২০১০ খ্রিস্টাব্দে আমার গঙ্গাসাগর মেলার ডিউটি পড়ল; চাকরি জীবনে প্রথমবার। এর আগে অবশ্য দুবার গঙ্গাসাগরে এসেছি। ২০০১ সালে মেলার সময় ঘুরতে আর ২০০২ সালে শরৎকালে শিক্ষামূলক ভ্রমণে। অর্থাৎ এবার নিয়ে তৃতীয় বার।
এর কিছুদিন আগে বারুইপুর মহকুমা ছেড়ে বীরভূম জেলার রামপুরহাট মহকুমায় গিয়েছি চাকরি সূত্রে। এজন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনাতে ডিউটি পড়াতে ভিতরে ভিতরে উৎফুল্ল হচ্ছিলাম। ডিউটিতে গেলে সদ্য বিচ্ছেদ হওয়া লোকজনের সঙ্গে দেখা মিলবে। আর গঙ্গাসাগর পুলিশের কাছে মিলনমেলা। পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হয়, আবার কয়েকদিন একসঙ্গে থাকার ফলে নতুন বন্ধু তৈরি হয়। স্বল্প পরিচিতির সঙ্গে গাঢ় বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়।
৯ই জানুয়ারি বিকাল তিনটেতে আলিপুর পুলিশ লাইনে ব্রিফিং। এই ডিউটিতে কী কী করণীয়, কী কী দেখা উচিৎ, কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত এসব নিয়ে নির্দেশাবলীর দেওয়া হয়। প্রথমে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার পুলিশ সুপার এবং পরে ডি.আই.জি. প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের ব্রিফিং।
ব্রিফিংয়ের পর যাদবপুরের ঢাকুরিয়া সার্ভিস সেন্টার থেকে তেল তুলে ডায়মন্ড হারবার রোড হয়ে সোজা কাকদ্বীপ। গিয়ে উঠলাম এস.ডি.পি.ও কাকদ্বীপ, জয়ন্ত স্যরের অফিসবাড়িতে। রাতে বিস্তর গল্প আর মাংস রুটি।
পরদিন সকাল সাতটার মধ্যে গাড়ি বেরিয়ে গেল। জোয়ার থাকতে থাকতে ভেসেলে করে গাড়ি ওপারে পাঠাতে হবে। জোয়ার না থাকলেও বোটে ওপার যাওয়া চলে বলে, আমি একটু পরে বের হলাম। স্নান, প্রাতরাশ সেরে থানার গাড়িতে লট নং ৮-এর ২ নং জেটি। ওখানে ‘সুলতান’ প্রস্তুত। সুলতান লঞ্চের নাম। আমিও সুলতানে সওয়ার হলাম। কিন্তু লঞ্চ ছাড়ছে না। কী হল? এ.পি.আই. ডায়মন্ড সাহেব আসবেন তারপর ছাড়া হবে? অগত্যা বসে রইলাম।

এ.পি.আই. ডায়মন্ড সাহেব এসে বললেন, “স্যর, আপনার সঙ্গে দেখা করব বলে লঞ্চ আটকে রেখেছি।” এদিকে একজন এসে বলল আমাদের স্পিডবোটে চলুন স্যর। সুন্দরবন কোস্টাল থানার স্পিডবোট। বললাম এতেই যাব। এর অভিজ্ঞতাটা নিতে হবে। ইতিমধ্যে পুরনো মুখের মিছিলে এসে ঘরে ফেরার অনুভূতি হচ্ছে। ভাটা চলছে। তাই স্পিডবোটের স্পিড দেখা গেল না। তার ওপর ড্রেজিং চলছে। একটা নির্দিষ্ট চ্যানেল ধরে স্পিডবোট এগিয়ে চলল।
এপাশেও গাড়ির জন্য অনুরোধ। “স্যর গাড়ি আছে?” সোজা পথ ৩০ কিমি পাড়ি দিয়ে দু’নম্বর গেট দিয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুম। ঘর বরাদ্দ হল রুম নং ৫৩। ছোট তালা চেন লাগানো হোগলা পাতার ঘর। সামনে ব্যালকনি, মাঝে ঘর, পিছনে বাথরুম, পায়খানা। নিচে বালি। তার উপর ‘খড়’ ও ‘হোগলা পাতা’ পাতা। দেখে মন ভরল না।
