বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি ঘাটু গান নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির উপর আলোকপাত করতে হয়।
বাংলাদেশ বৈচিত্র্যে ভরা এক দেশ। হাজার বছরের লোকসাংস্কৃতির ধারক ও বাহক বাংলাদেশ। প্রত্যেক জাতির রয়েছে তাদের নিজস্ব ভাষা, আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তেমনি বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাঙালির সংস্কৃতি।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল পটভূমি গ্রাম। গ্রামীণ মানুষের আচার-আচরণ, বিশ্বাস, মনন-রুচি, ধ্যান-ধারণা, চিত্তবিনোদনের প্রাণবন্ত ও প্রাকৃতিক রূপ আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। এই সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। বছরের পর বছর মানুষের চিত্রায়ণের ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি এমন ঐতিহ্য। আবার আমরাই আমাদের গড়ে তোলা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। বর্তমানে লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নগর সংস্কৃতি দ্বারা বিপর্যস্ত।
বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের মাঝে গ্রামীণ খেলাধূলার যেমন লাঠিখেলা, কাবাডি, নৌকা বাইচ, ঘৌড়দৌড় ইত্যাদি এক সময় লোকসংস্কৃতির অঙ্গ ছিল।
এছাড়াও বউছি, টোপাভাতি, কানামাছি, কুতকুত, গোল্লাছুট, ষাঁড়ের লড়াই, পুতুল নাচ, মার্বেল খেলা বাংলার লোক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সমহিমায় ভাস্বর ছিল।
বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ নকশি কাঁথা। আবহমানকাল ধরে এ দেশের মানুষ নকশি কাঁথা ব্যবহার করে আসছে। নারীরাই এই শিল্পে বেশি দক্ষ। দুপুরের বা রাতের খাবারের পর গ্রামের নারীরা একসাথে বসে গল্প করতে করতে সেলাই করেন এক একটি নকশি কাঁথা। এখন আর নকশি কাঁথা গ্রামের নারী তৈরী করে না।
ঐতিহ্যবাহী বাঁশ আর বেত শিল্পের তৈরি বিভিন্ন পন্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প বিলুপ্ত হওয়ার পথে।
এখন আমরা ব্যক্ষ্যমান নিবন্ধের বিষয়ে আলোচনা করার আগে বাংলার লোকসঙ্গীতের বিষয়ে দু’চারটা কথা বলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অন্যতম লোকগীতি ঘাটু গানের উপর বিষদ আলোচনা করবো।
ঘাটু গান লোকসঙ্গীতের একটি অন্যতম ধারা। এটি মূলত বাংলার নিজস্ব লোকগীতি। গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনের কথা, সুখ দুঃখ, প্রেম বিরহের কথা ফুটে ওঠেছে বাংলার ঘাটু গানে।

বাংলার লোকসঙ্গীত খুবই ঋদ্ধ। লোকসঙ্গীতের নানা ধারার মধ্যে ঘাটু গান, কবি গান, গম্ভীরা গান, আলকাপ গান, তরজা গান, অষ্টক গান ইত্যাদি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
ষোড়শ শতকের শেষের দিকে ঘাটু গানের প্রচলন হয় বলে মনে করা হয়। অধিকাংশ গবেষকের ধারণা, শ্রীকৃষ্ণের প্রেম-মগ্ন কোন এক ভক্ত রাধা সেজে কৃষ্ণের অপেক্ষায় ছিলো, তখন তার কিছু ভক্ত গড়ে ওঠে; তখন এই ভক্তদের মধ্য হতে ছেলেশিশুদের রাধার সখী সাজিয়ে নেচে নেচে বিরহ সংগীত পরিবেশন করা হতো এবং এভাবেই প্রচলন ঘটে ঘাটু গানের।
ঘাটু গান আজ বিলুপ্ত প্রায় এক প্রকার লোকগীতি। ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে এ গান গাওয়া হত বলে এর নাম হয়েছে ‘ঘাটের গান’ বা ‘ঘাটু গান’। নটীবেশে কিশোর বালক নৃত্য-সহ এ গান পরিবেশন করে। রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা ও দৈনন্দিন জীবনের বিচিত্র ঘটনা ঘাটু গানের বিষয়বস্তু।
