| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

গঙ্গাসাগর : পুরাণে এবং ইতিহাসে : নির্মল কর

Reporter
নির্মল কর / ১৬৬৩ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৪

সাগরদ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবনাঞ্চলের এই দ্বীপটিরই পৌরাণিক নাম শ্বেতদ্বীপ। এরই দক্ষিণাংশে গঙ্গা যেখানে সাগরের সঙ্গে মিলেছে, সেই স্থানটি গঙ্গাসাগর নামে খ্যাত। সামনে আদিগন্ত সমুদ্র, পেছনে শ্যামল বনানী আর বালুকাময় বেলাভূমির মাঝখানে মহর্ষি কপিলের মন্দির। হিন্দু-মানসে গঙ্গাসাগর একটি মহাতীর্থ হিসেবে গণ্য। সাগরতীরের সার কথা মকর-সংক্রান্তিতে সাগর সঙ্গমে পুণ্যস্নান। তাই যুগ যুগ ধরে সাধুসন্ত ও মোক্ষকামী মানুষের এত ভিড়।

এককালে সাগরদ্বীপ ছিল ১৭০ বর্গ মাইলের এক সমৃদ্ধ জনপদ। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে সামুদ্রিক ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে সাগরদ্বীপের প্রায় দু’লক্ষ মানুষ সমুদ্রের টানে ভেসে যায়। সেই থেকে দ্বীপটি বহুকাল জনহীন এবং শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দে বিদেশি বণিক এবং ইংরেজরা সাগরদ্বীপকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। হবসন জবসন অভিধানে এই দ্বীপের উল্লেখ আছে। জেমস প্রাইস নামে এক ইংরেজের লেখায় দেখা যায়, সাগরদ্বীপের নাম গঙ্গাসাগর। ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে হেজেস এখানে একটি হিন্দুমন্দির দেখতে পান। এখানকার রাজা নাকি বছরে দু’লাখ টাকা তীর্থকর আদায় করতেন। পরে লুইল্লিয়ার নামে আর এক সাহেব সাগরদ্বীপে দুই সাধুকে দেখেছিলেন। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে আলেকজেণ্ডার হ্যামিলটনের বিবরণ থেকে জানা যায়, সাগরদ্বীপ হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র তীর্থস্থান। প্রতি বছর শীতে বহু সাধু ও তীর্থযাত্রী এখানে স্নান করতেন এবং পুজো দিতেন।

পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজ বণিকরা বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য বেছে নিয়েছিলেন সুন্দরবনের খাড়ি আর সাগরসঙ্গমের দ্বীপগুলি। বলতে গেলে ইংরেজরাই সাগরের পুনরুজ্জীবন ঘটান। তাঁরাই যে জঙ্গালাকীর্ণ সাগরদ্বীপে ফের বসতি গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তার সমর্থন পাওয়া যায় ১৮১১ খ্রিস্টাব্দের (৩০ কার্তিক, ১২২৫) ‘সমাচার দর্পন’-এ। ওই বছর ১৪ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘যাহারা গঙ্গাসাগর উপদ্বীপে বসতি করাইবার উদ্যোগ করিতেছে, তাহারা কলিকাতার এক্সচেঞ্জে অর্থাৎ ক্রয়বিক্রয়ের ঘরে গত বুধবার একত্র হইল এবং দশ জন সাহেব ও দুই এতদ্দেশীয় লোককে সেই কর্ম সম্পন্ন করিবার নিমিত্ত নিযুক্ত করিল…।’’ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চার আনা খাজনায় সাগরদ্বীপের ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু সাগরমেলার বর্তমান বাড়বাড়ন্তের নেপথ্যে ইংরেজদের অবদান থাকলেও সাগর উন্নয়নে সেই সময় তাঁদের প্রচেষ্টা খুব যে ফলপ্রসূ হতে পারেনি তার অন্যতম কারণ উপর্যুপরি সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝা ও জলপ্লাবন। ১৮৩৩ ও ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের সাইক্লোন সাগরদ্বীপকে তচতচ করে দেয়। শুধুমাত্র ১৮৬৪-র ঝড়ে পাঁচ হাজার জনের মৃত্যু। এর ফলে দ্বীপের লোকসংখ্যা অনেক কমে যায়। তা হলেও দ্বীপোন্নয়নের কাজ থেমে থাকেনি। বনাঞ্চল মুক্ত করে সেখানে চাষবাদ, হাটবাজার এবং মহাজনের গোলাস্থাপনের ব্যবস্থা হয়েছে। সেই সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও।

