ভাদ্রপদ মাসের শুক্ল পক্ষের চতুর্থী তিথিতে সুখ-সমৃদ্ধির দেবতা বিঘ্নহর্তা গণেশের জন্ম উপলক্ষ্যে গণেশ চতুর্থী পালিত হয়। আজ থেকে দেশজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে বিনায়ক-দিবস। শাস্ত্র মতে গনেশ পূজা করলে ব্যবসায় সমৃদ্ধি আসে, গ্রহপীড়ার মধ্যে পড়তে হয় না, কর্মের বিঘ্ননাশ হয়।
তবে পুজো মানেই এখন বলিউডের একাধিক গান, নাচ, ডিজে নিয়ে সেলিব্রেশন। কিন্ত আসলে প্রত্যেক উৎসবের আয়োজনে নিহিত থাকে মানুষের কল্যাণ। ঘটনাগুলি পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে চিত্রিত হল যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে দেখলে তার যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যাবে। আসুন আজকে ভাবি একটু অন্যভাবে।
ভারতীয় সাহিত্য কলার প্রথম প্রসবিত হয়েছিল যে দক্ষ স্টেনোগ্রাফারের লেখনীর আঁচরে — তিনি হলেন গণপতি।
মহাভারতের যুদ্ধের পর মহামতি ব্যাসদেব সমস্ত ঘটনা একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করতে মনস্থ করলেন। কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি লিখবেন কিভাবে? চিন্তিত হয়ে ব্রহ্মার কাছে গেলেন। প্রজাপতি ব্রহ্মা তাকে গণেশের শরণাপন্ন হতে বললেন। গণেশ রাজি হলেন, তবে একটি শর্তে। শর্তটি হল, তিনি লিখতে শুরু করলে লেখার বিরতি দেবেন না। ব্যাসদেব শুনে রাজি হলেন। তবে তিনিও শর্ত দিয়ে বললেন যে আচ্ছা তাই হবে, তবে আমার শর্ত রইল যেকোনো শব্দ বা বাক্যের অর্থ ভালোভাবে না বুঝে শ্লোক লিপিবদ্ধ করা চলবে না। গণেশ শর্ত মেনে নিলেন। এরপর দুই বিদ্বানের মধ্যে শুরু হলো কাব্য রচনার খেলা!!
ব্যাসদেব মুখে মুখে জটিল শ্লোক বলতে লাগলেন আর মহাপন্ডিত গণেশ মুহূর্তেই অর্থ অনুধাবন করে এবং ছন্দ ঠিক করে শ্লোক লিখতে লাগলেন। কিন্ত লেখার মাঝখানে গনেশের কলমটি ভেঙে যায়। নতুন কলমের জন্য অপেক্ষা না করে গনেশ নিজের একটি দাঁত ভেঙে ফেলে সেটিকে কলমের মতো ব্যবহার করে লিখতে শুরু করেন। সৃষ্টি হয় এক মহাকাব্য।
গণেশের এই দাঁত ভাঙার ঘটনা, তাঁর নিঃস্বার্থ হয়ে অনুগতদের প্রতি ত্যাগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ফুটে ওঠে। সেই থেকেই তাঁর নাম হয় একদন্ত। “একদন্ত” বোঝায়, জীবনে প্রবলেম এলে ‘দি এন্ড’ না হত্তয়া পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে। তাই আজও জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ, পণ্ডিত এবং প্রতিভাধর কবি তথা লিপিকার মহাতপস্বী গণেশের আরাধনা করা হয়।
একটা জিনিস ভাবলে অবাক লাগে, গনেশ গজমুন্ডধারী এবং স্থূলকায়। অথচ তার বাহন একটি ক্ষুদ্র ইঁদুর। এটা হল কি করে? আমরা জানি, পৃথিবীমাতা তাঁকে ইঁদুরটা দিয়েছিলেন। আসলে ইঁদুর বা মূষিক হলো সমাজের পতিত বা দলিত শ্রেণীর প্রতিনিধি। গণেশ তাকে বাহন করে শোষিত অবহেলিত ও খেটে খাওয়া মানুষকে সম্মান দিয়েছিলেন। তিনি যেমন একদিকে গজদন্ত ধারণ করে উচ্চ জাতিদের বরণ করেছেন তেমনি মূষিক বাহন করে উপেক্ষিত সম্প্রদায়কে কাছে টেনে নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এই দুই জাতির সমন্বয় হলে, দেশ ও জাতির কল্যাণ হতে পারে। এই মহান জীবন দর্শনের পথ দেখিয়েছিলেন গণেশজী। তাইতো মহারাষ্ট্রে গণপতি উৎসব ব্যাপ্তি লাভ করেছে বলে অনেকেই মতপ্রকাশ করেন। এছাড়া গণেশের বাহন মূষিক জীবের কর্মফল কর্তন করে সিদ্ধির পথ উন্মুক্ত করে দেন।
এছাড়াও পোকামাকড় কৃষকদের ফসল খেয়ে নষ্ট করে দেয়। মর্ত্যে চাষীদের এই কষ্ট দেখে গণেশ তার বাহন ইঁদুরকে শস্য খাওয়া পোকাদের ধ্বংস করাতে পাঠিয়ে দেন। ফলে জীবনের দুর্গতি বাধাবিঘ্ন দূর হয়ে যায়, তাই তাকে বলা হয় বিঘ্নহর্তা।