ঘর পছন্দ হয়নিতো কী হয়েছে? বাইরেটা তো পছন্দের। এত লোক — ‘নানাভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’। বিভেদের মাঝে মহান মিলন দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই গেলাম বেলাভূমির দিকে। তারপর টেম্পল রোড ধরে মন্দিরের দিকে। বারুইপুরের প্রচুর পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হল। আজকে তাদের বিশেষ কোন ডিউটি নেই বলে সবাই আমার সঙ্গ নিল। বিকালের দিকে গিয়ে বসলাম পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মেলা অফিসে। এই সময় সাগর থানা এই মেলার মাঠেই চলে আসে অস্থায়ী লকআপ তৈরি হয়। আটটা নাগাদ আবার ঘুরতে বের হলাম রাতের গঙ্গাসাগর দেখতে। রাতে ফিরে আসার পর ডেরা পছন্দ হয়ে গেল। হোগলা ঘরের ভিতরে উষ্ণ পরিবেশ, কলে কবোষ্ণ জল, সাগর সঙ্গমে এর থেকে ভালো আর কী হবে?
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল একটা প্রভাতী সংগীতে। গানের লাইন পুরোটা মনে নেই, মোটামুটি এরকম ছিল “জাগো সুকসারী, জাগো নরনরী, প্রভাত সময় হল … ”। কিন্তু মিষ্টি গানটা চেপে দিয়ে ‘সূচনা কেন্দ্র’ মানে ইনফরমেশন সেন্টার থেকে তারস্বরে অনুপ জালোটার ক্যাসেট চাপাল। উঠছি উঠছি করে উঠছি না। বড় ঠান্ডা। সাতটা বাজুক।

সাগর বাসস্ট্যান্ড থেকে সাগর সৈকতে আসার জন্য একটা খাল পার হতে হয়। সেই ক্যানালের ওপরে পাঁচটি সেতু। বাসস্ট্যান্ড থেকে এই পাঁচটি ব্রিজে আসার জন্য পাঁচটি রাস্তা। সেগুলোর নাম রোড নাম্বার এক, রোড নাম্বার দুই, তিন, চার, পাঁচ। এই ব্রিজগুলিতে তীর্থযাত্রীদের প্রবাহ কন্ট্রোল করতে হয়। না হলে বাসস্ট্যান্ডে পদপিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা। আমার এই ব্রিজগুলিতেই ডিউটি ছিল। ব্রিজ পেরিয়ে আবার পাঁচটি রাস্তা সমুদ্রের দিকে গেছে সেগুলির নাম মেলা রোড এক, মেলা রোড দুই, তিন, চার, ও টেম্পল রোড।
সকাল সাতটায় প্রথমে ১ নং রাস্তা ধরে সমুদ্র সৈকত, ১ নং টাওয়ারে উঠলাম। টাওয়ারে অফিসাররা চা খাওয়ালেন। ১ নং রাস্তা ধরে সোজা বাস স্ট্যান্ড। এ রাস্তায় পড়ল ১ নং ব্রিজ, ওঙ্কারনাথ আশ্রম, মহানন্দ মঠ, ইরিগেশন বাংলো, উর্মিমালা ইন্সপেকশন বাংলো, শঙ্করাচার্য আশ্রম, কলকাতা যুবক সংঘ, পুরনো বাস স্ট্যান্ড, কপিলকান্তি সাংঘ্য যোগাশ্রম, কপিল কল্পতরু আশ্রম, কলকাতা বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতি। বাস স্ট্যান্ডে ডিউটি পড়েছে আমার ব্যাচমেটের। থাকার ব্যবস্থা আমাদের ঘরের মতো। তবে নিচে বালি নয় মাটি। কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে এলাম।
