টাঙ্গাইল নামে পশ্চিমবঙ্গের জিআই, বন্ধুদের কাছে কারিগর সংগঠনের খোলা চিঠি
পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ির জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনের স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জগতে প্রবল উথালপাথাল। ভদ্রবিত্তরা তাঁদের রাজনীতির রাস্তায় হাঁটছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যখন কোনও একটা কারিগরি বস্তু জিআই শংসাপত্র পায়, কারিগর সংগঠন থেকে, উৎসাহ নিয়ে পোস্ট দেওয়া বন্ধুকে, আনন্দ প্রকাশ করা সঙ্গীকে প্রশ্ন করি এই শংসাপত্রে কারিগরের লাভ? একই প্রশ্ন আমি কারিগর সংগঠনের পক্ষ থেকে আবারও পেশ করলাম এই চিঠি মার্ফত, পশ্চিমবঙ্গ টাঙ্গাইল নামে জিআই শংসাপত্র পেলে ফুলিয়া, সমুদ্রগড়, শান্তিপুরের তাঁতির কী লাভ আর বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের তাঁতিদেরই বা কী ক্ষতি। তাঁতির, কারিগরের সামগ্রিক যা ক্ষতি করার রাষ্ট্র করে চলেছে – বাংলার একের পর এক জেলার কাঁসা পিতলের উৎপাদনের কথাই ভাবুন। কজন বাড়িতে কাঁসাপিতলের তৈজস পণ্য ব্যবহার করেন জিজ্ঞাসা করে লজ্জা দেব না। শুধু বলব জাতিরাষ্ট্র কবেই বা কারিগর, কারিগর ব্যবস্থার পাশে দাঁড়িয়েছিল? সে তো সেই উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয় নি — তার একচক্ষু কাজ কর্পোরেটের খিদমত। তাই ভোটের রাজনীতিতে জিআই একটা চুষিকাঠিমাত্র — তারই ক্রেডিট নিতে কেন্দ্র রাজ্যের লড়াই। মাথা ঠাণ্ডা করে একটু বিশদেই আলোচনা করা যাক কারিগরের বন্ধু-শত্রু বাখান।
জিআই বিতর্কের ইঙ্গিতে আমাদের ডাক্তার-চাষী বন্ধুর টুকরো মন্তব্য ‘certificate, licence ইত্যাদি চোথা কাগজ নিয়ে চাষী কারিগরের ছেঁড়া যায়’। আমি মনে করি না উনি বাড়িয়ে কিছুই বলেন — শুধু চোখে আঙুল দিয়ে বাংলার কারিগরদের জীবনের বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়েছেন। কারিগর ব্যবস্থা কোনও দিনই সরকার বা রাষ্ট্র মুখাপেক্ষী ছিল না, আজও এই ঘোরতর দুর্দিন কলিতেও নেই। কারিগর সরকারি সার্টিফেকেট দিয়ে কী করবে? সেই সার্টিফিকেট দেখিয়ে কী সে তার স্থানীয় বাজারে তার ভৌগোলিক অথেন্টিকেশন প্রমান করবে? জয়নগরের মোয়া বা বsগুড়ার দই বা যশোরের গুড়ের শংসাপত্র সে নিজেই বলেই তার পণ্যে জায়গার নাম কারিগর পিয়াসীরা বসিয়ে দিয়েছে। সে মূর্তিমান জিআই। রাষ্ট্র তাকে কিসের জি আর দেওয়ার ক্ষমতা ধরে?