অনেকেই বলেন দুষ্টের দমনে পারদর্শী এই দেবতা বিশ্বের যে কোনওস্থানে ইঁদুরকে সঙ্গে করে সংহারকর্তা রূপে পৌঁছে যেতে পারেন। গণেশজী আমাদের শিক্ষা দেন, ক্ষুদ্র জীবকে কখনো অবহেলা করা উচিৎ নয়।
গণেশজী নাগযজ্ঞ উপবীত ধারণ করেছেন। গণেশের নাগযজ্ঞ উপবীত হলো জীবশক্তি কুন্ডলিনীর প্রতীক। কুণ্ডলিনী শক্তিকে ভুজাঙ্গাকারা বলা হয়। তিনি সর্পের মতো কুণ্ডলী পাঠিয়ে মূলাধারে নিদ্রিত থাকেন। এই উপবীতের মধ্যে দিয়ে গণেশ জীবাত্মার ঊর্ধ্বগতির কথা বুঝিয়েছেন অর্থাৎ সাধন ভজন করলেই মূলাধারস্থিত কুণ্ডলিনী শক্তি ঊর্ধ্বগতি লাভ করে সহস্রারে যায় এবং জীব তখন সর্বজ্ঞ হয়ে ওঠেন।
কথিত আছে, শনির অশুভ দৃষ্টিতে গনেশের জন্মের পর মাথা খসে পড়েছিল এবং দেবরাজ ইন্দ্রের হাতি ঐরাবতের মাথাটি কেটে এনে স্বয়ং বিষ্ণু লাগিয়েছিলেন এ কারণে তিনি হস্তীবদন বা গজানন। বলা হয়, হাতিরা ব্যতিক্রমী স্মার্ট প্রাণী। তাদের যে কোনও স্থল প্রাণীর মস্তিষ্কের বৃহত্তম এবং মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি নিউরন রয়েছে। যদিও এই নিউরনগুলির মধ্যে অনেকগুলি হাতির বড় এবং নিপুণ দেহকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিদ্যমান, এই প্রাণীগুলি বারবার তাদের চিত্তাকর্ষক মানসিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। আজ বলি শার্লি এবং জেনির হৃদয়স্পর্শী গল্প।
এলিফ্যান্ট শার্লিকে বন থেকে বন্দী করা হয়েছিল এবং ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দর্শকদের বিনোদন দিয়ে একটি ভ্রমণ সার্কাসে বিক্রি করা হয়েছিল। পারফরম্যান্সে জীবনের অপরিসীম কষ্টের জন্য শার্লি তার ডান কানের একটি অংশ হারায় এবং পা পুড়ে যায়। এরপর ২৪ বছর পর শার্লিকে টেনেসির দ্য এলিফ্যান্ট স্যাংচুয়ারিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে শার্লি আরেকটি এশীয় হাতি জেনির সাথে দেখা হয়ে হঠাৎ করেই প্রচন্ড একটি উচ্চস্বরে এবং আনন্দিত হয়ে ওঠে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে দু-জন ২৪ বছর আগে সার্কাসে একসঙ্গে পারফরমেন্স করতো। পরবর্তী সাত বছর ধরে, শার্লি এবং জেনির মধ্যে মা এবং সন্তানের মত একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। ভাবলে অবাক লাগে, এত বছর আলাদা থাকা সত্ত্বেও দু-জন দু-জনকে চিনতে পারে।
নানা ঘটনা হাতির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। এদের চেনার ক্ষমতা প্রচুর। হাতি যেহেতু সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও শক্তিশালী জীব, সেইহেতু গাম্ভীর্যে, বিরাটত্বে ও অভিজ্ঞতার প্রতীক রূপে সে গণেশেরই উপযুক্ত। হাতির মতো বিশাল উদর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে। বহুজনের হিতার্থে ও সুখার্থে গণপতিদের যেমন ভালো মন্দ, মান অপমান, নিন্দা স্তুতি, সমালোচনার ইত্যাদি সবকিছু হজম করার মতো ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। নয়তো তারা আবেগ তাড়িত হয়ে অহংকারে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক মূল্যবোধের অবমাননা করবে।
এই কারণ গুলির জন্যই হয়তো গণপতি এতটা প্রিয় সকলের কাছে. একাধারে তিনি যেমন শক্তিশালী, তেমন বুদ্ধিমান, অন্যদিকে সকলকে সাহায্য করা বা ভুল করলে, তার শাস্তি প্রদান, আবার সঠিক কাজে, নিজেকে উজাড় করে দেওয়া- সব গুনই তার মধ্যে বিদ্যমান। গণেশ যেহেতু গণশক্তি বা সমষ্টি শক্তির প্রতীক সেহেতু সকলের শক্তি তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকে, সেই শক্তির জেরেই যেকোনো বিভিন্নতা খুব সহজেই অপসারিত হয়। তাই গণেশ চতুর্থী ছাড়াও বাংলা নববর্ষে, অক্ষয় তৃতীয়ায় কিংবা কোন ব্যবসার শুরুতে ঘটা করে গণেশ পূজা করা হয়।
অসাধারণ প্রতিবেদন,, আপ্লুত হলাম এত তথ্য জেনে ????
খুব খুশি হলাম জেনে।