গঙ্গাসাগর মেলা ডিউটি অনেকগুলি সেক্টরে ভাগ থাকে। সমুদ্রধার থেকে অর্থাৎ সর্ব দক্ষিণ থেকে ধরলে প্রথমে বীচ সেক্টর, তারপর টেম্পল সেক্টর, তারপর ব্রিজ কন্ট্রোল সেক্টর, তারপর বাসস্ট্যান্ড সেক্টর, তারপর আইল্যান্ড ট্রাফিক সেক্টর, কচুবেড়িয়া, লট নং এইট, মেনল্যান্ড ট্রাফিক এরকম। আগেই বলেছি আমার ডিউটি ছিল ব্রিজ কন্ট্রোল সেক্টরে। একজন অ্যাডিশনাল এস.পি. চার্জে। তার আন্ডারে দুই ডি.এস.পি.। মোট পাঁচটা ব্রিজ মন্দিরের পিছনে খালের ওপর। এগুলি আমরা দুজন ভাগাভাগি করে দেখেছিলাম।
১১ তারিখে সকাল ১১ টার সময় অ্যাডিশনাল এস.পি. ব্রিফিং করলেন কন্ট্রোল রুমে। ব্রিফিং সেরে ডিউটির জায়গা দেখতে যাওয়া, ফোর্স বুঝে নেওয়া, ডিউটি বোঝানো, এসব কাজগুলো সারা হল। বিকাল তিনটের সময় আবার ব্রিফিং এস.পি ও ডি.আই.জি-র। তারপর ‘স্পট ব্রিফিং’। ডিউটির শিফ্ট ভাগ করে দেওয়া হল।

পরদিন সকালে মেলা ঘুরলাম আড়াআড়ি ভাবে অর্থাৎ সমুদ্র সৈকতের সমান্তরাল রাস্তা দিয়ে। এগুলিকে বলে মেলা রোড, মেলা রোড ১, ২, ৩, ৪। তখনও মেলায় সেভাবে পুণ্যার্থীদের ঢল নামেনি। বেশ ফাঁকা ফাঁকা মনোরম পরিবেশ ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগছে।
দেখা হয়ে গেল অনেক পরিচিত রিপোর্টারদের সঙ্গে। ওনাদের থাকার জায়গা দেখতে গেলাম। আমাদের মতো ব্যবস্থা। শুধু এক ঘরে দুজন। সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিক। দুটি খাট, একটা টেবিল।
পরদিন সকাল সাতটার সময় এক সাংবাদিকের সঙ্গে পূর্ব দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম একটা ছোট খালের ধারে। ওপারে ঝাউগাছ ঘেরা তপবন। শুনলাম ওখানে খেজুরের রস জ্বাল দেয়। নৌকাতে পেরোতে হবে। তিনজন পুণ্যার্থী বা ভ্রমণার্থী পেরোচ্ছেন লাল কাঁকড়া দেখতে যাওয়ার জন্য। আমিও ইচ্ছে প্রকাশ করলাম। লাল কাঁকড়ার জন্য নয়, ওপারের গ্রাম দেখার জন্য। কিন্তু জুতো খুলে পা ভিজিয়ে নৌকায় উঠতে হবে। তাই ফিরে এলাম।
ওই সাংবাদিকের মুখে শুনলাম আগে সাগরের ধারে ‘কদম ফুল’ ফুটে থাকত অর্থাৎ লোকের ত্যাগ করা মল পড়ে থাকত। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা BABS এসে সেই দৃশ্য দুর করেছেন। সত্যি প্রশংসা যোগ্য। BABS ছেলে মেয়েরা ডানহাতে ছোট বেলচা আর বা হাতে বালতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার দৃষ্টিকটু লেগেছিল এই দেখে যে, একজন আনন্দের সঙ্গে কদম ফুল ফোটাচ্ছে, আর BABS-এর স্বেচ্ছাসেবক পরম নিষ্ঠার সঙ্গে হাতে বেলচা নিয়ে অপেক্ষা করছেন ওনার ওঠার জন্য। কিন্তু বোঝাচ্ছে না এটা ভালো অভ্যাস নয়। আমিও ভাবি কী ধর্মপ্রাণ মানুষ জন! যে সাগরকে পুণ্যভূমি মানে, পুজো করে, তার ধারে বিষ্ঠা ত্যাগ করতে একটুও পাপ বোধ হয়না।
