ঘটনার ঘনঘটায় লোকসভার শীতকালীন অধিবেশন বেশ জমজমাট। মহুয়া মৈত্রকে বহিস্কার, সাংসদ ভবনে গ্যাস ক্যানেস্টার হামলা, তারপরেই শীতকালীন অধিবেশনের তিনদিন বাকি থাকতেই সংসদ থেকে বের করে দেওয়া হল সব মিলিয়ে ১৪১জন সাংসদকে। অথচ চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগে এটাই ছিল সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন। প্রসঙ্গত, লোকসভায় সর্বমোট ৫৪৩টি আসন, তার মধ্যে ২১টি আসন শূন্য, অর্থাৎ আসন রয়েছে ৫২২, তার মধ্যে ৩২৩টি আসনে বিজেপি ও তার শরিকদলের প্রতিনিধি আর বিরোধী সাংসদ ১৪২জন, যার মধ্যে ৬৭ শতাংশকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার মানে সংসদে বিরোধী সাংসদ রইলেন ৪৭জন আর রাজ্যসভায় ১০০জন মতো। এই ভাবে সাংসদকে বিরোধীশূন্য করে তোলার একটাই স্পষ্ট অর্থ হল লোকসভার গৈরিকীকরণ। তাছাড়া এখন সংসদ বিরোধীশূণ্য, এই সময়ে কোনো বিতর্ক ছাড়াই নয়া ফৌজদারি বিল পাশ করানো যাবে, বিরোধিরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ছাড়া ওই বিল পাশ করানোর দাবিতে জানাচ্ছিল। সেই লক্ষ্যেই লোকসভা এবং রাজ্যসভা থেকে একের পর এক সাংসদকে বহিস্কার করা হল।
বিরোধী সাংসদদের বহিষ্কার নিয়ে শিরোমনি আকালি দলের সাংসদ হরসিমরত কৌর বাদল বলেন, ‘মোদী নতুন সংসদ ভবনকে গণতন্ত্রের কবরস্থান বানাতে বিরোধীদের উচ্ছেদ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, যে বিজেপি সাংসদ অনুমতি পত্র দিয়েছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নতুন সংসদের জন্য নতুন নিয়ম তৈরি করা হচ্ছে- ঘুমের ওষুধ খান এবং এখানে আসুন কারণ এখানে আপনাকে মুখ খুলতে এবং প্রশ্ন করতে দেওয়া হবে না’। পাশাপাশি কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ বলেন, ‘বিজেপি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের বাহুবল কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের কণ্ঠস্বর দমিয়ে রাখতে বুলডোজার চালাচ্ছে।’ বিরোধিরা সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেই তাদের উপর আক্রমণ নেমে আসছে। মোদি সরকারের বহুদিন ধরেই বিরোধীদের কন্ঠরোধের চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু শীতকালীন অধিবেশনে বিরোধী সাংসদরা মুখ খুলতেই যে ভাবে গণ বহিষ্কার করা হল তাতে লোকসভার স্পীকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের ভুমিকাও অত্যন্ত নিন্দনীয়।

কোন দল কিংবা কতজন সাংসদ তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অগণতান্ত্রিক উপায়ে বেলাগাম ভাবে একের পর এক সাংসদকে সাসপেন্ড করা। সাংসদদের অপরাধ তাঁরা সংসদ হামলার পর নিরাপত্তা নিয়ে প্র্শ্ন তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়েছেন, আলোচনা চেয়ে লোকসভা ও রাজ্যসভায় নোটিস জমা দিয়েছেন। কার্যত বিরোধিদের এককাট্টা হতে দেখেই দিশাহারা হয়ে পড়ে মোদী সরকার ও তাঁর দল। তারপরেই বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতে অস্ত্র হিসাবে সাংসদ বহিষ্কারকে বেছে নেয় তারা। এই ধরণের কৌশলকে কি বলা যাতে পারে- গণতন্ত্র না মোদীতন্ত্র? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর জমানায় দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একের পর এক গণতন্ত্র হত্যার অধ্যায় রচনা করে চলেছেন। তেমনই এক নজিরবিহীন ঘটনা এক ধাক্কায় শতাধিক সাংসদ বহিস্কার। একদিনে এত জন সাংসদকে বহিস্কার করার ঘটনা অতীতে ঘটেছে কি? কিন্তু তাঁরা যে বিরোধী, তার উপর তাঁরা সংসদের নিরাপত্তা গাফিলতি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেছিলেন! বিরোধিরা ঐক্যবদ্ধ, অতএব সংখ্যাধিক্যের জোর যখন আছে তখন গণতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে স্বৈরতন্ত্রই একমাত্র পথ তাই গণতন্ত্রকে আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হল। বিরোধীশূন্য করা হল সংসদ।
গণতন্ত্রের প্রতি অবিচার বিজেপি বা মোদীর আজকের অভ্যাস নয়, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নরেন্দ্র মোদী নানা অজুহাতে বিধানসভায় হাজির না থাকাটা দস্তুর করে ফেলেছিলেন। সংসদে থাকাটাও তিনি পছন্দ করেন এমন নয়। কিন্তু গণতন্ত্র নিয়ে বাণী দিতে তিনি কার্পণ্য করেন না। মহুয়া মৈত্র বা রাহুল গান্ধী আদানি সংক্রান্ত যতই অভিযোগ আনুন, নীরব মোদি, মহুল চোকসি বা বিজয় মালিয়ারা কোটি টাকা নয়-ছয় করে বিদেশে গা ঢাকা দিলেও কোনো উচ্চবাচ্য নেই। বরং রাহুল গান্ধী, মহুয়া মৈত্রকে নিজেদের সুবিধামতো সাজানো শাস্তি দিতে মোদী অ তাঁর গৈরিক বাহিনী সর্বদাই তৎপর। কেবল নিত্য নতুন আইনের বিল এনে ফাঁকতালে পাশ করানো; গণতন্ত্রকে মোদী তামাশায় পরিণত করেছেন। দেশের গণতন্ত্র সমস্ত দিক থেকেই বিপন্ন। সাংসদ বহিস্কার ঘটনার পর দু-একটি প্রশ্ন সামনে এসে পড়েছে- সংসদের অন্দরমহলে মোদীর এই ফ্যাসিজিম কি বিরোধী জোট ইন্ডিয়াকে অক্সিজেন যোগাবে? সংসদের নিরাপত্তার ঢিলেঢালা সারা দুনিয়ার কাছেই বে-আব্রু হয়ে গিয়েছে। এর চাপ কিছুটা হলেও মোদী সরকারের উপর পড়বে। বিরোধিদের সম্মিলিত বিরোধীতার মুখে মোদী সরকার যে অগণতান্ত্রিক ও অসংসদীয় পথ নিতে বাধ্য হল, সেটিও নিন্দনিয়, বিরোধীরা কি কেবলমাত্র সংসদ চত্বরে বিক্ষোভ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বিবৃতির দাবিতে সরব হবেন? মোদী সরকারের পদক্ষেপগুলি দেশের গণতন্ত্রকে যেভাবে হাস্যকর করে তুলছে তা সামগ্রিকভাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।