ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত, দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে রাম লালার প্রাণ প্রতিষ্ঠা চলছে, দেশবাসী অপেক্ষায় আছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যদিও দ্বিতীয় কোনও রাষ্ট্রনেতাকে সেখানে দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি এমনকি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নেমন্তন্ন করেও শেষ মুহূর্তে তাঁদের কাউকেই অয্যোধ্যায় আসতে দেওয়া হয়নি। পাছে মিডিয়ার ফোকাস তাঁদের উপরেও গিয়ে পড়ে। তবে ষোলো জন বাছাই করা গদি মিডিয়ার সাংবাদিককে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে এক এবং অদ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য One Man Show এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রাখতে। অবশ্য ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মন্দির নির্মাণ এই প্রথম নয়। ১২ই নভেম্বর ১৯৪৭ সালের শুরুতে তৎকালীন দেশীয় করদ রাজ্য জুনাগড় অধিগ্রহণ করার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল সোমনাথ মন্দির পুনর্গঠন করার প্রস্তাব দেন মহাত্মার কাছে। গান্ধীজির পূর্ন সমর্থন ও আশীর্বাদ নিয়ে সোলাঙ্কি স্থাপত্য শৈলীতে সোমনাথ মন্দির পুনর্গঠন-এর কাজ শুরু হয়। ১৯৫১ সালের ১১ই মে সোমনাথ মন্দিরে বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের সর্বস্তরের নেতা, মন্ত্রী, আমলা, সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ মানুষ। সকলের সম্মিলিত সহমতে সোমনাথ মন্দির হয়ে ওঠে ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক। ভারতে ‘হনু-ম্যান’-এর দল যতই জহরলাল নেহরুকে হিন্দু বিরোধী প্রমান করার চেষ্টা করুক না কেন, শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি যে, নেহেরু প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, সোমনাথ মন্দির পুনঃনির্মাণ হল ভারতবর্ষে হিন্দু পুনর্জাগরণ এর প্রতীক। বাহাত্তর বছর পর আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এবারে প্রেক্ষাপট অযোধ্যা….
মঞ্চে তখন মোহন ভাগবত, সঙ্ঘ প্রধান তাঁর মূল্যবান বক্তব্য রাখছেন। আত্মসংযম, যা রামচন্দ্রের চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং সার্বিক অনুশাসন, যেটি রামরাজ্যের প্রতিটি প্রজার প্রাথমিক অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য, সেই প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরসঙ্ঘচালক হঠাৎ একটি উদ্ধৃতি করলেন… The world has enough for everyone’s need, but not enough for everyone’s greed…. সাভারকর নয়, হেডগেওয়ার নয় এমনকি গুরু গোলবলকরও নয়, একথা বলে গেছেন জাতির পিতা। সঙ্ঘ প্রধানের মুখে গান্ধীজির উদ্বৃতি!! দেশবাসী চমকে উঠলো। নাহ্, অঙ্ক মিলছে না। যেখানে রামমন্দিরের সমস্ত কৃতিত্ব, সমস্ত ফুটেজ নেওয়ার জন্য, পুরুষোত্তম রামচন্দ্র কে শিখণ্ডী করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে দেশের স্বঘোষিত প্রধান সেবক উপস্থিত সেখানে গান্ধী এলেন কিভাবে? তাও আবার তাঁকে নিয়ে এলেন সঙ্ঘ প্রধান। মুখে যতই মহাত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার চেষ্টা করুন না কেন, স্বয়ং সঙ্ঘ প্রধান মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে রামরাজ্যের প্রকৃত ব্যাখ্যা মহাত্মার চেয়ে ভালোকরে আর কেউ দিতে পারেননি, ভবিষ্যতেও পারবেন না। হাজার হোক তিনি সঙ্ঘ প্রধান। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার লোক তিনি নন। আবার সনাতনী ধ্রুব সত্যকেও তিনি জনসমক্ষে তুলে ধরতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
তাই তাঁর ধার্মিক এবং মানবিক আবেগের স্বাভাবিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সিন্থেসিস হিসাবে, রামলালার প্রাণ প্রতিষ্ঠার বিজয় মুহূর্তে, মহাত্মা গান্ধীকে সরাসরি টেনে নিয়ে এলেন অয্যোধ্যার রাজদরবারে। বেদান্তসার রামচন্দ্র একা ফিরলেন না, পরিবারের সাথে নিয়ে এলেন রক্ত মাংসে গড়া তাঁর শ্রেষ্ঠ ভক্তটি কে, যে সারা জীবনের জন্য সত্যব্রত অবলম্বন করেছে। রামলালা বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠাকারী বিড়াল তপস্বী নয়, রামচন্দ্র স্বীকৃতি দিলেন সেই মহামানবকে যিনি রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে নিজের প্রাণপাত করেছেন।
রাজঘোষক হিসাবে তার সূচনা দিলেন স্বয়ং সঙ্ঘ প্রধান, যিনি এই বিরাট কর্মযজ্ঞের প্রধান কান্ডারী। মহাত্মা আবারও জিতে গেলেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যে সত্যিই যুগপুরুষ, বিংশ শতাব্দীর একমাত্র ধর্মসংস্থাপক সেটা মোহন ভাগবতের সাক্ষ্যতে আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। স্বাধীন ভারতের আর্থ সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পোয়েটিক জাস্টিস এর ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল অযোধ্যার মাটি।
মহাত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে রামরাজ্য গঠন করা তো দূর অস্ত, কল্পনা করাও অসম্ভব। রামলালার প্রাণ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে মহাত্মা গান্ধীরও সন্তায়ন সম্পুর্ন হল। সত্যব্রত মর্য্যাদা পুরুষোত্তম তাঁর আগমনের সাথেই প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁর অমোঘ বাণী … বিংশ শতকে গান্ধীই একমাত্র সত্য, তিনিই পথ, তিনিই জীবন। মহাত্মাই ভারতবর্ষের অন্তরাত্মা, ভারত ভাগ্যবিধাতা ।।
অনুজ বিশ্বাস, কৃষ্ণনগর, নদীয়া।