আমার আস্তানা ১ নং মেলা রোডের কাছে। ওই সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে সমুদ্রতীর ধরে ৫ নং মেলা রোড পর্যন্ত চলে এলাম। দেখলাম বিভিন্ন রংয়ের শাড়ি শুকানো, পুজো, গরুর ল্যাজ ধরে বৈতরণী পার, গোদান, তর্পণ, মাথা ন্যাড়া করা, নারকেল প্রদান ইত্যাদি। এই নারকেল গুলো ডিউটি করতে আসা এন.সি.সি. ছেলেরা বা অন্যান্য ছেলের দল কুড়িয়ে নেয় স্নানের সময়। একজন সঞ্জয় রজক নামে NCC বালক পাঁচটি নারকেল জোগার করেছে, বাড়িতে গিয়ে মাকে দেবে। মা এগুলো পিঠে বানাবেন।
ডিউটি যাওয়ার সময় আবার বীচে এলাম হোভার ক্রাফটের আওয়াজ শুনে। নিচের ব্লাডার ফোলালো, কিন্তু চালালো না। আমি চললাম আমার ডিউটি পয়েন্টে। দুপুরের দিকে রুমে ফিরলাম চার নং রাস্তা দিয়ে, উদ্দেশ্যে রাস্তার ধারে এন.জি.ও এবং আশ্রম গুলো দেখা। কারণ ‘পিলগ্রিম’দের এগুলির নির্দেশগুলি বেশি করে বলতে হয়। ঘরে ফিরে পোশাক ছেড়েছি ওমনি হোভার ক্রাফটের আওয়াজ। চলে এলাম সৈকতে। হোডার ক্রাফট, নামা ও জল থেকে ওঠা দুটোই দেখলাম। কল্পনায় অনেক বেশি রোমাঞ্চিত হওয়ার ছিল। বাস্তবে অতটা হল না। শুধু একটাই অদ্ভুদ জলে ও ডাঙায় চলার ক্ষমতা।

১৪ ই জানুয়ারি পুণ্যস্নানের দিন। এদিন ভোর চারটের সময় বেড়িয়ে রাত দশটায় ঢোকা। মাঝে বিকাল তিনটের সময় একঘন্টার জন্য রুমে ফিরে খাওয়া, স্নান করা, দাড়ি কাটা। এই যাওয়া-আসাতেই বেশি কষ্ট হল। এত ধকল কোনও দিন পোহাইনি। সকাল দশটা পর্যন্ত দিব্যি চলল। সাধারণ জনপ্রবাহ। ১ নং দিয়ে শুধু বেরোনো। ভাবছি ড্রপগেট কাজে লাগবেই না। হঠাৎ বাসস্ট্যান্ড থেকে চিল্লা-মিল্লি শুরু করল। ৪ নং ব্রিজ কন্ট্রোল করতে হল। আমার দুটো ড্রপ গেটে ১০, ১০ মিনিট করে আটকাচ্ছিলাম। মাঝে বাসস্ট্যান্ডে চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেকক্ষণ আটকে দেওয়া হল। যখন ছাড়া হল তখন কারোর পকেট কেটে ১০ হাজার টাকা গেল, কারো গলার চেন গেল।
চাপও বেড়ে গেল ৪ নং ব্রিজ কন্ট্রোলে। তিনটে ড্রপগেট। ১০ মিনিট করে একটা লোক মোট আধঘণ্টা আটকে থাকছে ৪ নং ব্রিজ কন্ট্রোলে। লোকজনের সঙ্গে বচসা হল, হাসাহাসি হল। এই চাপ চলল রাত আটটা পর্যন্ত। মোট ১০ ঘন্টা। গলা ভেঙ্গে যাওয়ার জোগার। ক্লান্তিতে নটার সময় সামনের দোকানের বেঞ্চে শুয়ে পড়লাম। সাড়ে নটার সময় পরের শিফটের অফিসার চলে এলেন। উনি বললেন, “স্যর আপনি বিশ্রাম করুন আমি দেখছি।” আমি টলতে টলতে এগিয়ে চললাম বাসস্থানের দিকে।
পরদিন অর্থাৎ পয়লা মাঘ সকাল থেকে মেলা ফাঁকা ফাঁকা। মনও ফাঁকা ফাঁকা। যেদিন ১০ তারিখে এলাম, ভাবছিলাম ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫ কী ভাবে কাটাব। কী ভাবে যে দিনগুলো ফুরিয়ে গেল? এই ভাবে একদিন জীবনের সমস্ত দিন ফুরিয়ে যাবে!
