ভারতীয় শিল্পে একটি স্বকীয় ধারা গড়ে তোলা চিত্রকর গণেশ পাইনের জন্মদিন আজ। শিল্পজগতে তিনি নিঃসন্দেহে এক বড়মাপের সাধক। জীবনের নানান গতিময়তা মেশানো তাঁর ছবি যেন সমস্ত চাওয়া পাওয়ার আবেগজড়িত মানুষের অনন্য জীবনচিত্র। তাইতো তিনি “পেইন্টার অফ ডার্কনেস” নামেও পরিচিত।
১৯৩৭ সালে শিল্পীর জন্ম উত্তর কলকাতার কবিরাজ রো-এর একটি কায়স্থ পরিবারে। পিতা কৃষ্ণদাস পাইন। একান্নবর্তী পরিবারে সাংস্কৃতিক বিচারধারাযর মধ্যে বড়ো হয়ে ওঠার প্রভাব শিল্পীর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো। বাড়িতে ঠাকুর্দার একটি বড়ো কাঁচের আলমারিতে সম্রাট বাহাদুর শাহ ও মমতাজ মহলের আইভরি পেইন্টিং ইত্যাদি দুষ্প্রাপ্য মুল্যবান শিল্পবস্তু সাজানো থাকতো। সেই সমস্ত শিল্পবস্তু মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখতেন তিনি। দেখার অভ্যাস সেখান থেকেই তৈরি হয় তার মধ্যে।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৩ সাল অবধি কবিরাজ রো-র বাড়ি ছেড়ে শ্যামবাজার অঞ্চলে থাকতে হয়। ছেলেবেলায় ঠাকুমার কাছ থেকে শোনা মহাকাব্য, লোককাহিনীর অসাধারণ সব গল্প শিল্পীর চেতন, অবচেতন মনের মধ্যে এক প্রভাব বিস্তার করেছিলো। তাই পরবর্তীকালে মনের এই অভ্যন্তরীণ জগৎ শৈশব তাঁর ছবির বিষয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন বারংবার।
ছোটবেলায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় যে অলঙ্করণ থাকতো, তা দেখে দেখে ছবি দেখার অভ্যাস গড়ে ওঠে। “মৌচাক” নামের একটি মাসিক পত্রিকায় বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির reproduction- টা প্রথম দেখেন। যা তাকে বোঝাতে শিখিয়েছিল অলঙ্করণ ও ছবির পার্থক্যটা ঠিক কোথায়।
পাইন পরিবারের গৃহদেবতা ছিলো লক্ষ্মী-নারায়ণ। ধর্মের পরিবেশের মধ্যে শিল্পীর বেড়ে ওঠা। তাই তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে ‘চৈতন্যভাবনা’, দেবী-দুর্গা, ইহলোক, পরলোক ও মগ্নচৈতন্য। মগ্নচৈতন্য (psyche) বলতে বোঝায় এমন এক মানসিক অবস্থা, যা সচেতন মন নয় কিন্তু মানুষের সভ্যতার যা কিছু স্মৃতি তা অবচেতন মনের গভীরে সঞ্চিত হয়ে থাকে। গণেশ পাইনের আঁকা “The magician” ছবির মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব সুস্পষ্ট।

১৯৫৫-১৯৫৯ সাল অবধি তিনি গভর্মেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। ভর্তি হবার সময় তাঁর ছবি আঁকার হাত দেখে শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল চিন্তামণি কর গণেশ পাইনকে ডবল প্রমোশন দেন। কলেজে যে প্রাথমিক ছবি আঁকার ব্যাকরণগত সূত্র সেখানো হতো, তা ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক ঘরানায়। আমাদের দেশের শিল্পকলার মুখ সাধারণত ইউরোপের আর্টের দিকে ঘোরানো। সেই হিসেবে শিল্পীর জীবনে এর প্রভাবও ছিলো বিস্তর। ইউরোপের মধ্যযুগের শিল্পী রেমব্র্যান্ট, পল ক্লি-র ছবির দর্শন তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিলো।
গভর্মেন্ট কলেজে পড়ার সময় মীরা দত্তের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেম হয়। দরিদ্রতার কারণে প্রায় ত্রিশ বছর পর প্রেমিকযুগল পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন। গণেশ পাইনের ছবির composition-এর মধ্যে থিয়েটারের প্রভাব দেখা যায়। থিয়েটারে যেমন একটি সরলরেখায় দেখার (eye level ) ওপর কলাকুশলী ও অভিনেতাদের অভিনয়টা চলতে থাকে, তাঁর ছবির composition এও সেই ব্যাপারটা আছে।
পঞ্চতন্ত্রের চরিত্রগুলি অহংকারী সিংহ, ধূর্ত শিয়ালের চরিত্রকে নিখুঁতভাবে ফ্রেমবন্দী করেছেন। আলো, ছায়া, ক্যারেক্টার, দিগন্ত প্রসারিত দৃশ্যাবলীতে অসাধারন পর্যবেক্ষণ আর ভাঙচুরের খেলায় সৃষ্টি করেছেন এক অভিনবত্বের। জীবনের প্রথম দিকে পয়সার অভাবে কালি-কলমে ছবি আঁকেন। এরপর জলরঙ, গাউচে, টেম্পারা ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি ছবি এঁকেছেন। দ্বিমাত্রিক ছবি আঁকতে অনন্য ছিলেন গণেশ পাইন।

১৯৭০-র দশকের রাগ ও হতাশার ফলে শিল্পী হিসাবে তিনি ফুটিয়ে তোলেন ‘বিফর দ্যা চেরিওট’ এবং ‘দ্যা অ্যাসাসিন’ মতন কাজগুলিতে। ১২ মার্চ ২০১৩ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শিল্পী। ২০১১ সালে গণেশ পাইনকে কেরল সরকার কর্তৃক “রাজা রবি বর্মা পুরস্কার” এবং ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্সের জীবনকালের পুরস্কার (Lifetime achievement Award) প্রদান করা হয়। প্যারিস, লন্ডন. জার্মানি, সিঙ্গাপুর, ওয়াশিংটন-সহ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয়েছে।
অনন্য শিল্পীর আড়ালে তিনি ছিলেন নিখাদ এক সহজ, আত্মভোলা, মিষ্টভাষী, আলাপচারী মানুষ। ভারতীয় চিত্রকলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার শিল্পীকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।
তথ্যঋণ : চিত্রশিল্পী দেবরূপ গঙ্গোপাধ্যায় ও গণেশ পাইনের এক সাক্ষাৎকার এবং উইকিপিডিয়া।
শিল্পী বেঁচে থাকেন তার সৃষ্টির মধ্যে তার সৃষ্টির
দর্শন মাত্র তিনি জীবিত হন,আলোকিত করেন
চেতনা জগত।”শ্রী গণেশ পাইন” তেমনই স্রষ্টা যার শিল্প কর্মের ঝলক ম্যাডাম রিঙ্কি*র প্রতি-
বেদনে স্পষ্ট প্রতীয়মান।ভালোলাগা ভালোবাসা*
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।