এক বা একাধিক সুদর্শন কিশোর ঘাটু আসরের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এরা বংশপরম্পরায় ঘাটু গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। ঘাটুদের সুকণ্ঠের অধিকারী, অল্পবয়সী এবং লম্বাকেশী হতে হয়। এদের যুবতীসুলভ রূপ-লাবণ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সুমধুর কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি, নৃত্য প্রভৃতি দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
ঘাটু গানে রাধাকৃষ্ণের কাহিনী থাকলেও এতে সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত লৌকিক ও আদিরসেরই প্রাধান্য থাকে। প্রধানত বর্ষা মৌসুমে যখন নদী-নালা, খাল-বিল জলেতে ভরা থাকে তখন নৌকায় ঘাটু গানের আসর বসত। এ নৌকা গ্রামের ঘাটে ঘাটে ভিড়িয়ে গান শোনানো হতো।
বর্তমানে লোকালয়েও ঘাটু গানের আসর বসে। অনেক সময় এক সঙ্গে একাধিক দলেরও আসর বসে। তাদের মধ্যে বিশেষ করে রাধাকৃষ্ণের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে গানের প্রতিযোগিতা চলে। অনুষ্ঠান শেষে বিচারক বিজয়ী দলের নাম ঘোষণা করেন।
ঘাটু দলের প্রধান অর্থাৎ মূল গায়েনকে বলে ‘সরকার’। এ গানে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয় ঢোল, তবলা, বেহালা, সারিন্দা, মন্দিরা, বাঁশি, করতাল, হারমোনিয়াম প্রভৃতি। ঘাটু গানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক গ্রামের জোতদাররা এবং এর প্রধান কর্মী সমকামী যুবকরা। এ গান প্রধানত ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, কুমিল্লা জেলার উত্তরাঞ্চল এবং সিলেট জেলার পশ্চিমাঞ্চলে এক সময় ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে আধুনিক ওগশিক্ষার প্রভাবে এ গানের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে।
প্রাচীন যুগে সামন্ত প্রভুরা অন্দরমহলে বাইজির নাচ-গানের আয়োজন করত। তাতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। তখন কিছু মধ্যবিত্ত শৌখিন যুবকের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে ঘাটু গানের প্রচলন। ঘাটু গান মূলত ছুকরাভিত্তিক গান, বারো থেকে পনেরো বছরের ছেলে ছুকরাকে ঘাটু বানাবার জন্য মেয়েলি চেহারার ছেলেকে ঘাগড়ি বা শাড়ি পড়িয়ে ম্যাচিং করা ব্লাউজ, কানে দুল, দুহাতে রঙিন রুমাল বেঁধে মঞ্চে উঠানো হতো। ঘাটুর নাচে অঙ্গভঙ্গি ছিল দর্শক মনোরঞ্জনের প্রধান আকর্ষণ। সেই সঙ্গে একজন গানের সুন্দর কণ্ঠধারী লোক থাকত, যে ঘাটুকে পোষণ করত। ঘাটুগান সাধারণত রাধা কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রচিত হতো। উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
শ্যাম বলে —
নারী তো বেইমানের জাত গো
তোর বাড়ি আর যাইমু না
রাই বলে-পুরুষ তো বেইমানের জাত গো
আসবার কইয়া আইল না।
পয়সার কথা কইয়ারে কইয়া
প্রেম করিল শুইয়ারে শুইয়া
পয়সা দিল না।
২) তুই আমারে চিনলে নারে
আমি তো রসের কমলা।
বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি
মধ্যে নলের বেড়া।
৩) ঘুমাইলা ঘুমাইলারে বন্ধু
পান খাইলায়না
এক বালিশে দুইটি মাথা
সুন্দর কইরা কওরে কথা।
ঘাটু গানের মধ্যেও আবার মালজুরা গানের প্রভাব দেখা যায়। অনেক গানে আবার কবিগানেরও ছোঁয়া মিলে। ঘাটু গান সাধারণত প্রেম আর রসাত্মক গানের সমন্বয়ে গীত হতো।

ঘাটুকে গানে সাহায্য করতে একজন লোকের প্রয়োজন হতো, যাকে স্থানীয় ভাষায় মরাধার নামে সম্বোধন করা হতো। মরাধার ঘাটুর সঙ্গে নেচে নেচে তাকে প্রশ্ন করত, ঘাটুকে গানের মাধ্যমে তার উত্তর দিতে হতো। অনেকটা মালজুরার মতো।
ঘাটু গানের প্রচলন কবে, কখন শুরু হয়েছিল—তা সঠিক করে বলা মুশকিল। তবে কারও কারও মতে বৃহত্তর সিলেটের আজমিরীগঞ্জের উদয় আচার্য ছিলেন ঘাটু গানের প্রবর্তক। তাঁর মাধ্যমে ঘাটু গানের প্রবর্তন হয়। তখন ঘাটু গান গাওয়া হতো পূজা বা অর্চনার মতো একটি পবিত্র মাধ্যম হিসেবে।
