প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল কংগ্রেস রাজনীতি করার পর দল ছেড়েছেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গুলাম নবি আজাদ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা করাতে দলের অন্তর্বর্তীকালীন সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী যখন দেশের বাইরে, সেইসময় পাঁচ পাতার ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দেন প্রায় ২০ বছর এআইসিসি’র সাধারণ সম্পাদক গুলাম নবি আজাদ। ওই চিঠিতে তিনি কংগ্রেসের পতনের জন্য তিনি সরাসরি প্রাক্তন সভাপতি রাহুল গান্ধীকে দায়ী করেছেন। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের বিপুল পরাজয়ের পরই ২৩ জন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দলীয় রণকৌশল ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা দলের অন্দরে জি-২৩ গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। ইতিমধ্যেই এই গোষ্ঠীর অন্যতম পরিচিত মুখ কপিল সিব্বল কংগ্রেস ত্যাগ করে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির সমর্থন নিয়ে নির্দল হিসেবে রাজ্যসভায় গিয়েছেন। অন্যদিকে, হিমাচলপ্রদেশের স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন আরেক জি-২৩ নেতা আনন্দ শর্মা। তারপর কংগ্রেস থেকে বিদায় নেন গুলাম নবি আজাদ।
কংগ্রেস ত্যাগের কথা ঘোষণা করার পর থেকেই গুলাম নবি আজাদের বিজেপিতে যোগদান ঘিরে জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে গুলাম নবি আজাদের ব্যক্তিগত ভাল সম্পর্কের কথা সোস্যাল মিডিয়াতে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, গুলাম নবি আজাদ যেদিন সাংসদ হিসেবে রাজ্যসভা থেকে বিদায় নেন, সেদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেঁদে ফেলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের সেই ছবি সোস্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করে অনেকেই দাবি করেন, গুলাম নবি আজাদ খুব শীঘ্রই গেরুয়া শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। প্রাক্তন প্রবীন কংগ্রেস নেতা আজাদের বিজেপিতে যোগদানের জল্পনাকে বেশ কিছুটা চাগিয়ে দেয় কংগ্রেস থেকে সাসপেন্ড হওয়া অতি সম্প্রতি বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতা কূলদীপ বিষ্ণোর মন্তব্য। তিনি প্রায় ঘোষনা করে দেন যে আজাদ বিজেপিতে যোগ দিতে চাইলে তাঁকে স্বাগত জানানো হবে। এমনকি তিনি একথাও জানান যে, দল চাইলে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
কিন্তু প্রবীণ নেতা আজাদ কংগ্রেস দলের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার পর এ ধরনের যাবতীয় জল্পনার প্রেক্ষিতে জানান, তিনি আপাতত কারও গোলামি করবেন না, তিনি ‘আজাদ’ই থাকবেন। যদিও কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীকে লেখা তাঁর পাঁচ পাতার চিঠির প্রতিটি ছত্রে তিনি রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করে তাঁকে ‘অপরিপক্ক’ এবং ‘রাজনীতির বিষয়ে অ-গম্ভীর’ বলেছেন। কিন্তু তারপরও তিনি বলেছেন যে গান্ধী পরিবারের প্রত্যকের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি যা বলেছেন, তা কংগ্রেস দলের স্বার্থে বলেছেন। তিনি কংগ্রেস দলের পতনের কথা বলেছেন। প্রসঙ্গত, কাশ্মীরি এই নেতার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্ক খুবই ভাল ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর আমল থেকে রাজীব, নরসিমা রাও, মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভাতেও কেন্দ্রের মন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু রাহুল গান্ধীর কাছ থেকে তিনি আশানুরূপ মর্যাদা পাননি। কংগ্রেসের রাহুল-কেন্দ্রিক নেতৃত্বের সঙ্গ আজাদের বিরোধের কথা খুব ভাল করেই জানে বিজেপি। সুতরাং এমন একজন পোড় খাওয়া স্বচ্ছ রাজনীতিককে বিজেপি তাদের দলে পেতে চাইবেই। চলতি বছরের শেষেই জম্মু ও কাশ্মীরে নির্বাচন হওয়ার কথা। বিজেপিতে জম্মু ও কাশ্মীরের ভূমিপুত্র তেমন কেউই নেই যে মোদী-শাহদের নির্বাচনি বৈতরণি পার করে দেওয়ার একক ক্ষমতা রাখে।
পাশাপাশি কংগ্রেস-ত্যাগী আজাদের দলত্যাগের পরেই তাঁর মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মানবিক ব্যবহার’-এর প্রশংসা শোনা গেল। স্মৃতির পাতা থেকে মোদীর ‘নরম মনে’র নিদর্শনও তুলে ধরেছেন তিনি জানান, মোদীর সম্পর্কে আগে তাঁর ‘ভুল ধারণা’ ছিল। উল্লেখ্য, রাজ্যসভার সাংসদ না থাকার এই দেড় বছরেও আজাদ কিন্তু নয়াদিল্লির ৫, সাউথ অ্যাভিনিউর এমপি বাংলোতেই বসবাস করছেন। ইতিমধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গুলাম নবী আজাদের ঘনিষ্ঠ অনুগামী জি এম সারুরি জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আজাদ নতুন রাজনৈতিক দলের কথা ঘোষণা করবেন৷ আজাদ দল ছাড়ার পরই কাশ্মীর কংগ্রেসে ভাঙন ধরে৷ তাঁর অনুগামী কয়েকজন প্রাক্তন কংগ্রেস বিধায়ক দলত্যাগ করেন৷ সারুরি জানান, এক নতুন রাজনৈতিক দল কাশ্মীরে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে৷ গুলাম নবি আজাদ সেই দলের প্রতিষ্ঠাতা৷ ৪ সেপ্টেম্বর আজাদ জম্মুতে পৌঁছে নতুন দলের ব্যাপারে কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
আজাদের নতুন দলের কথা জানার পরেও কিন্তু জল্পনা থেমে নেই তাঁকে নিয়ে। নতুন দলের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন, সেই দল কি বিজেপির বি-টিম। প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা আজাদ জানিয়েছেন, তিনি জম্মু ও কাশ্মীরে গিয়ে সেই রাজ্যে তাঁর নিজস্ব দল গঠন করবেন। আপাতত জাতীয় দলের কথা ভাবা যাচ্ছে না। কিন্তু কোন সময়ে তিনি আঞ্চলিক দলের কথা বলছেন, যখন বিজেপি নেতৃত্ব সব আঞ্চলিক দলগুলিকে বিলুপ্তি করতে চাইছে। তাহলে বুঝতে হয় আজাদ শরদ পাওয়ার, মমতা বন্দ্যেোপাধ্যায়ের মতো আলাদা দল গঠন করে জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই চাইছেন? কিন্তু এই মুহুর্তে ৭৩ বছরের প্রবীণ নেতার পক্ষে এখন আলাদা দল গড়ে নতুন করে জাতীয় দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা সম্ভব কিন্তু তাতে সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাই বিজেপিতে সরাসরি যোগ না দিয়ে নতুন দল গড়ে কংগ্রেসের বিরোধীতা মানে বিজেপির বি-টিম।
“গোলাম মালিক খোঁজে, মালিক গোলাম।”
হতেই পারে। এখন রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। তবে এরজন্য যে রাহুল অন্যতম দায়ী এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনীতিতে ও এখনও নাবালক। আংশিক সময়ের রাজনীতিবিদ। দায় নেবে না কিন্তু দলের সবকিছুতেই কলকাঠি নাড়বে। বড়ো বড়ো বিবৃতি দিয়েই খালাস। এর হাতে ক্ষমতা থাকলে কংগ্রেস কিছুদিন বাদেই আঞ্চলিক দলে পরিণত হবে। লিখে দিলাম।