গত ২৬৬ বছর আমাদের মত প্রাক্তন উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো উপনিবেশের ছেড়ে যাওয়া অর্থনৈতিক নীতিই অনুসরণ করে। রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সামাজিক নীতিমালা বিপজ্জনকভাবে দেশিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিপরীতে আর কর্পোরেট উৎপাদন ব্যবস্থার পক্ষে ঝুঁকে আছে। ভারতের জাতিরাষ্ট্র কাঠামো গত ৭ দশক করর্পোরেটদের সক্রিয় সাহায্য করে কারিগর ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। মাত্র চার বছর আগে সরকারের কর্পোরেট বন্ধু নীতি বদলাতে চাষীদের এক বছর ধরে রাজধানী অবরোধ করতে হয়। শুধু সেনা নামিয়ে রাস্তাজুড়ে বসে থাকা চাষীদের উৎখাত করা ছাড়া যত ধরণের অত্যাচার নামানো যেতে পারে, রাষ্ট্র যথাসম্ভব সেই সব কাণ্ড করেছে।

ফিরে আসি তাঁতে। ১৮২০ থেকে বাংলায় তুলো চাষ বন্ধ। ১৮৭০-এর পরে সুতোর মিল তৈরি হওয়ার পর ক্রমশ সুতো কাটনির কাজ শেষ হয়ে আজ দুই বাংলাতেই সুতো কাটনি খুঁজে পেতে মাইক্রোস্কোপ ধরতে হয়। সেই যে মহিলাদের রোজগার গেল, তার পক্ষে রাষ্ট্র ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে? কোন সঙ্গঠন দাঁড়িয়েছে? তারপর কাপড়ের মিল এল। সেই মিলগুলোর ধাক্কায় কত তাঁতি কাজ হারিয়ে দিন মজুর হয়েছেন আমরা জানি না। তাঁতিকে পুরোপুরি যে কর্পোরেটের খাদ্য করে দেওয়া হল জিআই দিয়ে সেই বাস্তবতা পাল্টাবে? কাপড়ের মিল নিয়ে শহুরে বাবুদের রোমান্টিসিজমের অভাব ছিল না – এক দিকে বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল তো অন্য দিকে মোহিনী মিল। অগুনতি মিল তাঁতির রোজগার খায় নি? তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থা কী করছিল? ভদ্রবিত্তরা মোহিনী মিলের ছাপ মারা কাপড় পরে ঘুরেছেন। কবি সাহিত্যিকেরা মিলের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। রাষ্ট্র আরও আরও মিল বানাবার জন্যে উদ্যোক্তাদের প্রণোদিত করেছে — তাঁতের সংখ্যা বাড়াবার জন্যে কিন্তু কুটোটিও নাড়ে নি। এই মিলের ব্যবস্থাপনায় কাজ করেছে ভদ্রলোকেরা। তাঁতি তো আর ভদ্রলোকেদের কাজ দেয় না। ফলে তাঁতি মরল কী বাঁচল তাতে ভদ্রবিত্তের কিছু যায় আসে না। কারন অধিকাংশ ভদ্রবিত্ত প্যান্ট শার্ট পরে। তাঁতি, কাটনি, রঞ্জক কেউই তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ নয়।
এই যে টাঙ্গাইল জিআই পেল ফুলিয়া-শান্তিপুর-সমুদ্রগড়ের তাঁতিরা, গত ১০ বছরে এখান থেকে কত তাঁতি উচ্ছেদ হয়েছেন? আজ থেকে ৪০ বছর আগেও ফুলিয়ায় ২ লক্ষের বেশি তাঁতি ছিলেন। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর, কোচবিহার থেকে বহু তাঁতি ফুলিয়ায় এসে তাঁত বুনেছেন। গত দশ বছরে ফুলিয়া থেকে হাজার হাজার তাঁতি কাজ ছেড়েছেন — সংগঠকেরা বলেন ৫০ হাজার বা তারও বেশি — রোজ কয়েকশ উচ্ছেদ হচ্ছেন। যে রাষ্ট্র তাঁতি সমাজকে জিআই দিয়ে প্রবোধ দিচ্ছে, সেই রাষ্ট্রই আবার তার অঞ্চলে ছোট ছোট কাপড়ের মিল বসিয়ে দিচ্ছে, সেই মিলে এক দিনে অনেক শাড়ি কাপড় তৈরি হচ্ছে, তাঁতিরা কারিগর থেকে মিলের শ্রমিক হচ্ছেন। জিআই পাওয়ার