প্রায় অর্ধশতাব্দী হতে চললো তিনি নেই। তবুও আজও তাঁর গান কানে এলে যেন মনে হয়, ভারতীয় উপমহাদেশে তিনিই হতে পারতেন শতাব্দীর সেরা কন্ঠশিল্পী। যদি না তাঁর জীবনের পথটা ফুরিয়ে যেতো এতো তাড়াতাড়ি। হ্যাঁ, প্লে-ব্যাক ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই এক স্বতন্ত্র ঘরানার জন্ম দিয়েছিলেন গীতা দত্ত। হিন্দি এবং বাংলা ছবিতে তো বটেই, মারাঠি,গুজরাটি,পাঞ্জাবি সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার ছবিও ভিন্নমাত্রা পেয়েছিল তাঁর নেপথ্যকন্ঠের জাদুতে। শচীনকর্তা থেকে হেমন্তকুমার—সব প্রতিভাতেই তিনি ছিলেন সমান মানানসই। তবুও থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল তাঁকে। একান্তই ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা অস্থির করে তুলেছিল গীতা দত্তকে। কিন্তু মনের জোরে ঠিক যখনই ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলেন তিনি, তখনই মৃত্যু এসে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এই অনন্য প্রতিভাকে। মাত্র ৪১ বছর বয়সেই। দিনটা ছিল ১৯৭২-এর ২০ জুলাই।

বিয়ের আসরে গীতা দত্ত, গুরু দত্ত
সামান্য সুযোগেই অসামান্য
দু’টো গানে মাত্র দু’টো লাইনে কন্ঠদান। ছবির নাম ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’। কিন্তু এই সামান্য সুযোগেই প্রতিফলিত হয়েছিল ১৬ বছরের মেয়েটির অসামান্য গায়কী প্রতিভা। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ছবির সঙ্গীত পরিচালক কে হনুমান প্রসাদ। সালটা ছিল ১৯৪৬। একেবারেই নতুন। ফরিদপুরের জমিদারির মায়া কাটিয়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে মাত্র বছর চারেক আগে পাকাপাকিভাবে বম্বেতে (মুম্বাই) উঠে এসেছেন কিশোরী গীতা। সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলতে নিয়মিত তালিম দিতে শুরু করলেন হনুমান প্রসাদজি। বেশ চলছিল সঙ্গীত সাধনা। চাহিদা বাড়ছিল ছায়াছবি আর আধুনিক গানে। কিন্তু আচমকাই মনের দুয়ারে হাজির রোম্যান্স। সাড়া জাগানো উঠতি পরিচালক গুরু দত্তের হাত ধরে। হিন্দি ছবি ‘বাজি’র গান রেকর্ডিং এর সময় প্রথম দৃষ্টি বিনিময়। তারপরে অবশ্য হৃদয় বিনিময় আর শুভ পরিণয় ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। ছাদনাতলায় শুভদৃষ্টি ২৬ মে ১৯৫৩।
বিচ্ছেদের যন্ত্রণায়
নতুন আশায় বুক বেঁধে নতুন করে পথ চলার শুরু নবদম্পতির। স্ত্রীকে প্রোজেক্ট করতে নতুন ছবি হাতে নিলেন গুরু দত্ত। নাম ‘গৌরী’। কিন্তু দুর্ভাগ্য শ্যুটিং শুরুর দিন কয়েকের মধ্যেই স্থগিত হয়ে গেল ছবির কাজ। স্পষ্টতই হতাশ নবদম্পতি। ঠিক এই সঙ্কটের মুহূর্তেই চিড় দেখা দিল দাম্পত্য সম্পর্কেও। গুরু দত্ত প্রেমে পড়লেন ওয়াহিদা রহমানের। পরিণতিতে বিচ্ছেদ গীতা দত্তের সঙ্গে। প্রতিভার কথা ভুলে নিজেকে নেশায় ডুবিয়ে রাখতে শুরু করলেন ৩ সন্তানের মা গীতা দত্ত।

গীতা দত্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্তোষ সেনগুপ্ত
অস্থির হৃদয়
স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়লো কেরিয়ারেও। বছরটা সম্ভবত ১৯৫৮। শচীনদেব বর্মনের সঙ্গে তখন কোনও কারণে দুরত্ব বাড়ছে লতাজির। আশাকেও সেভাবে নিতে পারছেন না কর্তা। গীতা দত্তই তাঁর পছন্দের তালিকায় তখন এক নম্বরে। তাঁকে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এস ডি বর্মন। কিন্তু আনমনা গীতাজি কিছুতেই মন বসাতে পারলেন না শচীন-কর্তার নিজস্ব স্টাইলে। নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেন না তাঁর ঘরানায়। বাধ্য হয়ে আশাজিকে নিয়েই কাজ শুরু করলেন শচীন দেব বর্মন এবং ও পি নায়ার। ততদিনে নেশায় ডুবে গেছেন গুরু দত্তও। দোসর স্লিপিং পিল। ১৯৬৪ তে গুরু দত্তের মৃত্যু চরম বিপর্যয় ডেকে আনলো গীতাজির মনে। যাকে বলে একেবারে ভেঙে পড়লেন তিনি। নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হলেন তিনি।
কেন এমন ট্র্যাজেডি!
তবুও মনের জোরে আবার ফিরে এসেছিলেন গীতাজি। সফল কামব্যাক। কিন্তু এবারে পথ আগলে দাঁড়ালো মৃত্যু। সিরোসিস অফ লিভারের পথ ধরে সে এলো মাত্র ৪১ বছর বয়সেই। অসমাপ্ত থেকে গেলো ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
তবু মনে রেখো
এতো ঘাত-প্রতিঘাত সামলেও প্রায় ১২০০ হিন্দিগানে কন্ঠ দিয়েছেন তিনি। হেমন্তকুমারের সঙ্গে তাঁর দ্বৈতকন্ঠ আজও অম্লান,অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দি আর বাংলা গানের দুনিয়ায়। শচীনদেবের সুরে ‘মেরা সুন্দর স্বপ্ন বীত গায়া’, ‘ও স্বপ্নেওয়ালি রাত’, ‘হাম আপকে আঁখো মে’- হারিয়ে যাবে না কোনওদিনই। আর হেমন্তর সঙ্গে ‘তুম আউর হাম,ভুল কী স্বরগম’, ‘মুঝকো তুম যো মিলে’, ‘জয় জগদীশ হরে’- মনে রাখবে গোটা উপমহাদেশ। বাংলায় ‘ইন্দ্রাণী’ কিংবা ‘হারানো সুর’ -এখানে তো উত্তম-সুচিত্রার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে হেমন্ত-গীতা জুটি।

গীতা দত্ত ছেলে অরুণকে গান শেখাচ্ছেন সঙ্গে গুরু দত্ত
আসলে প্রতিভাটাই কিন্তু শেষ কথা নয়। তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত মানসিক শান্তি। মন যদি অশান্ত হয়ে থাকে তবে তা সৃজনশীলতার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবেই। হয়তো সেই কারণেই গীতা দত্তের মতো এক বিরল কন্ঠকে অকালে হারিয়েছেন সুরের পিয়াসীরা।
Anek ojana totho pelam.khub bhalo laglo