ইতিহাসের পাতাতেই নয়, মৎস্য, বায়ু এবং পদ্মপুরাণ শাস্ত্রেরও সাগরতীর্থ সম্পর্কে নানা কথা আছে। কালিদাসের ‘রঘুবংশ’ এবং মধ্যযুগের কয়েকটি মঙ্গলকাব্যেও ছড়িয়ে আছে গঙ্গাসাগর প্রসঙ্গ। ‘মহাভারতে’-এর বনপর্বে দেখা যায়, স্বয়ং যুধিষ্ঠির সাগরসঙ্গমে এসেছিলেন মেগাস্থিনিস, হিউয়েন সাঙের বিবরণেও গঙ্গাসাগর স্থান পেয়েছে।

মুক্তিতীর্থ গঙ্গাসাগর নিয়ে প্রচলিত আছে এক পুরা কাহিনি। অযোধ্যার সূর্যবংশের পরাক্রান্ত রাজা সগর নিরানব্বুই অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপনান্তে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন শততম যজ্ঞে। এই যজ্ঞ সম্পূর্ণ করতে পারলে তিনি স্বর্গরাজ ইন্দ্রের সমপর্যায়ে উন্নিত হবেন। ইন্দ্র সগররাজের শততম যজ্ঞ পণ্ড করতে যজ্ঞের ঘোড়াটি অপহারণ করে লুকিয়ে রাখলেন। সগরের ষাট হাজার পুত্র বহু অন্বেষণের পর যজ্ঞাশ্বের সন্ধান পেলেন মহর্ষি কপিলের নির্জন সাধনক্ষেত্রে, যেখানে মহামুনি গভীর ধ্যানে মগ্ন। এই চৌর্যকর্মটি কপিলদেবের মনে করে রাজপুত্ররা তাঁর দেহে আঘাত করে বসলেন। ঘটনার এই আকস্মিকতায় মহর্ষির কোপানলে পড়ে মুহূর্তেই তাঁরা ভস্মীভুত হলেন। তারপর সগররাজের পৌত্র ভগীরথ কঠোর তপস্যায় গঙ্গাকে মর্তে নিয়ে এলেন। তাঁর পুণ্য সলিলের স্পর্শে পাপমুক্ত হলেন সগরনন্দনরা। সাগরের সঙ্গমস্থল পরিণত হল তীর্থক্ষেত্র গঙ্গাসাগরে। সেখানে একদিন প্রতিষ্ঠিত হল কপিলমুনির আশ্রম। খ্রিস্টিয় ৪৩৭ অব্দে ওখানে একটি প্রচীন মন্দিরের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু নদীর পথ পরিবর্তনের ফলে সে মন্দির সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর পরেও দু’বার মন্দির নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রগ্রাসে কোনওটাই স্থায়ী হয়নি। বর্তমান মন্দিরটি আদি মন্দির স্থল থেকে প্রায় দুই কিমি দূরে অবস্থিত। ১৩৮০-৮১ (ইং ১৯৭৩-৭৪) বঙ্গাব্দে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে এটি তৈরি করেন অযোধ্যার হনুমানগড়ি মঠের মোহন্ত রামদাসজি মহারাজ। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে উইলসন সাহেবের বর্ণনানুযায়ী মন্দির চত্বরে ছিল প্রকাণ্ড এক বটবৃক্ষ, যার পাদদেশেই ছিল শ্রীরাম ও হনুমানের মূর্তি। মন্দিরাভ্যন্তরে আজও বিরাজমান লালসিঁদুরে পরিলিপ্ত শিলাময় কতিপয় বিগ্রহ। প্রথমেই চোখে পড়ে পদ্মাসনে যোগারুঢ়, জটাশ্মশ্রুমণ্ডিত মহাযোগী কপিল, যাঁর বামহস্তে কমণ্ডুল, ঊর্ধে উত্থোলিত দক্ষিণ-করে জপমালা। শিরোদেশে পঞ্চনাগ-ছত্র। ডানপাশে চতুর্ভুজা মকর বাহিনী গঙ্গাদেবী, যাঁর অঙ্কে মহাতাপস ভগীরথ। স্বল্পদূরে গদা ও গন্ধমাদন পর্বত হস্তে মহাবীর হনুমান। কপিল বিগ্রহের বাঁয়ে ষাট সহস্র সন্তান বিয়োগ বেদনায় মুহ্যমান নগররাজ, যিনি মহর্ষি কপিলের করুণায় বীতশোক। রাজমূর্তির বাঁয়ে অষ্টভুজ সিংহবাহিনী বিশালাক্ষীদেবী। সর্ব বাঁয়ে অশ্বের বল্গাহস্তে ইন্দ্রদেব। মন্দিরের আশেপাশে রয়েছে কিছু দেবস্থান ও আশ্রম। যথা—স্বামী কপিলানন্দ মহারাজের আশ্রম, চিন্তাহরণেশ্বরের মন্দির, সীতারাম ওঙ্কারনাথের যোগেন্দ্রমঠ, মহানির্বাণ আশ্রম, ভারতসেবাশ্রম সঙ্ঘের ধর্মশালা, সেচবিভাগের ডাকবাংলো এবং বেগুয়াখালির হাওয়া অফিস। কপিলমুনি আশ্রমের পরম্পরাগত পুরোহিত অযোধ্যার যাজনিক ব্রাহ্মণেরা প্রত্যহ মন্দিরে পাঁচবার পূজারতি করেন—রাত দ্বিপ্রহরে ভোগারতি, সায়াহ্নে সন্ধ্যারতি এবং রাত ন’ঘটিকায় শয়নারতি।