তার মৃত্যুর পর এই ঘাটু গানকে বাণিজ্যিক করে বেশ জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হয়। আদি রসাত্মক কথাবার্তা চালু করে অনেক গান রচনা করা হয়। এর ফলে ঘাটু গানটা তার আগের ধরন ছেড়ে নতুন এক ধরনের গানে চলে আসে। যার পরিপ্রেক্ষিতে গানগুলো লোকের মুখে মুখে গীত হতে থাকে। গানগুলো হলো—
১) ভাইছাব আমায় জলে ভাসা
সাবান আইন্না দিলায়না
সাবান আছে ঘরে পরে
তার পরোয়া কেবা করে।
২) আইও বন্ধু বইও পাশে
মুখে দিয়া পান
দেইখ্যা যাওরে ঘাটুর নাচন
পূর্ণিমারও চান।
৩) পালং সাজাও প্রাণ সজনি
আসব তোমার কুঞ্জে।
৪) আইস বন্ধু বইস পাশে
হাত দিয়োনা ডালিম গাছে।
এক সময় সীমানা অতিক্রম করে সারা দেশের গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পরে। ঘাটু গানের বিভিন্ন পর্যায় আছে—যেমন রংবাউলা, মুড়ালি, বিচ্ছেদ। প্রত্যেক গানের সঙ্গে তাল-লয় ঠিক রেখে ঘাটুকে নেচেগেয়ে দর্শকদের বাহবা অর্জন করে।
এক সময় সিলেট অঞ্চলে ঘাটু গানের প্রচলন ছিল রমরমা। আষাঢ়ের বর্ষার অথই পানিতে এসব এলাকায় নৌকা বাইচের প্রচলন ছিল। অনেক দূরের গ্রামাঞ্চল থেকে সুন্দর কারুকার্য খচিত নৌকাগুলো সারিগানের মহড়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় যোগ দিত। হাওরের বিরাট অংশে নৌকা বাইছ প্রতিযোগিতা হতো। হাজার হাজার দর্শক ছোট ছোট নৌকায় বসে প্রতিযোগিতা উপভোগ করত।
হাওরের অন্য পাশে বসতো ঘাটু গানের আসর। দুটো খোলা নৌকা একসঙ্গে জড়ো করে তার ওপর পাটাতন লাগিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হতো। ওপরে চাঁদ-তারা খচিত শামিয়ানা খাঁটিয়ে রঙিন কাগজের নিশান দিয়ে মঞ্চটা আরও আকর্ষণীয় করা হতো, তারই মধ্যে চলতো ঘাটু গানের আসর।
উৎসুক লোকজন ছোট নৌকায় চড়ে দূর থেকে উঁকি দিত, তখন কানে বাজত চিকন কণ্ঠের গান আর উচ্চ শব্দে ঢোল হারমোনিয়ামের আওয়াজ। চোখে ভাসত কিছু মাশুলধারী মাস্তান টাইপের লোক লাঠি সুলফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সত্যিই ভয়ে ত্বরিত স্থান ত্যাগ করতাম।
পরে অবশ্য গল্প শুনেছি, একদল মাস্তান লোক নাকি ঘাটু শিকারি থাকে, তারা কখনো অতর্কিতে ঘাটুকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। যার দরুন অপর পক্ষের এই সতর্কতা। তারপর গল্প শুনতাম, ঘাটু নাকি বেচাকেনাও হতো। এখন বুঝতে পারি, এটি মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এখন মনে হয় এই ব্যাপারটা আর সংস্কৃতির মধ্যে ছিল না। ঘাটু গানের যে লোকজ ঐতিহ্য ছিল, তা যেন ধীরে ধীরে লোকজ স্মৃতির অগোচরে এক অপসংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছিল।
ঘাটুদের নিয়ে নানা ধরনের যৌন লালসা চরিতার্থ করত এক ধরনের বিকারগ্রস্ত প্রভাবশালী মানুষ। এর ফলে সমকামিতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, যা কখনো বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি বা প্রত্যাশা করেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে ঘাটু গানের সংস্কৃতি।
প্রাচীন ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্রা কুমার দে বলেন, ঘাটুদের কেনাবেচা ও দর্শকদের কাছে নোংরাভাবে প্রদর্শন করা নিয়ে সমাজে নানা সংঘাত দেখা দেয়। ঘাটুদের যৌন আকর্ষণীয় করে তুলে অপসংস্কৃতির দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সহায়তা করে।
আসল ঘাটু গান হারিয়ে যাওয়া আরও দশটা লোকালয়ের মতো মুছে গেছে আমাদের যাপিত জীবনের পাতা থেকে। প্রমত্তা নদীর ভাঙনের উপাখ্যানে রূপ নিয়েছে। আজকাল বাংলার আনাচেকানাচে যে ঘাটুগানের উল্লেখ আমরা পাই, তা অনেকটা আমাদের অগ্রজদের হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপি থেকে তুলে আনা আসল ঘাটু গানের সংকল্পিত কিছু অনুরণন।
