বড়দিন, বর্ষবিদায় এবং নতুন বছরকে আহ্বানের উৎসবে রাজ্যে করোনা সংক্রমণ একলাফে অনেকখানি বেড়েছে। প্রায় ১৭৭ দিন পরে রাজ্য ২৪ ঘন্টায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার পার করে। কয়েকদিন আগের হিসাবে সারা রাজ্যে ১০৮৯ জন আক্রান্তের মধ্যে শুধুমাত্র কলকাতাতেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৪০ জন। কলকাতার পরেই ছিল উত্তর ২৪ পরগনা। এছাড়াও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, বীরভূম এবং নদিয়া জেলার পরিস্থিতিও খারাপ। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর অনুযায়ী, রাজ্যে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা খুব কম সময়ের মধ্যে ৩০ হাজার পার হয়ে যেতে পারে।
এই ঘটনার মাত্র কিছুদিন আগে করোনা সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ধরে নিয়েই আমরা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে গিয়েছিলাম। আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম মাত্র কয়েকদিন আগে করোনা আমাদের জীবনের উপর কিভাবে দাপট দেখিয়েছে। আমদের সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনে যতটা অধঃপতন ঘটেছে তা ভারসাম্যে ফিরতে বেশ কিছু বছর সময় লেগে যাবে। কিন্তু দুর্গোৎসব থেকে শুরু করে ইংরেজি নতুন বছরের উৎসবে আমারা যেভাবে মেতে উঠেছিলাম তাতে করে কিন্তু একবারও মনে হয়নি যে করোনা আমাদের জীবনকে অভিশপ্ত করেছে।
এই আবহে আগামী ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে চলেছে গঙ্গাসাগর মেলা। পূণ্য স্নানের এখনও কয়েকদিন বাকি তবু এখন থেকেই দর্শনার্থীদের প্রবল উৎসাহ দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর এই ছবিটাই দেখা যায়। যদিও করোনার ছায়া গত দু’বছর মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করেছিল কিন্তু সাগরে দর্শনার্থীদের উৎসাহের ঘাটতি ছিল না। তারা ভিড় ও করোনা এড়াতে আগে থেকেই পৌঁছে গিয়েছেন। এবারও হাজার হাজার পুণ্যার্থী কপিল মুনির সাগর তটে ভিড় জমাতে শুরু করেছে। প্রবল শীতের সকালে সাগরে স্নান সেরে মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য লম্বা লাইন দিয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের সংক্রমণ রুখতে মাস্ক ছাড়া তীর্থযাত্রীদের হাতে মাস্ক তুলে দিচ্ছে। সরকারি তরফে তীর্থযাত্রীদের যাতে কোনওরকম অসুবিধা না হয়, প্রশাসনিক কর্তারা সাহায্যের সব রকম প্রস্তুতি আগাম নিয়ে রেখেছে। করোনার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সংক্রমণ এড়াতে ২০টি ড্রোনের মাধ্যমে জল ছিটিয়ে পুণ্যার্থীদের স্নান করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়া, যতদিন মেলা চলবে ততদিন করোনা নিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করা হবে।
প্রশ্ন, বর্ষ বিদায় উৎসবের শেষে যদি রাজ্যে করোনা সংক্রমণ একলাফে অতটা বেড়ে যায়, তারপর গঙ্গাসাগর মেলা হলে যে কোভিড গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তাছাড়া সাগরমেলায় সরকারি ভীড়ের হিসাব ৩০ লক্ষ। এই জনসমাগমে দূরত্ববিধি বা অন্য কোনও কোভিড প্রোটোকল মানা সম্ভব নয়। তার মানে জেনে বুঝে গোষ্ঠী সংক্রমণের আশঙ্কা জাগিয়ে তোলা। তাছাড়া ওই বিপুল ভীড়ে সংক্রমণ ঘটলে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে। ওই বিপুল পরিমাণ মানুষকে কোনও ভাবেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে না। লাগাতার পরিষেবা দিতে দিতে চিকিৎসক থেকে সমস্ত চিকিৎসাকর্মীরাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়বেন। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে সে কথা ভেবে কি এবারের মতো গঙ্গাসাগর মেলা বন্ধ রাখা যায়না?
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে তার সরকার গঙ্গা সাগর মেলাকে বন্ধ করতে বা তার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন না। লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী যে মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর দ্বীপে জড়ো হয় সেটা কোনো সরকারি উৎসব নয়। এটা একটা ‘পাবলিক ইভেন্ট’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে মানুষ আসে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার প্রভৃতি রাজ্য থেকে আসা লোকদের তিনি কীভাবে থামাবেন? মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন যে তিনি জানেন সংক্রমণ বাড়ছে তবে রাজ্য সরকার পরিস্থিতি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে। এরপরই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, জনগণের অর্থনীতি এবং জীবিকার উপর বিরূপ প্রভাবের কারণে রাজ্য জুড়ে মহামারী-সম্পর্কিত বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে না।

মুখ্যমন্ত্রী ২৫, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধে থেকে পার্ক স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকায় ভীড় হবে জেনেও কোনও বিধিনিষেধ জারি করেন নি। সংখ্যায় বিপুল না হলেও বাংলায় খ্রিষ্টানদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এমনকি বাংলার রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও তাদের যথেষ্ট প্রভাব আছে। হয়তো সেকথা মাথায় রেখেই ২৫ ও ৩১ ডিসেম্বর এবং ১ জানুয়ারির উৎসবে রাজ্য সরকার কোনও নিষেধাজ্ঞা চাপায়নি। কিন্তু সরকার যদি সত্যি ওই সব রাতে পার্কস্ট্রিট সহ রাস্তাগুলিতে ভীড়-হুল্লোড়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন তাতে কি কোনও খ্রিস্টান সরকারের উপর ক্ষোভ উগরে দিত? কখনই নয়। কারণ এবারও অন্যান্য বারের মতো হিন্দু বাঙালিরাই ওই সব এলাকায় কাঙালিপনা করেছেন। আর খ্রিস্টানরা ২৫ ডিসেম্বর চার্চে শান্ত আরাধনা ও অন্য দিনগুলিতে বাড়িতেই আনন্দে দিন কাটিয়েছেন।
২৫ বা ৩১ ডিসেম্বর উৎসবে মেতে ওঠার ছাড়পত্র বা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো মানুষকে পাশে রাখার পরিণাম যে কত ভয়াবহ তা এখনও টের না পাওয়া গেলেও যাবতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, লোকাল ট্রেন চলাচলে বেশ কিছু বিধিনিষেধ জারি হয়েছে, আবার ফিরে এসেছে নাইট কারফিউ। কিন্তু যেটা বন্ধ হওয়া দরকার ছিল, সেই গঙ্গাসাগর মেলা হবে! প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতেও গঙ্গাসাগর মেলা বাতিল করলে হিন্দু ভাবাবেগে আঘাত লাগাবে, তাতে রে রে করে তেড়ে আসবে হিন্দু সন্ত্রাসবাদীরা? সেই ইস্যু কি আর এখন বাংলার মানুষের মনে কোনও প্রভাব ফেলবে।