পঞ্চায়েতের উন্নয়নমূলক কাজের ফলে অনেক অঞ্চল আজ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা লাভ করছে। গ্রামে নগরায়নের ছোঁয়া লেগেছে। উদয়নারায়ণপুর হাওড়া জেলার পরিচিত এক বিধানসভা কেন্দ্র। এই এলাকার অন্তর্গত এমন কিছু পঞ্চায়েত আছে যা সুযোগ সুবিধার দিক থেকে বিচার করলে শহরের স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। এমনই একটি উল্লেখযোগ্য অঞ্চল হলো গড়ভবানীপুর। উত্তরে হুগলি জেলার দিল-আকাশ থেকে দক্ষিণে হাওড়া জেলার পেঁড়ো পর্যন্ত রোন নদীর দুই তীরে সাত আট বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে গড়ভবানীপুর। দামোদর নদীর নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত এই অঞ্চল। মূলত এটি বন্যা প্রবণ এলাকা। ১৯৭৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৩০ বারের কম-বেশি বন্যা হয়েছে এই অঞ্চলে। এখানে আছে ১০০টি গ্রাম ও ৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত। এই অঞ্চলে রাস্তা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ব্যবস্থা, নিকাশি, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সব বিষয়েই নতুনত্ব এসেছে। এলাকার মানুষ শুধুমাত্র চাষের ওপর এখন নির্ভরশীল নন। নানা রকম কুটির শিল্পের সঙ্গে এখন তাঁরা যুক্ত। একটি বাড়ির মধ্যে দুইজন মানুষ চাষ করলেও বাকি আরও ৪ থেকে ৫ জন মানুষ শোলার কাজ, জড়ির কাজ, বাটিকের কাজ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত। পাকা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একদিকে যেমন সবুজ ধানের খেত চোখে পড়ছে, ঠিক একই ভাবে চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না সুসজ্জিত উদ্যানগুলি। পুকুর সংস্কারও হয়েছে অনেক জায়গাতে। বিশেষত পর্যটন শিল্পতেও গড়ভবানীপুর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
যে কোনও দেশ তথা রাজ্যের অর্থনৈতিক মানদণ্ড নির্ভর করে কৃষি ও শিল্পের মেলবন্ধনের ওপর। দেশ এগিয়ে চলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই কাজটিই করছেন খুব দক্ষতার সঙ্গে। সম্প্রতি বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলনে আমরা দেখলাম শিল্পপতিদের ভিড়। একই সঙ্গে সৃষ্টি হলো এই রাজ্যে একাধিক শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা। শিল্প হলে কর্মসংস্থান আরও বাড়বে। আমাদের গড়ভবানীপুর অঞ্চল থেকে রাজ্যের রাজধানী কলকাতা যাবার যাতায়াতের ব্যবস্থা খুবই সুগম। ট্রেন, বাস পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। কুটির শিল্পের জন্য এই অঞ্চলটির নাম সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে শোলার কাজ, জড়ির কাজ, পাটের নানারকম হস্তশিল্প খ্যাতি লাভ করেছে। অঞ্চলের বেশিরভাগ বাড়ির মহিলারা এই সমস্ত কাজের সঙ্গে বংশপরম্পরায় যুক্ত। শিল্প সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের রসদ খুঁজে পান। রাজ্য সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের জন্য আজ গ্রামের মহিলারা অনেকবেশি স্বাবলম্বী। শিল্প সামগ্রি কেনা থেকে শুরু করে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে আর আজ অন্য কারোর উপর গ্রামের মহিলাদের নির্ভর করতে হয় না। এছাড়া কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, খাদ্যসাথীর মতো একাধিক প্রকল্পের সুযোগ পাচ্ছে এলাকাবাসী। এবার আসি গড়ভবানীপুরের কয়েকটি পরিচিত কুটির শিল্পের কথায়।

শোলা শিল্প — এটি গ্রাম বাংলার নিজস্ব একটি শিল্প। গড়ভবানীপুর অঞ্চলে বেশ কিছু বাড়ির উঠোনে প্রতিদিন সকালে দেখতে পাওয়া যায় শোলা কেটে, আলতার জলে চুবিয়ে তা শুকনো করার ছবি। বছরের শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কাঁচা অবস্থায় শোলা পাওয়া যায়। মূলত জলা জমিতে শোলা গাছ জন্মায়। ডালপালা বিশিষ্ট এই গাছগুলি ৩ থেকে ৫ ফুট লম্বা হয়। শোলার কাজের জন্য এই গাছের কান্ড ব্যবহার করা হয়। হাওড়ার মাজু, জালালশি, মুন্সিরহাটের বিস্তীর্ণ জলা জমিতে এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। কাঁচা শোলা রোদে প্রায় ৬-৭দিন ধরে শোকানো হয়। আবহাওয়া খাবাপ থাকলে সময় আরো বেশি লাগে। শুকনো হয়ে যাবার পর ছুড়ির সাহায্যে পাতলা করে শোলাগুলি কেটে বাড়িতে তৈরি আঠার সাহায্য চাঁদমালা বা টোপরের কাঠামো তৈরি হয়। এরপর চুমকি, ভেলভেট ও নানা রকম রঙের পাথর বসিয়ে তিন ধাপ বিশিষ্ট চাঁদমালা প্রস্তুত করা হয়।