প্রাচীনকালে নববর্ষ পালনে আরও একটি সংস্কৃতি যোগ হতো। তা ছিল ঘাটু গান। ঘাটু গানের সঙ্গে নাচটা ছিল খুবই উপভোগ্য। একটা অল্প বয়সী ছেলেকে মেয়ে সাজিয়ে সহজ নাচের মুদ্রা শিখিয়ে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বাইজির নাচের মতো করে এই অনুষ্ঠান হতো। বঙ্গজ ঢোল, হারমোনিয়াম, বেহালা, মন্দিরা, বাঁশি—এসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। বাড়ির আঙিনায় গোলাকার প্যান্ডেল সাজিয়ে শ্রোতারা বসে উপভোগ করত ঘাটুর গান, দেখতেন আর শুনতেন নাচের মুদ্রার সঙ্গে ঘুঙরুর আওয়াজ। দর্শকদের মাঝ থেকে কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে ঘাটুকে মুদ্রা ছুড়ে দিতেন, এমনই রেওয়াজ ছিল।

এক সহজ বর্ণনায় বলা হতো, ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে যে গান গীত হতো, সেটাই ঘাটু গান।
প্রাচীন যুগে সামন্ত প্রভুরা অন্দরমহলে বাইজির নাচ-গানের আয়োজন করত। তাতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। তখন কিছু মধ্যবিত্ত শৌখিন যুবকের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে ঘাটু গানের প্রচলন। ঘাটু গান মূলত ছুকরাভিত্তিক গান, বারো থেকে পনেরো বছরের ছেলে ছুকরাকে ঘাটু বানাবার জন্য মেয়েলি চেহারার ছেলেকে ঘাগড়ি বা শাড়ি পড়িয়ে ম্যাচিং করা ব্লাউজ, কানে দুল, দুহাতে রঙিন রুমাল বেঁধে মঞ্চে উঠানো হতো। ঘাটুর নাচে অঙ্গভঙ্গি ছিল দর্শক মনোরঞ্জনের প্রধান আকর্ষণ। সেই সঙ্গে একজন গানের সুন্দর কণ্ঠধারী লোক থাকত, যে ঘাটুকে পোষণ করত। ঘাটুগান সাধারণত রাধা কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রচিত হতো।
ঘাটু গানের মধ্যেও আবার মালজুরা গানের প্রভাব দেখা যায়। অনেক গানে আবার কবিগানেরও ছোঁয়া মিলে। ঘাটু গান সাধারণত প্রেম আর রসাত্মক গানের সমন্বয়ে গীত হতো।
ঘাটুকে গানে সাহায্য করতে একজন লোকের প্রয়োজন হতো, যাকে স্থানীয় ভাষায় মরাধার নামে সম্বোধন করা হতো। মরাধার ঘাটুর সঙ্গে নেচে নেচে তাকে প্রশ্ন করত, ঘাটুকে গানের মাধ্যমে তার উত্তর দিতে হতো। অনেকটা মালজুরার মতো।
ঘাটু গান ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করে সিলেটের সীমানা অতিক্রম করে সারা দেশের গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পরে। ঘাটু গানের বিভিন্ন পর্যায় আছে—যেমন রংবাউলা, মুড়ালি, বিচ্ছেদ। প্রত্যেক গানের সঙ্গে তাল-লয় ঠিক রেখে ঘাটুকে নেচেগেয়ে দর্শকদের বাহবা অর্জন করে।
অঞ্চলভেদে ‘ঘাটু’ শব্দটির উচ্চারণগত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়; এই শব্দটি ঘাঁটু, ঘেটু, ঘেঁটু, গাটু, গেন্টু, গেঁটু, ঘাডু, গাডু, গাঁটু প্রভৃতি বলা হয়। এক সহজ বর্ণনায় বলা যেতে পারে যে, ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিরিয়ে যে গান গীত হতো সেটাই ঘাটু গান। আগেকার যুগে ধনী সামন্ত প্রভুরা মনোরঞ্জনের জন্য বাইজির নাচ গানের আয়োজন করতেন অনেক টাকা খরচ করে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিলো না। তখন কিছু শৌখিন যুবকের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে ঘাটু গানের দল। যা গ্রামের সবাই মিলে একসঙ্গে উপভোগ করত। ঘাটু গান গাওয়া হতো প্রচলিত সুরে; যেখানে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের প্রভাব ছিলো স্পষ্ট। পরবর্তীকালে আদি রসাত্মক কথাবার্তা চালু করে অনেক গান রচনা করা হয়; এর ফলে ঘাটু গানের জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে যুবসমাজে। কতগুলো জনপ্রিয় ঘাটু গান যেমন —
১) সুয়া উড়িলো উড়িলো জীবের ও জীবন,
সুয়া উড়িলো রে…
(শীতালং শাহ্ ফকির)
২) আমার যমুনার জল দেখতে কালো,
চান করিতে লাগে ভালো,
যৌবন মিশিয়া গেলো জলে…
(প্রচলিত)।
৩) সাবান আইনা দিলে না রে,
ভাইছাব রে তুই জলে ভাসা
সাবান আইনা দিলে না……….