পরে আমলা বা তাঁতি নেতারা নিশ্চিত করতে পারবেন ফুলিয়া-সমুদ্রগড়-শান্তিপুর থেকে আর তাঁতি, তাঁতের সঙ্গে জুড়ে থাকা কারিগর কাজ ছেড়ে যাবেন না? হাতের তাঁতের বাজার বাড়বে? শান্তিপুরে তাঁত ঘরে ইলেক্ট্রিক আলো জ্বললে ডোমেস্টিক হারে বিদ্যুতের মাশুল নেওয়া হয়, তার ১০ কিমি দূরে ফুলিয়ায় একই ইলেক্ট্রিক আলোর জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল হার নেওয়া হয়, তাদের দাবি ছিল এখানেও ডোমেস্টিক হারে বিদ্যুৎ দেওয়া হোক। তাঁতি সঙ্গঠন গত দেশ দশক দরবার করে এই তুচ্ছ ব্যাপারটার সমাধান করতে পারেন নি। তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা জিআইএর চোথা কাগজ ধরিয়ে দিল। দিল। বন্ধুর ভাষা ধার করে বলি, ‘চোথা কাগজ নিয়ে চাষী কারিগরের ছেঁড়া যায়’। সে রোজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে আছে আর রাষ্ট্র তাকে জিআইএর চুষিকাঠি ধরাচ্ছে।
বাংলাদেশর কারিগরদের অবস্থা কী এর থেকে আলাদা? দুই বাংলায় সরকারি উদ্যমে মসলিন রিভাইভ্যালের চক্কর দেখে সংগঠনের পক্ষে আমি আর শফিকুল চন্দন লিখেছিলাম, মসলিন নিয়ে সরকারের মন্ত্রী আমলার যে উৎসাহ, সেই উৎসাহ সার্বিক হাতে চালানো তাঁত ব্যবস্থা নিয়ে বিন্দুমাত্রও নেই। সরকার পক্ষ, মিডিয়া, পাঠক মসলিন রিভাইভ্যাল নিয়েই বেতর। মসলিন কজন তাঁতিকে কাজ দেবে? মসলিন রিভাইভ্যাল ভাল ব্যাপার — ভদ্রবিত্তেরর ইমোটিভ ইস্যু। কিন্তু দিনের শেষে এটা এলিট প্রোডাক্ট, স্পেশালাইজড প্রোডাক্ট। এই ধরণের প্রকল্পে রাষ্ট্রের, আমলাদের, ফেসভ্যালু বৃদ্ধি হয়, ডিজাইনারদের রোজগার বাড়ে। তাঁতিদের কী হয়? তাদের উচ্ছেদ হতে হয়, কারন ইওরোপ থেকে ছোট ছোট কাপড়ের কল এশিয়ায় চলে আসছে। রাষ্ট্র সে সব তাঁতের অঞ্চলে বসাবার জন্যে উৎসাহ দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার যে দামে তাঁতিদের থেকে কাপড় কিনে নিজের ব্রান্ডে দোকান থেকে বিক্রি করে, প্রথমত সেই দামে তাঁতির পেটের ভাত জোটে না, দ্বিতীয়ত সেই টাকা তাঁতির জোগাড় করইতে চটির শুকতালা খয়ে যায়। তারপরেও সরকারের জিআই না কী তাঁতি-বন্ধু! আর সরকারি ভর্তুকি সব পায় ভদ্রবিত্ত পরিচালিত সমবায়গুলো কাপড় না বিক্রি করে শুধুই বিল কেটে।

ভারতের টাটা বাংলাদেশে গাড়ি বিক্রি করে, আর বাংলাদেশের প্রাণ ভারতে তার খাওয়ারদাওয়ার বিক্রি করে। কর্পোরেটের কাছে সীমান্ত সমস্যা নয় — কারন রাষ্ট্র দিনের শেষে তারাই চালায় — চাষী কারিগর নয়। কারিগর, ছোট ব্যবসায়ী ৫০ হাজার টাকার বা ১ লক্ষ টাকার পণ্য নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে দুই বাংলার বাজারে ব্যবসা করতে আসতে পারেন না। রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাকে সেই সুযোগ করে দেয় না। সীমান্তের আইন দুপক্ষকেই আটকায়। তাকে যে অর্থ সীমান্তকে দিতে হয়, তাতে তার পড়তা পোষায় না। বাস্তবতা এটাই।
দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থা মূলত উপনিবেশিক। উপনিবেশেরই অর্থনীতি, রাষ্ট্র কাঠামো আজও তিন দেশের বাস্তবতা। গত ৭ দশকের ভারতে গ্রাম থেকে যে ২০-২৫ কোটি মানুষ উচ্ছেদ হয়েছে, তার অধিকাংশ কারিগর চাষী। রাষ্ট্র তার জীবন জীবিকার নিরাপত্তা দেয় নি, শহরে এনে কম পয়সায় ঘেটোতে রেখে কর্পোরেট কারখানায় মজুর বানিয়েছে। এই উপনিবেশিক বাস্তবতা এড়াতে ধনীরা সহজেই বিদেশে সম্পদ পাচার করেন, ভদ্রবিত্তরা দেশ ছেড়ে প্রাক্তন মেট্রোপলিটনে চাকরি করতে বা সেবা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, কিন্তু সেই প্রিডেটরি উপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ২৬৬ বছর ধরে উচ্ছেদের আশংকা মাথায় নিয়েও চাষী কারিগরকে ঘাড় গুঁজে দেশেই কাজ করতেই হয়, কারন সে তার অঞ্চলকে ভালবাসে, তার মাটিতে মরিওতে চায়, সে তার কাজকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে – রাষ্ট্র প্রতিমুহূর্তে তার রুটি রুজি খেয়ে নেওয়ার উদ্যম নিচ্ছে জেনেও সে পড়ে থাকে ঠকাঠক তাঁতে পিঠ বেঁকিয়ে।
মাথায় রাখুন ১৮২০তে বাংলার তাঁতের সরতাজ ঢাকা জনশূন্য হয়েছিল। আজও সেই উপনিবেশিক নীতি বদল হয়েছে? হয় নি। দুই বাংলায় বহু বন্ধু বিষ চাষের বিরুদ্ধে লড়ছেন। রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে? নামমাত্র। ভারত রাষ্ট্র শুধু সারে ভর্তুকি দেয় ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। চাষ কমিয়ে, পরম্পরার উৎপাদন ধ্বংস করে ইওরোপের মত উন্নত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া রাষ্ট্র কারিগরকে জিআই শংসাপত্র দিচ্ছে তার উপকারের জন্যে? কয়েন না কয়েন না কত্তা ঘুরায় হাসব।

আমরা মানি জিআই পিওরলি ভদ্রবিত্ত ইস্যু — তাই নেট দুনিয়া উত্তাল। বর্তমান জিওপলিটিক্যাল সিনারিওতে এই ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের ভদ্রবিত্ত বেসামাল। তারা প্রতিবাদ করছেন ভারতের দখলদারির মানসিকতায়। বঙ্গভাগের পর থেকে ভারত রাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় দাদাগিরি চালিয়েছে। মালদ্বীপে সে অবাঞ্ছিত, বাংলাদেশে ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হচ্ছে। আমরা কারিগরেরা এই ডাকের সঙ্গে আছি। সমর্থন দিচ্ছি। কিন্তু আমরা সীমান্তের দুপাশের বন্ধুদের বলতে চাই, অতীতে বহু পণ্য জিআই পেয়েছে। জিআই শংসাপত্র দিয়ে কারিগরকে পণ্য বিক্রি করতে হয় নি। সে পণ্য বিক্রি করেছে নিজের দক্ষতায়, নিজের উদ্ভাবনী শক্তিতে। কারিগরের জোর জিআই নয়, তার বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থায়। সেই বাজার রাষ্ট্রের উদ্যমে কর্পোরেটরা খেয়ে নিচ্ছে। গোয়েঙ্কাদের শপিং মলে ধনেপাতা বিক্রির বিরুদ্ধে হকার ইউনিয়ন মল অবরোধ করেছিল। সে ধনেপাতার মত তুচ্ছ পণ্যের বাজার ছাড়ছে না — কারন সে জানে রাষ্ট্র তার পক্ষে।
যে ভদ্রবিত্ত রাষ্ট্রযন্ত্র চালায় তাদের উদ্দেশ্যে কারিগর সংগঠনের চিঠি শেষ হচ্ছে এই বার্তায় — ২৬৬ বছরের উপনিবেশ, নবজাগরণ, স্বাধীনতার সময় সব আমরা দেখে আজও জীবিত আছি। আমরা নিজেদের সামলাতে পারি। শুধু কর্পোরেট আর জাতিরাষ্ট্রের ভালকরার উদ্যমগুলো মাঝেমধ্যে ভালবাসার অত্যাচার হয়ে আমাদের দেহে দগদগের ঘাএর মত ফুটে ওঠে।
জিআই ভিক্ষে চাই না হে জাতিরাষ্ট্রদাতা, কুকুর সামলাও।