গোয়ায় গণপতি আসেন ক্যাসিনো, কাসা (ভিলা), চার্চ আর কাজু গাছের ছায়ায় ছায়ায়। ‘ভক্তজনাঞ্চে’ দর্শন দিতে শিঙা, তাসাবাদ্যি বাজিয়ে মহারাষ্ট্র, গোয়ার ঘরে ঘরে, গলিমহল্লায় বাপ্পার আবির্ভাব। শিঙাধ্বনিতে অনভ্যস্ত বাঙালি কল্পনা করতেই পারে শিবাজী মহারাজ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন বুঝি! তারপর একটু পুরাণটুরাণ ঘাঁটলে দেখা যায় গণপতিও কম যুদ্ধ-নিপুণ ছিলেন না। স্বয়ং পিতা মহাদেব, পরশুরামের সঙ্গে লড়াই করেছেন। আরো কত অসুর নিধন করেছেন।
গণপতি উৎসবের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় আন্দোলনকে সুসংগঠিত ও সংঘবদ্ধ করার জন্যে। চরমপন্থী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক গণেশপুজোকে জাতীয় উৎসবে পরিণত করেন। তাই তাঁর আগমনে শিঙা বাজতেই পারে। তিনি আসলে মাল্টিটাস্কার দেবতা। গজাননের শুঁড়ওয়ালা মস্তকটি জ্ঞান-বুদ্ধিতে ঠাসা। তিনি যুদ্ধ করতে পারেন। মহাভারত লেখার কাজ করেন। বীণা বাজাতে পারেন। বাজান তালবাদ্যও। নাচতেও পারেন।

চেহারা দেখে বোঝাই যায় তিনি খেতেও বড় ভালোবাসেন। গোয়াতে মেওয়া, নারকেলনাড়ুর পুর দিয়ে গণেশের জন্যে তৈরি হয় ময়দার মিষ্টি নেভারি। যাকে আমরা পেড়াকি বলে জানি। মোদকপ্রিয় গজাননের জন্যে বাজার আলো হয়ে আছে রঙবেরঙের নানা স্বাদের মোদকে। হৃষ্টপুষ্ট গন্নু ভগবানের জন্যে “লাড্ডুয়ন কা ভোগ চড়ে আর চড়ে মেওয়া”।
গতকাল পানাজির বাজারে চেনা ফলফুলের পাশাপাশি অনেক অচেনা রঙিন ফল, বীজ, ঘাস, পাতা। কোঙ্কনী বাঈরা ব্যস্ত গ্রাহক সামলাতে। তাদের আমার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। তবু মাতোলি, মাতোলি শব্দে যেটুকু বোঝা গেল এসব রঙবেরঙের ফলপাতায় সাজানো হবে গণপতির আসন। গোয়ার অকৃপণ প্রকৃতির রঙে রসে বিরাজিত হবেন তিনি। তাঁর আসনের পিছনে চালচিত্রের মত একটি ফ্রেমে ঝুলবে টিমলা, মাত্তা, কাঙলা এমনি নামের আরও কত অজানা ফুল ও ফল।

সিদ্ধিদাতা পিতা আশুতোষের মতই অল্পে সন্তুষ্ট। তিনি ভক্তের ভগবান। পুণের কাছে মোরেগাঁওতে মোরিয়া নামের এক ভক্ত উপাসকের নাম একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে তিনি ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’।
গোয়ার গণেশপুজোয় প্যান্ডালের আধিক্য, সাজসজ্জার ছটা নেই। কোলে চড়ে গন্নুভগবান কোঙ্কনী পরিবারে এসে দেড়দিন, তিনদিন, পাঁচদিন, সাতদিন থাকতে পারেন। এই ক’দিন তালা বন্ধ করে তাঁকে একলা বাড়িতে রাখা যায় না। সকাল বিকেল আরতি ফলমিষ্টির প্রসাদ দিয়ে ভোলাভালা এই পার্বতীপুত্রটিকে সন্তুষ্ট করা যায়।

তবে চারদিন পরেই ছেলের অদর্শনে ব্যাকুল হয়ে গণেশ জননী পতির কাছে কাতর আবেদন জানান, —
“গিরি, গণেশ আমার শুভকারী/তারে না দেখিলে ঝরে নয়নবারি”।
ছেলের টানে তিনি তড়িঘড়ি এসে পৌঁছন এ ধরাধামে। পরনে উজ্জ্বল রঙের নওয়ারী শাড়ি, খোঁপায় ফুলের বেণী, নাকে নথ, কপালে অর্ধচন্দ্র টিপ পরে গৌরীকে বরণ করেন কোঙ্কনী মহিলারা। গৌরীকেও তাঁরা সাজান এমন সাজে। ছেলের মত শুধু ফলমিষ্টিতে তাঁর মন ওঠে না। তাঁর পছন্দ মশালাদার খাবার দাবার। তাঁর জন্যে জেলে পরিবারের হেঁশেলে তৈরি হয় মাছ-ভাত-ভাকরি (চালের রুটি)-রসালো সব্জি-মাংস-চিংড়ি-কাঁকড়া।

তাঁর ভোগের থালায় সাজানো থাকে দু-তিন রকমের চাটনি, রাওয়া অর্থাত সুজির প্রলেপ দেওয়া মাছভাজা নারকেলের দুধ,আদা-রসুন-পেঁয়াজ-টম্যাটো মশলা দিয়ে বানানো মাছমাংস নৈবেদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন পার্বতী। পাশাপাশি বসিয়ে মা আর ছেলেকে তাঁদের পছন্দমত ভোগ নিবেদন করা হয়। ‘আপ রুচি খানা’, ব্যক্তিস্বাধীনতার এক সুন্দর উদাহরণ প্রতিষ্ঠিত হয় গোয়ার সাধারণ মানুষগুলির ঘরে ঘরে।