| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ঘট : নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

Reporter
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী / ১২৯৭ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২০

চিরকাল আমার এই সন্দেহটা হয়েছে এবং সন্দেহটা রীতিমতো এক আধ্যাত্মিক সন্দেহ। আমি ভেবে দেখেছি একটা শব্দের এমন দ্বয়ী গতি হয় কী করে? যে বস্তুটা সবসময় একটা চলমানতার তাৎপর্য নিয়ে বসে আছে, সেই বস্তুটাই আবার চরম স্থির একটা অর্থ প্রকাশ করছে—এমন শব্দ আমাদের অভিধানে বেশি নেই। দেখুন, সংস্কৃত ভাষায় ঘট্ একটা ক্রিয়াপদ, সেই ক্রিয়াপদ থেকেই ঘটনা, ঘটছে, ঘটমান, ঘটানো, পূর্বঘটিত—এই সব অনন্ত প্রক্রিয়াবাচক শব্দ তৈরি হচ্ছে, অথচ যেই বলবেন—ওরকম ঘটের মতন বসে আছিস কেন—তখন কিন্তু ঘট বলতে একটা স্থির, নিশ্চল নড়েচড়ে না এমন একটা বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে বসি আমরা। আমি এটাও বুঝেছি যে, আমিই প্রথম এই ঘটের দ্বৈরথে আকুল হয়ে উঠিনি। এক প্রাচীন মানুষ বহুকাল আগে একটি শ্লোক লিখে বলেছিলেন—ঘটে চলেছে, নিরন্তর ঘটে চলেছে বলেই তাকে ঘট বলি আমরা, কিন্তু কিছুই যদি না ঘটে তাহলে কিন্তু ঘট হয়ে যাবে তুমি—ঘটতীতি ঘটো জ্ঞেয়ো নাঘটন্ ঘটতামিয়াৎ।

আমার এই সামান্য প্রবন্ধের কল্পারম্ভ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আমি অনেক কথা বলতে চাই। কিন্তু তার আগে ঘটের দৃশ্যমান মধুর ভাবনাটা আগে বুঝিয়ে নিই, যদিও সেটা নিতান্তই একটা প্রতীকী ব্যাপার হবে, কিন্তু সেই প্রতীক এখনকার পারিভাষিকতায় সিমবলিজম্ হলেও সেটা আমাদের অনন্ত মধুর অনুভবে তিল তিল করে তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে ঘটের মাহাত্ম্য এতটাই যে, সেটা একজন দেবতার পরিবর্ত হিসেবে ব্যবহার হয়। দেবতার মূর্তি যদি সামনে না-ও থাকে, যদি মূর্তি বানাবার বা মূর্তি কেনার অর্থ না থাকে তবে শুধু ঘট স্থাপন করে ঘটের ওপরেই দেবতার আবাহন করতে পারি আমরা। এমনকী মূর্তি যদি সামনে থাকেও তাহলেও একটা ঘট স্থাপন করতে হবে এবং আসল পুজোটা কিন্তু হবে ঘটের ওপরেই। এর কারণ হলো—মূর্তি যেটা একজন মূর্তিকার বানান—সে মূর্তি মাটিরই তৈরি হোক অথবা পাথরে খোদাই করা, সেই মূর্তির মধ্যে শিল্পীর আপন অনুভব চেতনা মিশ্রিত থাকে বলে দেব-দেবীর অভীষ্ট পৌরাণিক রূপটি আহত কিংবা অস্পষ্ট হতে পারে, কিংবা মূর্তি বানানোর মধ্যে খুঁত থাকতে পারে, মূর্তির অবয়ব সংস্থান ঠিক না-ও হতে পারে, তাই শিল্পীর শিল্পচেতনা পূর্ণ সম্মান দিয়েই একটি পৃথক ঘট স্থাপন করাটা একেবারে শাস্ত্র-নির্দিষ্ট পন্থা। তবে ঘটের ক্ষেত্রে ঘটটি যাতে দেখতে সুন্দর হয়, ভাঙাচোরা না হয়, অক্ষত এবং যথাসম্ভব শুদ্ধ হয় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হয়।

ঘটের মধ্যে দেবতার আবাহন ঘটবে বলেই সে ঘট আর শুধু ঘট থাকে না, সেটা মঙ্গল-ঘট হয়ে ওঠে। আর এই মঙ্গল ব্যাপারটা এমনই এক প্রসার্যমান ভাবনা যে, ঘট শুধুমাত্র দেবতার প্রতীক, দেবতাহ্বানের বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, যে কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে মূল ঘটস্থাপন ছাড়াও গৃহ-প্রবেশের দরজা থেকে ঘরের দরজায় দ্বারঘট স্থাপন করাটাও একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই রীতি কোনও আধুনিক উপস্থাপনা নয়, আমি বৈষ্ণবাড়িতে অষ্ট-প্রহর, ষোলো প্রহর হরিনাম-সংকীর্তনের অধিবাস কীর্তনের পদ শুনেছি—রাম-রম্ভা আরোপন/পূর্ণঘট সংস্থাপন/ আম্রপল্লব সারি সারি।