এদিন সকাল নটার সময় সমুদ্রে স্নান করে এলাম। গঙ্গাসাগরের ডিউটি শেষ করে ‘গঙ্গা স্নান’। সাগরের জল খুব ঠান্ডা। আর একদম ঢেউ নেই। একদম মজা পাচ্ছি না। তাই দু তিন ডুব দিয়ে চলে এলাম। হোগলা বাথরুমে আবার সাবান মেখে গরম জলে স্নান করলাম।
আজ সমুদ্র স্নানাগার ফাঁকা ফাঁকা। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সমুদ্র সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। ভিড় সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ভোঁতা করে দেয়। লোকের স্নানটাও ভালো করে লক্ষ করলাম। জলেতো ঢেউ কম। বেশিরভাগ লোক হাঁটু জলেই বসে ডুব সারছে। ৩, ৪, ৫ রাস্তা গুলোর দোকান ফাঁকা, সবাই দু’নম্বর রাস্তায় ভীড় জমিয়েছে। আজ স্থানীয় লোকের ঢল নেমেছে। দু’নম্বর রাস্তা বা টেম্পেল রোড দিয়ে হাঁটা যাচ্ছে না।
গঙ্গাসাগর মেলার আমি চারটে প্রধান বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলাম, ১. হোগলা পাতার ঘর, ২. ভিখারির সমাবেশ ৩. সাগর পাড়ে হাগা, ৪. মেলায় হারানো। মেলায় হারাবে না কেন? যেসব দেহাতি মানুষেরা আসেন বা নিয়ে আসা হয়, দেখে মনে হয় তাদের পক্ষে নিজের পাড়ায় একা একা চলা মুশকিল। তারপর যখন লাইন দিয়ে একে অন্যের আঁচল ধরে, চাদর ধরে সারিবদ্ধ অথবা দড়ির ভিতর গণ্ডিবদ্ধভাবে গড্ডালিকা প্রবাহের মতো মাথা গুজে চলেন, চারিদিকে তাকাবার তাঁদের অবসর নেই। ফলে পথ, ঘাট, কোন নিদর্শন জ্ঞাপক বস্তু চোখেও পড়ে না বা তাঁরা চোখ ফেলেন না। আর মাথা গুজে মাটির পানে তাকিয়ে চলবেন না কেন? মাথায় সবার তো ব্যাগ বা বোঁচকা। তখন মনে হয় গঙ্গাসাগর গরীব পুণ্যলোভী মানুষদের মেলা। এদের কথা আরো একটু আন্তরিকভাবে ভাবা উচিৎ। যতই এদের মূর্খামিতে রাগ হোক, শেষে কেমন যেন করুণা হয়।
এক বৃদ্ধা মহিলা বুক পর্যন্ত সায়া দিয়ে ঢেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, পরিজন হারিয়ে ফেলেছেন। একজন লোক গামছা গায়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে জানাচ্ছেন তার জামা কাপড় খোয়া গেছে। কিছু বৃদ্ধা মহিলারা কিছু বলতে পারছেন না, বুঝতে পারছেন না। তাদের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে পাঠিয়ে দিলাম হিন্দি ও বাংলাতে ‘সূচনাকেন্দ্র’ লিখে। এদেরকে তারপর ‘সূচনা কেন্দ্রের টাওয়ারে’ উঠিয়ে ঘোষণা করানো হয় স্বকন্ঠে। কী যে বললেন, উনিই বুঝলেন, আর নিশ্চয় ওঁর বাড়ির লোক বুঝেছিলেন।

গঙ্গাসাগর মেলায় এত ভিখারি আসে, মাঝে মাঝে মনে হয় গঙ্গাসাগর সাধুদের নয়, ভিখারিদের মেলা। অবশ্য শুনেছি অনেক গৃহস্থ সাধুর ভেকধরে ভিক্ষা করতে আসেন। সাগর পাড়ে সারিবদ্ধ ভাবে নানা বেশে, নানা ভূষণে তাঁরা ভিক্ষা করেন। কেউ ঠাকুরের মূর্তির সামনে থালা পেতে থাকে। কেউ নিজের শরীরে কুষ্ঠ রোগের মেকআপ নিয়ে মানুষের করুণা আদায় করে। একদিন তাঁদের অবসর সময়ে পায়ের উপরে রং তুলি দিয়ে কুষ্ঠ মেকআপ করতে স্বচক্ষে দেখেছি।
সাগর পাড়ে কেউ যদি জামা-কাপড় খুলে সাগর জলে নেমেছেন পুণ্যস্নানের জন্য; উঠেই তিনি দেখবেন কোনও কৃষ্ণ তাঁর পোশাক হরণ করে নিয়ে চলে গেছেন। এই কৃষ্ণদের নারী-পুরুষ বাছ-বিচার নেই। মেলার বিভিন্ন প্রান্তে উদ্ধার হত পরিত্যক্ত ব্যাগ, সুটকেস ইত্যাদি। ভয়ার্ত হয়ে ডাকতে হত বোম স্কোয়ার্ডের লোকজনকে। আসলে এইসব কৃষ্ণের দল বস্ত্র বোঝাই ব্যাগ চুরি করে ব্যাগ খালি করে যেখানে সেখানে ফেলে দিত। এমনিতে মেলায় বা যে কোনও ভিড়ে পকেটমার ছিনতাইবাজদের দৌরাত্ম্য বারে। গঙ্গাসাগর মেলায় এই বস্ত্রহরণকারীরা বাড়তি সংযোজন।
মজার ব্যাপার প্রচুর আছে, এক নম্বরে রাখব আমার ড্রাইভার লালের হাওয়াই চটি হারানো। এখানে আসার আগে নতুন কিনেছে। চান করতে গিয়ে চটিটা একটা চৌকির নিচে রেখেছে। চৌকির ওপরে ফুল, বস্ত্র, নারকেল বিক্রি হচ্ছে। চারিদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে ক্রেতারা। লাল ভেবেছে এখানে এত লোকের মধ্যে কে চুরি করবে? সবাই হাসাহাসি করে বললাম ‘সবাই গরু দান করে, লাল জুতো দান করে এসেছে’। লোকজন যে সব বস্ত্র, নারকেল দান করে, সেটা ছুড়লে সাগরের জলে পড়ার আগেই ছেলে-পিলেরা দৌড়ে লুফে নিয়ে নিচ্ছে। ভক্তদের আকুতি, “আরে তোরা একটু সাগরের জলে চুবিয়ে নে!”
একটা বাচ্চা ছেলে থালা পেতে ভিক্ষা নিচ্ছে, পুণ্যার্থী যেই এগিয়ে যাচ্ছে অমনি সে ঘুরে দৌড়ে এসে আবার আগে দাঁড়িয়ে পড়ছে। এভাবে ৪-৫ বার ভিক্ষা নিচ্ছে। ভিক্ষা প্রাপ্ত চাল ভিখারীরা বিক্রি করছে। চাল ক্রেতারা আট টাকা দরে দাড়িপাল্লা দিয়ে মেপে কিনে নিচ্ছেন। এগুলি নাকি ওঁরা ন/দশ টাকা করে বিক্রি করবেন। এক মালদহের মহিলা ভিক্ষা করছেন। উনি দশজন লোক নিয়ে এসেছেন। প্রত্যেকে উনাকে ১০০ টাকা করে দেবে, খাওয়াবে। আর ওনার ভিক্ষাটা ওভারটাইম। এক পূজারি বালির তিনটি ঢিপি বানিয়ে তার ওপর ৫ টাকার কয়েন রেখে পূজা করছেন। পূজারির পায়ের তলা দিয়ে হাত গলিয়ে ১৫ টাকা নিয়ে চম্পট।

কয়েকটি ভালো অভিজ্ঞতা — খোলা আকাশের নীচে আগুন জ্বেলে লিট্টি বানানো। লম্বা জটার সাধু। জটা ছড়িয়ে বসে ভিক্ষা করছেন। জটাটা আসল কিনা সন্দেহ ছিল আমার। এক সাধুর লিঙ্গতে ঘন্টা বাঁধা। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ঘন্টা বাজায়। টপাটপ পয়সা পড়ে। ইসকনের প্রাঙ্গনে ‘সাক্ষীগোপাল’ যাত্রা পালা। তিন নং ব্রিজের সামনে এক মহিলার সুস্বাদু পিঠে তৈরি করা, মূল্য চারটে দশ।
সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ঘরে গরম জল সাপ্লাই আর সূচনাকেন্দ্রের ঘোষণার মাধ্যমে হারানো মানুষ খুঁজে দেওয়া। বেশ সিস্টেমেটিক মেলা। বিশাল এলাকা জুড়ে এক অস্থায়ী নগরী গড়ে ওঠা সত্যি বিস্ময় জাগায়। লাইট, জল, স্যানিটেশন সবের ব্যবস্থা করা।
খারাপ লাগত সারারাত ধরে সূচনা কেন্দ্রের মাইকের চ্যাঁচানি। রাতে হয়তো কোনও নিরুদ্দেশের ঘোষণা নেই তবুও রাত-ভোর অনুপ জালোটার ভজন, রবীন্দ্র সঙ্গীত অন্যান্য ভক্তিগীতি শোনাবে।
এবার ফেরার পালা। গাড়ি নিয়ে সোজা কচুবেড়িয়া। ভেসেলে পার হবার জন্য গাড়ি লাইন দিল। আমাদের অনেকে খেজুর গুড় কিনল। কিলো ৬০ টাকা। কর্নার্জুন লঞ্চে মুড়িগঙ্গা পরোলাম। লট নং আটের জেটিতে মজাদার একটা ভাজা খেলাম। খাওয়ার মজা বাড়াতে বিক্রেতা ক্লাউনদের মতো পোশাক পরে সেজেছেন।
ইতিমধ্যে গাড়ি চলে এলো। আমি মা গঙ্গা ও কপিলমুনিকে প্রণাম জানিয়ে চলে এলাম। এ মেলায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এত জনসমাগম দেখা। একসঙ্গে এত লোক বিগ্রেডেও দেখা মিলবে না। পুরনো লোকের সঙ্গে দেখা। নতুন লোকের সঙ্গে আলাপ। আমার তো মনে হয়ে ছিল সাতদিনের পিকনিক। অতীতে গঙ্গাসাগরে সন্তানসহ অনেক কিছু বিসর্জন দিত। আমার কাছে গঙ্গাসাগর যেন শুধু অর্জনের গল্প, ‘পাওয়া’র কাহিনী।
লেখক এক সময় এস.ডি.পি.ও. বারুইপুর ছিলেন। বর্তমানে রাজ্য পুলিশে ডি.আই.জি. পদে নিরাপত্তা আধিকারিক দপ্তরে কর্মরত।