(প্রচলিত)।
ঘাটু সংস্কৃতি ছিলো মূলত একটি দলগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মত। এক একটি ঘাটু দলে ৮ থেকে ১০ জনের মতো সদস্য থাকতো। এর মধ্যে একজন সর্দার গোছের লোক দলটিকে পরিচালনা করতো। সাধারণত এক একটি ঘাটু দলে একজন সর্দার, একজন সুগায়ক (সে একাধারে নৃত্য ও সংগীত প্রশিক্ষক), একজন ঘাটুছেলে (যে বাচ্চা ছেলেটি মেয়ে সেজে নৃত্য পরিবেশন করতো), আর পাঁচ থেকে সাত জন বাজনদার থাকতো। ঘাটু গান প্রদর্শনের সময় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাজানো হতো বঙ্গীয় ঢোল, বেহালা, হারমোনিয়াম, মন্দিরা, বাঁশী, করতাল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র। ঘাটু গানের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িয়ে থাকতো নাচ। ঘাটু গান সাধারণত প্রেম আর আদিরসাত্মক গানের সমন্বয়ে গীত ও নাচ হতো। ঘাটু গানের মধ্যে আবার মালজুরা গানের প্রভাব দেখা যায়। অনেক গানে আবার কবিগানেরও ছোঁয়া মিলে। একটা অল্পবয়সী বালককে মেয়ে সাজিয়ে সহজ নাচের মুদ্রা শিখিয়ে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বাইজির নাচের মতো করে এই অনুষ্ঠান পরিবেশন হত। এই বাচ্চা ছেলেটিকেই বলা হতো ঘেটু বা ঘাটুছেলে। ঘাটুকে গানে সাহায্য করতে একজন লোকের প্রয়োজন হত; যাকে স্থানীয় ভাষায় মরাধার নামে সম্বোধন করা হতো। মরাধার ঘাটুর সঙ্গে নেচে নেচে তাকে গানের মাধ্যমে প্রশ্ন করত, আর ঘাটুছেলেকে গানের মাধ্যমে তার উত্তর দিতে হত মেয়েলি ভঙ্গিমায় নেচে নেচে। বাড়ির আঙিনায় বা ঘাটের কোনো বটতলায় গোলাকার প্যান্ডেল সাজিয়ে, উপরে সামিয়ানা টাঙিয়ে সন্ধ্যার পর বসত ঘাটুর আসর। দর্শক-শ্রোতারা উপভোগ করতেন প্রেম ও আদি রসাত্মক ঘাটু গান ও নাচ। দর্শকের মাঝে থেকে কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে ঘাটুছেলেকে মুদ্রা ছুঁড়ে দিতেন, এমনটাই রেওয়াজ ছিলো সেই সময়। বঙ্গদেশে প্রাচীনকালে নববর্ষ পালনে আরো একটি সংস্কৃতি যোগ হত; তা হলো এই ঘাটু গান ও নাচের সংস্কৃতি। তাছাড়া পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের হাওর এলাকায় অন্যতম প্রধান মনোরঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই ঘাটু সংস্কৃতি। যার ফলে দিনে দিনে এর জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে।
তৎকালীন রক্ষণশীল বঙ্গসমাজে গান, যাত্রাপালা, নাটক ইত্যাদি তে নারীদের বিচরণ খুব সহজ ছিলো না। তাই এই ক্ষেত্রে এক বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিলো। ঘাটু গানের দলের মূল চরিত্রে থাকতো সুন্দর মেয়েলি গড়নের একটা বাচ্চা ছেলে। সাধারণত সেই ছেলের বয়স হতো ১০ থেকে ১৫/১৬ বছরের মধ্যে। বাচ্চাটিকে মেয়েদের পোশাক পরিয়ে, মাথায় পরচুলা লাগিয়ে, বুকে নারকেল মালা দ্বারা প্রস্তুত কৃত্রিম স্তনযুগল লাগিয়ে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, মেয়েদের ব্যবহৃত প্রসাধন সামগ্রীর দ্বারা সজ্জিত করিয়ে আসরে নামানো হতো। এরপর সেই নারীবেশী বাচ্চা ছেলেটি বা ঘাটুছেলেটি মেয়েলি অঙ্গ ভঙ্গি করে গান ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল রেখে বিভিন্ন সহজ মুদ্রায় নেচে যেতো অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত।
এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো, তবে গোলটা বাঁধে আরো একটা জায়গায়। সেই জায়গাটা হলো সমকাম ও সমকামের ছায়ায় শিশু নির্যাতন। হাওর অঞ্চলের বিত্তবান তথা জমিদার ও পয়সাওয়ালারা এই জলমগ্ন অবসরের সময়টুকু কাটানোর জন্য মনোরঞ্জনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এই ঘাটু গানকে। এই সমস্ত বিত্তবানেরা এই জলমগ্ন বর্ষার ৬ মাসের জন্য ঘেটু দল ভাড়া করে আনতেন নিজেদের বাড়িতে। এই সময়টুকু গোটা দলের জন্য বিত্তবানদের বাড়িতে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করা হতো। ঘাটু দলের কাজ ছিলো প্রতি সন্ধ্যার পর নাচ-গান করে বিত্তবানদের মনোরঞ্জন করা। ৬ মাস শেষে যাবার সময় ঘাটুদল তাদের পারিশ্রমিক পেতো; আর এই পারিশ্রমিকের মূল্য অনেকটাই নির্ভর করতো ঘাটুছেলের উপর। কারণ নারীবেশী এইসব সুকুমার ঘাটুছেলের অঙ্গভঙ্গিমায় প্রফুল্ল হয়ে বেশিরভাগ বিত্তবানেরা সমকামের সূত্র ধরে এই ঘাটুছেলেদের সঙ্গে অশ্লীলতা করার জন্য লালায়িত থাকতেন। নাচ-গানের শেষে প্রতি রাতে সেই ১০ থেকে ১৫/১৬ বছর বয়সী ঘাটুছেলেকে বাধ্য করা হত সেইসব পৈশাচিক পয়সাওয়ালাদের বিছানায় গিয়ে তাদের যৌনসঙ্গী হওয়ার জন্য। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সর্দারের নির্দেশে এই ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় অন্য কোনো উপায় থাকতো না এইসব ঘাটুছেলেদের কাছে। কারণ তারা প্রত্যেকেই আসত একেবারে দরিদ্র পরিবার থেকে। পরিবারের জন্য পুরো বৎসরের আয়ের জোগাড় করতে হতো এই ৬ মাসে এমন ভাবেই। আর এই সুযোগে বিত্তবানেরা তাদের পৈশাচিক যৌনক্ষুধা মেটাতো এইসব নিরুপায় বালকের মধ্যমে। বেশিরভাগ বিত্তবানেরাই তাদের এই অশ্লীল কার্য সম্পাদনের জন্য নিজেদের বিবাহিত স্ত্রীকে বর্ষার এই ৬ মাসের জন্য বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। এই বিষয়টি বিত্তবানদের স্ত্রীদেরও অজানা ছিলো না; তবে তাদের এই অশ্লীল ব্যাপারটি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকতো না। তাই এইসব বিত্তবানদের স্ত্রীরা ঘাটুছেলেদের একরকম সতীন রূপেই দেখতেন, আর হিংসাও করতেন। তবে বিষয়টা অনৈতিক ও অশ্লীল হলেও, পয়সাওয়ালাদের প্রতিপত্তির জোরে একট সময় বিষয়টা সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পেয়ে যায়। হাওর অঞ্চলের শৌখিনদার মানুষ জলবন্দির সময়টায় কিছু দিনের জন্য হলেও ঘাটুছেলেদের যৌনসঙ্গী হিসেবে নিজের কাছে রাখবেন- এই বিষয়টা একরকম স্বাভাবিকভাবে বিবেচিত হতে থাকে। আর এভাবেই ঘাটু সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে সমকামিতার সূত্র ধরে সমাজে শিশুদের যৌন নির্যাতন চলতে থাকে দিনের পর দিন। আর এর জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়তে থাকে।