তবে কিনা এই দ্বারঘট এবং অন্য ঘটগুলি মাঙ্গলিক প্রসারণমাণ, দেব-দেবীর পূজা বা অন্য কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে মূল ঘটটাই সব। সেটা শাস্ত্রকারেরা এত সুন্দরভাবে চেয়েছেন যে, সেই ঘট তৈরির ব্যাপারে গৃহস্বামী যেন বিত্তশাধ্য না করেন, সেটা একরকম শাস্ত্রীয় নির্দেশ। একটি ঘটের জন্য এত যে আন্তরিক ভাবনা তার পিছনে একটাই কারণ—একটা নির্দিষ্ট দিন আমরা কয়েক দিন দেবতার পূর্ণ অবস্থায় ঘটবে ঘটের মধ্যে। সে ঘটকে দেবতার মতোই সাজানো হয়—মণিরত্নে সজ্জিত করে, উপযুক্ত পরিধানে। খেয়াল করে দেখুন, ঘটের মধ্যে পঞ্চরত্ন কিংবা নবরত্ন দিয়ে হয়, ঘটের মুখে পঞ্চপল্লব, তার উপর ফুল, ঘটের গায়ে স্বস্তিক সিঁদুর তার ওপরে নববস্ত্র—এ সব কী? এসব কিন্তু ঘটাবস্থিত দেবতাকে সালংকারে সুবাসে সাজিয়ে ঘটের মধ্যে দেবতার মানস-মূর্তি তৈরি করা।

দেবতার মূর্তি গড়ে বা বাইরে থেকে কিনে এনেও যদি তার পুজো করতে হয়, তবে তাঁর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হয় মন্ত্র-সহ—প্রাণা ইহ প্রাণাঃ। কিন্তু সোনা রুপো কিংবা মাটির ঘটে দেবতার অবস্থান এবং তাঁর স্থির বসতির জন্য জল দিয়ে পূর্ণ করতে হয় ঘট। কেননা, জলই প্রাণের প্রতীক, জলই জীবন। অতএব প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় যাকে বলি জীব ইহ স্থিতঃ সেই জীবনই নয় শুধু, ক-দিন ধরে বা একদিনই যাতে দেবতার জীবন স্থির থাকে তার জন্য জলভর্তি ঘটটাকে নাড়ানো পর্যন্ত যাবে না। ঘট নাড়িয়ে দেওয়া মানেই স্থির প্রাণকে নাড়িয়ে দেওয়া হলো, ঘট নাড়িয়ে দেওয়া মানেই ঠাকুর বিসর্জন হয়ে গেল—জলেতে মিলায়ে জল। একটি ঘটকে নবরত্নে সাজিয়ে নরম মাটির তালের মধ্যে পঞ্চ-শস্য দেবার পর সেইখানে ঘট বসানো মানে এই উদ্ভিদপূর্ণা পৃথিবীর মধ্যে আমার অভীষ্ট অন্তরীক্ষা লোকের দেবতাকে অধিষ্ঠিত করছি। এক সামান্য ঘটের মধ্যে এই দেবকল্পনার ব্যাপ্তিটুকুই কিন্তু লক্ষ্য করার মতো। কেননা শাস্ত্রকারের ধ্যানাবস্থিত মনের মধ্যে দেবতার এবং দেব-প্রতিষ্ঠার যে ব্যাপ্ত রূপ সেটাই কিন্তু ঘটাকার দেবতা।

আর ওই ঘটের মধ্যে যে জল, তা-ও কিন্তু দেবতারই ব্যাপ্ত রূপ। পূর্ণ ঘট প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে একটা অসম্ভব সুন্দর মন্ত্র পড়ে ঘটাধিষ্ঠিত দেবতাকে বলা হয়—তুমি এই ঘটের ওপর উঠে এই ঘটের মধ্যেই অবস্থান করো—ইমং ঘটং সমারুহ্য তিষ্ঠ দেবগণৈঃ ( দেবীগণৈঃ ) সহ। দেবতার আবাস হিসেবে এই ঘটের মর্যাদা কী? মন্ত্র পড়া হচ্ছে—সমস্ত নদীতীর্থের জল—গঙ্গা-যমুনা, সিন্ধু-সরস্বতী, কাবেরী-নর্মদা—সমস্ত তীর্থের জল এই ঘটের মধ্যে আছে, তাই সমস্ত দেবতাদের অধিবাস এখানেই, অতএব তুমিও এসো, তুমিও এসো. তুমিও এসো এবং তুমি—সর্বতীর্থোদ্ভবং বারি সর্বদেব সমন্বিতম। যে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—আমি কানন হতে তুলিনি ফুল ভরিনি তীর্থজল—সেখানে তীর্থজল ভরে না আনার অক্ষেপটুকু আরও বড়ো এক মানস-পূজায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে, কিন্তু এই তীর্থজলের অনন্ত প্রচারের মধ্যে যে এক এবং অদ্বিতীয়ের ব্যাপ্ত রূপ আছে এবং সেই ব্যাপ্তি যে এক পূর্ণ ঘটের মধ্যে ধরা পড়ে, সেটা রবীন্দ্রনাথের অমানুষী ভাষায় লেখা একটা প্রবন্ধ পরিচ্ছেদ থেকে প্রমাণ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের—যিনি অগ্নিতে যিনি জলেতে—যো দেবো অগ্নৌ যো অপ্‌সু—এই মন্ত্র বোঝাতে গিয়ে লিখেছেন—

