছবি পাঠাতে। এখানে মানুষের এই সংকট দেখে আমার বার বার আপনার কথা মনে পড়ছে। এঁরা যদি আপনার কথা শোনার সুযোগ পেতেন!
এর পরই কবি এক অসামান্য চিঠি লেখেন এন্ড্রুজকে, যেটি ডারবানের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে গান্ধীজির আন্দোলনে এবং কবির বিবিধ কার্যক্রমে এন্ড্রুজ অন্যতম প্রধান সহায় হয়ে উঠেছিলেন। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ পুলিশের নারকীয় তাণ্ডবের বিরুদ্ধে কবির তীব্র প্রতিবাদ-বার্তা দিকে দিকে প্রচার করেছেন এন্ড্রুজ। গান্ধীজি ১৯১৫ সালে দেশে ফিরে প্রথম দেখা করেন তাঁর মেন্টর গোপালকৃষ্ণ গোখলের সঙ্গে। গোখলে তাঁকে পরামর্শ দেন ভারত ভ্রমণের। গান্ধীজি গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সেখানে জগদানন্দ রায়, নেপালচন্দ্র মজুমদার, ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রী, বিধুশেখর ভট্টাচার্য শাস্ত্রী প্রমুখের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এন্ড্রুজ ক্রমশ হয়ে ওঠেন বৃহত্তর অর্থে একই সঙ্গে ভারতবন্ধু ও দীনবন্ধু। বিশ্বভারতীর জন্য অর্থসংগ্রহে গান্ধীজিকে বার বার উৎসাহিত করেছেন দীনবন্ধু এন্ড্রুজ। গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ এবং এন্ড্রুজের পরিবেশ-ভাবনা আজ গোটা বিশ্বে আলোচিত হচ্ছে। কবির সঙ্গে গান্ধীজির নানা বিষয়ে গভীর মতপার্থক্য হয়েছে। কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কখনও এতোটুকু শিথিল হয়নি। কবির তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েও গান্ধীজি বিশ্বভারতীর জন্যে অর্থসংগ্রহের কাজ করেছেন। আজকের এই অসহনশীলতার যুগে বিষয়টি ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। ১৯৪০ সালে এন্ড্রুজ প্রয়াত হলে গান্ধীজি বলেন, চার্লির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কোনও ইংরেজ ও ভারতীয়ের বন্ধুত্ব ছিল না। আমাদের মধ্যে বন্ধন ছিল প্রকৃতপক্ষে দুই বিশ্বজিজ্ঞাসুর নিবিড় বন্ধন এবং আমরা উভয়েই মানুষের কাজে সেবকের আদর্শে আত্মনিয়োগ করেছিলাম।এন্ড্রুজের প্রয়াণ বিশ্ববাসীর কাছে অপূরণীয় ক্ষতি। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ এই শোক সংবাদে প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। পরে রচনা করেন ‘দীনবন্ধু এন্ড্রুজ’ শীর্ষক বিখ্যাত লেখা।