এই গল্পে চমক যেমন আছে তেমনি আছে কঠিন লড়াই। যে সংগ্রামে স্বপ্ন সফল হতে বাধ্য। উত্তরবঙ্গের একটি ছোট্ট চা বাগান থেকে শ্রমিক তনয়া পড়তে যাবে লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই ঘটনায় কেবল নাগরাকাটার ভগত্পুর চা বাগানের মানুষরাই নয়, আদিবাসী মেয়ে গীতিকার এই কৃতিত্বে সকলেই যেমন আশ্চর্য হয়েছেন, তেমনি ওই মেয়ে আজ সকলের গর্বের বিষয়।
সত্যিই তো, নাগরাকাটার এক ছোট্ট চা বাগান থেকে এই কৃতিত্ব গড়া কি যে সে কথা। অসম্ভব ব্যাপার। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন চা শ্রমিক কন্যা। উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেন গীতিকা এক্কা। কঠিন প্রতিযোগিতা পেরিয়ে গীতিকা এখন এমএসসি করবেন ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

গীতিকার বাবা গণেশ এক্কা নাগরাকাটার ভগত্পুর চা বাগানের প্রাক্তন শ্রমিক। মা কমলা এক্কা প্রাইমারি স্কুল শিক্ষিকা। গীতিকা কালিম্পংয়ের একটি স্কুল থেকে ২০১৩ মাধ্যমিক পাস করেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর রেজাল্ট খুব একটা আশানুরূপ হয়নি। কিন্তু তাতে ভেঙে পড়েননি গীতিকা। ২০১৫ সালে উচ্চমাধ্যমিকের কলা বিভাগে ৮৬ শতাংশ নম্বর পান গীতিকা। এরপর প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুযোগ পান নয়াদিল্লির পুশার ইনস্টিটিউট অফ হোটেল ম্যানেজমেন্ট, নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্যাটারিং-এর কোর্সে।
এরপর আরও কঠিন লড়াই শুরু করতে হয় গীতিকাকে। ২০১৮ সালে নয়াদিল্লির পুশার ইনস্টিটিউট অফ হোটেল ম্যানেজমেন্ট থেকে বিএসসি করার পর শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। প্রবেশিকা পরীক্ষার একাধিক ধাপ পেরিয়ে এবার গীতিকার গন্তব্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পারের কিংস্টন লেন। সেখানকার ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিলেশন বিষয়ের ওপর এমএসসি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
আগামি ২৬ সেপ্টেম্বর দমদমের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গীতিকা যাত্রা শুরু করবেন। তাঁকে পেরতে হবে সাড়ে ৯ ঘণ্টার পথ। আগামী তিন বছরের জন্য লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলই হবে গীতিকার ঠিকানা। পাসপোর্ট-ভিসা ইতিমধ্যেই হাতে এসে গিয়েছে।

কিন্তু নাগরাকাটার ভগত্পুর চা বাগানে বসে এমন এক সাফল্য কীভাবে ছিনিয়ে নিল গীতিকা। তাঁর কথাতে, চা বাগানের অনেক ছেলেমেয়ে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এটা যেন তারা কোনওভাবেই না করে। সেই বার্তাই দিতে চায় গীতিকা সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের। পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলেও তাতে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। লন্ডন থেকে ফিরে এসে উত্তরবঙ্গেই পর্যটন নিয়ে কাজ করতে চায় গীতিকা।
গীতিকার বাবা গণেশ এক্কা বলেন, চা বাগানেই বাস করছি। নিজেদের যত কষ্টই হোক ছেলেমেয়েরা লেখাপড়াটা যাতে করতে পারে, সেই চিন্তা থেকে দূরে সরে আসিনি। অন্য অভিভাবকদেরও আমি সেই কথাটাই বলতে চাই। গীতিকার জন্য পেজফোর-এর তরফ থেকে রইল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।