“ঈশ্বর সর্বত্র আছেন এ-কথাটা আমাদের কাছে অত্যন্ত অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এইজন্য এই মন্ত্র আমাদের কাছে অনাবশ্যক ঠেকে। অর্থাৎ এই মন্ত্রে আমাদের মনের মধ্যে কোনো চিন্তা জাগ্রত হয় না।

কিন্তু এ-কথা যাঁরা কানে শুনে বলেননি—যাঁরা মন্ত্রদ্রষ্টা, মন্ত্রটিকে যাঁরা দেখেছেন তবে বলতে পেরেছেন—তাঁদের সেই প্রত্যক্ষ উপলব্ধির বাণীকে অন্যমনস্ক হয়ে শুনলে চলে না। এ-বাক্য যে কতখানি সত্য তা আমরা যেন সম্পূর্ণ সচেতনভাবে গ্রহণ করি।

হঠাৎ মনে হতে পারে প্রথম ছত্রেই কথাটা নিঃশেষ হয়ে গেছে–তিনি বিশ্বভুবনেই আছেন—তবে কেন শেষের দিকে কথাটাকে এত ছোটো করে ওষধি বনস্পতির নাম করা হল।

বস্তুত মানুষের কাছে এইটেই শেষের কথা। ঈশ্বর বিশ্বভুবনে আছে এ-কথা বলা শক্ত নয় এবং আমরা অনায়াসেই বলে থাকি, এ-কথা বলতে গেলে আমাদের উপলব্ধিকে অত্যন্ত সত্য করে তোলার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু তার পরেও যে-ঋষি বলেছেন তিনি এই ওষধিতে এই বনস্পতিতে আছেন সে-ঋষি মন্ত্রদ্রষ্টা। মন্ত্রকে তিনি কেবল মননের দ্বারা পাননি, দর্শনের দ্বারা পেয়েছেন। তিনি তাঁর তপোবনের তরুলতার মধ্যে কেমন পরিপূর্ণ চেতনভাবে ছিলেন, তিনি যে-নদীর জলে স্নান করতেন সে স্নান কী পবিত্র স্নান, কী সত্য স্নান, তিনি যে-ফল ভক্ষণ করেছিলেন তার স্বাদের মধ্যে কী অমৃতের স্বাদ ছিল, তাঁর চক্ষে প্রভাতের সূর্যোদয় কী গভীর গম্ভীর কী অপরূপ প্রাণময় চৈতন্যময় সূর্যোদয়—সে-কথা মনে করলে হৃদয় পুলকিত হয়।”

ছোটো জিনিসকে বড়ো ভাবার এই মানসিক মহিমা কিন্তু ঘটের ভাবনা লোকেও আছে। হয়তো এই জন্যই প্রথমে ঘটের সঙ্গে ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলাম আমরা। বস্তুত কুম্ভকার যে ঘট বানান, সেটা কিন্তু থালা, বাটি, গেলাস বানানোর মতো সোজা জিনিস নয়। ঘট কিংবা কলস—কলস কিন্তু ঘটেরই আর এক নাম—এই ঘট কলসের যে আকৃতি হয় তাতে এটা একবারে তৈরি করা যায় না। কুলাল কিংবা কুম্ভকারের হাতের কৌশলে যতটাই নিপুণতা থাকুক এক্কেবারে তলার জায়গাটা থেকে মাঝখানে পেট-মোটা হয়ে আবার ওপরে সংকোচন করাটা যদি-বা একটানে সম্ভব, কিন্তু ঘট কিংবা কলসের ওপরের বিস্তারিত মোড়ানো অংশটা একবারে তৈরি করা যায়। সেটা আলাদা করে তৈরি করে জোড়া দিতে হয় বহুল নিম্নাংশের সঙ্গে অর্থাৎ এক অংশের সঙ্গে আরেক অংশের সংযোগটুকু ঘটাতে হয়। আর মূলত এই ঘটানোর কাজটা হলো সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার। এমনও বলা হয় যে, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এই ব্রহ্মাণ্ডটাকেই তৈরি করেছেন ঘটের আদলে, যার জন্য ব্রহ্মাণ্ডকে বলা হচ্ছে একটি বৃহৎ ভাণ্ড এবং সেই ব্রহ্মাণ্ড-ভাণ্ডকে তৈরি করার ব্যাপারে কুম্ভকার হলেন ব্রহ্মা—ব্রহ্মা যেন কুলালবন্নিয়মিতো ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ডোদরে।