হ্যান্ড বাটিক শিল্প — গড়ভবানীপুরের অনেক মহিলা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই কাজের জন্য দরকারি কাপড়ের থান আনা হয় কলকাতার বড়বাজার থেকে। এক-এক রকম জিনিসের জন্য এক-এক ধরনের কাপড় লাগে। প্রথমে এই কাপড়গুলিকে প্রয়োজন মতো কেটে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা পর্যন্ত জলে ডুবিয়ে রাখতে হয়। তারপর সেটি শুকিয়ে কার্বন পেপারের সাহায্যে নানা রকম নকশা আঁকা হয়। এর পরবর্তী পর্যায়ে কাপড়টির যে অংশে কোনও রং হবে না অর্থাৎ সাদা থাকবে সেই অংশ পুটন্ত মোম আর রজন-এর মিশ্রণের প্রলেপ লাগানো হয় তুলির সাহায্যে। তারপর সালফিউরিক অ্যাসিড ও রঙের মিশ্রণ গরম অবস্থায় রেখে আর একটি পাত্রে জল নিয়ে কাপড়টি একবার রঙের জলে ও পরের বার রং বিহীন জলে ৫ মিনিট করে মোট ৩ বারে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হয়। তারপর পুনরায় শুকিয়ে যতগুলি রং ব্যবহার করা হবে ততবার আলাদা আলাদা করে সালফিউরিক অ্যাসিড মিশ্রিত জলে ৩ বার করে ডোবাতে হবে। আগের রং হয়ে যাওয়া অংশ মোম দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। সব শেষে বড় পাত্রে জলে সার্ফ মিশিয়ে তাতে কাপড়টি ভিজিয়ে মোম তোলা হয়। তারপর কাপড়টি আবার শুকনো করে, ইস্ত্রি করে তা বিক্রি করা হয়। এইভাবে তৈরি হয় বিছানার চাদর, শীতের শাল, উত্তরীয়, চুড়িদার ইত্যাদি। শহরের বিভিন্ন মেলায় এই সমস্ত জিনিস পাওয়া যায়। দিল্লি, বম্বে, দেবাদুন ইত্যাদি জায়গাতেও বাটিকের জিনিস এখান থেকে রপ্তানি হয়। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন আমাদের রাজ্যই সমস্ত স্কুলের পোশাক তৈরি হবে। এর জন্য ব্যবহৃত কাপড়ও আমরাই তৈরি করবো। এই ঘোষণার পর গ্রাম-বাংলায় শিল্পের প্রসার আরো বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস।

জরি শিল্প — এটিও আমাদের রাজ্যের একটি পরিচিত শিল্প। হাওড়া জেলার বাগনান, উলুবেড়িয়া, আন্দুল, ডোমজুর, গড়ভবানীপুর ইত্যাদি অঞ্চলে ঘরে ঘরে জরি শিল্পের কাজ দেখা যায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই শিল্পেরও পরিবর্তন ঘটেছে। আগে জরি শিল্পের মধ্যে শুধু আড়ি সেলাইয়ের কাজ হতো। এখন পাথর ও চুমকির কাজ হয়। একটা শাড়িতে চুমকির কাজ করতে ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। ওস্তাদগাররা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের বাড়িতে এসে কাপড়, জরি, চুমকি, আঠা, ছুঁচ, সুতো ইত্যাদি দিয়ে যায় ও কাজ শেষ হলে তাঁরাই আবার তৈরি কাপড় নিয়ে যায়।

চট শিল্প — পশ্চিমবঙ্গ চট শিল্পের শক্ত ঘাঁটি। বর্তমান গময়ে চটের ব্যাগ, চটের জুতো, চটের তৈরি নানান ঘর সাজাবার সামগ্রীর চাহিদা অনেক বেড়েছে। পরিবেশের পক্ষে প্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর তা এখন সকলে বুঝছে। তাই প্লাস্টিক বর্জন করে চটের ব্যাগ বা থলের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। বড় বড় শহরের বিভিন্ন মলেও এখন চটের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এই সব ব্যাগ তৈরি করেন আমাদের গ্রাম-বাংলার ঘরের মেয়েরাই। এঁরা অনেকেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য। এছাড়া শহরের নানা মেলায় শিল্পীরা নিজেরাই এই সমস্ত জিনিস বিক্রি করেন।
গ্রামেররূপ বদলাচ্ছে। এখন ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূর’ কলসি কাঁকে পুকুর থেকে উঠে আসার ছবি দেখতে পাওয়া প্রায় যায় না। তার পরিবর্তে দেখা যায় তাঁরা সাইকেলের কেরিয়ারে বড় বড় কাপড়ের গাঁট নিয়ে চলেছে পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে। এঁরা বেশিরভাগই এখন সাবলম্বী। এই অঞ্চলের শিল্পীদের সরকারি তরফে ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চান রাজ্যের কুটির শিল্পের আরও অগ্রগতি ঘটুক। মহিলারা আরও উৎসাহের সঙ্গে কাজ করুন। আমরা প্রতিবছর সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকি। এই প্রশিক্ষণ নিয়ে মহিলারা আজ সসম্মানে উপার্জন করছেন।
সমীর পাঁজা, বিধায়ক, উদয়নারায়ণপুর