সৌম্য সিংহ
অবাক করার মতোই ঘটনা। এই তো সেদিনও কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিতে তিনিই ছিলেন শেষ কথা। হুরিয়তের পাকিস্তান-প্রেমীদের কাছে তিনিই ছিলেন আদর্শ। কারণ কাশ্মীরের পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে সরাসরি সওয়াল করেছিলেন তিনি। তা হলে কী এমন হলো যে একেবারে অল পার্টি হুরিয়ত কনফারেন্স থেকেই আচমকা পদত্যাগ করে বসলেন সৈয়দ আলি শাহ গিলানি? সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার, শুধু পদত্যাগই করলেন না, সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুললেন হুরিয়ত নেতাদের দিকেই এবং বুঝিয়ে দিলেন, তাঁদের আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়েই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, কট্টরপন্থী এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এমন একটা সময়ে এই অবাক করা সিদ্ধান্তটা নিলেন, যখন ভারত-চিন এবং ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। স্বাভাবিকভাবেই গিলানির পদত্যাগ জম্মু-কাশ্মীর তো বটেই, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের হুরিয়ত মহলেও একটা বড় ঝাঁকুনি বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাকপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে এ হতে পারে এক বড় ধাক্কা।
কিন্তু গিলানির এই সরে যাওয়ার নেপথ্যে আসল কারণ কী থাকতে পারে? নিছকই বয়সের ভার? হ্যাঁ, বয়স অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর। কারণ, জীবনে ফেলে আসা বছরের সংখ্যাটা ৯১। কিন্তু শুধুই কি তাই? মোটেই নয়। এটা স্পষ্ট যে হুরিয়ত কনফারেন্সে ক্রমশই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিলেন তিনি। সীমান্তের ওপারে তো অবশ্যই, এপারেও। ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির পরে তিনি খুব আশা করেছিলেন, প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলবে হুরিয়ত। কিন্তু তা হয় নি। ব্যাপক গ্রেফতারি অভিযানের মধ্যেও তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন মুক্ত হুরিয়তিদের সঙ্গে। উসকে দিতে চেয়েছিলেন আন্দোলনের আগুনকে। কিন্তু সেভাবে সাড়াই পাননি তথাকথিত নিজের লোকেদের কাছ থেকেও। অন্যদিকে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আই এস আই এবং অবশ্যই তাদের মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নাকি এর জন্য দায়ী করেছিল গিলানিকেই। ফলে ভেতরে ভেতরে বেশ ভেঙেও পড়েছিলেন গিলানি।
অন্যদিকে হুরিয়ত নেতাদের লেখা এক চিঠিতে অধিকৃত কাশ্মীরের হুরিয়ত নেতাদের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র ক্ষোভও কিন্তু চেপে রাখতে পারেন নি গিলানি। উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কাশ্মীরি নেতাদের একাংশের দুর্নীতি নিয়েও। মুখের ওপরে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এই দুর্নীতির দায় তিনি নিতে পারবেন না। ওপারের হুরিয়ত নেতাদের ক্ষমতা সম্পর্কেও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাঁর মতে, কাউকে কাউকে প্রশাসন এবং আইনসভার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, তাঁরা আসলে নিছকই প্রতিনিধিমাত্র। সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও ক্ষমতাই নেই তাঁদের। এখানেই শেষ নয়, ওপারের হুরিয়ত যে গিলানির কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল তার প্রমাণ, সংগঠনের একটা অংশ সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অধিকৃত কাশ্মীরে একটি সম্মেলন করে সম্প্রতি এবং সেখানে খোলাখুলিই সংগঠনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। অদ্ভুত বিষয় হলো, করোনা-নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই এপারেও শ্রীনগরে একইভাবে হুরিয়তের একটি সম্মেলন হয়,যেখানে পাক-কাশ্মীরের বিদ্রোহীদের সম্মেলনের সমর্থনে প্রস্তাবও নেওয়া হয়। এটা নিশ্চিতভাবেই একটা বড় ধাক্কা এই প্রবীণতম শীর্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার কাছে। কারণ, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রতি নিঃসন্দেহে এ একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
জোরদার ধাক্কা খেয়েছিলেন, সংগঠনে নিজের উত্তরাধিকারি মনোনয়নের প্রশ্নেও। তেহরিক-ই-হুরিয়তের নেতৃত্বে বসাতে চেয়েছিলেন ছেলে নইমকে। বাধ সেধেছিল আই এস আই। তা ছাড়া সন্ত্রাসে অর্থ জোগানোর অভিযোগে তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়েছিলেন নইম। গ্রেফতার হয়েছিলেন গিলানির জামাই ফান্টুশ। ফলে রীতিমতো চাপে পড়ে গিয়েছিলেন পাক মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এক সময়ের অবিসংবাদিত নেতা। আজাদ কাশ্মীরের সমর্থকরাও আর তেমন পাত্তা দিচ্ছিলেন না গিলানিকে। আকর্ষণ বাড়ছিল তুলনামূলকভাবে তরুণ নেতৃত্বের প্রতি। সব মিলিয়ে গিলানির বুঝতে বাকি ছিল না, কত তাড়াতাড়ি মাটি সরে যাচ্ছে তাঁর পায়ের তলা থেকে। হতে পারে, তাই সম্মান থাকতে থাকতেই সরে গেলেন তিনি। হয়তো নিজেকে একটু বিশ্রাম দিতেও। আবার এমনও হতে পারে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে সংগঠনের মাথায় আরও ভালোভাবে জাঁকিয়ে বসার জন্য পদত্যাগের নাটকটা আসলে সৈয়দ আলি শাহ গিলানির একটা কৌশলমাত্র।