পৃথিবীর মতো বৃহৎ ঘটাধার থেকে যদি শুধু ঘটেই নেমে আসি, তাহলে দেখবেন ঘট কিংবা কলস তৈরি হওয়ারও একটা পৌরাণিক ইতিহাস আছে। পুরাণে বলা হয়েছে—দেবতারা এবং অসুরেরা মন্দর পর্বতকে মন্থনদণ্ড বানিয়ে বাসুকের-নাগের রজ্জু দিয়ে সমুদ্রমন্থন করার পর যখন শেষমেশ অমৃত উঠে এল, তখন সেই অমৃত ধারণ করার একটা পাত্রের প্রয়োজন হলো। দেবতাদের নির্দেশে ভগবান বিশ্বকর্মা তখন বিভিন্ন দেবতার শরীর থেকে একটি করে কলা বা অংশ নিয়ে একটি পাত্র তৈরি করলেন। কলা থেকে নির্মাণ করা হয়েছিল বলেই তার নাম কলস—

কলাং কলাং গৃহীত্বা বৈ দেবানাং বিশ্বকর্মণা।

নির্মিতো’য়ং সুরৈর্যস্মাৎ কলসস্তেন উড্যতে।।

এই কলস ঘটের মুখে ব্রহ্মার অবস্থান। গ্রীবায় মহেশ্বর শিবের, ঘটমূলে বিষ্ণুর স্থান, মধ্যে মাতৃগণের অবস্থান, আর ঘট-কলমের চার দিকে দেবতারা বেষ্টন করে আছেন। কলস-গর্ভে সপ্ত-সাগর এবং সপ্তদীপা বসুমতী।

আশা করি, এতক্ষণে একটা ঘটের প্রতীকে কত ব্যাপ্ত একটা ভাবনা ভাবা যায় সেটা যৎসামান্য বোঝাতে পেরেছি। বোঝাতে পেরেছি হয়তো যে, একটা ঘট তৈরির মধ্যে কত ঘটনা, এমনকী কত ঘটনা-পরম্পরা আছে যাতে অঘটিত বস্তুর ঘটনা হয়, সুঘটিত বস্তুও দুর্ঘটিত হয়ে দুর্ঘটনায় পরিণত হয়, অতএব ঘট শুধু দেবতাদের অবস্থান ভূমি, ঘট আসলে মানুষের বুদ্ধির আধার, মানে মানুষের মাথা। ঘটের ভগ্ন অংশখণ্ডগুলিকে বলে কপাল; কপাল মানে কিন্তু ‘স্কাল’। এবারে আমার মাস্টার-মশায়ে আসি, যিনি আমাকে ছোটোবেলায় প্রশ্ন করে বলেছিলেন—মূর্খ! তোমার ঘটে কি কিছুই নেই? সেদিনের সেই ঘটনায় আমার মাথাটাই যে ঘটের সাদৃশ্যে দেখেছিলেন মাস্টারমশাই, তাতে আমি এই সমাধান পেয়েছি যে, ঈশ্বর-কুম্ভকারের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এই কুম্ভখানি—কুম্ভ মানেও ঘট, কুম্ভ মানেও কলস। সেই কুম্ভকার আমার মস্তক-স্বরূপ ঘটখানি গড়ে সেটা উলটো করে আমার-আপনার ধড়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। উলটো করে জুড়েছেন এইজন্যই যাতে বুদ্ধির অমৃতটুকু চলকে বেরোয়। কোন কালে কত বার ঈশ্বর কত স্থানে তাঁর অমৃত-কুম্ভ উলটে ফেলেছিলেন, সেটা নিয়ে কত পুরাণ, কত কথা, কত সাধু-সমাগম, মানুষের মেলা—ওরে! দেবতায় উল্টে পড়েছে, ছিটে-ফোঁটা যা পাই—তা এত জায়গায় কুম্ভমেলা হয়। আর মানুষের মস্তক-ঘট থকে চলকে পড়া বুদ্ধিটুকুই কিন্তু সেই অমৃত, যা দিয়ে জগৎ চলে। ঘট তাই দেবতার স্থান, মানুষের চরম বুদ্ধ্যাধার, পূর্ণঘটের এত মূল্য এইখানেই।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev