শহর যত বৃদ্ধি পায়, শহরতলীও ততই বিস্তৃতি লাভ করে। তার চেয়েও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে পরিবেশ দূষণের। পরিবেশকে হত্যা করেই শহর-নগরের বিস্তৃতি। খালবিল ভরাট হয়ে যায়, জলাভূমি আত্মগোপন করে, নদীও খাল হয়ে ওঠে। সেখানে আধুনিক সভ্যতাগর্বী মানুষের আধিপত্য বিস্তারে তার প্রাণবায়ুই বিপন্ন হয় না, স্বাভাবিক জীবনকেও বিপদসঙ্কুল করে তোলে। পরিবেশকে দূষিত করেই মানুষের স্বরচিত স্বর্গ যত ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে সেজে ওঠে,ততই তার আসল প্রাকৃতিক জীবনদায়ী পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে পড়ে। সেখানে দাও ফিরে সেই অরণ্যের তীব্র আবেদন উপেক্ষিত হয়, আপন প্রভুত্বকে জাহির করতে গিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দাসত্বের উপেক্ষা নেমে আসে। শুধু তাই নয়, সে বিষয়ে সচেতনতাতেও আমাদের ঘোরতর অনীহা। অথচ সেই পরিবেশ রক্ষার জন্য জি ডি আগরওয়াল নিজের সর্বস্ব দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। গঙ্গার দূষণরোধে তাঁর আত্মত্যাগ সেভাবে দেশকে জাগাতে পারেনি। অথচ প্রতিনিয়ত খাল-বিল নদীনালাকে ধ্বংস করে শহর-নগরের শ্রীবৃদ্ধির প্রাণঘাতী আয়োজনে তাঁর অস্তিত্ব নানাভাবেই উঠে আসে, হয়ে ওঠে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কণ্ঠ।ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ঐতিহ্যপ্রাচীন মালদা জেলাতেও তার পরিচয় প্রকট। জেলার সদর শহরের বৃস্তৃতিতেই তার পরিচয় নিবিড়তা লাভ করেছে।

মালদা ছেড়ে দক্ষিণে যাত্রাকালে শহরের কোল ঘেঁষে চলার পথে সুদূরগামী মনের চলনে গতি বাড়িয়ে দেয় চাতরা বিলের দিগন্ত বিস্তারি অনাবিল হাতছানি। জনবহুল শহরের ইঁত-কাঠ-পাথরের অরণ্যের পাশে তার সজল মুক্ত পরিসর আপনাতেই মনকে উন্মুক্ত করে তোলে। এমনিতে শহরটিকে মহানন্দা অর্ধচন্দ্রাকারে বেষ্টন করে রয়েছে। সেদিক থেকে চাতরা বিলটি সেই চন্দ্রের বিন্দুতে শোভিত মনে হয়। অন্যদিকে ধনুকের ছিলার মতো ৩৪নং জাতীয় সড়কের বিস্তারে শহরের দূষণজর্জর সরব অস্তিত্বের পাশে চাতরা বিলের সবুজের দিগন্ত বিস্তারি আমন্ত্রণ শুষ্কপ্রাণে নির্মল অক্সিজেনের আস্বাদ বয়ে আনে। ফেরার পথে জানালা দিয়ে তার ভরপুর জলরাশির সবুজের সমারোহ বলে দেয় মালদায় আপনি স্বাগত। শহরে প্রবেশের পূর্বে প্রাণভরে সতেজ অক্সিজেন প্রদানের আগাম আমন্ত্রণ। জনবসতির চাপে তার বাড়বাড়ন্ত প্রকৃতিতে স্থানসংকুলানের ফাঁসে যে দমবন্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে চাতরা বিলের নদীর আদর প্রাপ্য ছিল। অথচ তাই অকেজো দৃষ্টিতে তার ভাগাড়ের পরিণতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। বদ্ধ জলাশয় যেমন সময়ান্তরে মজা পুকুরের আকার নেয়, চাতরা বিলও তেমনই ক্রমশ জলাভূমিতে আত্মগোপন করে চলেছে। অবশ্য তাতে তার অস্তিত্বসংকট আরও নিবিড় হয়ে উঠেছে। পরিবারে জনসংখ্যাবৃদ্ধিতে উঠোনও নিশ্চিন্ন হয়ে পড়ে। পরিত্যক্ত ভাগাড়ও তখন মহার্ঘ মনে হয়। তাতে অবশ্য প্রয়োজন মিটলেও আয়োজনে ফাঁক থেকে যায়। তাতে জীবন বাঁচলেও স্বাস্থ্য বিনষ্ট হয়। শহরের স্বাস্থ্য রক্ষায় চাতরার বিলের অস্বাস্থ্য দূর করার প্রতি আমাদের নির্লিপ্ত উদাসীনতায় জি ডি আগরওয়ালের মহৎ আত্মত্যাগ আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।

আইআইটি কানপুরের স্বনামধন্য অধ্যাপক ছিলেন জি ডি আগরওয়াল। অথচ গঙ্গাদূষণের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এবছর গঙ্গাদূষণ প্রতিরোধে ২২ জুন থেকে আমরণ অনশন শুরু করে ১১১দিন মাথায় ১১ অক্টোবর ৮৭ বছর বয়সে (১৯৩২-২০১৮) তিনি আত্মত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশবিদ হিসাবেও তিনি কাজ করেছেন। অন্যদিকে এরপূর্বে একাধিক বার জি ডি আগরওয়াল অনশন করেছিলেন। গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার জন্য তাঁর দীর্ঘ লড়াই প্রচারের অন্তরালে থেকে গিয়েছে। অবশ্য গঙ্গারক্ষায় তিনিই প্রথম শহিদ নন। তাঁর পূর্বে স্বামী নিগমানন্দ একদশক লড়াই চালিয়ে ২০১১-এর ১৩জুন শহিদ হয়েছিলেন। অন্যদিকে সেই ২০১১-তে জি ডি আগরওয়াল সন্ন্যাস নিয়ে স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ হয়ে সেই আন্দোলনকেই আরও সক্রিয় করে তোলেন। ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’ থেকে ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্প চালু হলেও তার প্রচারসর্বস্বতায় গঙ্গা তার স্বাস্থ্য ফিরে পায়নি। প্রচারের অন্তরালে থেকেও গঙ্গার মতো নদীর দূষণমুক্ত করায় জি ডি আগরওয়াল যেভাবে দধীচির মতো আত্মত্যাগে সামিল হয়েছেন, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। অধ্যাপক থেকে পরিবেশবিদ হয়ে সন্ন্যাসীর জীবনকে বেছে নিয়েও তিনি তাঁর সর্বস্ব দিয়ে গঙ্গার স্বাস্থ্য রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। সরকারি ঔদাসীন্য থেকে মিডিয়ার বিমুখতাও তাঁকে বিরত করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুসংবাদই সেখানে তাঁর বেঁচে থেকে অসম লড়াইয়ের কথা প্রচার করে। অন্যদিকে এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রকট উদাসীনতা নির্মমতা বয়ে আনে। জি ডি আগরওয়ালের পর মধ্য তিরিশের স্বামী গোপাল দাসও আমরণ অনশনে সামিল হয়েছেন। তাঁর পরবর্তী সংবাদও প্রচার লাভ করেনি। সেক্ষেত্রে জি ডি আগরওয়ালদের প্রচারও যে পরিবেশ আন্দোলনের প্রাণিত করবে, তা সহজেই অনুমেয়। জনবিমুখ পরিবেশের মধ্যে থেকেও যাঁরা এই পৃথিবীকে দূষণমুক্ত করায় সংশপ্তকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাঁদের সংগুপ্ত করে রাখলেও সময়ান্তরে ছায়ার কায়ারূপ লাভের মতোই তাঁরা আবির্ভূত হয়ে থাকেন। চাতরা বিলের প্রতিকূল অস্তিত্বে সেই কায়ার মূর্তির প্রতিমার দিকে তাকিয়ে আমরা। সেখানে অসম লড়াইয়ে জি ডি আগরওয়ালই আমাদের পথপ্রদর্শক!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।