ঘাটুছেলেটিকে শুধু যে বিত্তবানদেরই শয্যাসঙ্গী হতে হতো এমনটা নয়। মধ্য রাতের পর সেইসব পৈশাচিক পয়সাওয়ালাদের আঁশ মিটে গেলে শ্রান্তক্লান্ত অবস্থায় সেই ঘাটুছেলেকে লালসার স্বীকার বানাতো সেইসব বিত্তবান পয়সাওয়ালাদের বন্ধুবর্গ ও আত্মীয়বর্গের একাংশেরা। ঐটুকু একটা বালকের শরীরের উপর প্রতি রাতে ঝাপটে পড়তো সেই হিংস্র পশুগুলো। অসহায় সেই বাচ্চা ছেলেটির মুখ বুঁজে সব কিছু সহ্য করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকতো না। তাদের কান্নার করুণ শব্দ বিত্তবানদের ঘরের চার দেওয়ালে আবদ্ধ হয়ে থাকতো। অনেক ঘাটু ছেলেদেরই মলদ্বারে ঘাঁ হয়ে যেতো, সারা গায়ে কামড়ানো-আঁচড়ানোর দাগ বসে যেতো, শরীর মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তো। তাছাড়া পায়ুপথের রক্তক্ষরণ তো ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক একটা ব্যাপার। অল্পসংখ্যক মানুষের এমন দুশ্চরিত্রের জন্য এতো সুন্দর একটি সাংস্কৃতিক বিষয় অন্য দিকে মোড় নেয়। ফলে এতে সংগীত ও নৃত্য চর্চার চেয়ে যৌন চর্চা প্রাধান্য পেয়ে উঠে। এইভাবে ঘাটুছেলেদের নিয়ে নানা ধরনের যৌনলালসা চরিতার্থ করতেন এক শ্রেণীর বিকারগ্রস্ত প্রভাবশালী বিত্তবান মানুষেরা।

প্রাচীন ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে জানিয়েছেন যে, ঘাটুছেলেদের কেনাবেচা ও দর্শকের মাঝে নোংরাভাবে প্রদর্শন করা নিয়ে সমাজে নানা সংঘাত দেখা দেয়। বঙ্গদেশের সচেতন ও ধর্মপ্রাণ মানুষেরা ধীরে ধীরে বিষয়টিকে নোংরা ও নিন্দনীয় বলে গণ্য করতে শুরু করেন। একটা সময় ঘাটুছেলেদের মাতা-পিতারাও এ ধরণের যৌনাচারে লিপ্ত সংস্কৃতির চর্চায় আসতে নিজেদের ছেলেদের বাঁধা দেওয়া শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে কালের স্রোতে একটু একটু করে হারিয়ে যেতে থাকে পূর্ববঙ্গের এই ঐতিহ্যপূর্ণ ঘাটু সংস্কৃতি। এইভাবেই সমকামের সূত্র ধরে যে নিকৃষ্ট কদাচার শুরু হয়েছিলো এই পল্লী সংস্কৃতির মাধ্যমে তা একসময় সমাজের সচেতনতায় বন্ধ হয়ে যায়; যা খুবই মঙ্গলের বিষয়। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গদেশ তার একটি অসাধারণ পল্লীসংস্কৃতির অঙ্গ এই ‘ঘাটু সংস্কৃতি’ও হারিয়ে ফেলেছে; যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। যার ফলে বঙ্গদেশ থেকে হারিয়ে গেছে বিস্ময়কর এই ‘ঘাটু সংস্কৃতি’র ধারা।
সবশেষে এই কথা না বললেই নয় যে, সমকাম মোটেও ঘৃণ্য নয়। এই যে পাশবিক ভাবে শিশুদের যৌন নির্যাতন চলছিলো ‘ঘাটু সংস্কৃতি’র আড়ালে তা নিশ্চয়ই নিন্দনীয় ও দণ্ডনীয়। তবে আনন্দের কথা এই যে, পূর্ববঙ্গের এই ঘাটু সংস্কৃতি শিশুনির্যাতনের নিকৃষ্ট কালিমা মুছে একেবারে ধীর গতিতে হলেও পূর্ববঙ্গের হাওর বা ভাটি অঞ্চলে তা আজও বহমান।