গঙ্গাসাগরকে নিয়ে প্রচলিত আছে এক বিখ্যাত প্রবচন: ‘‘সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।’’ কথাটার যথার্থ ব্যাখ্যা মেলে ‘খনার বচনে’। খনা বলেছেন, ‘‘সারা বছর যাঁরা শয়ন একাদশী, ভৈমী একাদশী, উত্থান একাদশী, পার্শ্ব একাদশী, জন্মাষ্টমী, রামনবমী, শিব চতুর্দশী বা দুর্গার মহাষ্টমীর মতো শাস্ত্রীয় আচারের একটিও পালন করতে পারবেন না, তাঁরা যদি পৌষ সংক্রান্তির দিন শুধু একবার সাগরসঙ্গমে স্নান করেন, তা হলে সর্বতীর্থের পুণ্য অর্জন করবেন।’’ তারই অমোঘ আকর্ষণে প্রতি বছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এবং সাধুসন্ত তীর্থ ও মুক্তির আশঙ্কায় এখানে ছুটে আসেন, এমনকী বিদেশ থেকেও। সাগরদ্বীপ পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। সেই সঙ্গে বিস্তীর্ণ বেলাভূমি জুড়ে বসে নানা পণ্য পসারের এক বিশালমেলা। শস্ত্রীয় স্নানপর্ব একদিনের হলেও গঙ্গাসাগর মেলা চলে পক্ষকাল। শীতের হিমেল হাওয়ায় বালিয়াড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গমে সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে পুণ্যার্থীরা আদিগন্ত জলসীমায় পৌঁছে যান। সাধারণ তীর্থযাত্রীদের কাছে সাগরমেলার প্রধান আকর্ষণ নাগাসন্নাসী আর হিমালয়ের সাধুসন্ত। কিন্তু ইদানীং বড়মাপের যোগী মহাত্মাদের বড় একটা দেখা যায় না। তবু কিছু ভবঘুরে হটযোগী মাধুকরী বৃত্তিধারী সাধু এবং গৈরিকবসনধারী পরিব্রাজক সাগরমেলা জমিয়ে তোলেন। বিচিত্র কামনাবাসনা নিয়েও একদল মানুষ আসেন, যাঁরা স্নানান্তে প্রার্থনা জানিয়ে সন্তানের স্বাস্থ্য ও অর্থের জন্য মানত করেন। একদা গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রথা ছিল। সন্তানহীনরা এই মর্মে মানত করতেন যে, তাঁদের সন্তান হলে প্রথমটিকে সাগরে অর্ঘ দেবেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ওয়েলেসলি এসে দেখলেন, ওই বছরেই তেইশটি শিশু সন্তান বিসর্জনের ঘটনা ঘটেছে। পরে আইন করে এই নির্মম প্রথা তিনি নিষিদ্ধ করে দেন। কিন্তু পরনো প্রথা স্মরণে আজও কখনও চোখে পড়ে প্রথম সন্তানকে সাগরজলে বিসর্জন দিয়েই তুলে নিচ্ছেন কোনও মা। রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় সাগরসঙ্গমে সন্তান বিসর্জনের করুণ কাহিনী তো সকলেরই জানা।

গঙ্গাসাগরের যাত্রাপথটি বিংশ শতাব্দের গোড়ার দিকেও ছিল দুর্গম এবং শ্বাপদসঙ্কুল। তীর্থ করতে যাঁরা আসতেন, তাঁদের অনেতেই বাঘ, বন্যশুয়োর, বিষধর সাপ আর নোনাজলের কুমির হাঙরের আক্রমণে প্রাণ হারাতেন। তা ছাড়া কলেরা বসন্ত এবং নানা সংক্রমক ব্যাধিতেও মানুষ মারা যেতেন। চোর-ডাকাতের দৌরাত্ম্য তো ছিলই। তবু সাগরমেলার তীর্থযাত্রীর অভাব হয়নি কোনও দিন। স্বগৃহে আর ফেরা হবে না, এই মন নিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছেদ বিদায় নিয়ে তীর্থযাত্রীরা গৃহত্যাগ করতেন। নৌকা বজরা ছাড়া তখন যন্ত্রচালিত যানবাহন ছিল না বলে যাত্রীদের অধিকাংশ পথ পদব্রজে অতিক্রম করতে হত। পরিষেবা বলতে তখন কিছুই ছিল না। সাগরযাত্রীদের সাহায্যে এবং সেবাশুশ্রূষার কাজে প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন খাঁদুরাম নামে মেদিনীপুরের এক ধার্মিক রাজা। তিনি দরিয়াপুর থেকে নৌকাযোগে সাধু সন্নাসী এবং সাধারণ তীর্থযাত্রীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতেন। তা ছাড়া পানীয়জল এবং ওষুধপত্র দিয়েও সাহায্য করতেন। পথে চোরডাকাতের উপদ্রব রুখতে সঙ্গে দিতেন সৈন্য-সামন্ত।

বর্তামানে সাগরযাত্রা অনেক সহজগম্য হয়েছে। জঙ্গিহানার আশঙ্কায় এ বছর সাগরে পুণ্যস্নানের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ডের হোভাব-ক্রাফট, বি এস এফ-এর লঞ্চ ছাড়াও ভারতীয় নৌবাহিনী সাগরদ্বীপ সংলগ্ন জলসীমায় প্রহরায় থাকছে। ১৪ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তির ব্রহ্মমুহূর্ত থেকে এবার প্রায় ছয় লক্ষ পুণ্যার্থী পুণ্যস্থান করবেন।

প্রাচীনত্ব ও বৈশিষ্ঠের দিক থেকে সাগরমেলা ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় তীর্থ হওয়া সত্ত্বেও মেলা, যাত্রীপরিষেবা এবং সাগর উন্নয়ন খাতে এক কানাকড়িও সাহায্য করে না কেন্দ্রীয় সরকার এবং অযোধ্যা ট্রাস্ট। বরং প্রণামীবাবদ গৃহীত লক্ষ লক্ষ টাকা, সোনাচাঁদি এবং অন্যান্য অর্ঘ বস্তাবন্দি হয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খরচে চলে যায় অযোধ্যার হনুমানগড়ি মঠে। এই আয়ে কোনও অধিকার নেই রাজ্য সরকারের। আছে শুধু মেলা উপলক্ষে এক বিরাট ব্যয়ভার আর মাথাব্যথা। ফলে তীর্থযাত্রীদের জন্য এখানে আজও গড়ে ওঠেনি কোনও যাত্রীনিবাস ও শৌচাগার, ব্যবস্থা হয়নি স্থায়ী বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের। এ সব নিয়ে স্থানীয় মানুষদের ক্ষোভ বহুদিনের। অযোধ্যা ট্রাস্টের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করেও কোনও ফল হয়নি। কেননা, কপিল মন্দিরের মালিকানা হনুমানগড়ি মঠের রামানন্দ পন্থীদের। কয়েক শতাব্দ আগে মন্দিরটি তাঁরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরন্তু রামায়ণের যুগে বঙ্গদেশ নাকি, অযোধ্যা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। সুতরাং রাজ্যের চরম আর্থিক সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে মেলা কমিটি এ বছর সাগরে পুণ্যস্নানের আয়োজনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বেসরকারি পর্যটন এবং বিজ্ঞাপন এজেন্সিকে। তাদের কাছ থেকে রাজ্য সরকার রাজস্ব আদায় করবে। চারটি পর্যটন সংস্থার উদ্যোগে ভি আই পি ভিলেজ হচ্ছে, যেখানে আধুনিক নগর জীবনের সমস্ত পরিষেবা পাওয়া যাবে। সর্বোপরি মেলায় অসুস্থ তীর্থযাত্রীদের চিকিৎসার জন্য চালু হচ্ছে টেলি-ইনফোটিক সার্ভিস।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev