আনুমানিক ৪০০ বছর আগে চন্দ্রনাথ ঘোষ, হুগলী জেলার অন্তর্গত বিলসরা গ্রামে এই ভিটে বাড়ী প্রস্তুত করেন। বাবু চন্দ্রনাথ ঘোষের পুত্র গৌর মোহন ঘোষের সময় এই পরিবারের আর্থিক এবং সামাজিক প্রতিপত্তিও বৃদ্ধিলাভ করে। খুব সম্ভবত তিনিই বাড়ীর এই দুর্গাপূজার সূচনা করেন। বর্ধমানের রাজার অধঃস্তন বাইশটি গ্রামের জমিদার ছিলেন এই পরিবার। সুরক্ষায় জন্য সদর দরজার সামনে রাখা থাকতো দু-খানা কামান। একবার ভেবে দেখুন, শোভাবাজারের দেবেরা তখনও সাহস করে উঠতে পারেননি ইংরেজ সরকারের বিনা অনুমতিতে বাড়িতে দুর্গা পুজো করার। সেই সময় এই ঘোষেরা জাঁকজমকপূর্ণ এই দুর্গা পুজো শুরু করেন।
পারিবারিক সুত্রে জানা যায় বর্ধমান রাজবাড়িতে অষ্টমীর সন্ধিপুজো শুরু হলে ৮টি কামান দাগা হতো, সেই কামানের গোলার আওয়াজ এসে পৌঁছত এই সাহেব বাড়ী পর্যন্ত। সেই আওয়াজ শোনার সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ীর সামনে রাখা দুটি কামান থেকেও গোলা দাগা হতো আর তার সাথে সাথেই এই ঘোষ বাড়ির কত্তা, বাড়ীর ছাদ থেকে বন্ধুক ছুঁড়তেন। শুরু হতো সন্ধিপূজো। পুজোর পাঁচ দিনই চলতো খাওয়া-দাওয়া, দরিদ্র নারায়ণ সেবা। বাড়ীর সামনে মেলা বসতো সেই সময়। শুধু দুর্গোৎসব নয়, প্রচলিত ছিল দোল, রাস, জগদ্ধাত্রী পুজোর। পাত পড়তো, দু-তিন হাজার লোকের। আজও এই বাড়ি থেকে কেউ বিনা আতিথেয়তায় বাড়ী ফেরে না। আজও নবমীর দিন আমন্ত্রিত হন বহু মানুষ।

বিলসরা ও তার সংলগ্ন সমস্ত গ্রামের মানুষ ওই দিন মহানন্দে তৃপ্তির সাথে মহাভোগ গ্রহণ করেন। যে সমস্ত নিয়ম গুলি আজ সময়ের পরিবর্তনে প্রায় সবাই ভুলে গেছে ঘোষেদের বাড়িতে কিন্তু তার সবটাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে আজও পালন করা হয়। উল্টো রথের দিন ঠাকুরের কাঠামো প্রতিষ্ঠা থেকে মহালয়ার দিন চক্ষু সম্প্রদান সবটাই বাড়ীতে কুমোর পরিবার পুরুষানুক্রমে চালিয়ে আসছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে ভক্তি ও শিল্প সত্তার এক অভিনব সমন্বয়। শোনা যায় একবার পুজোর সময় ডাকাতি করতে এসেছিল একদল ডাকাত। কিন্তু তারা কোনকিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি কারণ, মা দুর্গা নাকি দর্শন দিয়েছিলেন। মা নাকি নিজে বলেছিলেন, সাবধান! এই আমার আবাস। শেষে ডাকাতের দল কেঁদে, মাথা ঠুকে ক্ষমা চেয়েছিল মা দুর্গার কাছে। যাওয়ার আগে ডাকাতরা মশাল জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিল দুর্গা মায়ের প্রতীক হিসাবে। বলে গিয়েছিল, এই যে মশাল তারা জ্বালিয়ে গেল, কোনোওদিন আর ডাকাতি হবে না।

সেই পরম্পরা বজায় আছে আজও। এখনো বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রায় দুর্গা মায়ের সঙ্গে যায় দুটি জ্বলন্ত মশাল। ব্যবসা বাণিজ্যের কারণে ও জমিদারির বিভিন্ন বিষয়ে এ বাড়িতে ফিরিঙ্গি সাহেবদের আনাগোনা লেগেই থাকতো সেখান থেকেই লোকমুখে এ বাড়ীর নাম হয়ে যায় সাহেব বাড়ি। জানালেন এ প্রজন্মের এক সদস্য। তবে এখানে যেহেতু মন্দিরে গোবিন্দ জিউ প্রতিষ্ঠিত তাই অন্দরে চলাফেরার অনুমতি ফিরিঙ্গি সাহেব বা মেমদের ছিল না। তাই তাঁদের আপ্যায়নের জন্য পাশে স্থাপন করা হয়েছিল আরেকটি দুই মহলা ভবন। ঘোষেরা যে শুধু জমিদারি করতেন তা না। সমাজ কল্যানে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি প্রকল্পে তাদের নিবিড় তাগিদ ছিল। বৈচি স্টেশন থেকে সাত কিমি পাকা রাস্তা এঁরা নিজেদের টাকায় জমি কিনে মজুর এনে বানিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিল টোল , ছাত্রনিবাস ও শিক্ষকনিবাস। এঁদের উত্তর প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথ ঘোষ প্রতিষ্ঠা করেন এই এলাকার সর্বপ্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয়, যার খরচ বহন করতো এই ঘোষ পরিবারই। পরবর্তীকালে সরকার এই বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেয় এবং এটি বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে।

তৈরী করেছিলেন আবাসিক হাসপাতাল যেখানে ডাক্তার, সেবিকা, রুগী সবার থাকার ব্যবস্থা ছিল। সরকার ওই হাসপাতালের দ্বায়িত্ব নিলেও এটি রক্ষা করতে পারেনি যা আজ ভগ্নপ্রায়। আনুমানিক চারশত বছর আগে এই বাড়ীতে যে সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল তা বর্তমানে প্রজন্ম বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। বৈভবে হয়তো ভাটা পরেছে কিন্ত আতিথেয়তা ও নিয়মানুবর্তিতায় ঘোষ পরিবার আজও সমুজ্জ্বল।
তথ্য ও ছবি : ঘোষ পরিবারের পক্ষে অনিমেষ ও সুভাশিষ ঘোষ
অজানা কে জানতে পারলাম, খুব ভালো লাগলো
কেমলদা কে অনেক অনেক ধ্যন্যবাদ ????????
Khub bhalo laglo. Kintu vabte abak laage je arakom akta oitijyabahi poribarer chele chitingbaaz hoye gelo. Aami “Sunandan Ghosh/ Honey” r katha bolchi.ak doridra loker 1.30 lac niye ga dhaka diyeche.
পড়ে ভাল লাগলো, জানা গেল ইতিহাস।