শুক্রবার কলকাতা উচ্চ আদালত নতুন করে করোনা সংক্রমণের কালেও সামাজিক দূরত্ববিধি মেনে, কোনওরকম জমায়েত না করার শর্ত বেঁধে দিয়ে গঙ্গাসাগর মেলার অনুমতি দিয়েছিল। তবে আদালত এও জানিয়েছিল, স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত কোথাও কোনও ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটলে মেলা বাতিল করা হতে পারে। মেলায় যথেষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর দেওয়ার জন্য আদালত তিন সদস্যের কমিটিকে নজরদারির দায়িত্বও দিয়েছিল। কিন্তু বিতর্ক শুরু হয়েছে ওই কমিটিতে বিজেপি-র বিধায়ক তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে রাখা নিয়ে।
অন্যদিকে সোমবার নতুন করে কলকাতা উচ্চ আদালতে গঙ্গাসাগর মেলা বন্ধের আরজি জানিয়ে ফের মামলা দায়ের হল। এদিন আদালতে আরও ৫টি ভিন্ন ভিন্ন আবেদন জমা পড়ে যাতে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করে মেলা বন্ধ করে দেয়। আবেদনকারীদের আশঙ্কা, মেলা চলবে ১৪ তারিখ পর্যন্ত, এই দিনগুলিতে রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি চূড়ান্ত মাত্রা নেবে। যদিও আদালতে এদিনও রাজ্যের তরফে জানানো হয়, করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা চলবে।

কলকাতা উচ্চ আদালতে সোমবারের শুনানিতে আদালতের নির্দেশে গঠিত কমিটির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কোভিড পরিস্থিতিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন কাউকে নজরদারি কমিটিতে রাখা হয়নি। আবেদনকারীদের প্রশ্ন, এত বড় একটি মেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ভীড়ে কি কোভিডবিধি মেনে যথাযথ দূরত্ব রাখা সম্ভব? কোথায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না, তার উপর কি নজরদারি করা কি কার্যত সম্ভব? আবেদনকারীরা উল্টে মনে করেন, এই ধরণের পরিস্থিতিতে ১৪ তারিখ পর্যন্ত মেলা চললে রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি যেভাবে বাড়বে তাতে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
সোমবার নতুন করে যারা মামলা করেছেন তাঁরা অধিকাংশই চিকিৎসক। তাঁরা জানান, অধিকাংশ গঙ্গাসাগর যাত্রী গণপরিবহণে মাস্ক ছাড়া যাতায়াত করছেন। ভীড়ের মধ্যে দুরত্ববিধি পালন অসম্ভব যে কারণে গত ৩ জানুয়ারি থেকে করোনা সংক্রমণ উল্কার গতিতে বাড়তে শুরু করেছে। এমন অনেক গঙ্গাসাগর যাত্রী মেলায় এসেছেন যারা আগে থেকেই করোনা সংক্রমিত। অনেকে উপসর্গহীন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভীড়ে রাজ্যের কোভিড পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব কাজ।
সোমবার শুনানিতে কলকাতা উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য একাধিক আবেদনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের তরফেও পৃথক আবেদন জমা দেওয়া হয়। সেখানে রাজ্য জানায়, শুভেন্দু অধিকারী কেবলমাত্র বিরোধী দলনেতা নন, আদ্যোপান্ত এক জন রাজনৈতিক মানুষ। গঙ্গাসাগর মেলার নিরপেক্ষ কমিটিতে তাঁকে কোনও ভাবেই মানায় না।। এতে গঙ্গাসাগর মেলায় রাজনীতির রং লাগে। অযথা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। যাকে ঘিরে কিছু সুযোগ সন্ধানী মানুষ রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করবে। তাই দাবি করা হয়, এ ধরণের কমিটিতে রাজ্য সরকারের নেতা-মন্ত্রী-আমলা থেকে বিরোধী শিবিরের নেতা কাউকেই রাখা উচিত নয়। তাছাড়া মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কিম্বা রাজ্যের কোনও আমলা বা নেতা-মন্ত্রী, এঁরা কেউই করোনা বিশেষজ্ঞ নন। এই কাজে একমাত্র করোনা সংক্রান্ত ওয়াকিবহাল ব্যক্তির নামই আসতে পারে।

প্রসঙ্গত, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালীন উত্তরপ্রদেশে কুম্ভমেলা করা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ‘সুপার স্প্রেডার’ হবে বলে মত দিয়েছিলেন। এরপরও যোগী কুম্ভমেলার পক্ষে সওয়াল করায় তাঁকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তাছাড়া আদালত গঙ্গাসাগর মেলার জন্য যে নজরদারি কমিটি গঠন করেছেন, তার রিপোর্ট পেতে আরও কয়েক দিন লাগবে। তত দিনে রাজ্য আরও ক্ষতগ্রস্ত হবে।
ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বৃহস্পতিবার চিঠি ভারত সেবাশ্রম সংঘ জানিয়ে দিয়েছে তাদের বহু স্বেচ্ছাসেবক কোভিডে আক্রান্ত ফলে ওরা ভলেন্টিয়ার পাঠাতে পারবে না। সেক্ষেত্রে রাজ্যের উপর বাড়তি চাপ বাড়ল বলে মনে করা হচ্ছে। এই অবস্থায় কি গঙ্গাসাগর মেলা? মুখ্যমন্ত্রীকে এই প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘ওটা আদালতের বিচারাধীন বিষয়। আদালত তাদের রায় দিক।’ কিন্তু সোমবার কলকাতা উচ্চ আদালত কোনও রায় না দিয়ে বিষয়টি স্থগিত রেখেছে। আগামী ১০ জানুয়ারি শুরু হবে সাগরমেলা। ১২ জানুয়ারি পুণ্যস্নান। ইতিমধ্যে সেখানে হাজির অনেকেই। মেলায় এবার ভারত সেবাশ্রম সংঘের সেচ্ছাসেবক খুব কম থাকবে। যেখানে প্রতি বছর মেলায় সংঘের লোকেদের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের উপর বাড়তি চাপ বাড়ল। ঘুরে ফিরে তাই প্রশ্নটি আসছে গঙ্গাসাগর মেলা কী তাহলে হচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘আদালতের বিচারাধীন’ বলে তাদের উপরেই ছেড়ে দিতে চাইছেন কিন্তু আদালত সোমবার বিষয়টিকে স্থগিত রেখেছে। এখন কোনদিকে জল গড়ায় সেটাই দেখার। আপাতত গঙ্গাসাগর মেলা আদালতের ঘাড়ে।
আপাতত গঙ্গাসাগর মেলা এক খেলা, মেলা আর খেলা নিয়েই তো বাংলার রাজনীতি। জনগন গাধার দল সেই মেলা আর খেলার পিছনে ছুটে ছুটে
দম বন্ধ হয়ে মরছে।