আমাদের কৈশোরে সিলেট অঞ্চলে তখন ঘাটু গানের সংস্কৃতির যৌবন তলানিতে চলে আসে। আষাঢ়ের বর্ষার অথই পানিতে আমাদের এলাকায় নৌকা বাইচের প্রচলন ছিল। অনেক দূরের গ্রামাঞ্চল থেকে সুন্দর কারুকার্য খচিত নৌকাগুলো সারিগানের মহড়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় যোগ দিত। হাওরের বিরাট অংশে নৌকা বাইছ প্রতিযোগিতা হতো। হাজার হাজার দর্শক ছোট ছোট নৌকায় বসে প্রতিযোগিতা উপভোগ করত। হাওরের অন্য পাশে বসতো ঘাটু গানের আসর। দুটো খোলা নৌকা একসঙ্গে জড়ো করে তার ওপর পাটাতন লাগিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হতো। ওপরে চাঁদ-তারা খচিত শামিয়ানা খাঁটিয়ে রঙিন কাগজের নিশান দিয়ে মঞ্চটা আরও আকর্ষণীয় করা হতো, তারই মধ্যে চলতো ঘাটু গানের আসর।
আমরা ছোট নৌকায় চড়ে দূর থেকে উঁকি দিতাম, তখন কানে বাজত চিকন কণ্ঠের গান আর উচ্চ শব্দে ঢোল হারমোনিয়ামের আওয়াজ। চোখে ভাসত কিছু মাশুলধারী মাস্তান টাইপের লোক লাঠি সুলফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তখন সত্যিই ভয়ে ত্বরিত স্থান ত্যাগ করতাম। পরে অবশ্য গল্প শুনেছি, একদল মাস্তান লোক নাকি ঘাটু শিকারি থাকে, তারা কখনো অতর্কিতে ঘাটুকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। যার দরুন অপর পক্ষের এই সতর্কতা। তারপর গল্প শুনতাম, ঘাটু নাকি বেচাকেনাও হতো। এখন বুঝতে পারি, এটি মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এখন মনে হয় এই ব্যাপারটা আর সংস্কৃতির মধ্যে ছিল না। ঘাটু গানের যে লোকজ ঐতিহ্য ছিল, তা যেন ধীরে ধীরে লোকজ স্মৃতির অগোচরে এক অপসংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছিল।
আসল ঘাটু গান হারিয়ে যাওয়া আরও দশটা লোকালয়ের মতো মুছে গেছে আমাদের যাপিত জীবনের পাতা থেকে।
বাংলাদেশের প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদ ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ নামে চলচ্চিত্র তৈরি করেন তাতে তিনি ঘাটুগানের
চিত্র তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে নেচে-গেয়ে জমিদারদের মনোরঞ্জন করতো ‘ঘেটুর দল’ বলে যে কিশোর শিল্পীদের দল, তাদের গান এবং তাদের ওপর যৌন নিপীড়নের কাহিনি নিয়েই মূলত এই ছবি।
আজকের আধুনিক যুগে সুদর্শন ছেলেদেরকে মেয়ে সাজিয়ে ঘাটুগান গাওয়ানো প্রয়োজন পড়ে না। Slept ঘাটুগান, অষ্টক গান, সার্কাস ও যাত্রাগানে মেয়েরা অংশ নেয় কালেভদ্রে ওইগুলো অনুষ্ঠিত হলে।
সেকালের জমিদাররা নেই। ঘাটুগানের চলও আজ প্রায় উঠেই গেছে। তাছাড়া, টেলিভিশন, ফেসবুকের যুগে বাংলাদেশের লোকগীতি ঘাটুগান অবলুপ্ত হবে এটাই স্বাভাবিক।
তবু্ও বলতে হয়, বাংলাদেশের এককালের ঐতিহ্যবাহী ঘাটুগানের অতীত ছিল, যা লোকজ সংস্কৃতিতে বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে বিবেচিত হতো। আমরা কোনক্রমেই অতীতের লোকসংগীত ঘাটুগানকে বিস্মৃত হতে পারি না। কারণ ঘাটুগানের মধ্যে অপসংস্কৃতি অনুপ্রবেশ ঘটলেও সেযুগের জনমানসে বিনোদনের খোরাক ছিল অবশ্যই।
তথ্যসূত্র : ১) উইকিপিডিয়া, ২) বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, ৩) সেঁজুতি পত্রিকা- কলকাতা
মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।